kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

মধুসূদন বারবার ফিরে আসবেন

গোলাম কবির

২৮ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মধুসূদন বারবার ফিরে আসবেন

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

মহাকবি মধুসূদন বঙ্গভূমির প্রতি কবিতায় দেশমাতৃকার কাছে আকুল প্রার্থনা জানিয়েছিলেন : ‘রেখো, মা, দাসেরে মনে,/এ মিনতি করি পদে। ’ (বিবিধ কাব্য, মাইকেল রচনাবলী, প্রথম ভাগ, পৃষ্ঠা-২) আবার সুদূর প্রবাসে মাতৃভূমির জন্য ব্যাকুল কবি নানা বিষয় ও ব্যক্তির সঙ্গে স্মরণ করেছেন ‘কপোতক্ষ নদ’ সনেটে স্বদেশকে। নদের কাছে কবির বিনীত অনুরোধ, কপোতাক্ষ যত দিন সাগরবক্ষে নিজেকে নিবেদন করে যাবে, তত দিন যেন বঙ্গবাসীর কানে কানে তাঁর দেশপ্রেমের কথা কলধ্বনিতে ব্যক্ত করে যায়। আজ কপোতাক্ষ মৃতপ্রায়।

বিজ্ঞাপন

কে জানে, একদিন হয়তো নদীর নামটি বিস্মৃত ইতিহাস হয়ে যাবে! যেমন—অনেক নদী বাংলার ভূখণ্ড থেকে হারিয়ে গেছে। ‘ধলেশ্বরী নদী তীরে পিসিদের গ্রাম’ কথাগুলো হয়তো অনাগতকালের বাঙালি পাঠক মনে রাখবে, তবে ধলেশ্বরীর অস্তিত্ব তত দিনে বিলীন হয়ে যাবে। কপোতাক্ষ কিংবা ধলেশ্বরী কালের করালগ্রাসে হারিয়ে গেলেও মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ মহাকালের পৃষ্ঠায় অক্ষয় হয়ে থাকবেন।

মধুসূদনের প্রার্থনা ছিল বাংলাভাষী মানুষ যেন তাঁকে ভুলে না যায়। না, ভুলিনি আমরা। যদিও কবির প্রিয় কপোতাক্ষ নদ অদূরভবিষ্যতে বিস্মরণের পথে চলে যাবে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী কবি মধুসূদনকে ‘ভুলি কেমনে’! অবশ্য আমাদের প্রায় সব স্মরণোৎসব শুধু আড়ম্বরের। তা-ই বা কম কিসের! ২৫ জানুয়ারি তাঁর জন্ম শুভক্ষণকে প্রণতি জানাই।

উনিশ শতকের গোড়ার দিকে নগর কলকাতায় উদীয়মান ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের উজ্জীবনের কালে মধুসূদন রূপকের অন্তরালে ছলে-বলে-কলে-কৌশলে ক্ষমতাদখলকারী ব্রিটিশদের স্বরূপ উদঘাটন করেছেন শ্রীলঙ্কার স্বাধীনতা হরণের বাল্মীকি কথিত রামায়ণকে সামনে রেখে। ‘মেঘনাদবধ’ রচনার প্রায় শতবর্ষ আগে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় সিরাজের পরাজয় ও বাংলার স্বাধীনতা হরণকে মধুকবি সেই সূত্রে গেঁথেছেন। আমরা ১৯৭৫ সালের খন্দকার মোশতাক আহমদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের শিকার বঙ্গবন্ধুর হত্যাযজ্ঞকে যদি বিভীষণ কিংবা মীরজাফরের অপকর্মের সঙ্গে মেলাই, তাহলে দেখব কী আশ্চর্য ইতিহাসের চিরন্তন মিল। চক্রান্তকারীরা চেয়েছিল রক্তের দামে অর্জিত বাংলাদেশকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে। পারেনি, কারণ স্বাধীনচেতা দেশপ্রেমিক বাঙালির স্মরণকালের ইতিহাসে একদা বিদ্রোহের যে বীজ বপন হয়েছিল তার ফল আমরা কালে কালে প্রত্যক্ষ করেছি।

মধুসূদন দীর্ঘকালের বাঙালির বিশ্বাস ও সংস্কারের মূলে আঘাত হেনেছেন মেঘনাদবধ কাব্যের মাধ্যমে। বাল্মীকি সৃষ্ট অবতার রামচন্দ্রকে তিনি মানবীয় দোষে-গুণে উপস্থাপন করেছেন। সামাজিক, ধর্মীয় ও অবস্থানগত সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা তিনি সচেতনভাবে পরিহার করতে চেয়েছেন, বর্তমান বিশ্বে যা অত্যন্ত জরুরি। জয়তু দত্তকুলোদ্ভব মধুসূদন।



সাতদিনের সেরা