kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

তিন নম্বর সাইডিং

গৌতম রায়

৩০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



তিন নম্বর সাইডিং

অঙ্কন : মাসুম

মুখ চড়াইতে ঠাওর হয় না? চড়াইবার মতো মুইখ কি ক্যাবল তোমারেই দ্যাছে ভগবান? বলি, ও অতসীর বাপ, কওনের মইত্য মুইখ ত্য আমারও আছছে—গীতার কথাগুলো যেন সাতসকালে আছড়ে পড়ে তিন নম্বর সাইডিংয়ের বস্তির আনাচকানাচে।

গীতার বর, গীতার পেটের শত্তুর অতসীর বাপ তখন বস্তির এজমালি পায়খানায় যাওয়ার তোড়জোড় করার তাগিদে বিড়ির প্যাকেটটা হাতাচ্ছিল।

কাউয়া ডাহা শুরু হইতে না হইতে প্যাচাল পারা শুরু হইছে তর। কই শাউড়ি কি এক ফোঁটাও মধু ঢাল্যেনি ত্যর মুহে বিয়োনোর পর?

বরের মধুর বচনে গীতার গলার আওয়াজ পাশের ঘরের লতিফার আওয়াজে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

লতিফার মরদ আফতাব কাল গভীর রাতে ফিরেছে পেটে গুলি বিঁধিয়ে। ব্যান্ডেজ চুইয়ে এখনো রক্ত পড়ছে। লতিফা চায় ইলাজ করাতে। আফতাবের তাতে বেজায় আপত্তি। কেন যে আপত্তি সেটা মালুম করার মতো দিমাগ লতিফার থাকলে তো!

কৈসন বান্ডিজ তু কৈলসন? সব তো খুন সে ভিঁজ গৈল বা—লতিফার কান্না মেশানো চিলচিৎকারে পাত্তা দেয় না আফতাব। কারণ সে জানে গুলিটা তার পেটে বিঁধে নেই। পেট ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে। গুলির ছররাতেই আগুনের ফুলকি বিঁধে এই রক্তারক্তি।

রক্ত নিয়ে আফতাবের চিন্তা নেই। তার চিন্তা নিজের পিস্তলটার নলে মুততে না পারার জন্য। আফতাবের কপালে ভাঁজ এই কারণে যে তার এই না মোতার কারণে যদি পরবীন ভাইয়ার কোনো তকলিফ হয়ে যায়? পরমোদ ভাইয়া যে কালকের হাঙ্গামা তৈরির জন্য দুই হাজারের কড়কড়ে দশটা পাত্তি আফতাবকে দিয়েছে।

মনুয়া চ্যাঁচাতে থাকে কোলের মেয়েটার ওপর। এটা বড্ড মায়ের ন্যাওটা। ভকিল সাহাবের মেহরারুকে তেল মালিশ করতে যাওয়ার সময় চলে যাচ্ছে যে—তাই মনুয়ার এত তাড়াহুড়া। ভকিল সাহাব চলে যাওয়ার পর ওনার মেহরারুকে মালিশ করতে গেলে ভকিল সাহাব যে বাড়তি বকশিশ দেবেন না। তাই মনুয়ার এই ক্ষিপ্রতা।

কোলেরটাকে দরজার পাশে বসিয়ে ভকিল সাহাবকে মালিশ করতে গিয়ে সেদিন যা গোল পাকিয়েছিল মেয়েটা—মনুয়া ভাবে।

সঙ্গমের দৃশ্য বস্তির একঘরে বড় হওয়া শিশুদের কাছে কোনো নিষিদ্ধ দৃশ্য নয়। পশ্চিমা সংস্কৃতি যেন ভারতের পথপ্রান্তের বস্তির একচালের খুপরির ভেতর একটি জায়গায় এক ধরনের নিষিদ্ধ আধুনিকতার বিশ্বায়ন ঘটিয়ে দিয়েছে।

