kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ধারাবাহিক লেখা - ৩

কবিতার অন্বেষণ, কবিতার কৌশল

কামাল চৌধুরী

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কবিতার অন্বেষণ, কবিতার কৌশল

কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ছন্দের জাদুকর হিসেবে বাঙালির কাছে পরিচিত। পাঠকের সুবিধার্থে তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতার বই থেকে পদ্য ও কবিতার উদাহরণ দিচ্ছি :

গ্রীষ্ম-চিত্র

বৈশাখের খরতাপে মূর্চ্ছাগত গ্রাম,

ফিরিছে মন্থর বায়ু পাতায়-পাতায়;

মেতেছে আমের মাছি, পেকে ওঠে আম,

মেতেছে ছেলের দল পাড়ায়-পাড়ায়।

 

চম্পা

আমারে ফুটিতে হল

বসন্তের অন্তিম নিশ্বাসে,

বিষণ্ন যখন বিশ্ব

নির্মম গ্রীষ্মের পদানত;

রুদ্র তপস্যার বনে

আধ ত্রাসে আধেক উল্লাসে,

একাকী আসিতে হল

সাহসিকা অপ্সরার মতো।

প্রথমটি যে পদ্য এ নিয়ে মনে হয় কারো সংশয় হবে না। এখানে সুন্দরভাবে গ্রীষ্মকালের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আমের মাছি, বৈশাখের খরতাপ—এসব ক্লিশে বা বহু ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্য এখানে আমরা পাই। এটি আমাদের পাঠে তাৎক্ষণিক আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু ভাবায় না। কারণ এই পদ্যে যা আছে তা আমাদের অতি পরিচিত।

দ্বিতীয়টি কবিতার উদাহরণ। এটিও ছন্দোবদ্ধ, কিন্তু এখানে কল্পনা অনেক প্রসারিত। এখানেও গ্রীষ্মকালের ছবি আছে, কিন্তু ভিন্ন রূপে। ‘বসন্তের অন্তিম নিশ্বাসে’, ‘আধ ত্রাসে আধেক উল্লাসে’, ‘সাহসিকা অপ্সরার মতো’—এ ধরনের রূপক ও উপমার ব্যবহার পাঠকের কাছে আলাদা দ্যোতনা তৈরি করে।

 

ভালো কবিতা বাজে কবিতা

ওপরের আলোচনায় দেখলাম পদ্য ছন্দোবদ্ধ রচনা। অর্থাৎ ছন্দ-মাত্রায় বিন্যস্ত না হলে তাকে পদ্য গোত্রে ফেলা যাবে না। পদ্য লেখা সব সময় যে বাজে হবে তা কিন্তু নয়। পদ্য পদ্য হিসেবে উত্তীর্ণ হলে ঠিক আছে, কিন্তু বাজে পদ্যও আছে। পদ্য ছন্দোবদ্ধ রচনা বিধায় পদ্যের বহুযুগ লালিত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় মুক্ত ছন্দে বা গদ্য ছন্দে পদ্য লেখা সম্ভব নয়। কবিতারও শুরু ছন্দোবদ্ধ পদ দিয়ে, এখন ভিন্ন আঙ্গিকেও লেখা হচ্ছে কবিতা। কিন্তু ছন্দোবদ্ধ রীতিতে যা লেখা হচ্ছে তাকে যেহেতু পদ্য বলতে পারব না, কী বলব? সেটি কি শুধু কবিতা? এ ধরনের লেখার সবই যে কবিতার বিচারে উত্তীর্ণ তা নয়। বাজে লেখার উদাহরণই বেশি। বাজে কবিতাকে তাহলে আমরা কি পদ্য না বলে বাজে কবিতা বলতে পারি?

সব ভাষায় বাজে লেখা আছে। জর্জ অরওয়েল ইংরেজি ভাষায় বাজে লেখার অনেক উদাহরণ দিয়েছেন। ভালো লেখার আনন্দ তাৎক্ষণিক নয়, চিরকালীন। হেরমেন হেস লিখেছেন, স্কুলে যে লেখাকে প্রথম কবিতা মনে হয়েছে, কালের বিচারে সেটি মন্দ লেখা। বর্তমানে কবিতা লেখা হচ্ছে নানাভাবে—প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে কবিতা প্রিন্ট মিডিয়ার পাশাপাশি, ফেসবুক, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন ইত্যাদিতে ছড়িয়ে পড়েছে। আগে পত্রিকার সাহিত্য পাতায় কবিতা ছাপা হতো, না হয় প্রথাবিরুদ্ধ রাগী তরুণরা ছোট কাগজ বের করতেন কষ্ট করে। এখন এসব লাগে না। কবিতা এখন তিন জগতের বাসিন্দা। একটি প্রিন্ট মিডিয়া, অন্যটি ফেসবুক অথবা অনলাইন পত্রিকা, আর পারফমিং কবিতা। ফেসবুকে হাজার হাজার পাঠক, শ্রোতা। এক পোস্টে কবিতা চলে যাচ্ছে বহুজনের কাছে। পড়ুক বা না পড়ুক, লাইক দিচ্ছে সবাই। আবার আবৃত্তিও প্রচুর শ্রোতার কাছে পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু এর প্রায় ৯৫ শতাংশ বাজে কবিতা কিংবা অকবিতা। আগে কবিতা প্রকাশ ছাড়া কবি হওয়া কঠিন ছিল। ভালো পত্রিকায় ছাপা না হলে কেউ কবি বলতেন না। এখন এসবের বালাই নেই। ছোট কাগজ বের করা যেমন সহজ, তেমনি প্রতিদিন ফেসবুকে কবিতা পোস্ট দেওয়াও সহজ। এতে চাল আর কাঁকরে সাধারণ পাঠক পার্থক্য করতে পারছে না। তাহলে এসব বাজে কবিতা বা অকবিতাকে কী বলব?

