kalerkantho

রবিবার । ৩ জুলাই ২০২২ । ১৯ আষাঢ় ১৪২৯ । ৩ জিলহজ ১৪৪৩

বই আলোচনা

ভাষা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

পবিত্র সরকার   

২৭ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ভাষা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

হাজার বছরের বাঙালি জাতির নানা দিকে বিপুল গরিমা তৈরি হয়েছিল ইতিহাসের প্রবহমানতায়; কিন্তু ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন তার এক নতুন আত্মপরিচয় নির্মাণ করে। শুধু তা-ই নয়, এই নবপরিচয়ের দুর্দমনীয় তেজ, অহংকার ও স্পর্ধা তাকে দিয়ে পৃথিবীর বুকে এক নতুন স্বাধীন দেশ কায়েম করায় এবং দেশের মুক্তিযুদ্ধে যিনি অবিসংবাদিত নেতৃত্ব দেবেন সেই শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতার যথার্থ নির্মাণও ওই ভাষা আন্দোলন থেকেই আরম্ভ হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক অভাবিত ইতিহাস তৈরি হয় পৃথিবীতে, শুধু ভাষাকে ভালোবেসে অপরিসীম ত্যাগ ও রক্তপাতের পর এক স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব। সেখানেই শেষ নয়।

বিজ্ঞাপন

ভাষা আন্দোলনের সেই শাহাদাতের দিন, অমর একুশে ফেব্রুয়ারিকে ১৯৯৯ সালের শেষে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে চিহ্নিত করে ইউনেসকো এবং ২০০০ সাল থেকে তার উদযাপন আরম্ভ হয়। তাতে এই হয়েছে যে সারা পৃথিবীর সব গোষ্ঠীর মাতৃভাষার অস্তিত্বের গৌরব ও উদ্বেগের সঙ্গে বাঙালির ওই ভাষা আন্দোলন তথা বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতি যুক্ত হয়ে গেছে। এখন বাংলা ভাষার প্রতি, বাঙালির প্রতি সারা পৃথিবীর সব ভাষাগোষ্ঠী কৃতজ্ঞ থাকবে মানুষের ইতিহাসের শেষ দিন পর্যন্ত।

তাই বাঙালির ভাষা আন্দোলন তার নতুন আত্মপরিচয়ের, সেই সঙ্গে তার অহংকারের এক প্রধান উৎস। আর এ দেখেও আনন্দিত হয়েছি যে এম আবদুল আলীম পাবনায় তাঁর নিজের গ্রামে একটি ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করে ভাষা আন্দোলনের ওপর একাগ্রচিত্তে গবেষণা করে চলেছেন। এ কথা ঠিক যে ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণার জন্য অনেক গবেষক একেবারে প্রথম থেকেই এগিয়ে এসেছেন এবং তাঁরা অনেকেই স্মরণীয় কাজ করেছেন। তাঁদের কাছে শুধু বিদ্বজ্জনসমাজ কৃতজ্ঞ থাকবে তা নয়, সমগ্র বাংলাভাষী এবং বাঙালি জাতি অন্তহীনভাবে কৃতজ্ঞ থাকবে।

আবদুল আলীমের ওই গবেষণাকেন্দ্রটি যেমন অভিনব, তেমনই ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে এই কোষগ্রন্থ প্রণয়নের চিন্তাও অভিনব। এ জন্যও আলীমকে অভিনন্দন জানাই। এই কোষের কতখানি আমি দেখেছি, তাতে একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থে যা যা থাকা দরকার তার কিছুই আলীমের মনোযোগ এড়িয়ে যায়নি। ঘটনা, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি (তাঁরা পক্ষে-বিপক্ষে যেখানেই থাকুন), ঘটনাস্থল (নগর, গ্রাম, জেলা, অঞ্চল), নানা দেশের ভূমিকা, পত্রপত্রিকা, সংকলন, ছোটদের ও বড়দের দৃষ্টিভঙ্গি—কী নেই এই কোষগ্রন্থে? একবার দৃষ্টিপাতে মনে হয় কিছুই বুঝি সংকলকের মনোযোগের বাইরে থাকেনি।

তবু আমি জানি, এ ধরনের কোষে একবারে সম্পূর্ণতা আসে না, তা ধীরে ধীরে তৈরি হয়। আমার মনে আছে, সত্তরের বছরগুলোতে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির বর্জিত পত্রপত্রিকার মধ্যে বেশ কিছু ‘একুশের সংকলন’ দেখেছিলাম, দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের ফস্টার লাউঞ্জের বাইরের আলমারিতে কিছু রাখা ছিল। জানি না তার সব আবদুল আলীমের হাতে এসেছে কি না। আমার কাছেও বোধ হয় কিছু আছে। কিন্তু এই কাজে বাংলাদেশের লেখক, পাঠক, সম্পাদক, প্রকাশক ও গবেষকরা নিশ্চয়ই আলীমকে সর্বাত্মক সাহায্য করবেন এবং তাঁদের সহযোগিতায় এই কোষগ্রন্থটি সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্যের অপরিহার্য আকর হয়ে উঠবে। আরেকটি অনুরোধ যে এর নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ ভুক্তি বা এন্ট্রিগুলো নিয়ে এর একটি ইংরেজি সংস্করণ প্রস্তুত করা হোক। আমি আবদুল আলীমকে সমগ্র বাংলাভাষীর পক্ষ থেকে অভিনন্দিত করি।

রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন (জেলাভিত্তিক ইতিহাস) : এম আবদুল আলীম। প্রকাশক : কথা প্রকাশ। প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা। মূল্য : ১৫০০ টাকা।

 



সাতদিনের সেরা