কালীমন্দিরের সেক্রেটারি, শেতলা মন্দিরের প্রেসিডেন্ট, বাঁশতলী কোর্টের গভর্নমেন্ট প্লিডার প্রায় আশি ছুঁই ছুঁই বাচ্চু উকিল যখন উলঙ্গ হয়ে মনুয়াকে বলাৎকারের উদ্দেশে নিজের ঘুমন্ত শিশ্নকে জাগাবার বৃথা চেষ্টা করছে, তখন বারান্দার বাইরে এ দৃশ্য দেখে মনুয়ার কোলেরটা চিলচিৎকার জুড়েছিল; হামারা মাতারিয়াকে বুড়হোয়া চোদতরণ... দৌড়ে, হামলে পড়ে মনুয়া আত্মজার চিলচিৎকার থামাতে পারেনি। বিরক্ত, ক্ষুব্ধ বাচ্চু উকিল লুঙ্গির কষি বাঁধতে বাঁধতে একটা এক শ টাকার নোট মনুয়ার দিকে ছুড়ে ফেলে বলেছিল—অ্যান্ডা-গ্যান্ডা নিয়ে এলে পরের দিন থেকে ঢুকতে দেব না খানকি।

ঠিক শিক্ষিত কেতায় না ভাবতে পারলেও বাচ্চু উকিলের ছুড়ে দেওয়া এক শ টাকার নোটটা কুড়োবার সময় ভাবে, এই যে সুবে সুবে টিকা কেটে পূজারি পণ্ডিতের মতো মকান থেকে নিকলোন ভকিল সাহাব, উনহে হামাকে খানকি না বানালে হামনে কি খানকি বনতাম?

মনুয়ার বর টোটোর ডেরাইভার। সুরিন্দরবাবুর টোটো চালায়। জমা দিয়ে যা থাকে তা কোথায় যায় মনুয়া জানে না। রংকলে যখন বদলির কাজ করত ওর বর, সেই বিয়ের সময়, তখন থেকেই বরের তলব কোথায় যায় তা কখনো জানার সুযোগ হয়নি মনুয়ার। বর তাকে শুধু একটাই জিনিস দিয়েছে। বছর বছর পেট করে দিয়েছে। মনুয়া একের পর এক নিঃশব্দে বিইয়ে গেছে। হসপিটালে যখন শেষবার ডেলিভারির সময় সিসটোর দিদি ওকে লাইগেশনের কথা বলে, মনুয়া শুধু ভীরু চোখটা তুলে একবারই বলেছিল—

ওদের বাবাকে কিন্তু বলো না দিদি।

বউয়ের যে বন্ধ্যাত্বকরণ হয়ে গেছে এটা জানে না মনুয়ার বর। তাই বীর্ষ নিক্ষেপের অবোধ্য লক্ষ্যবস্তুটিতে অকৃপণভাবে দান করে যায় অকাতরে। তা বলে পেটের জোগাড় কী দিয়ে হবে—সেই ভাবনার ধারপাশ দিয়েও সে যায় না।

এই তিন নম্বর সাইডিংয়ের প্রায় প্রতিটি ঘরই ভারতের অর্থনীতিতে নারীর অর্থায়নের যেন এক একটা কয়লায় কালো সত্য অঙ্গার। জ্বালানি কাঠের মতো জ্বলতে জ্বলতে বস্তির প্রায় সব ঘরের আট থেকে আশি না জানা সত্যের নির্মাণে, মিছরির দানার টুকরা আলগা মিষ্টতা নিয়ে বলতে থাকে—

আকাশ তলে এসে অঙ্গার হলো আলো।

গীতা, লতিফা, আফতাব, মনুয়ারা জয়মঙ্গলবার, খোয়াজ খিজির কিংবা দশবিবির দোয়া চাইবার কালে কিংবা তিজ, জুহুতিয়ার বোলবোলাতে তিন নম্বর সাইডিংয়ের তিনটে লাইটের দুটি মুসবালটির কলে জল একেবারে উথলে পড়ে। গীতা জয়মঙ্গলবারের কলাটা, মুলোটা কিনতে লক্ষ্মীর কৌটোতে লুকানো সিঁদুরমাখা টাকাগুলো বের করেও ব্যাগ ভরাতে পারে না।

লতিফা তার মরদের জন্য দশবিবির দোয়া চাইবার কালে শিরনির আটা কম করে কিনতে কিনতে ভাবে, বিবি সাহেবা নিশ্চয়ই পরসাদির ভাগে একটু কম পড়লে গজব ওঠাবেন না।

