kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দুই হৃদয়ের আত্মকথা

সাহাশ্রী মানিক   

১৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুই হৃদয়ের আত্মকথা

মাঝখানে প্রশস্ত রাস্তা। তারই এক পাশে শ্মশান। অন্য পাশে গোরস্তান। মাঝখানে মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরনো বটগাছটি। ঠিক কত বছরের বৃক্ষ কারো বলার উপায় নেই! ৯০ পেরোনো বৃদ্ধকেও বলতে শুনেছি, আমরাও ছোটবেলা থেকে গাছটি একই রকম দেখে আসছি।

রাস্তার পথিক একসময় হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়, সে তখন বটের ছায়ায় বসে শরীর জুড়ায়। চাষির কাজ করতে করতে খিদে পায়, সে পরম তৃপ্তিতে গাছের তলায় বসে নিজের ক্ষুুধা নিবৃত্ত করে। রাখালরা গরু চরাতে মাঠে আসে, তারাও মনের সুখে এখানে বসে গান গায়। কেউ আবার বটের ছায়ায় বসে মনের গোপন কথা প্রাণ খুলে উজাড় করে। অনেকেই এখানে এসে গল্পের আসর জমায়। কেউ বা পরম শান্তিতে দুপুরের ঘুমটা ঘুমিয়ে নেয়।

এ তো গেল মানুষের কথা। এবার পাখির কথায় আসি। প্রতিদিনই অসংখ্য পাখি এসে ডালে ডালে ভিড় করে। কোনো কোনো পাখির বটের ফল খুব প্রিয়। তারা পরম আনন্দে নিজেদের খিদে মেটায়। কেউ আসে নিতান্তই আড্ডা জমানোর জন্য। আবার অনেক পাখি এসে সুখ-দুঃখের গল্প বলে মনটাকে হালকা করে।

এ রকম হাজার হাজার মানুষ, হাজার হাজার পাখি, এমনকি হাজার হাজার গল্পকাহিনির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরনো বটগাছটি। কেউ জানে না, মৃত্যুর পর একবার অন্তত তার মুখোমুখি হতেই হয়।

সে এখন উচ্চতা ছাড়িয়েছে আকাশের কাছাকাছি। শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত করেছে চারদিক। এরই মধ্যে ছেলে-মেয়ে হয়েছে। নাতিপুতি হয়েছে। এমনকি নাতিপুতিরও নাতিপুতি জন্মেছে। বৃদ্ধ বয়সেও তার ছেলে-মেয়ের কোনো অন্ত নেই! এখনো পর্যায়ক্রমে তার থেকে অসংখ্য চারাগাছের জন্ম নেয়।

এই যেমন কিছুদিন আগেই একটা পাখি বটের ফল নিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। হঠাৎই মুখ থেকে ফলটি মাটিতে পড়ে গেল। পরবর্তী সময়ে সেখানেই জন্ম নিল ছোট্ট চারাগাছ। এভাবেই তার শত শত সন্তানের জন্ম হয়। বর্তমানে এটিই তার কনিষ্ঠ সন্তান।

ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বটগাছটি গ্রামের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে। আশপাশের গ্রামেও আর কোনো শ্মশান কিংবা গোরস্তান নেই। মানুষ মরলে লোকরা এখানেই সৎকার করে। সৎকারের সময় দুই ধর্মের মানুষ দুই রকম পদ্ধতি অবলম্বন করে। কিন্তু কে হিন্দু, কে মুসলিম তার কোনো বাছবিচার থাকে না। মৃত্যুর পর একজনের মুখোমুখি সবাইকেই হতে হয়।

আজ যেমন পালা পড়েছে অমলকান্তির। মাত্র ৫৭ বছর বয়সেই হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছে অমল। এখনো তাঁর স্ত্রী-পুত্র বর্তমান।

শ্মশানের এক পাশে অমলের দেহটা নিথর হয়ে পড়ে আছে। কয়েকজন লোক চিতা সাজানোর কাজে ব্যস্ত। এই ফাঁকে বটগাছ তার মনের কথাগুলো সেরে নেয় একবার।

বলো অমল, পৃথিবীতে বেঁচে থেকে কী পেলে? অমলকান্তি প্রথমে বুঝতে পারে না কে তাকে এমন প্রশ্ন করছে? থতমত খেয়ে উওর দেয়—কে তুমি?

আমি সামান্য একটা বটগাছ। তোমাদের গ্রামের সবচেয়ে প্রাচীন বৃক্ষ।

কিন্তু তুমি হঠাৎ আমাকে প্রশ্ন করছ কেন?

মৃত্যুর পর সব মানুষের সঙ্গেই আমি একবার কথা বলি। সেই মতো আজ হঠাৎ তোমার পালা। বলো অমল, পৃথিবীতে কী পেয়েছ?

অনেক কিছুই পেয়েছি। এই অল্প সময়ে বলাই কঠিন।

যেমন?

