kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

কাজী আনোয়ার হোসেন

অন্তিম প্রণিপাত

স্বকৃত নোমান   

২১ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অন্তিম প্রণিপাত

জন্ম ১৯৩৬ মৃত্যু ২০২২ ছবি : কাকলী প্রধান

সত্যিকারের নিভৃতচারী, আত্মমুখীন, প্রচারবিমুখ লেখক বলতে যা বোঝায়, ঠিক তাই ছিলেন প্রয়াত কাজী আনোয়ার হোসেন। আমরা, এই সময়ের অনেক লেখক তো নানা প্রচার-প্রচারণার মধ্যে থাকি। ফেসবুক, পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশনসহ নানা প্রচারমাধ্যমে সরব থাকি। আমি বলছি না এসব প্রচারণা খারাপ, দোষণীয়।

বিজ্ঞাপন

কাজী আনোয়ার হোসেন এসবের মধ্যে ছিলেন না। এত এত বই লিখেছেন, এত পাঠক সৃষ্টি করেছেন, একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের হাল ধরে রেখেছেন, কিন্তু কখনো তাঁকে টেলিভিশনে দেখিনি, কিংবা অন্যান্য প্রচারমাধ্যমে সরব দেখিনি। তিনি কাজটি করে গেছেন একাগ্রচিত্তে। লিখে গেছেন এবং লেখাকে পৌঁছে দিয়েছেন পাঠকের কাছে।

কেউ একজন যুগের পর যুগ লিখে গেলেন। কিন্তু তাঁর লেখা পাঠক মনে কোনো রেখাপাত করতে পারল না। এই ব্যর্থতার দায় শুধু পাঠকের নয়, সেই লেখকেরও। যিনি সত্যিকারের লেখক, তিনি যতই অন্তরালে থাকুন না কেন, যতই নিজেকে আড়াল করুন না কেন—পাঠক তাঁকে খুঁজে বের করবেই। যেমন পড়েছে কাজী আনোয়ার হোসেনের লেখা এবং তাঁর প্রকাশনীর অন্যান্য বই। কাজী আনোয়ার হোসেন সেই লেখক, যিনি শুধু লেখেননি, লেখাটিকে পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।

সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে আমার পরিচয় আজ থেকে প্রায় ২৩ বছর আগে। সেই সুবাদে কাজী আনোয়ার হোসেনের লেখার সঙ্গেও। সেবা প্রকাশনী ও কাজী আনোয়ার হোসেন ছিলেন সমার্থক। দেশের রেলস্টেশনগুলোতে তখন একটি করে বুকস্টল থাকত। এখনো কোনো কোনো স্টেশনে আছে। সেসব বুকস্টলে নিশ্চিতভাবেই থাকত সেবা প্রকাশনীর বই, কাজী আনোয়ার হোসেনের বই।

মাসুদ রানা সিরিজের বইগুলো কাজী আনোয়ার হোসেনের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। বাংলাদেশে সিরিজটি খুব জনপ্রিয়। গত প্রায় চার দশক ধরে এই মাসুদ রানা সিরিজ বাংলাদেশের তরুণ পাঠকরা পড়ে আসছে। মনে আছে, এই সিরিজের প্রায় দেড় শ বই আমি পড়েছি। কিছু পড়েছি এক বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে, কিছু পড়েছি কিনে এবং আর কিছু পড়েছি ভাড়ায়। আমাদের এলাকায় তখন ভাড়ায় বই পাওয়া যেত। এক সপ্তাহের জন্য তিন টাকা, দুই সপ্তাহের জন্য পাঁচ টাকা। মাসুদ রানা সিরিজসহ কাজী আনোয়ার হোসেনের বিস্তর বই পড়েছি ভাড়া নিয়ে। সেসব বই আলাদা একটা জগতে নিয়ে যেত। পড়তে পড়তে একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে যেতাম।

কাজী আনোয়ার হোসেনের প্রতিটি লেখার মধ্যে টান টান উত্তেজনা থাকত। একবার শুরু করলে শেষ না করে উঠতে পারতাম না। এমন একটা জগত তৈরি করতেন তিনি, পাঠক সেই জগতে ঢুকে পড়লে সহজে আর বের হতে পারত না। বইটি শেষ করার পরও একটা রেশ পাঠক হৃদয়ে থেকে যেত। সেই রেশ থাকত অনেক দিন। এবং সেই রেশ অন্য আরেকটি বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করত।

