kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

ফিওদর দস্তয়েফস্কির দ্বিশততম জন্মবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি

অসাক্ষাতে মুখোমুখি দস্তয়েফস্কি-তলস্তয়

মোজাফফর হোসেন

২৬ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অসাক্ষাতে মুখোমুখি দস্তয়েফস্কি-তলস্তয়

পৃথিবীর দুই মহান লেখক, উপন্যাস সাহিত্যের দিকপাল দস্তয়েফস্কি (১৮২১-৮১) ও তলস্তয় (১৮২৮-১৯১০) প্রায় একই সময়ে একই দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে, একই সময়ে একই ভাষায় লেখা হয়েছে ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’, ‘দ্য ইডিয়ট’, ‘দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ’ এবং ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’, ‘আনা কারেনিনা’ ও ‘রেজারেকশন’। বিংশ শতকের বিশ্বসাহিত্যে উপন্যাসশিল্পে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এই উপন্যাসগুলোর মাধ্যমে; এমনকি একবিংশ শতকে এসেও পৃথিবীর যেকোনো ভাষায় কাফকা-শেকসপিয়ারের পর সবচেয়ে চর্চিত নাম সম্ভবত দস্তয়েফস্কি-তলস্তয়।

দস্তয়েফস্কি বয়সে তলস্তয়ের থেকে সাত বছরের বড়। লিখতেও শুরু করেছেন আগে। চল্লিশের দশকেই প্রকাশিত হয় তাঁর তিনটি উপন্যাসিকা ‘পুওর ফোক’ (১৮৪৬), ‘দ্য ডাবল’ (১৮৪৬) ও ‘দ্য ল্যান্ডলেডি’ (১৮৪৭)। ১৮৪৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘ঘবঃড়পযশধ ঘবুাধহড়াধ’। এটি তাঁর অসমাপ্ত উপন্যাস। ‘স্বীকারোক্তি’র আকারে বৃহত্ পরিসরের উপন্যাসটি লেখার ইচ্ছা ছিল; কিন্তু তিনি এটাকে অনুবাদক জেন কেনটিশের মতে, ‘উপন্যাসের প্রস্তাবনা’ হিসেবে প্রকাশ করেন। এ সময় তাঁর গ্রেপ্তার ও সাইবেরিয়ায় নির্বাসনের ঘটনা ঘটে। নির্বাসন থেকে ফিরে তিনি এই লেখায় আর হাত দেননি। পঞ্চাশের দশকে তাঁর দুটি বই বের হলেও বিখ্যাত উপন্যাসগুলো লেখেন ষাটের দশকে। তাঁর ‘হাউস অব ডেড’ (১৮৬২), ‘নোটস ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড’ (১৮৬৪), ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ (১৮৬৬) ও ‘ইডিয়ট’ (১৮৬৯) প্রকাশিত হয় এই দশকে।

অন্যদিকে লেখক তলস্তয়ের আত্মপ্রকাশ ঘটে পঞ্চাশের দশকে। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘চাইল্ডহুড’ ১৯৫৪ সালে ‘বয়হুড’ ও ১৯৫৬ সালে ‘ইয়ুথ’। আত্মজৈবনিক ট্রিলজি দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। পঞ্চাশের দশকেই তাঁর বেশ কিছু ছোটগল্প প্রকাশিত হয়। তবে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়ার অ্যান্ড পিচ’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। অর্থাত্ ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ ও ‘ইডিয়ট’ প্রকাশের মধ্যবর্তী বছরে। মাঝে এক বছরের ব্যবধানে পরপর তিন বছরে রাশিয়ায় রুশ ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বসাহিত্যের তিনটি প্রধান উপন্যাস। এরপর ১৯৮০ সালে মৃত্যুর এক বছর আগে প্রকাশিত হলো দস্তয়েফস্কির আরো একটি বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য ব্রাদারস কারামাজভ’। তলস্তয়ের ‘আনা কারেনিনা’ (১৯৮৭), ‘ডেথ অব ইভান ইলিচ’ (১৯৮৬) ও ‘রেজারেকশন’ (১৯৯৯) যখন প্রকাশিত হয়েছে তখন দস্তয়েফস্কি আর বেঁচে নেই।

