kalerkantho

শনিবার । ১৫ মাঘ ১৪২৮। ২৯ জানুয়ারি ২০২২। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

কবিতার অন্বেষণ, কবিতার কৌশল ১১

মিশ্ররীতি ও মুক্তছন্দ

কামাল চৌধুরী

১২ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মিশ্ররীতি ও মুক্তছন্দ

ওয়াল্ট হুইটম্যানকে (১৮১৯-৯২) বলা হয় আমেরিকার বিশ্বকবি। কবিতার জন্য নানা প্রতিকূলতা, বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন— প্রথাগত শিক্ষা খুব বেশি দূর ছিল না। চিত্রকর, স্কুল শিক্ষক, রিপোর্টার ও সম্পাদকের কাজ করেছেন। জীবনযাপনে ছিলেন ভবঘুরে, প্রথাবিরুদ্ধ— কবিতায়ও এনেছেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

বিজ্ঞাপন

১৮৫৫ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘Leaves of Grass’ ইংরেজি কবিতার মানচিত্র বদলে দেয়। চিরাচরিত মাত্রার হিসাব ও ছন্দের বিন্যাস (Pattern) পরিহার করে কবিতাকে প্রথাগত ছন্দের নিগড় থেকে নিয়ে আসেন মুক্ত এক জগতে। এখন যাকে বলা হয় ফ্রি ভার্স বা মুক্তছন্দ, মূলত এর জনক তিনি। তবে তাঁর লেখা ছন্দোবদ্ধ কবিতাও আছে—যেমন আব্রাহাম লিংকনকে নিয়ে লেখা ‘O Captain! My Captain’ (১৮৮৫) কবিতা। প্রথাগত ছন্দ পরিহার করতে গিয়ে হুইটম্যান কবিতায় এনেছেন নতুন ছন্দ—আঙ্গিকে প্রলম্বিত ও বর্ণনাত্মক অবয়ব।

প্রায় কাছাকাছি সময়ে আমরা দেখি, ফরাসি প্রতীকবাদীদের হাতে কবিতার প্রথাগত কাঠামো আস্তে আস্তে ভেঙে পড়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যায়ে এসে ফরাসি কবিতায় Vers Libre-এর ধারণার উদ্ভব ঘটে। এরই হুবহু অনুবাদ ফ্রি ভার্স। ভার্স লিবরের প্রবক্তারা কবিতার বিষয়বৈচিত্র্যের নিরিখে ছন্দ ও বক্তব্যে নতুন দ্যোতনা আনার চেষ্টা করেছেন। তবে তারও আগে অনেকে এর উৎস খুঁজেছেন বাইবেলের কাব্যময় গদ্যশৈলী ও ক্রিস্টোফার স্মার্টের (১৭২২-৭১) তত্সংশ্লিষ্ট লেখা ও উইলিয়াম ব্লেকের (১৮৪১-৯৪) দীর্ঘ চরণসমৃদ্ধ গদ্যে।

বর্তমান সময়ের কবিতার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফ্রি ভার্স ও ছন্দোবদ্ধ কবিতা দুটিই সমান্তরালে বহমান। বিশিষ্ট কবিরা কবিতার সব আঙ্গিক ও প্রকরণে যেমন সিদ্ধহস্ত, তেমনি নানা ধরনের কবিতাও তাঁরা লিখেছেন। তবে এখন ফ্রি ভার্সে প্রচুর লেখা হচ্ছে—এর সুবিধা এই যে এখানে কোনো কাঠামোয় বিন্যস্ত থাকতে হয় না। এর স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট কোনো নকশা নেই। বাঁধাধরা নিয়মের নিগড়ে আবদ্ধ থেকে ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি অবদমন করতে হয় না। কবিতার স্বতঃস্ফূর্ততা বজায় রেখে সংহত কবিতার অবয়ব তৈরি করা সম্ভব হয়। কবিতার তাল, লয়, শব্দ, শ্বাসাঘাত, অনুপ্রাস—সব কিছুই কবির নিয়ন্ত্রণে থাকে। কোনো গাণিতিক হিসাব দিয়ে তার শুদ্ধতা নিরূপণের প্রয়োজন হয় না। অনেকে একে সে জন্য ঙত্মধহরপ বা জৈব কবিতা রূপেও দেখে থাকেন, যা স্বতঃস্ফূর্ত বা প্রাকৃতিক-আরোপিত নয়। তবে চূড়ান্ত অর্থে এটি ছন্দোমুক্তি নয়—ছন্দের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে এসে আরেক ধরনের দোলা তৈরি করা। শঙ্খ ঘোষ ‘ছন্দের বারান্দা’ গ্রন্থে ‘মুক্তছন্দ ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে চমৎকারভাবে বলেছেন, ‘ছন্দসিদ্ধ রচনা আর গদ্যছন্দের মধ্যবর্তী সেই অল্প দেখা দেশটির নাম বলা যায় ফ্রি ভার্স... অবাধ মুক্তিতে বস্তুত কোনো আনন্দ নেই। জটিল বন্ধনের মধ্যে মুক্তির প্রত্যাশায় বাঁধন পরানো বাঁধন খোলানোর খেলাতেই শিল্পীর তৃপ্তি। ফ্রি ভার্সে একই সঙ্গে পাই বন্ধন ও বন্ধন মুক্তির খেলা। ’