কাজী আনোয়ার হোসেনের বই-পুস্তক বা মাসুদ রানা সিরিজকে অনেকে মূলধারার সাহিত্য বলে স্বীকার করতে নারাজ। হ্যাঁ, আমিও বলছি না কাজী আনোয়ার হোসেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক বা হাসান আজিজুল হকের মতো সাহিত্যের মূলধারার সঙ্গে ছিলেন। তিনি তাঁর মতো লিখেছেন। মূল-অমূল চিন্তা করেননি। তাঁর লেখা পড়েছে এ দেশের হাজার হাজার তরুণ। বই পড়ে পাঠক আনন্দ পেয়েছে, এই বই পড়ে অন্য বই পড়তে অনুপ্রাণিত হয়েছে—এটা তো কম কথা নয়। এমন তরুণও আছে, যারা কাজী আনোয়ার হোসেনের বই পড়ে পাঠ শুরু করেছে, পরবর্তী সময়ে তাঁকে ছাড়িয়ে বাংলা সাহিত্যের এবং বিশ্বসাহিত্যের মৌলিক সাহিত্যকর্মগুলো পাঠের দিকে অগ্রসর হয়েছে। পাঠের সেই আগ্রহটা প্রজন্মের মধ্যে তৈরি করে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন।

অনেকে বলেন, কাজী আনোয়ার হোসেনের নামে যত বই, সব বই তিনি লেখেননি, কিছু তিনি লিখিয়ে নিয়েছেন। হ্যাঁ, লিখিয়ে নিয়েছেন, তাতে সমস্যা কোথায়? ‘গোস্ট রাইটার’ নামে একটা পেশা আছে। অর্থাৎ লিখব আমি, ছাপা হবে অন্যের নামে। বিনিময়ে আমি পাব টাকা, যশ-খ্যাতি নয়। যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গোয়েন্দা সিরিজ ‘ন্যান্সি ড্রিউ’-এর প্রতিটি বইয়ের লেখকের জায়গায় লেখা থাকে ‘ক্যারোলিন কিন’-এর নাম। কিন্তু আসলে এ নামে কোনো লেখকই  নেই। ১৯৩০ সাল থেকে সিরিজটি লিখছেন একাধিক লেখক, যাঁদের নাম কখনোই প্রকাশ করা হয়নি। ধারণা করা হয়, সিরিজটির গোড়াপত্তন করেছিলেন মার্কিন প্রকাশক-শিশুসাহিত্যিক এডওয়ার্ড স্ট্রেমেয়ার। গোস্ট রাইটার একটি বৈধ পেশা বলেই মনে করি।

কাজী আনোয়ার হোসেন শুধু লেখক ছিলেন না, একজন প্রকাশকও। সেবা প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা তিনি। সেবা প্রকাশনী এই দেশে পাঠক তৈরিতে কতটা ভূমিকা রেখেছে, সাহিত্যজগতের সবাই সে কথা জানেন। শুধু কাজী আনোয়ার হোসেনের বই নয়, সেবা প্রকাশনী তাদের নানা সিরিজের মাধ্যমে, অনুবাদের মাধ্যমে পাঠকদের সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট করে রেখেছে বহু দিন। কুড়ি বছর আগে কাজী আনোয়ার হোসেন বা সেবার বইয়ের যে জনপ্রিয়তা দেখেছি, কুড়ি বছর পরও সেই জনপ্রিয়তা কমেনি। প্রতিবছর বইমেলায় সেবা প্রকাশনীর স্টল থাকে। এবং যথারীতি সেখানে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের ভিড় লেগে থাকে। তারাই সেবা প্রকাশনী বা কাজী আনোয়ার হোসেনের বইয়ের পাঠক।

পাঠক তৈরিতে এই যে তাঁর এত বড় অবদান, এ জন্য রাষ্ট্র তাঁকে কোনো স্বীকৃতি দিয়েছে? না, রাষ্ট্র তাঁকে কোনো পুরস্কারে ভূষিত করেছে বলে আমার জানা নেই। এটাই আমদের ট্র্যাজেডি। চোখের সামনে দিয়ে একটি ইতিহাস গড়িয়ে যায়, তাকে আমরা চিনতে পারি না, বুঝতে পারি না, ধরতে পারি না। জীবৎকালে তাঁকে স্বীকৃতি দিই না, অথচ মৃত্যুর পর তাঁর জন্য আমরা হাহাকার করি।

কাজী আনোয়ার হোসেন কতটা জনপ্রিয় ছিলেন, তা বোঝা গেছে তাঁর মৃত্যুর পর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভেসে গেছে তাঁর মৃত্যু সংবাদে, শোকবাণীতে। অনলাইন এবং দৈনিকগুলো গুরুত্ব দিয়ে তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রচার করেছে। জীবৎকালে যদি এভাবে তাঁকে পুরস্কৃত করার দাবি উঠত, তবে কতই না ভালো হাতো। তাতে রাষ্ট্রের বোধোদয় ঘটত, তাঁকে প্রাপ্য সম্মানে ভূষিত করত।

কে জানে, হয়তো কাজী আনোয়ার হোসেন এসব পুরস্কারের আকাঙ্ক্ষী ছিলেন না। তিনি ছিলেন এসবের ঊর্ধ্বে। তিনি তাঁর কাজটি করে গেছেন নীরবে। প্রাপ্তির ধার ধারেননি। হুট করেই তিনি চলে গেলেন। বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে, অগুনতি পাঠকের হৃদয়ে। তাঁকে অন্তিম প্রণিপাত।



সাতদিনের সেরা