আমার মনে হয়, পদ্য বেচারাকে আর কষ্ট দিয়ে লাভ নেই। পদ্য যেহেতু ছন্দোবদ্ধ রচনা, তাই বর্তমান সময়ে প্রথাগত ছন্দের বাইরে লেখা মুক্ত বা গদ্য ছন্দের কবিতাকে পদ্য বলার সুযোগ নেই। বরং সাধারণ মানের, বিরক্তিকর, একঘেয়ে, পুরনো ও বহু ব্যবহৃত অলংকারসংবলিত এসব কবিতাকে বাজে কবিতা বলি—আর যা হয় না, যাকে কোনো হিসাবে কবিতা বলা যায় না, সেগুলোকে অকবিতা বলি।

 

কবিতার ভাষা

আমরা সব সময় বলি, কবিকে তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষা তৈরি করতে হবে। বলি রবীন্দ্রনাথের ভাষা আলাদা, সব বড় কবিরই ভাষা আলাদা। এ ভাষা আসলে কী? আমরা সবাই জানি এটি কাব্যভাষা, মাতৃভাষা নয়। এই ভাষা কিভাবে আলাদা হয়? ভাষা আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আর আমরা যখন মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনা করি তাতে আমাদের সংস্কৃতির রূপও প্রতিফলিত হয়। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা আছে, লিখিত রূপ না থাকলেও অন্তত কথ্যরূপ আছে। ভাষার প্রমিত, মৌখিক, আঞ্চলিক নানা রূপ আছে; বলা হয় কবিতা ভাষার মাধ্যমে কথা বলে। কারণ কবিতা ভাষার সব উপাদান একসঙ্গে ধারণ করতে পারে—সাহিত্য বা শিল্পকলার অন্য কোনো মাধ্যম এভাবে সামগ্রিকভাবে ভাষাকে ধারণ করতে পারে না। ভাষার ভেতরে শুধু বর্ণ, ধ্বনি, অক্ষর নয়, এর ভেতরে আছে শব্দার্থ ও নিহিতার্থ, গতি, ছন্দ, প্রতীক, উপমা, উেপ্রক্ষা, চিত্রকল্প; জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা, সমকাল ও আগামীর স্বপ্ন—সব কিছু। এ সবই আমাদের চারপাশে আছে, যা আমাদের অতি পরিচিত ও চেনা। কবি এ থেকেই শব্দচয়ন করেন, শব্দকে নবরূপ দেন। কবির কবিতায় আলাদা এক স্বর তৈরি হয়, তা থেকে জন্ম নেয় স্বতন্ত্র এক কণ্ঠস্বর, যাকে আমরা কাব্যভাষা বলি। এ কাজটা করতে গেলে কবিকে গভীর অভিনিবেশ সহকারে আত্মস্থ করতে হয় ভাষার অন্তর্হিত উপাদান। নিজস্ব ভাষা তৈরি করতে গেলে চেনা জগেক আলাদা রূপ দিতে হয়—কবি কিভাবে এ কাজটি করবেন, তা কবির নিজস্ব কাব্যক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। এ জন্য বহু কবি হারিয়ে যান, কেউ কেউ জীবন্ত থাকেন পাঠক হৃদয়ে।

ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে diction, এর অর্থ শব্দ নির্বাচন বা বাছাই। বলা হয় এটি এসেছে লাতিন শব্দ dicere থেকে। কালক্রমে এর অর্থ দাঁড়িয়েছে কোনো কিছুকে শব্দ দিয়ে প্রকাশ করার পদ্ধতিতে। ফরাসি কবি মালার্মে বলেছেন, শব্দই কবিতা। বস্তুত শব্দের মাধ্যমেই প্রাণ পায় কবিতা। শব্দের ভেতরে যে অপরিমেয় ঐশ্বর্য, কবি এর ভেতরে অবগাহন করেন সৃজনক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে। আমেরিকান কবি ম্যারি অলিভার ডিকশনের তিনটি উপাদানের কথা বলেছেন : শব্দ, শব্দের যথার্থতা এবং নিহিতার্থ। কবিকে যেমন শব্দ খুঁজতে হয়, তেমনি শব্দকে হতে হয় জুতসই। শব্দের জন্য কোনো লাগসই, টেকসই প্রযুক্তি নেই। কিন্তু শব্দকে কবিতার সঙ্গে মেলাতেই হয়। শব্দের যথার্থতাও আপেক্ষিক—কবিভেদে নানা রূপ হতে পারে; কিন্তু কবিকে যথার্থ শব্দ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতেই হয়। অমিয় চক্রবর্তী লিখেছিলেন—‘মেলাবেন তিনি মেলাবেন/ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়িটাকে মেলাবেন’—বৈপরীত্যকেও এভাবে মেলাতে হয় কবিতায়। সেই সঙ্গে শব্দের বা বাক্যের আভিধানিক অর্থের বাইরে বিস্তার ঘটাতে হয় কবিতার। নদীর শব্দ সব সময় জলের শব্দ নয়—এটি গতিরও শব্দ, প্রবাহেরও শব্দ। সব শব্দের যেমন অন্তর্নিহিত ধ্বনি আছে, তেমনি ভিন্ন অর্থও আছে—এই নিহিতার্থের উন্মোচন ঘটাতে হয় কবিতায়। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘মানচিত্রের ভেতর ছোট জায়গার মধ্যে গোটা পৃথিবীকে যেমন ধরে দেওয়া যায়, তেমনি শব্দের মধ্যে গোটা পৃথিবীকে আঁটিয়ে নেওয়া যায়।’                                       [চলবে]



সাতদিনের সেরা