জুহুতিয়াতে একটা পুঁটি মাছ কিনেই পরবের গেরস্তালি সামলায় মনুয়া। বাঙালি মছলিওয়ালারাও যে এখন জুহুতিয়া মাঈকে জেনে গেছে। পুজোর মওকাতে অন্য মাছের দাম যা-ই থাকুক না কেন, পুঁটি মাছের দাম আকাশ ছুঁইয়ে দেয়। তাই একটা পুঁটি দিয়েই জিতাষ্টমীতে যমকে রুখতে হয় মনুয়াদের।

তবু কিন্তু তিন নম্বর সাইডিংয়ে মুসবালটির টাইম কলে পানির টাইম আর খতমই হয় না। মহুরিগুলোতে বস্তির অ্যান্ডা-গ্যান্ডাগুলোর গুয়ের ন্যাড় ভাসতে থাকলেও লাঠিঠদানিতে সাপের প্যাঁচন দেওয়া দুই রঙা টুনির রোশনাই আরো উজ্জ্বল হতেই থাকে। সেই টুনির আলোতে অ্যাকশন সেরে আফতাবদের ফিরতে অনেক মেহনত করতে হয়। কারণ পরমিন্দর ভাইয়ার আলামত থাকে—

কুত্তাভুকা এবাদতি কবুল না করার।

পরবীন আর পরমিন্দার ভাইয়ারা মিলেমিশে যায়। আফতাবরা কুঁকড়োতে থাকে রক্ত, পুঁজ, ইনফেকশনকে সঙ্গী করে নোংরা ব্যান্ডেজের ভেতর তিন নম্বর সাইডিংয়ের কোথাও টালি, কোথাও টিন, আবার কোথাও বা অ্যাসবেটারসে ছাওয়া খুপরির ভেতর।

ডগদারি ইলাজের খোয়াব আফতাবরা দেখে না। তারা জানে, পরবীন ভাইয়া লছমিন্দার কমফোরটারকে ঠিক পাঠাবে সাইডিং বস্তিতে। আফতাবের পেটের ঘা না শুকালে চুনাওআলা অ্যাকশনে যাবে কে?

এবারে চুনওয়ের পরও আফতাবদের বাজার দর বেশ চড়াই ছিল। লিডরলোগের অদলিবদলি আফতাবদের ঘরে দুটি দিনের বাড়তি খাবার জুটিয়ে দিয়েছে এই সালের চুনাও। লতিফা বাংলা মুলুকের মেয়ে। আফতাবের মুজফফরপরী এবাদত জানার সুযোগ ওর জোটেনি।

লতিফার ‘দশবিবির ব্যের্ত্য’তে মন দিয়ে সবটা দেখে গীতা যেন খুঁজে পায় তার ঢাকা মালিকান্দার কুলকুলতী ব্যের্ত্যকে। আপন মনে লতিফার ঘরের সামনের ঘেরা জায়গাটায় দাঁড়িয়েই মালিকান্দার ঘোইষ পাড়ায় ছোটবেলায় নিজের কাটা পুকুরের সামনে যেন সে ছুটে গিয়ে বলে ওঠে—

কুলকুলতি কুলবতী

তোমার কুলে দিলাম বাতি।

সগেগ যাবার বাতির ঠাঁই

আমার স্বামীর জীবন চাই...

লতিফা দশবিবির উদ্দেশে তখন গাইতে থাকে—

বিবি হাজেরা মা আমার

দ্যাছেন গিইয়া ঠাঁহই

আপনে নাচান নছিব খানি

আপনে পাতেন ঠাঁই

হাজেরা বিবি মা গে আমার

দোয়া কবুল বারংবার...