দুজন লেখক একই সঙ্গে রুশ সাহিত্যে উপন্যাসের দুটি ধারা উন্মোচন করেন। দস্তয়েফস্কির গদ্য মনস্তাত্ত্বিক, অন্তর্মুখী; তলস্তয়ের সামাজিক, বহির্মুখী। দুজনেই ধার্মিক ছিলেন। তলস্তয় নিয়ত নিজেকে সংশোধন করার চেষ্টা করেছেন। দস্তয়েফস্কি নিমজ্জিত হয়েছেন আত্মদহনে। তলস্তয় অদৃষ্টবাদী হলে দস্তয়েফস্কি অস্তিত্ববাদী। তলস্তয়ের সাহিত্য হৃদয়নিঃসৃত এই কারণে তিনি বেশি পাঠকপ্রিয় হয়েছেন, অন্যদিকে দস্তয়েফস্কির গদ্য মস্তিষ্কসৃজিত; এই কারণে তাঁর লেখা দর্শনশাস্ত্রের মতো গুরুগম্ভীর হয়ে উঠেছে। এমন কিছু পার্থক্য বাদ দিলে দুজনই বাস্তববাদী লেখক। দুজনের সামাজিক অবস্থান ও রাজনৈতিক কমিটমেন্ট এক রকম না হওয়ায় তাঁদের গল্প-উপন্যাস রুশসমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার দুই রকম চিত্র তুলে আনে। ফলে ঊনবিংশ শতকের রাশিয়াকে জানতে হলে একজনকে পাঠ থেকে খণ্ডিত জানা হবে, দুজনকে পাঠ করার ভেতর দিয়ে টোটাল রাশিয়াকে ধরা যাবে। এই কারণে কেউ কারো সুখ্যাতি ও জনপ্রিয়তায় ভাগ বসাতে পারেননি। দুজনই একই সঙ্গে হয়ে উঠেছেন সমান অপরিহার্য। 

এই দুই লেখককে বিশ্বের সব দেশের খ্যাতিমান লেখকরা যখন নমস্য মনে করছেন, কে কার চেয়ে বড় ঔপন্যাসিক, সেই তর্ক যখন অমীমাংসিত থেকে গেছে গত এক শ বছরে, তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে : তাদের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল? তাঁরা কি একে অপরের বন্ধু হতে পেরেছিলেন? কেমন ছিল তাঁদের আড্ডা কিংবা পত্রবিনিমিয়? পরস্পরের লেখা নিয়ে মূল্যায়নই বা কেমন ছিল?

এই প্রশ্নগুলোর সবচেয়ে হতাশাজনক উত্তরটা হলো : এই দুই মহান লেখক স্বদেশি এবং সমকালীন হলেও অদ্ভুত সত্য এই যে তাঁরা একে অপরকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না। তাঁদের সাক্ষাত্ ও আড্ডার ঘটনা ঘটেনি। তবে উভয়েই একে অপরের কাজ সম্পর্কে উচ্চ ধারণা রাখতেন। ১৮৫৫ সালে তরুণ লেখক তলস্তয় যখন পিটার্সবার্গ আসেন, তিনি তুর্গেনেভ ও নেকরাসভসহ অনেক লেখকের সঙ্গে পরিচিত হন; কিন্তু তখন দস্তয়েফস্কি নির্বাসনে ছিলেন। ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ প্রকাশিত হওয়ার পর দস্তয়েফস্কি পড়ে খুব মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি তলস্তয়ের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। ১৮৭৮ সালে তাঁরা উভয়েই দার্শনিক ভ্লাদিমির সলোভ্যভের সলোভিয়েভের একটি বক্তৃতায় অংশ নেন; কিন্তু একে অপরের সঙ্গে দেখা হয়নি। দুই বছর পর পুশকিনের একটি ভাস্কর্য উদ্বোধনে অংশ নিতে মস্কো আসেন দস্তয়েফস্কি। উদ্বোধনের আগে তলস্তয়ের সঙ্গে দস্তয়েফস্কি দেখা করতে চাচ্ছিলেন; কিন্তু তিনি জানতে পারেন তলস্তয় সামাজিক মেলামেশা কমিয়ে দিয়েছেন, নির্জন জীবন যাপন করছেন।

