kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি

আমার বাবা পটুয়া কামরুল হাসান

সুমনা হাসান

৩ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমার বাবা পটুয়া কামরুল হাসান

আমার বাবা ছিলেন অন্য বাবাদের চেয়ে একটু ভিন্ন। তিনি আমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন—এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাবার মধ্যে যেটা ছিল— আমার ছোটবেলায় অন্যকে দেখে বা নিজ থেকে আবদার করলে সেটা তাঁর কাছে যৌক্তিক না হলে এনে দিতেন না। বাবা প্রায়ই আমাকে বলতেন, এমন অনেক বাচ্চা আছে তুমি যেটা পাচ্ছ ওরা সেটা পাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

এই উদাহরণগুলো শুনতে হতো। তাঁর ছবি আঁকার জিনিসপত্র ধরা এবং ছবি আঁকার ঘরে গিয়ে জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করাটা খুব অপছন্দ করতেন। এর পরও আমি চুরি করে বাবার ছবি আঁকার ঘরে যেতাম। মা আমার ছবি আঁকার সরঞ্জাম আলাদা করে দিয়েছিলেন, বাবা তাঁর জিনিসপত্র ধরা পছন্দ করেন না বলে। বাবার যেদিন অফিস থাকত, সেদিন সুযোগ পেলেই সে ঘরে ডুকতাম। বাবার ড্রইংয়ে যে কাগজ থাকত লেয়ার লেয়ার করে, তার মধ্য থেকে একটা কাগজ বের করে এনে আমার ছবি আঁকতেই হবে। বাবা কিন্তু বাসায় এসে ঠিকই টের পেতেন। বাবা হিসেবে দেখেছি তিনি খুব ন্যায়নীতি, আদর্শ—এই বিষয়গুলো বড় করে দেখতেন। আমার ছোটবেলা থেকেই পূর্ণাঙ্গ একজন বাঙালি নিজের সংস্কৃতি ধারণ করে কিভাবে বেড়ে উঠতে হয়, সেটা শিক্ষা দিয়েছেন। মূল্যবোধ, আদর্শ, নীতি—এই বিষয়গুলোর প্রতি সচেতন করে তুলেছেন। আমি তো মনে করি, এখন যে কাজ করি না কেন, তার সব  কিছুর প্রতিফলন বাবার কাছ থেকে পাওয়া।

বাবা ছবি আঁকতেন সব সময়। হাতের কাছে যা কিছু পেতেন কাগজের টুকরা, কার্ডের টুকরা, ম্যাচের বাক্স, সিগারের প্যাকেটে ছবি আঁকতেন। সিগারেটের প্যাকেট ছিল তাঁর নিয়মিত ছবি আঁকার উপকরণ। তাঁর হাত কখনো বন্ধ থাকত না। হয়তো এডুকেশন মিনিস্ট্রিতে মিটিং হচ্ছে। সবাইকে এজেন্ডা দেওয়া হচ্ছে। সেই এজেন্ডা ভরে বাবা স্কেচ করেছেন। সেগুলোও অনেক আমার সংগ্রহে আছে।

ছবি আঁকার পাশাপাশি তাঁর একটা কাজ ছিল ফটোগ্রাফি করা। তাঁর প্রচণ্ড একটা প্যাশন ছিল ফটোগ্রাফি। আমি সব সময় বাবাকে দেখেছি,   তাঁর অফিসের কাজের পাশাপাশি ক্যামেরাটা গলায় থাকতই। আর ছুটির  দিন মানেই বাবার গলায় ক্যামেরা। আমার শৈশবের সব কার্যকলাপ তাঁর ক্যামেরায় ধারণ করা ছিল। এখন সেগুলো দেখে ভিজ্যুয়ালাইজ করতে পারি।   ছুটির দিনগুলোতে বাবা আমাকে নিয়ে যেতেন সাভারের দিকে। সেখানে বাবা কুমারপাড়া, কামারপাড়া ঘুরে ঘুরে তাদের কার্যক্রম, তাদের জীবনমান, জীবনযাত্রার ছবি ধারণ করতেন, ইন্টারভিউ নিতেন। সময়টা ছিল ১৯৬৯, ’৭০, ’৭১ সালের দিকে। তখন আমি অনেক ছোট।