আশ্বিনের কৃষ্ণাষ্টমীতে জিতাষ্টমী পালনের তোড়জোড় করে যখন মনুয়া, তখনই বেলেতোড়ের মোক্ষদাবালার মনে পড়ে যায় দেশ-গাঁয়ে জিমূতবাহনের পুজোর ধুমের কথা।

দশবিবির শিরনি, জুহুতিয়ার ভেজানো মটর ডাল, পুঁটি মাছ তখন মোক্ষদাবালার মনে সদর খাঁড়ার দোকানের ম্যাচার জন্য কেমন হু হু করে ওঠে। সারা বছর এই সাইডিংয়ের লাইন ঘরে থেকেও মদন পুরুতের বাউনির জলখাউকি বেলা থেকেই মনটা কেমন কোন্দরের বাতাস ভরা হয়ে যায়। ভাতখাউকি বেলায় সোয়ামি এলে বলেই ফেলে—এল্লাপুহুরের পাড়ে জেমূতঠাহুরের থানে ইবার কি ম্যালা জইমবে? কী কন শিবুর বাপে?

অনেক কষ্টে জোটানো কয়েকটা ছ্যাঁচি পেঁয়াজের একটা মুখে দিয়ে তখন দেশেরই ওম পেতে চায় তিন নম্বর সাইডিংয়ের পণ্ডিতজি। পেঁয়াজ চিবোতে চিবোতে ভাবে, রাতে বড় ঠাকুরের পুজো করতে গেলে কেউ না আবার মুখে প্যাঁজের লেবাস ঠাওর পেয়ে যায়!

এবার আষাঢ়-শ্রাবণে বৃষ্টির নামগন্ধই ছিল না। ভাদ্রে তা-ও একটু আকাশ ছ্যাদা হয়েছিল। সবাই বলছে পুজোয় বৃষ্টি হবে।

সেই দোলের সময়ে দেওয়া বিউলির ডালের বড়িগুলোতে বুঝি ফাকুন্দা পড়ে গেল—এই আশঙ্কার কথা আশ্বিনের বিদূষী রোদে পাতা কাপড়ের ওপর বড়ি ঢালতে ঢালতে বলে গীতা।

হাঁ করে গীতার মুখের দিকে চেয়ে থাকে মোক্ষদা। গীতা বোঝে সবটা। হাসি চেপে বলে—

আরে দিদি, তোহমরা যারে ছাইত্যা বলো।

হাসি চাপতে পারে না মোক্ষদা; কি বইল্যে বটে?

দোক্তা খাওয়া বত্রিশপাটি বের করে গীতা আবার বলে—ফাকান্দা।

ইতিমধ্যে খবর এসেছে রোডে নাকি বোম চলছে। কেউ কেউ বলছে, গোলি ভি চলতাড়ন।

তিন নম্বর সাইডিং ভাবে—গুলি কে চালাবে? আফতাবই তো পেটে ব্যান্ডেজ নিয়ে পড়ে আছে।

তিন নম্বর সাইডিং জানে না, আফতাব কখন শিউচরণ হয়ে ওঠে, কখনই বা হয়ে যায় পরদেশিয়া। এই বস্তি জানে না, আকিকা কিংবা রাশিনামের ঠোক্করে মজে না আফতাব বা শিউচরণ কিংবা পরদেশিয়ারা। তাই বোম ভি চলে, গোলি ভি চলে। নেতা লোকগোকে ইনাম ভি মেলে, চুনাওয়ের কামজাম ও উসুল হয়ে যায় এক জার থেকে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, বসন্ত অতিক্রম করে অপর এক অচেনা অজানা শীতের সুরভিত অ্যান্টিসেফটিকের শুষ্কতা আর আর্দ্রতার গোলাপজলে চোবানো, গ্লিসারিন নিংড়ানো বার্ধক্যের বিজন দাওয়ায়।

কয়েক দিন ধরে অ্যাকশনের ঠ্যালায় তিন নম্বর সাইডিংয়ের প্রায় সবারই কাজকাম, ধান্দা চুলোয় উঠেছে। লতিফা থেকে মদন পণ্ডিত—কেউই সাহসে ভর করে কাম-ধান্দায় না গেলেও মনুয়া পেটের শত্তুরগুলোর উপোসি মুখের দিকে চেয়ে এই গোলমালের বাজারেও রোজ যায় বাচ্চু ভকিলের বাড়ি।

ভকিলাইনকে মালিশের নামে ধুমসো ভকিলসাবকে ওপরে উঠিয়ে খানিকটা সময় ধামসাধামসি করতে দিতে হয়। তাতে মাসের তলব ছাড়াও রোজ কড়কড়ে একটা এক শ টাকার নোট মেলে। আর ভকিলাইনের মুতের ডেরামটা পরিষ্কার করার জন্য রোজ পায় পঞ্চাশ টাকা করে।

