kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

অমর কীর্তিমান রফিকুল ইসলাম

সৌমিত্র শেখর

৩ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অমর কীর্তিমান রফিকুল ইসলাম

রফিকুল ইসলাম। জন্ম : ১ জানুয়ারি ১৯৩৪, মৃত্যু : ৩০ নভেম্বর ২০২১

বিজয়ের মাসের সূচনা হতে মাত্র এক দিন বাকি থাকতেই এমন একটি দুঃসংবাদ শুনতে হবে, ভাবতে পারিনি। ৩০ নভেম্বর দুপুরে এক প্রিয় ছাত্র-সাংবাদিক ফোন করে বললেন, ‘রফিকুল ইসলাম স্যার নেই। ’ এরপর আরো দু-একটি ফোন এলো; আর এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এই মহান মানুষের মৃত্যুসংবাদ। সেদিন বাংলা বিভাগে একটি সভাকক্ষ উদ্বোধন করা হলো; এলেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, এ টি এম নুরুর রহমান খানসহ কয়েকজন।

বিজ্ঞাপন

উপস্থিত হবেন বলে আশা করেছিলাম অধ্যাপক সন্জীদা খাতুন, ওয়াকিল আহমদ, রাজিয়া সুলতানা এবং অবশ্যই জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। গত ২৯ নভেম্বর জানা গেল তাঁর অবস্থা একটু ভালোর দিকে। তাহলে তিনি হয়তো আসবেন। কিন্তু এক দিন পরই হলো তাঁর চিরপ্রস্থান। আমরা কেউ এমন আকস্মিক চিরবিদায় সংবাদের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।

অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে আমার মাঝেমধ্যেই কথা হতো। অন্তত তাঁর কুশল আর শরীরের অবস্থা জানতে কর্তব্যবশত ফোন করতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের আয়োজনে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) ইতিহাস নিয়ে লেখার প্রয়োজনে ফোন করেছিলাম মাসখানেক আগে। দিন পনেরো আগে বাংলা বিভাগের প্রস্তাবিত বইয়ে লেখার প্রয়োজনে একটি তথ্য যখন ইন্টারনেটে পেলাম না, তখন ভাবলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রবীণ অধ্যাপক আমার জানাশোনা আছেন, তিনি হয়তো বলতে পারবেন। কিন্তু তিনিও যখন তথ্য দিতে পারলেন না, তখন রফিকুল ইসলাম স্যারকে ফোন করা মাত্র তিনি বলে দিলেন। সেদিন তাঁর কাছ থেকে উত্তর না পেলে লেখাটি নিয়ে বিশেষ অগ্রসর হতে পারতাম না। ঈর্ষণীয় স্মরণশক্তি ছিল তাঁর। শেষ দিকে তাঁর লেখা বেশ জড়িয়ে গিয়েছিল; কিন্তু স্মৃতিশক্তি একটুও প্রতারণা করেনি। ইতিহাসের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন বলে তাঁর জীবনটাও হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের অংশ।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য মোটেও পড়ে না বলে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে অনেকেই অংশ নেয়—এমন মনোভাব অনেকের। তাই তাদের পড়ানোর জন্য বাংলা বই লেখা দরকার। মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন একটি কমিটি গঠন করে এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রফিক স্যারকে আর কথিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে দায়িত্ব দেয় বই লেখার। রফিক স্যার তখন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের সঙ্গে যুক্ত। আমরা বসে যাই বইয়ের কাজে। সেখানে আমরা ছেলেমেয়েদের সামনে ফেসবুক ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরি। বাংলাদেশে বিদ্যায়তনিকভাবে ফেসবুক নিয়ে লেখা পাঠ্য করা বোধ করি এটাই প্রথম। এটা সম্ভব হয়েছিল রফিক স্যারের আধুনিক মনের অনুমোদনের জন্যই। আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সবার হাতে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই যোগাযোগ মাধ্যম দিয়ে বেশি প্রভাবিত। কিন্তু তাদের এ ব্যাপারে জ্ঞান নেই। আইন করা হয়েছে, তার পরও আইন সম্পর্কে তরুণরা জানে না। তাই বারবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-নির্বিশেষে তরুণ প্রজন্মকে এই জ্ঞানের আওতায় আনা দরকার। রফিকুল ইসলাম আমাকে বলেন, রোকেয়ার ‘বায়ুযানে পঞ্চাশ মাইল’ লেখাটি সেখানে পাঠতালিকায় দিতে। লেখাটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির। একজন মুসলিম নারী বায়ুযানে চড়েছিলেন—এটি যে তাঁর স্বপ্নের মতো আর সেটি যে সত্য হয়েছে—এই স্বপ্ন ও সত্য বিষয়টি রোকেয়া সেই লেখায় উল্লেখ করেছেন।

রফিকুল ইসলাম ছিলেন রাজনীতিসচেতন মানুষ, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে তিনি সব সময় কাজ করেছেন। পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, তাঁর তোলা ফটোগুলো রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের যে ইতিহাস মূর্ত করে তা আর কোথাও পাওয়া যায় না। আইয়ুব খানের দণ্ডনীতি তাঁকে ভীত করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁকে টিক্কা খানের কারাগারে আটক থাকতে হয়েছে। আবার স্বাধীনতার পর জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে তিনি শিক্ষক আন্দোলন করেছেন। ফলে বাকস্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অবাধ অধিকারে বিশ্বাস ছিল তাঁর। রফিক স্যারের সঙ্গে মাস তিনেক আগে তাঁর উত্তরার বাড়িতে দেখা হয়। বেশ উজ্জ্বল মনে হয়েছিল তাঁকে। তিনি আমাকে জানালেন : বাংলা একাডেমির সভাপতি হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে জনৈক মন্ত্রী গিয়েছিলেন তাঁর বাড়িতে। উচ্চ পর্যায়ের আকাঙ্ক্ষা। ফলে তাঁকে সম্মত হতে হচ্ছে। তিনি নজরুল ইনস্টিটিউটের সঙ্গে থাকতেই পছন্দ করছিলেন। আসলে দেশে নজরুল পঠন ও গবেষণা ছড়িয়ে দিতে রফিক স্যারের অবদানের সীমা নেই। তাঁর মতের সঙ্গে যাঁরা সর্বাংশে একমত নন, তাঁরাও বলবেন, দেশজুড়ে নজরুলের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে রফিকুল ইসলাম যা করেছেন তার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। তাঁর নজরুলচর্চা গবেষণার একটি বিষয় বটে।

কীর্তিমানের মৃত্যু নেই—এমন একটি কথা আছে। অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের জীবন ও কর্ম বিস্তারিতভাবে আলোচনা করলে তাঁর সম্পর্কেও এ কথাই বলতে হবে।

 

 লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়   



সাতদিনের সেরা