kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

পদ্মার ঢেউ রে...

আন্দালিব রাশদী

২৪ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পদ্মার ঢেউ রে...

অঙ্কন : মাসুম

শচীন দেব বর্মনের কণ্ঠে কাজী নজরুল ইসলামের ‘পদ্মার ঢেউ রে’ শুনে আমার কালের মানুষের নদী ও নারী চেনা।

ও পদ্মারে ঢেউয়ে তোর ঢেউ উঠায় যেমন চাঁদের আলো/মোর বঁধুয়ার রূপ তেমনই ঝিলমিল করে কৃষ্ণ কালো। /সে প্রেমের ঘাটে ঘাটে বাঁশি বাজায়/যদি দেখিস তারে এই পদ্ম দিস তার পায়/বলিস কেন বুকে আশার দেয়ালি জ্বালিয়ে/ফেলে গেল চির অন্ধকারে। ...

পদ্মার নাম নিয়ে রচিত হয়েছে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’।

বিজ্ঞাপন

পদ্মা সেতু নিয়ে কী রচিত হয় আমরা সে অপেক্ষায় রইলাম। তবে নদী ও সেতু নিয়ে সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে কালজয়ী যেসব কর্মকাণ্ডের সমাহার ঘটেছে তার কিছু জেনে নিতে পারি।

রবীন্দ্রনাথকে এড়িয়ে নদী নিয়ে কথা বলা সমীচীন হবে না—তিনি দিয়েছেন স্মরণীয় গান :

ওগো নদী আপন বেগে পাগলপারা

আমি স্তব্ধ চাঁপার তরু গন্ধ ভরে তন্দ্রাহারা...

ওগো নদী চলার বেগে পাগলপারা

পথে পথে বাহির হয়ে আপনহারা

আমার চলা যায় না বলা, আলোর পানে প্রাণের চলা

আকাশ বোঝে আনন্দ তার, বোঝে নিশার নীরব তারা।

১৯৫৭ সালের আলোড়ন সৃষ্টি করা চলচ্চিত্র ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই’ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন বার্মা সীমান্তে কৌশলগত কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাওয়াই নদীর ওপরের সেতু নিয়ে গড়ে ওঠা কাহিনি। ১৯৬১ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী ইভো আদ্রের উপন্যাস ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য দ্রিনা’ চলচ্চিত্রায়িতও হয়েছে, সেখানে অনুভূত হয় মানুষ ও সেতুর আর্তনাদ। মিখাইল শলোকোভ ১৯৬৪ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন, একটি উপন্যাস তাঁকে বিশ্বে পরিচিত করিয়েছে, ‘অ্যান্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দ্য ডন’—‘ধীরে বহে ডন’ নামে বাঙালি পাঠকের হাতে পৌঁছেছে। সেই ডন নদী তারুণ্য হারিয়েছে, কাওয়াই শুকিয়ে গেছে, দ্রিনাও বিপন্ন—সাহিত্যে এখন নদী বাঁচানোর আহাজারি।

ইভো আদ্রে (১৮৯২-১৯৭৫) শৈশবেই পিতৃহারা, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দ্রিনা নদীর পারে মায়ের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়ে ওঠেন। দ্রিনা নদী রচনা করেছে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা এবং সার্বিয়ার প্রাকৃতিক সীমান্ত। উসমানিয়া রাজত্বে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে রাষ্ট্র তার প্রাপ্য কর হিসেবে এক সার্বিয়ান মহিলার শিশুপুত্রকে উঠিয়ে নেয়। করের শিকার সে একাই নয়—প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকেও একইভাবে শিশু কর আদায় করা হয়। শিশুদের নিয়ে সরকারের প্রতিনিধি জাহাজ ঘাটের দিকে রওনা হয়—পেছনে তাদের অনুসরণ করেন বিলাপরত বিপন্ন মায়েরা। উপন্যাসের একটি ধর্মান্তরিত শিশু চরিত্র মেহমেদ। রাষ্ট্র তাকে লালন-পালন করে, শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে, তার কর্মক্ষেত্রে অঢেল উন্নতি হয়। ৬০ বছর বয়সে সেই বালক উসমানিয়া সাম্রাজ্যের একজন খ্যাতিমান উজির। বিত্ত, বৈভব, খ্যাতি ও সংবর্ধনার মধ্যেও দ্রিনা নদীর ধারে তাঁর জীবনের একটি বেদনার সুর কেবলই বাজতে থাকে—ঠিক সেখান থেকেই তাঁকে অপহরণ করে জাহাজে ওঠানো হয়। কিন্তু সামনে বিশাল খরস্রোতা নদী—নদীর কারণে ক্রন্দসী জননী আর এগোতে পারেন না। সেখানেই থমকে দাঁড়ান আর তাঁর ক্রন্দন মিশে যায় নদীর ঢেউয়ে, বাতাসের প্রবাহে, অরণ্য ও পর্বতে।

সেই উজির মেহমেদ পাশা শকোমোভিচ সিদ্ধান্ত নিলেন দ্রিনা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ করবেন—সেতুর প্রথম প্রস্তর স্থাপিত হবে ঠিক সেখানেই, যেখানে শিশুদের সঙ্গে তাদের মায়েদের বিচ্ছেদ ঘটেছে, সেই জাহাজ ঘাটে। ১৫৬৬ থেকে ১৫৭১—এই সময়ে দ্রিনা নদীর ওপর সেতুটি নির্মিত হলো। পৃথিবী জানল মেহমেদ পাশার অন্তরের কান্না এবং মিলনের স্বপ্নের কথা। দ্রিনা নদীর ওপর এই সেতু বিভেদ ঘোচানোর, এই সেতু মানুষের মিলনের, এই সেতু বিচ্ছেদ ঘোচানোর।

