kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

কবিতার অন্বেষণ, কবিতার কৌশল ১২

মিশ্ররীতি ও মুক্তছন্দ

কামাল চৌধুরী

২৬ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মিশ্ররীতি ও মুক্তছন্দ

ইমেজ, ছবি বা গ্রাফিক চিত্র উপস্থাপনাও মুক্তছন্দের কবিতায় লক্ষণীয়। ফরাসি কবি গিয়েম অ্যাপলিনের এ ধরনের ভিজ্যুয়াল কবিতার জন্য বিখ্যাত। উদাহরণ হিসেবে তাঁর ‘বৃষ্টি হচ্ছে’ কবিতার কথা বলা যায়, যেখানে তিনি অক্ষর ও শব্দকে বৃষ্টির ফোঁটার মতো সাজিয়েছেন। ইংরেজ বা ফরাসি কবিদের প্রভাবে বাংলা কবিতায়ও আমরা এর প্রয়োগ দেখি—সৈয়দ শামসুল হক ‘গেরিলা’ কবিতায় এই আঙ্গিকের সফল প্রয়োগ করেছেন।

অবিরাম

দক্ষিণ ভিয়েতনাম

কম্বোডিয়া

বাংলাদেশ

অ্যাঙ্গোলায়

মোজাম্বিকে তুমি

নিসর্গের ভেতর দিয়ে

সতর্ক নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে যাও সারাদিন সারারাত যখন গ্রামগুলো

জনশূন্য চাতাল চির খাওয়া আর উপাসনার চত্বরগুলো ঝরাপাতায়

অনবরত ঢেকে যায় নিঃশ্বাসের শব্দের ভেতরে

তোমাদের চলাচল

যেন তুমি আমাদেরই দ্বিতীয়

শরীর কোন এক রবীন্দ্রনাথের

গান সমস্ত কিছুর কেন্দ্রেই আছো

এবং ধ্বনিত করছ দুঃখের পাহাড়

আফ্রিকার এশিয়ার

নিসর্গে তুমি নতুন বৃক্ষ

নতুন বর্ষা নতুন ফুল

দিগন্তে নতুন মাস্তুল

পিতৃ পুরুষের চিত্রিত দণ্ড

দাউ দাউ নাপামের

মধ্যে তুমি হেঁটে যাও

উদ্যত একাকী

জনশূন্য জনপদে উজ্জ্বল এক চিতা

[গেরিলা/সৈয়দ শামসুল হক]

এ কবিতায় তিনি সারা পৃথিবীর মুক্তিসংগ্রামকে উপজীব্য কবে গেরিলা যোদ্ধাদের একটা অবয়ব তৈরি করেছেন। গেরিলা যোদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে ঋজু ভঙ্গিতে—হাতে উদ্যত সঙ্গিন। ‘নিসর্গে নতুন বৃক্ষ’, ‘উজ্জ্বল এক চিতা’ এ ধরনের জাগতিক নানা উপমার পাশাপাশি গেরিলা যোদ্ধাদের চলাচল অনুভব করেছেন নিঃশ্বাসের শব্দের ভেতরে। এখানে পাঠক দৃষ্টি এবং হৃদয় দুটি দিয়েই অনুভব করবেন কবিতার চিত্র ও দৃশ্যময়তা।

 

৪.

বাংলা কবিতায় সচেতনভাবে মুক্তছন্দেরও প্রয়োগ রবীন্দ্রনাথের হাতে। রবীন্দ্র কবিতা পাঠ পাঠকের জন্য সমুদ্রস্নানের অভিজ্ঞতা—এই বিপুল রত্নরাজির প্রতিক্ষণে আমরা তাঁর ছন্দ-জিজ্ঞাসা ও নিরীক্ষার পরিচয় পাই। তবে এ ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য বা সিদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন আছে—রবীন্দ্রচিন্তা বলয়ে মুক্তছন্দ এবং গদ্যকবিতার ধারণা নিয়ে অস্পষ্টতাও যে ছিল না তা নয়, স্বয়ং অমিয় চক্রবর্তীও এ অভিযোগ করেছেন যে রবীন্দ্রনাথ গদ্যছন্দকে ‘ভার্স লিবর’-এর সমান বিবেচনা করেছেন। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথ হুইটম্যানের ফ্রি ভার্স আর ফরাসি কবিদের কাছ থেকে পাওয়া এজরা পাউন্ডদের মুক্তছন্দের প্রভেদ বিচার করেননি। ফ্রি ভার্স আলোচনায় কখনো গদ্যকবিতা কখনো বলাকার ছন্দ উদ্দিষ্ট হতে দেখে ওই ছন্দের ব্যবহার প্রসঙ্গে শঙ্খ ঘোষও বিপন্ন বোধ করেছেন। বুদ্ধদেব বসু ‘সাহিত্যচর্চা’ গ্রন্থে ‘বাংলা ছন্দ’ বিষয়ে আলোচনায় লিখেছেন, ‘...এ কথা নির্ভয়ে বলা যায় যে কোনো ইংরেজ বা ফরাশির কাছে ফ্রীভার্সের যা অর্থ, তা রবীন্দ্রনাথ রচনা করেননি। এদের ফ্রীভার্স প্রবোধচন্দ্রের মুক্তক নয়, গদ্যছন্দও নয়।’ বুদ্ধদেব বসু যথার্থই বলেছেন, বাংলা কবিতায় যে ফ্রি ভার্সের চর্চা হয়েছে তার প্রকৃতি ভিন্ন, এমনকি অমিয় চক্রবর্তীও হুইটম্যানের পদ্ধতি থেকে দূরে এসে তাঁর ভাষায় ‘অন্তর্লীন ঝংকৃত ও সংহত ভার্স লিবরের রাজ্যে’ তৃপ্তির সন্ধান করেছেন। এ কাজ অমিয় চক্রবর্তী সচেতনভাবেই করেছেন এবং এটা করতে গিয়ে তিনি গদ্য-পদ্য ও নানা ছন্দের মিশেলে মিশ্ররীতিতে লিখেছেন। যদিও তিনি একে অন্তর্লীন ‘ঝংকৃত ও সংহত ভার্স লিবর’ বলতে চেয়েছেন; কিন্তু মূলত তা এক ধরনের মিশ্ররীতি। আকস্মিক উদাহরণ বাদ দিলে অমিয় চক্রবর্তীকে মিশ্ররীতির প্রবর্তক বলাটা অযৌক্তিক নয়। সমর সেনও অনেক কবিতা মিশ্ররীতিতে রচনা করেছেন।

