kalerkantho

রবিবার । ৯ মাঘ ১৪২৮। ২৩ জানুয়ারি ২০২২। ১৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

হাসপাতালে শুয়ে জীবনস্মৃতি লিখছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

আলী হাবিব

৫ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাসপাতালে শুয়ে জীবনস্মৃতি লিখছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মিছিলে গুলি চালাল পুলিশ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে শহীদ রফিকের মরদেহ দেখে তরুণ মনে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। লিখলেন কবিতা, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি/ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু ঝরা এ ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি/আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি/জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা/শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,/দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবী/দিন বদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?/...ওরা গুলি ছোঁড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবীকে রোখে/ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই সারা বাংলার বুকে/ওরা এদেশের নয়,/দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়/...’

তাঁর বয়স তখন মাত্র ১৮ বছর।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা কলেজের ছাত্র তিনি। এই কবিতাটিতে প্রথমে সুরারোপ করেন আবদুল লতিফ। পরে সুর করেন আলতাফ মাহমুদ। আলতাফ মাহমুদের সুরেই গানটি একুশের প্রভাতফেরির গান হিসেবে গীত হয়। সেই থেকে দেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরীর নাম।

আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী সেই অসামান্য গল্পকথক, যাঁর কলামের প্রতিটি শব্দ পাঠককে টানে। লেখার মধ্য দিয়ে তাঁর এই বলার ভঙ্গিটি অসাধারণ। তিনি বাংলাদেশের সেই সেলিব্রিটি সাংবাদিক, দেশে ও দেশের বাইরে যাঁর কলামের অপেক্ষায় থাকে গুণগ্রাহী পাঠক। বাংলাদেশের চারটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিকে সপ্তাহে পাঁচ দিন তাঁর কলাম প্রকাশিত হয়। এর বাইরে লেখেন লন্ডনের বাংলা সাপ্তাহিক জনপদে। প্রচলিত সংবাদভাষ্য ও সাহিত্যের ভাষার ব্যবধান ঘুচিয়ে দেশের সংবাদপত্রে তাঁর কলাম যে নতুন এক ঘরানা সৃষ্টি করেছে, তার আবেদন পাঠকের কাছে প্রতিদিনের জন্য নতুন। সাহিত্যের মানুষ বলেই হয়তো এই ধারাটি এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন তিনি।

এখনো হাতে লেখেন। লেখা শেষে সহকারীর মাধ্যমে স্ক্যান করে পিডিএফ কপি পাঠান সংবাদপত্রে। এ বয়সেও ঝরঝরে হাতের লেখা। অসামান্য স্মৃতিশক্তি। অবলীলায় বলে যান শৈশব-কৈশোরের কথা। দেশের অনেক রাজনৈতিক ঘটনা তাঁর ঠোঁটের ডগায়। বর্তমান সময়ে সংবাদ সাহিত্যের পুরোধা পুরুষ তিনি। একুশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রাজনৈতিক বিশ্বাসে ধারণ করে গণতান্ত্রিক, সেক্যুলার, জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে অটল থেকেছেন চিরকাল। মুক্তিযুদ্ধের কলমযোদ্ধা আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী ১৯৭১ সালে জয় বাংলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মডারেটরের ভূমিকাও পালন করেছেন তিনি।

প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে নিয়ম করে লিখতে বসা যাঁর অভ্যাস, সেই আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এক মাসেরও বেশি সময় কলম ধরতে পারেননি। কারণ অসুস্থতা। বার্ধক্যজনিত নানা রোগ তাঁকে ভোগাচ্ছে। লিখতে পারছেন না। গত ২৮ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে কালের কণ্ঠের বিশেষ ক্রোড়পত্রে তাঁর শেষ লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে। লিখেছিলেন গত ২৩ সেপ্টেম্বর। অসুস্থ হয়ে পড়লে ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে তাঁকে লন্ডনের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ২৯ সেপ্টেম্বর লন্ডন সময় বিকেলে ফিরে আসেন বাড়িতে। কিন্তু কয়েক দিন পরই নানা জটিলতা নিয়ে আবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাঁকে।

তাঁর সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয় প্রতিদিন। এপার থেকে আমি ফোন করতে ভুলে গেলেও তিনি ঠিকই ফোন করবেন। কুশলাদি বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করবেন, দেশের খবর কী? দেশ নিয়ে সর্বক্ষণ ভাবেন তিনি। দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি কি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে? স্বাধীনতাবিরোধীরা কি অপতৎপরতায় লিপ্ত? রাজনীতির গতি-প্রকৃতি জানতে চান।

সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে কাজের সূত্রেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়। তিন দশকের সম্পর্ক আজও অক্ষুণ্ন। শুরুতে সেই যে পরম মমতায় কাছে টেনে নিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে ছেদ পড়েনি কোনো দিন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও প্রতিদিন ফোন করেন। খোঁজ নেন। গত ৪ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেলে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। দেশের খবর নিলেন। জানালেন, শরীর আগের চেয়ে অনেক ভালো। আশা করছেন, শিগগিরই ছাড়া পাবেন হাসপাতাল থেকে। বললেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের নানা দিক নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বই লিখবেন, এমন পরিকল্পনা ছিল তাঁর। এরই মধ্যে দুটি অংশ কালের কণ্ঠের ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসকদের পরামর্শ আপাতত লেখালেখিতে ফিরতে পারবেন না তিনি। চিকিৎসকরা পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিলেও ঘরে ফিরে জীবনস্মৃতি লেখার পরিকল্পনা করে ফেলেছিন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই চিকিৎসক ও নার্সদের নজরদারির মধ্যে কয়েক পৃষ্ঠা লিখেও ফেলেছেন। বললেন, কাজটি শেষ করতে চান। আর কলাম লিখলে লিখবেন শুধু কালের কণ্ঠের জন্য।



সাতদিনের সেরা