আমাদের সময় খুব ট্রেন্ড ছিল জিন্সের প্যান্ট, টপস পরার। স্বাভাবিক কারণেই আমিও পরতে চাইতাম। বাবার পছন্দ ছিল কোথাও গেলে শাড়ি পরতে হবে। আমি যখন ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, তখন বাবার সঙ্গে যেতে হলে বলতেন—‘মা, তুমি একটু শাড়ি পরে আসো। ’ একসময় শুরু হলো স্কার্ট অ্যান্ড টপ। বাবা বলেন, ‘এটা আবার কী রকম ড্রেস?’ ছোটবেলায় আমি বাবার সঙ্গে ভোরে হাঁটতে গেছি। আমরা তখন সেন্ট্রাল রোডে থাকতাম। ওখান থেকে হাতিরপুলটা ছিল, সেটা হেঁটে পার হয়ে কাটাবন, নীলক্ষেত, বিশ্ববিদ্যালয়, ফুলার রোড হয়ে পরিবাগে যেতেন। সেখানে মাঝে মাঝে স্বনামধন্য স্থপতি মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। তিনি বাবার বন্ধু ছিলেন। ওখানে আড্ডা দিয়ে আমাকে নিয়ে বাসায় ফিরতেন। তারপর যখন একটু বড় হলাম, তখন ভোরে উঠিয়ে দিতেন গানের রেওয়াজ করার জন্য। সকালবেলা রেওয়াজ করলে স্বর ভালো হবে। আরো একটু বড় হয়ে প্রতিবাদ করতাম—উঠব না। প্রতিদিন সকালবেলা স্কুল থাকে, ছুটির দিনেও কেন সকালে উঠব?

১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাবা না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। তখন আমার বয়স ২৩ বছর। বাবা যেদিন চলে যান, তার আগের দিন টিএসসিতে কবিতা উৎসবে নামিয়ে দেওয়া হলো। আমি তখন নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম। আমাকে আমার অফিসে নামিয়ে দিয়ে বাবাকে টিএসসিতে নামিয়ে দিল। বাবা বললেন, ‘তোমরা ফেরার সময় আমাকে নিয়ে ফিরো। ’ দুপুর আড়াইটা-তিনটার দিকে আমরা বাবাকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম। সেটা ছিল ১ ফেব্রুয়ারি। সেদিন বাবা দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে ঘুমালেন। পরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখলাম বাবা একটা পোলনের গেঞ্জি পরেছেন। তার ওপর একটা জ্যাকেটের মতো। যথারীতি বাবার ক্যামেরা রেডি। আমাকে বললেন, ‘তুই একটু দাঁড়া, ছবি তুলি। ’ তখন আমার অফিস ছিল সাড়ে ৭টা থেকে। বললাম, অফিসে দেরি হয়ে যাবে। বাবা বললেন, ‘আমার একটু ব্যাংকে কাজ আছে। তোকে নিয়ে ব্যাংকে যাব। ’ আমি বললাম, বাবা পরের সপ্তাহে যাব। বের হয়ে গেলাম বাবাকে নিয়ে। সেদিন বাবা আমার অফিসে নামলেন। বললেন, ‘আমি তোর অফিসটা দেখতে চাই, তুই কোথায় বসিস। ’ আমার তখন নতুন চাকরি। তখনো অফিস শুরু হয়নি। আমি কোন রুমে বসি, বাবা নেমে ঘুরে ঘুরে দেখলেন। দেখে বললেন, ‘ভালোই তো। শুরুটা সবার এ রকমই হয়। ’ তারপর বাবাকে টিএসসিতে নামিয়ে দেওয়া হলো। ওটাই ছিল বাবার সঙ্গে আমার শেষ দেখা।

শ্রুতলিখন : মোহাম্মদ আসাদ 



সাতদিনের সেরা