kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

কবিতার অন্বেষণ, কবিতার কৌশল ১৬

গদ্যছন্দ—গদ্যকবিতা

কামাল চৌধুরী

২৮ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গদ্যছন্দ—গদ্যকবিতা

তবে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কবিদের কাব্যপ্রবণতায় ছন্দ অভিজ্ঞান এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। ষাট-পরবর্তী সময়ের অনেকে উল্লেখযোগ্য গদ্যকবিতা রচনা করেছেন; কিন্তু তার তুলনায় ছন্দোবদ্ধ ও মুক্তছন্দে লেখা কবিতার প্রাবল্য পরিদৃষ্ট হয় বেশি। আমাদের তরুণতম কবিও গদ্যকবিতা লিখছেন; কিন্তু সার্বিকভাবে এ ধারাকে ক্ষীণতর ধারা বলা শ্রেয় হবে। এখানে বাংলা কবিতায় গদ্যকবিতার কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো :

কচি লেবু পাতার মতো নরম সবুজ আলোয়

পৃথিবী ভরে গিয়েছে এই ভোরের বেলা;

কাঁচা বাতাবির মতো সবুজ ঘাস—তেমনি সুঘ্রাণ—

হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে!

আমার ইচ্ছে করে এই ঘাসের এই ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো

গেলাসে গেলাসে পান করি,

এই ঘাসের শরীর ছানি—চোখে ঘষি,

ঘাসের পাখনায় আমার পালক,

ঘাসের ভেতরে ঘাস হয়ে জন্মোই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার

শরীরের সুস্বাদু অন্ধকার থেকে নেমে।

বিজ্ঞাপন

(ঘাস : জীবনানন্দ দাশ)

আমার ভালোবাসার কথা বলতে বলতে

যখন প্রায় ঘৃণার কাছাকাছি পৌঁছেছি

সমস্ত মধ্যরাত কাঁপিয়ে তখন শেষ ট্রেনের হুইসিল শোনা গেল

আর আমরা তখন

যেহেতু ঘৃণা আমাদের গন্তব্য উজ্জ্বল করে তুলেছে

সেই ঘৃণা থেকে প্রত্যাবর্তনের আশায়

আবার আমরা ভালবাসা ভালবাসা বলে

চীৎকার করে উঠলাম।

(ট্রেন/আহসান হাবীব)

আমি অল্প করে বলি যদি তুমি বোঝো নইলে পাহাড় সমুদ্দুর মরুভূমি তোমাকে উদ্বাস্তু করবে নইলে মহাশূন্য তোমাকে নিয়ে চক্কর জুড়বে তুমি ছোট্ট দরজাটা দেখতে পাবে না যে তোমাকে পৌঁছে দেবে তোমার একলা পিদ্দিমের কাছে যাকে হাত দিয়ে আগলে তুমি সেই রাস্তা রাখতে পারো যেখান দিয়ে অগুনতি পাখির ওড়া আর পায়ে পায়ে ধুলোটে গঞ্জ চওড়া হতে হতে চওড়া হতে হতে শেষকালে পৃথিবীর মেলা।

(আমি অল্প করে বলি/অরুণ মিত্র)

শীতের ছোটো দিন—কুয়াশা-মোড়া, অগ্নিমাধুরীতে সারাদিন সান্ধ্য, যেন

আমাদের; এতো কুয়াশা—পথে-পথে পাথরের মত আলো; আলো জ্বলে

অনবরত হ্রেষা ঝেড়ে এঁকেবেঁকে আস্তে-আস্তে চলছে গাড়িগুলি, কুয়াশায় ইশারার মতো হীরের চোখ ঝ’রে পড়ছে তাদের,—যেন এক-একটি আলো-প্রেম-নীলিমা-ভরা দোতলা জাহাজ রওনা হ’লো রবিবারে।

(পরস্পর/আবদুল মান্নান সৈয়দ)

 এখানে কয়েক প্রকারের গদ্যকবিতার উদাহরণ দেওয়া হলো। দেখা যায় ভাষারীতিতে পার্থক্য থাকলেও রবীন্দ্র-উত্তর বেশির ভাগ কবিই পদ্যরীতির অনুসরণে পর্ব, যতি, স্তবক বিন্যস্ত করে গদ্যকবিতার চর্চা করেছেন—পাশাপাশি যতিচিহ্নহীন দীর্ঘ ও প্রলম্ব্বিত চরণে গদ্যকবিতাও লেখা হচ্ছে দেখা যায়।

৩.