আমরা দেখি, ছন্দ ব্যাখ্যায় প্রায়ই মিশ্রছন্দ ও মুক্তছন্দ এ দুটিকে অনেকেই সমার্থক ভাবেন। যেমন আবদুল মান্নান সৈয়দ মুক্তছন্দের স্থলে মিশ্রছন্দ শব্দটি ব্যবহারের পক্ষপাতী, এ জন্য যে তাঁর মতে ‘মিশ্রছন্দ’ শব্দটি আরো সুনির্দিষ্ট, কারণ ‘মুক্তছন্দ’ বলতে গদ্যছন্দকেও ধরা যেতে পারে। মিশ্রছন্দ বললে এই ছন্দের চারিত্র্য পরিষ্কার হয়ে যায়। তাঁর মতে, ‘যে কবিতায় অনেক ছন্দের মিশেল থাকে, তাকে বলা হয় মিশ্রছন্দ।’ কিন্তু এতে সমাধান হচ্ছে না, কারণ ভার্স লিবর সব সময় মিশ্ররীতি নির্দেশ করে না। এর ভেতরে যে সূক্ষ্ম বিরোধ ও পার্থক্য আছে তা আলোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

ছান্দসিকরা যে আলোচনা করেছেন এবং যেসব উদ্ধৃতি উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন তাতে দেখা যায় যে একই কবিতায় একাধিক ছন্দের মিশ্রণকে তাঁরা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাত্ মিশ্রছন্দ বললে ছন্দের উপস্থিতি অনিবার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা জানি, এ ছন্দে অন্ত্যমিল গ্রহণীয়; কিন্তু ছন্দোবদ্ধ কাঠামো কাম্য নয়। মিশ্ররীতিতে স্বাধীনতা নেওয়া যায়, তবে এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এই যে ছন্দের ভুল প্রয়োগকে মিশ্রছন্দ বলে চালিয়ে দেওয়া সহজ। কোনো কবি হয়তো প্রথম পঙক্তিটি রচনা করেছেন অক্ষরবৃত্তে, পরের পঙক্তি হয়ে গেছে মাত্রাবৃত্ত—কবি কিংবা ছন্দ ব্যাখ্যাতা একে মিশ্রছন্দ বলে চালিয়ে দিতে পারেন। তাই যদি হয়, তাহলে ছন্দ জানার প্রয়োজন হয় না। যাঁদের ছন্দজ্ঞান নেই; কিন্তু ছন্দের কান পরিষ্কার তাঁরা কবিতা আকারে পঙক্তি সাজালে, কোনো না কোনো পঙক্তি কোনো না কোনো ছন্দে পড়বেই। ছন্দজ্ঞান কম থাকলেও এটা ঘটতে পারে। এ জন্য কেউ যদি বলেন ছন্দ জানা বা বোঝার প্রয়োজন নেই, তিনি মিশ্রছন্দে লিখছেন। অকাট্য যুক্তি! অনেকে এ ধরনের কবিতাকে তাই অনিয়ন্ত্রিত, খামখেয়ালিপূর্ণও বলেছেন। তবে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করতে পারেন—যেমন অমিয় চক্রবর্তী, সমর সেন করেছেন অক্ষরবৃত্ত; মাত্রাবৃত্ত মিলিয়েছেন, অন্ত্যমিলও দিয়েছেন—এটা তাঁদের ছন্দজ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ বটে, তবে পাঠকের জন্য সুখকর নয়।

আমার বিবেচনায় ভার্স লিবরের এত দিনকার প্রথাগত ও বিতর্কমূলক ধারণা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারি, বিশেষ করে বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে যদি একে আলাদা স্বরের বাহন হিসেবে বিবেচনা করি। মুক্তছন্দের মধ্যে মিশ্র ধারা থাকতে পারে, সেটি কবিতার প্রয়োজনে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে আসতে পারে; কিন্তু কয়েকটি ছন্দের সমাহারে কবিতা সাজালে সেটিকে মুক্তছন্দ বলা ঠিক হবে না। সেটি আরোপিত, বানানো কবিতা হবে। একে ছন্দ না বলে রীতি বলাই আমার বিবেচনায় সংগত।

চলবে



সাতদিনের সেরা