মাসিক তিন হাজার টাকা বাঁধা মাইনের বাইরে রোজকালের এই হাতে গরম দেড় শ টাকা বাড়তি পাওনা মনুয়ার। তাই তার ঘরে দুই বেলাই ভাতের গন্ধ মেলে। আর তাতেই চোখ ট্যারায় গীতা, লতিফা, মোক্ষদাদের। চোখ ট্যারালে হবে কি অতগুলো মন্দিরের পিসিডেন, সিকেটারি বাচ্চু উকিলকে নিয়ে এতটুকু সন্দেহ তাদের মনে উঁকি দিতেই পারে না। অতখানি ধম্মকম্ম করা খানদানি লোকটাকে নিয়ে ভাবলে রৌরব নরক কিংবা নিকৃষ্টতম দোজখের ভয় নেই?

মনুয়ার ছেলে বাপের টোটোটা নিয়ে বেরিয়েছে এই পেরেশানির ভেতরেই। যেমন বাপ তার তেমন ছ্যা। ছেলেও এক পয়সা উপুড় করে না সংসারে। মনুয়ার হাড়ভাঙা পরিশ্রমে যখন গড়গড়িয়ে সংসারটা চলেই যাচ্ছে, এলো পুত্র গেল কোথা ভাবার মতো সময় বাপ-বেটা কারই বা আছে?

বোমাবাজির তোয়াক্কা না করে ভকিল সাবের বাড়ির নোকড়ানি বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। ফেরারও সুযোগ পায় অনায়াসেই। পুলিশও জানে গরমেনপ্লিডার বাচ্চু উকিলের পরিবার কয়েক বছর ধরে বিছানায়। মনুয়া না গেলে উকিল গিন্নি সারা দিন যে গুয়ে-মুতে পড়ে থাকবে—তা থানার বড়বাবু থেকে পরমিন্দার বা তার সাঙ্গাতদের কারো জানতে বাকি নেই।

তাই-ই এত নিরাপত্তাহীনতার ভেতরেও মনুয়া খুব সহজেই কাম ধান্দায় যায়। রোজকারের পাত্তি দেড় শ টাকা ও নিয়ে নিরাপদেই বস্তিতে ফেরে।

সেদিন ভকিল সাবের বাড়িতে যাওয়ার আগেই ছেলেটাকে টটো নিয়ে রেল সাইডিংয়ের দিকে যেতে দেখেছিল মনুয়া। জানতে চাওয়ায় ছেলে বলেছিল—পরসাদীর দোকানের সমন আনতে যাচ্ছে।

রবিন্দরকে গোলি লাগ গেয়ি—স্টোভ থেকে চোখার কড়াই নামাতে নামাতে এ কথা শুনে মনুয়ার হাত ফসকে চোখা মাটিতে পড়ে যায়। উন্মাদিনীর মতো বাইরে এসে দেখে লতিফা আর গীতা জল ভরা চোখে তার ঘরের দিকেই তাকিয়ে।

বুকের কাপড় খসে পড়েছে মনুয়ার। শুকিয়ে যাওয়া যে বুকে দাঁত দিয়ে আঁচড়ে কামবিকৃতির নগ্ন প্রকাশ ঘটায় বাচ্চু উকিল, সেই বুকেই রবিন্দরের গুলিতে চুইয়ে পড়া রক্ত যেন প্রবল মমতায় বন্ধ করে দেওয়ার মৃতসঞ্জীবনী দিতে চাইছে তার গর্ভধারিণী। যে গর্ভধারিণীকে নিজের মেহনতের এক লোকমা চালও হয়তো খাওয়ায়নি রবিন্দর, সেই গর্ভধারিণীই আজ চোর হোক, পুলিশ হোক, সাধু হোক, শয়তান হোক—একঝাঁক গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া অপত্যের মাথাটা নিজের লেপটে যাওয়া বুকে চেপে বাস রাস্তায় বসে যেন উচ্চারণ করছে লানতের পঙতিমালা।