রবীন্দ্রনাথ যদিও ওয়াল্ট হুইটম্যানকে পাশ্চাত্য গদ্যকবিতার প্রবর্তক হিসেবে দেখেছেন—কিন্তু হুইটম্যানের প্রসিদ্ধি ফ্রি ভার্সের প্রবর্তক হিসেবে। তবে ইউরোপে গদ্যকবিতার প্রবর্তক হিসেবে সর্বাগ্রে শার্ল বোদলেয়ারের নাম উচ্চারিত হয়; কিন্তু শুরুর কৃতিত্ব পুরোপুরি তাঁকে দেওয়া ঠিক হবে না। কবিতার একটি ক্ষীণতর ধারা হিসেবে এর শুরুটা হয়েছিল ফরাসি প্রতীকবাদী কবি অ্যালোয়াজিয়্যুস বেরত্রাঁর (Aloysius Bertrand-1807-1841) মাধ্যমে। বেরত্রাঁর ‘গ্যাসপার দ্য লা নুই’ (Gaspard of the night) প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পরে ১৮৪২ সালে। এতে তিনি গদ্যকবিতার সূচনা করেন। বোদলেয়ার তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হন—যার ফলে তাঁর ‘ল্য স্পিলিন দা পারি : প্র্যতি পয়েম আ প্রোজ (Le Spleen de Paris : Petits Poemes en Prose) রচিত হয়। এ কবিতাগুলো তাঁর মৃত্যুর পর ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত হয়। বোদলেয়ারের গদ্যকবিতা ধ্রুপদি ফরাসি কবিতার আঁটোসাঁটো বন্ধনের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ। এসব কবিতায় তিনি চেয়েছিলেন ভিন্ন মেজাজের কাব্যিক গদ্য তৈরি করতে, যা সংগীতময় কিন্তু ছন্দ ও অন্ত্যমিলবিহীন। মুখবন্ধে বন্ধু আর্সেন উসেকে লেখা এক চিঠিতে বোদলেয়ার বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কে এমন আছে, যে তার উচ্চাশার মুহূর্তে ভাবেনি এক কাব্যিক গদ্যের জাদুর কথা, যে গদ্য হবে ছন্দোমিলহীন সুরেলা, যথেষ্ট নমনীয় এবং যথেষ্ট অমসৃণ, সে জন্যে তা হৃদয়ের লিরিক আন্দোলন, স্বপ্নের তরঙ্গ এবং চেতনার উল্লম্ফনের উপযোগী মাধ্যম হবে?’ (অরুণ মিত্রের অনুবাদ)

সামগ্রিকভাবে বিশ্বকবিতায় বোদলেয়ারের প্রভাব এখনো অপরিসীম। বাংলা কবিতায় নলিনীকান্ত গুপ্তের প্রবন্ধ (১৯৮১), মূল ফরাসি থেকে তরু দত্তের ইংরেজি অনুবাদ ও বাংলায় সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অনুবাদের (১৯১০) মাধ্যমে বোদলেয়ার নিয়ে লেখালেখি শুরু হলেও মূলত বুদ্ধদেব বসুর কল্যাণে বাংলা কবিতায় ব্যাপক পরিচিত হন। টীকা, ভাষা, ভূমিকাসহ বোদলেয়ারের Les Fleurs Du Mal-এর অনুবাদ ছিল তাৎপর্যময় ঘটনা। স্বল্পায়ু, প্রথাবিরুদ্ধ ও অমিতাচারী জীবনে বোদলেয়ার থিতু হতে পারেননি—কিন্তু কবিতায় রেখে গেছেন অভূতপূর্ব প্রভাব। তাঁর গদ্যকবিতাগুলো প্যারিস স্পিলিনে (Le Spleen De Paris) অন্তর্ভুক্ত আছে, যা থেকে নিচে দুটি উদ্ধৃতি দেওয়া হলো—

 বলে; আমাকে, রহস্যময় মানুষ, কাকে তুমি সবচেয়ে ভালোবাসো :

তোমার পিতা, মাতা, ভ্রাতা অথবা ভগ্নীকে?

পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভগ্নী—কিছুই নেই আমার।

তোমার বন্ধুরা?

এই শব্দের অর্থ আমি কখনো জানিনি।

তোমার দেশ?

জানি না কোন দ্রাঘিমায় তার অবস্থান।

সৌন্দর্য?

পারতাম বটে তাকে ভালবাসতে—দেবী তিনি, অমরা।

কাঞ্চন?

ঘৃণা করি কাঞ্চন, যেমন তোমরা ঘৃণা করো ভগবানকে।

বলো তবে, অদ্ভুত অচেনা মানুষ। কী ভালোবাসো তুমি?

আমি ভালোবাসি মেঘ... চলিষ্ণু মেঘ... ঐ উঁচুতে... ঐ উঁচুতে...

আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল!

(‘অচেনা মানুষ’ প্যারিস স্পিলিনের প্রথম কবিতা)

 ফরাসি কবিতার আরেক বিস্ময়কর প্রতিভা, ‘ইনফেন্ট টেরিবল’ নামে খ্যাত আর্তুর র্যাঁবো (১৮৫৪-১৯৪১) তাঁর অসাধারণ কবিতাগুলো মাত্র ২০ বছর বয়সের আগেই রচনা করেছিলেন। তাঁর A Season in Hell বা নরকে এক ঋতুতে আমরা গদ্যকবিতার সম্ভার খুঁজে পাই—ফরাসি প্রতীকবাদী কবিতার জনক বলে খ্যাত স্তেফান মালার্মে কম লিখেছেন কিন্তু তাঁর The Shudder of Winter, The White Lily সহ কয়েকটি গদ্যকবিতা বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ।

            চলবে



সাতদিনের সেরা