আমি তো কবি ছিলাম। আমার কবিতা ছিল। পাঠক ছিল। খ্যাতি ছিল। সুখ-দুঃখ-ভালোবাসা সব কিছু ছিল।

আমি যদি বলি তুমি কিছুই পাওনি!

সে কথা কোনো মতেই মানব না।

অমল, লুকানোর চেষ্টা কোরো না। পৃথিবীতে তোমার আরো অনেক সম্মান প্রাপ্য ছিল। তোমার লেখা ‘হৃদয়ের ইতিকথা’ অসাধারণ ভালো বই। অনেকেই আমার ছায়ায় বসে তোমার লেখা বই পড়ে। সেগুলো শুনতে শুনতে আমারও কখন যেন মুখস্থ হয়ে গেছে!

সে তো আনন্দের কথা। কিন্তু তুমি হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গ টেনে আনছ কেন?

অন্য প্রসঙ্গই বটে। তবে আমি ভুল কিছু বলিনি। লেখকদের কোনো কিছুরই অভাব হওয়ার কথা নয়। তুমি তো লেখকদেরই একজন।

কই আমার তো কোনো কিছুরই অভাব ছিল না।

তোমার অনেক কিছুর অভাব ছিল। এত কষ্ট করে রাত জেগে বই লিখলে অথচ তার মূল্যায়ন হলো না। রয়ালটির টাকাও ঠিকমতো পেলে না। বাড়ি-গাড়ি কিছুই তো হলো না। উপরন্তু স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেলে।

অমলকান্তি অবাক হয়। বটগাছ যেন একে একে সব কিছু বলে ফেলছে! তার ক্ষতবিক্ষত মনের গভীরে অবচেতন বেদনাগুলো তোলপাড় করে উঠছে বারবার। পরলোকের অদৃশ্য মায়াজাল ভেদ করে চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। অমল শেষ পর্যন্ত তার দুর্বলতাকে ঢেকে রাখতে পারল না।

ঠিকই বলেছ তুমি। আমি আমার কষ্টের কথা কাউকে বলিনি। কিন্তু তুমি এসব জানলে কী করে!

তোমার লেখা বই পড়ে। লেখক তো তাঁর জীবনী নিয়েই বই লেখে। আমার মনে হয় তুমিও তাই লিখেছ। এ ছাড়া আমিও তো কত কত যুগের সাক্ষী! তোমার বাপ-ঠাকুরদা পূর্বপুরুষ সবার কথাই জড়িয়ে আছে আমার স্মৃতিতে।

সে তো সত্যিই। তবে আমি কখনো টাকা-পয়সায় ধনী হতে চাইনি। চেয়েছিলাম নিজের প্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে। শেষ পর্যন্ত কিছুই হলো না!

এ দুঃখ তোমার শুধু একার নয়। বেশির ভাগ লেখকেরই। অনেকেই মৃত্যুর পর কত কত পুরস্কার পায় ! অথচ বেঁচে থাকতে কানাকড়িও জোটে না।

অমলকান্তি বিষণ্নতার মাঝেও এক বুক প্রসন্নতা অনুভব করে। সন্ধ্যা নামবে নামবে ভাব। বটগাছে পাখির কলকাকলি নেই। জীবন থেকে সূর্যের আলো মুছে গেছে। অমল আবারও মুখ খোলে।

তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে বটগাছ! তুমি কত নিষ্পাপ। হাজার বছর জন্মভূমির মাটি আঁকড়ে পড়ে আছ। তোমার ঋণ কোনো দিনও শোধ করতে পারব না।

বটগাছ নিস্তব্ধ একাকী। বিষণ্নতায় সে-ও যেন রাশি রাশি অশ্রু ঝরাচ্ছে। আবছা অন্ধকারে কাঁপা কাঁপা গলায় শেষবারের মতো মুখ খোলে সে।

আচ্ছা অমল, তুমি তো চিতায় উঠলেই ঈশ্বরের কাছে চলে যাবে। ঈশ্বর যদি বলে তুমি আমার কাছে কী চাও? তুমি তাঁর কাছে কিছু চাইবে?

নিশ্চয় চাইব। খুশি হয়ে বলব, আমি যুগ যুগ পৃথিবীতে কবি হয়ে বেঁচে থাকতে চাই।

ঈশ্বর নিশ্চয় তোমার আশা পূর্ণ করবে।

গাঢ় অন্ধকারে ছেয়ে গেছে চারদিক। বটগাছ হারিয়ে গেছে তারই আড়ালে। অমলের দেহ জ্বলে উঠছে চিতার ওপরে। জনাসাতেক লোক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। আগুনের লাল শিখায় চারপাশ আলো হয়ে উঠেছে। সেই আলোতেই অমল যেন দেখতে পাচ্ছে পৃথিবীর সব কিছু!



সাতদিনের সেরা