kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দেশের প্রথম নারী পাইলট প্রশিক্ষক লারা

অলকা ঘোষ

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেশের প্রথম নারী পাইলট প্রশিক্ষক লারা

২৭ সেপ্টেম্বর। দেশের এক নবীন উজ্জ্বল নক্ষত্রের অকালপ্রয়াণ ঘটেছিল এদিন পোস্তগোলার আকাশে। তিনি ছিলেন অমিত সাহসী এক মেধাবী কন্যা—ফারিয়া লারা। এ প্রসঙ্গে এসে যান জননী সাহসিকা কবি বেগম সুফিয়া কামাল। ব্রিটিশ শাসনামলে বেগম রোকেয়ার হাত ধরে বেরিয়ে এসেছিলেন। ১৯২৮ সালে লোকনিন্দার ভয় আর সামাজিক-পারিবারিক বাধা ভেঙে বিমানে চড়েছিলেন নিজেকে যথাসম্ভব গোপন রেখে। একদা এমনই ছিল আমাদের বাঙালি নারীর জীবনচিত্র। বেগম রোকেয়ার ১৮৮০ থেকে ফারিয়া লারার ১৯৭০ সাল। ৯০ বছরে দুটি রাষ্ট্র, আর একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় সমাগতকালে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আমাদের কত উত্থান, নবজাগরণের ইতিহাস।

১৯৭০ সাল। বিমান কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন খান ও কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের ঘর আলো করে এলেন ফারিয়া লারা। দিনটি ছিল বৈশাখের ৩ তারিখ। ১৬ এপ্রিল।

পরের বছর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। লারার বাবা মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেন। আর এই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ হয়ে ওঠে শিশুকন্যার জননী সেলিনা হোসেনের সাহিত্যরচনার পটভূমি। মা-বাবা, ভাই-বোনের সঙ্গে লারার শৈশবের দিনগুলো ছিল সোনালি আলোয় মুখরিত। ঘরভরা বই তাঁর নিত্যসহচর। মা-বাবার হাত ধরে এক সুন্দর সকালে স্কুলে ভর্তি হন। বাড়ির বাইরে সে দেখে এক বিচিত্র আনন্দময় জগৎ। স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের মনোজগৎ আলোকে উদ্ভাসিত করার জন্য রয়েছে খেলাধুলা, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ। আগ্রহীদের জন্য নাচ-গান-আবৃত্তি, গল্প বলা, ছবি আঁকা, বিতর্ক, রচনা প্রতিযোগিতার সুযোগ। সবখানে ছিল তাঁর সফল পদচারণ। ঘরে মায়ের কাছে বসে মনের আনন্দে বেহালা বাজানো আর ছবি আঁকা ছিল তাঁর শখ। বাবার কাছে মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনে বড় বড় ডাগর দুই চোখের তারা চকচক করে।

ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্ব ছিল লারার। তোমার জীবনের লক্ষ্য কী? স্কুলের পরীক্ষার এমন প্রশ্নের উত্তরে এক দিন নির্দ্বিধায় লিখে এলেন, ‘আমি বড় হয়ে বৈমানিক হব।’ মা-বাবা আত্মজার সে বাসনায় কখনো অন্তরায় হননি।

অমিত সাহসী ও মেধাবী লারা ছাত্রজীবনে ছবি আঁকা, গল্প বলা, টিভি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে যেসব পুরস্কার অর্জন করেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—১৯৭৮ সালে কোরিয়ান চিলড্রেন সেন্টার পুরস্কার, ১৯৭৯ সালে ফিলিপস বাংলাদেশ পুরস্কার, ১৯৮০ সালে নিপ্পন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আয়োজিত প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক, ১৯৮৪ সালে ভারতের শঙ্কর আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতায় উপস্থিত বক্তৃতায় পুরস্কার ইত্যাদি।

১৯৯২ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হওয়ার পরই ছোটবেলার স্বপ্ন বৈমানিক হওয়ার জন্য পাইলট প্রশিক্ষণে ভর্তি হন। দুই বছর পর ১৯৯৪ সালে লারা ইংরেজি সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর লারা সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশের কাছ থেকে প্রাইভেট পাইলটের লাইসেন্স অর্জন করেন। ১৯৯৮ সালের ১৯ মার্চ তিনি বাণিজ্যিক পাইলটের লাইসেন্সপ্রাপ্তির পর পাইলটদের প্রশিক্ষক হওয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু করলেন।

তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট প্রশিক্ষক। পাইলট হতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি উড্ডয়নের প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু হয় ৫০ ঘণ্টার। এই প্রশিক্ষণের শেষ দিনটি ছিল ১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর।

এ দিন বরিশাল থেকে এয়ার পারাবাতের সেসনা ১৫০ প্রশিক্ষণ বিমানের তিনি প্রশিক্ষক পাইলট, সঙ্গে সহকারী পাইলট রফিকুল ইসলাম সুমন। ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়ে ছোঁয়ার কথা ছিল সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে। তাঁর ৫০ ঘণ্টার নির্ধারিত ফ্লাইং টাইম শেষ করতে তখন মাত্র কয়েক মিনিট বাকি।

রাজধানী ঢাকার কাছে চলে এসেছে বিমান। নির্ধারিত কাঙ্ক্ষিত ফ্লাইং টাইম শেষে গোলে পৌঁছবেন লারা। জীবনের অন্য রকম এক সাফল্য ধরা দেবে। আনন্দ-উত্তেজনা চেপে মনোযোগী নিজের কাজে। হঠাৎ অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে ওঠে তাঁর। শেষ সময়ে বিমানে যান্ত্রিক গোলযোগের আভাস। বিচক্ষণ লারা তাৎক্ষণিক সমস্যাটি সামলানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। পোস্তগোলার আকাশ। দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে সময়! সমস্যা তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

বিপদ ঘটার আশঙ্কা জানার পর কয়েক মিনিট সময় হাতে পেয়েছিলেন। বিমান দুর্ঘটনার মাত্র কিছু সময় আগে বিমান থেকে মে ডে কলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকক্ষে জরুরি বার্তা পাঠালেন, ‘আর কয়েক মিনিট মাত্র এ পৃথিবীতে বেঁচে আছি, আমরা আর কয়েক মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছি।’ এটাই ছিল তাঁর জীবনের শেষ বার্তা। মাত্র ২৮ বছর বয়সেই জীবনের ইতি!

জনক-জননীর উপস্থিতিতে সন্তান বিয়োগ পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর কষ্টের ক্ষত, সে বেদনা দুর্বহ-অসহনীয়। কোনো সান্ত্বনাই সেখানে শান্তির প্রলেপ হতে পারে না। সেই হারানোর যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি সযত্নে বুকে লালন করে আজীবন বয়ে চলতে হয় স্বজনদের। দেখতে দেখতে আজ ২৩টি বছর পার হয়ে গেল। লারা এ দেশের প্রথম নারী প্রশিক্ষক বৈমানিক। এক অন্তহীন ভালোবাসা ফারিয়া লারার জন্য!

বিমান দুর্ঘটনায় প্রিয় কন্যার জীবনাবসান ঘটলেও লারার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে শোকস্তব্ধ মা-বাবা সেই দুঃসময়ের দুই বছরের মধ্যে নিজেদের জমিতে গড়ে তোলেন লারা ফাউন্ডেশন। সেই ফাউন্ডেশন আগামী প্রজন্মকে আলোকিত মানুষ করে গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রত্যয়ী। এ লক্ষ্য নিয়ে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরা। বরগুনার ছয়টি উপজেলার ৩৭৮টি গ্রামে চলছে শিক্ষা স্বাস্থ্য উন্নয়নে এক মহা কর্মপরিকল্পনা। ঢাকার অদূরে গাজীপুর সদরের ভাওয়ালগড়, ঢাকা-কাপাসিয়া সড়কের পাশে লারা ফাউন্ডেশনের মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। এখানে আর্তপীড়িত অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবা দানের মহৎ উদ্যোগে অগণিত নারী-শিশু উপকৃত হচ্ছে। অন্যদিকে লারার পৈতৃক জমিতে প্রতিষ্ঠিত বরগুনার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলে-মেয়েরা একাডেমিক পাঠ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে আদর্শ মানুষ হিসেবে সুকুমার বৃত্তির চর্চা করছে।  

ফারিয়া লারার মা-বাবার জীবনে যে বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটেছে তা অপূরণীয়। সন্তানের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে, ফারিয়া লারার উজ্জ্বল আশাকে অগণিত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার বিপুল বাসনায় যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তাঁরা, আমাদের শ্রদ্ধা-সম্মান সে উদ্যোগের প্রতি।



সাতদিনের সেরা