হুইটম্যানের এই নবতর উদ্ভাবন প্রভাবিত করেছে অনেককে। টি এস ইলিয়ট ‘The Love Song of J. Alfred Prufrock’ এবং এজরা পাউন্ড ‘The Return’ কবিতার মাধ্যমে মুক্তছন্দে স্মরণযোগ্য কবিতা রচনা করেছেন। ডাব্লিউ বি ইয়েটস, পাউন্ডের ‘The Return’ কবিতাকে মুক্ত ফর্মে লেখা সবচেয়ে সুন্দর কবিতা বলে উচ্ছ্বিসত প্রশংসা করে বলেছেন, মুক্ত ফর্মে লেখা সবচেয়ে সুন্দর কবিতা ও হাতে গোনা কয়েকটি কবিতার অন্যতম যার মধ্যে আমি সত্যিকারের জৈব ছন্দ পেয়েছি। ’

মুক্তছন্দের কবিতা যেহেতু জৈব প্রকৃতির অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ত ও হৃদয়উৎসারিত তাই তাৎক্ষণিকও। ছন্দ-মাত্রার খেলা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা অনেক সময় কবিতাকে বানানো কবিতায় রূপান্তর করে—এতে শব্দ নিয়ে কসরতের চিহ্ন থাকে। ফলে কবিতার দোলা বা সংগীতময়তা বাধাগ্রস্ত হয়। এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। মুক্তছন্দ সম্পর্কে এজরা পাউন্ড বলেছেন, ‘লেখা সাজাতে হবে সাংগীতিক ক্রম অনুযায়ী, তালের ক্রম অনুযায়ী নয়। ’ হোর্হে লুইস বোর্হেস ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে—‘ছন্দের বাইরে ফ্রি ভার্সের মাধ্যমে আমরা যা পাই তা তথ্য বা যুক্তি নয়, বরং আবেগ। ’

সন্দেহ নেই, এ ধরনের কবিতার জন্য বোর্হেস কথিত আবেগ থাকা জরুরি।

 

২.

আমেরিকান কবি মেরি অলিভার জানান, চূড়ান্ত বিচারে বন্ধনমুক্ত নয় এসব কবিতা। এর অবশ্যই একটা ডিজাইন বা নকশা আছে, যা কবির স্বতন্ত্র চিন্তার বা তাড়নার ফসল। তিনি ফ্রি ভার্সকে সময়ের দাবি বলেও তাঁর ‘A Poetry Handbook’ (১৯৯৪)-এ উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, কবিরা প্রচলিত কণ্ঠস্বর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছিলেন—সম্ভবত এর সঙ্গে গণতন্ত্র ও আমেরিকার শ্রেণিহীন সমাজেরও একটা সম্পর্ক আছে। তিনি উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের ‘The Red Wheelbarrow’ কবিতাকে ফ্রি ভার্সের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে তাঁর গ্রন্থে আলোচনা করেছেন।

 

The Red Wheelbarrow

so much depends

upon

a red wheel

barrow

glazed with rain

water

beside the white

chikens

 

এত কিছু নির্ভর

করে

একটি লাল ঠেলা

গাড়ি

বৃষ্টির পানিতে

ঝলমলে

সাদা মুরগিদের

পাশে

 

যুক্তি হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন যে এ কবিতায় বস্তুগত আবহ আছে, দৃশ্য আছে, কল্পনা আছে, তাৎক্ষণিকতা আছে—তাৎক্ষণিকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণের প্রবণতা আছে। এতে কোনো বিরাম চিহ্ন ব্যবহার করা হয়নি। লাইন ভেঙে এক ধরনের নীরবতা তৈরি করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে যা ঘটছে, যা জাগতিক কবি তাকে তুলে আনছেন গভীর পর্যবেক্ষণে।

►►চলবে



সাতদিনের সেরা