বছরের পর বছর ধরে দ্রিনা নদীর এই সেতু যুদ্ধের পর যুদ্ধ মোকাবেলা করেছে, প্রথম মহাযুদ্ধে সেতুটির একাংশ বিধ্বস্ত হয়ে যায়।

পদ্মার ওপর প্রথম রেলওয়ে সেতু ১.৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের নামে নামকরণ (রাজনৈতিক অনেক ঝড়ের পর এখনো পূর্বনাম বহাল)—১৯৭১ সালে স্বাধীনতার লড়াইয়ের সময় কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুর পাকশী প্রান্ত থেকে চতুর্থ গার্ডার ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ উড়িয়ে দেওয়া হলে পাকিস্তানি সেনাদের চলাচল রহিত হয়ে যায় এবং তাদের পরাজয় ত্বরান্বিত হয়। দুর্ভাগ্য আমাদের সাহিত্যের, হার্ডিঞ্জ নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সাহিত্যকর্ম নেই।

ইউরোপ-আমেরিকার সাহিত্যে নদী ও সেতু স্মরণীয় স্থান অধিকার করে আছে। ১৮০২ সালে টেমস নদীর ওপরে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ লেখেন ‘কম্পোজড আপ অন ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজ’ নামের বহুল পঠিত কবিতা। হার্ট ক্রেইনের মহাকাব্যিক কবিতার নাম ‘দ্য ব্রিজ’, একই নামের উপন্যাস লিখেছেন আয়ান ব্যাংকস।

নদীর ওপর সেতু—স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ একে বললেন ‘প্রতীক’ আর উইলিয়াম ব্লেক বললেন ‘কল্পনা’।

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ানো বিট প্রজন্মের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ তাঁর ‘হাউল’ কবিতায় লিখলেন ব্রুকলিন ব্রিজের কথা। জন মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’, স্যার ওয়াল্টার স্কটের ‘দ্য লেডি অব দ্য লেইক’-এ সেতু এসেছে বারবার। টি এস এলিয়ট ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এ লিখলেন :

One must be so careful these days/Unreal City,/Under the brown fog of a winter dawn/A crowd flowed over London Bridge.

হেনরি ওয়ার্ডওয়ার্থ লঙ্গফেলোর স্মরণীয় কবিতা ‘দ্য ব্রিজ’—

মধ্যরাতে আমি সেতুর ওপর দাঁড়াই/ঘড়ি ঘণ্টা বাজিয়ে যায় মধ্যরাতে/শহরের ওপর দিয়ে চাঁদ ওঠে/অন্ধকার চার্চ টাওয়ারের পেছনে।

সেতু হচ্ছে পর্বতপ্রমাণ প্রাকৌশলিক নির্মাণ। পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত সেতুগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘গোল্ডেন গেট ব্রিজ’। সানফ্রান্সিসকোর এই সেতু ১৯৬৪ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাসপেনশন ব্রিজ হিসেবে পরিচিত ছিল। এ বছর জাপানের আকাশি-কায়াকো ব্রিজ এই স্থানটি নিয়ে নেয়। বহুল উদ্ধৃত সেতুগুলোর একটি হচ্ছে ‘লন্ডন টাওয়ার ব্রিজ’ (১৮৯৪)। বিলেতি শিশুদের ছড়াপাঠ শুরু হয় লন্ডন ব্রিজ দিয়ে—

লন্ডন ব্রিজ ইজ ফলিং ডাউন/ফলিং ডাউন, ফলিং ডাউন/লন্ডন ব্রিজ ইজ ফলিং ডাউন/মাই ফেয়ার লেডি।

অনেক বছর ধরে অজ্ঞাতনামা কবির এই ছড়াগান গীত হয়ে এলেও প্রথম প্রকাশিত হয় ১৭৪৪ সালে।

সেরা সেতুর তালিকা প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। তবু সর্বকালের স্মরণীয় সেতু : গোল্ডেন গেট ব্রিজ, ব্রুকলিন ব্রিজ, ফ্রান্সের ভিডাক মিলাও, সিডনি হারবার ব্রিজ, আকাশি-কায়াকো ব্রিজ, টাওয়ার ব্রিজ, ফ্লোরেন্সের পনটে ভেচ্চিও ব্রিজ, রিয়ালটো ব্রিজ, চার্লস ব্রিজ, সানশাইন স্কাইওয়ে ব্রিজ, লন্ডন ব্রিজ, কনফেডারেশন ব্রিজ, ভাস্কো দা গামা ব্রিজ ও সেভেন মাইল ব্রিজ।

পৃথিবীতে সেতু থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটে গোল্ডেন গেট ব্রিজে। দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাপো ব্রিজে আত্মহত্যার ঘটনা কমাতে নাম বদলে রাখা হয়েছে ব্রিজ অব লাইফ।

আমাজনের অহংকার এই নদীর ওপর কোনো সেতু নেই।

নদী ও সেতুকে খ্যাতিমান করে তোলেন সে দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, চিত্রকর, চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রমুখ। পদ্মা নদী ও পদ্মা সেতু সেই প্রতীক্ষায় থাকল।



সাতদিনের সেরা