একই বছর তলস্তয় যখন দস্তয়েফস্কির ‘দ্য হাউস অব দ্য ডেড’ পড়েন, তিনি এতটাই মুগ্ধ হন যে এক পত্রে তিনি বইটিকে ‘পুশকিনসহ সমস্ত নতুন সাহিত্যের সেরা’ বলে অভিহিত করেন।

১৮৮১ সালে দস্তয়েফস্কি মারা যান। তলস্তয় তাঁর মৃত্যুর খবরে গভীরভাবে শোকাহত হন। একটি ব্যক্তিগত চিঠিতে দুজনের এক কমন বন্ধুকে তিনি লেখেন : ‘তার মৃত্যুর খবর শুনে আমি বুঝতে পারি সে আমার কাছে খুব আত্মীয়, প্রিয় ও প্রয়োজনীয় মানুষ ছিল। আমি বিদ্বান মানুষ, আর সব বিদ্বান ব্যক্তি ব্যর্থ ও ঈর্ষাকাতর; অন্তত আমি সেই ধরনের বিদ্বান। তবে কখনোই তার সঙ্গে নিজেকে তুলনা করার চিন্তা মাথায় আসেনি, কখনোই না। সে যা করেছে (অবশ্যই তা ভালো ও হৃদয়নিঃসৃত) তা এমনই যে যত বেশি করেছে, ততই আমার মঙ্গল হয়েছে। শিল্প আমার মধ্যে ঈর্ষা জাগায়, এমনকি ধীশক্তিও; কিন্তু হৃদয়ের বিষয়গুলো শুধু আনন্দ দেয়। তাই আমি তাকে আমার বন্ধু ভেবেছি, কখনো কল্পনাও করিনি আমাদের দেখা হবে না। রাতে খাবার টেবিলে যখন তার মৃত্যুসংবাদ পড়লাম, তখন মনে হলো আমি কারো সমর্থন হারালাম, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। তখনই স্পষ্ট হয়ে গেল সে আমার কাছে কতটা প্রিয়। আমি কাঁদলাম, এখনো কাঁদি।’

দেখা না হওয়ার অপূর্ণতা অন্যভাবে পূরণ করেছিলেন তলস্তয়। নিজের জীবনের শেষ বইটি পড়েছিলেন দস্তয়েফস্কির ‘দ্য কারামাজভ ব্রাদার্স’।

তবে মজার ব্যাপার হলো, দস্তয়েফস্কির স্ত্রী তলস্তয় ও তাঁর স্ত্রীর বন্ধু ছিলেন। তাঁরা একে অপরকে অনেকবার দেখেছেন। দস্তয়েফস্কির মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীর কাছে তলস্তয় দস্তয়েফস্কির সঙ্গে দেখা না হওয়ার অনুশোচনার কথা জানান।

দস্তয়েফস্কির জন্মের দুই শ বছর হলো ১১ নভেম্বর। পৃথিবীর অন্যতম প্রধান লেখক তিনি। পৃথিবীর প্রতিটি ভাষার সাহিত্যে, এমনকি চিন্তায়ও কমবেশি তাঁর প্রভাব আছে। সেই অর্থে পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সৃষ্টিশীল মানুষ তাঁর কাছে ঋণী।



সাতদিনের সেরা