kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ক্লদ সিমোঁর জীবনে অপ্রত্যাশিত অধ্যায়

দুলাল আল মনসুর   

১৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ক্লদ সিমোঁর জীবনে অপ্রত্যাশিত অধ্যায়

ফরাসি ঔপন্যাসিক ক্লদ সিমোঁ সচেতন পাঠকের প্রিয় লেখক। সাহিত্য সমালোচক ও প্রাতিষ্ঠানিক পণ্ডিতবর্গ অযৌক্তিকতা থেকে নাস্তিবাদ পর্যন্ত অনেক কিছু জুড়ে দিয়েছেন তাঁর লেখার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে। তবে তিনি নিজে তাঁর কাজকর্মের বড় বড় পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টাই করেছেন। নিজেকে সোজাসাপ্টা লেখক হিসেবেই পরিচয় দিয়েছেন। জীবন থেকে যেসব উপাদান পেয়েছেন, সেগুলো নিয়েই লেখার কাজ করেছেন সিমোঁ। অবশ্য জীবনের বাস্তব উপাদান থেকে সোজাসাপ্টা শৈলীতে যা তৈরি করেছেন তা অত সোজা নয়, শিল্পের বারোক রীতির মতো তাঁর লেখার সর্বশেষ রূপটা জটিল হয়েই দেখা দেয়। বাক্য কখনো কখনো পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে চলে যায়; কোথাও বা দীর্ঘক্ষণ বিরামচিহ্নের ব্যবহার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাঁর বিষয় ও দৃশ্য একে অপরের গায়ে প্রতিধ্বনি তোলে, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয় বিষয় ও দৃশ্যের ভিন্ন ভিন্ন চেহারা। উনিশ শতকের উপন্যাসের রীতি অনুসরণ না করে তিনি দস্তয়েভস্কি, চেখভ, কনরাড, প্রুস্ত, জয়েস, ফকনার প্রমুখের পথে হাঁটেন।

লেখালেখির কাজকে পেশা বলা যায় না বলেই মনে করতেন সিমোঁ। তিনি বলতেন, উপন্যাস লেখার বিনিময়ে কোনো বসের কাছ থেকে মাস কিংবা বছর শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণের টাকা পাওয়া যায় না। পেশাজীবী লোকরা কিছু দক্ষতার অধিকারী; এবং তাঁদের সেসব দক্ষতার কারণে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা-পয়সা উপার্জন করেন। কসাই মাংস টুকরা করতে জানেন, চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করতে জানেন, রাজমিস্ত্রি দেয়াল তৈরির কাজ জানেন। তাঁরা সবাই নিজ নিজ নিয়ম মেনে কাজ করেন। শিল্পের জন্য তেমন কোনো নিয়ম নেই। তাঁর লেখা অন্যরা পড়বেন—এটাই তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। তাঁর লেখার প্রধান উদ্দেশ্য পাঠককে আনন্দ দেওয়া। তিনি মনে করতেন, পাঠক তাঁর লেখায় কোনো বার্তা পাবেন না; শুধু আনন্দ পাবেন। সে কারণেই অন্য লেখকদের এবং সচেতন পাঠকদের কাছে আজও এত প্রিয়।

ক্লদ সিমোঁর জন্ম ১৯১৩ সালে ফ্রান্সের মাদাগাস্কারে। ছেলেবেলা কেটেছে ফ্রান্সের পেরপিগনানে। বাবা প্রথম মহাযুদ্ধের সময় নিহত হন। তখন সিমোঁর বয়স এক বছরও হয়নি। ১১ বছর বয়সে মাকেও হারান। সিমোঁকে প্যারিসের এক বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করা হয়। তাঁর মা ছিলেন ধার্মিক। তিনি ছেলেকে ধর্মীয় শিক্ষায় বড় করতে চেয়েছিলেন। সে কারণেই সিমোঁকে স্টানিস্লাস নামের ওই স্কুলে ভর্তি করা হয়। স্কুলে ধর্মীয় আইন-কানুন খুবই কড়া ছিল। স্কুল চলে যেদিকে, যে তালে, সিমোঁ চলেন তার উল্টো দিকে। তাঁর মনের ওপর কেমন প্রভাব ফেলেছিল সেই স্কুল—এ প্রসঙ্গে দ্য প্যারিস রিভিউ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিমোঁ বলেন, ‘আমি তো ওখান থেকে নাস্তিক হয়ে বের হলাম। আমার বইপত্রে আপনারা সে রকমই দেখেন বলে মনে হয়।’  গ্রীষ্মকালে স্কুল বন্ধ থাকার সময় বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে থাকতেন। সে সময়ের স্মৃতি তাঁর কাছে চিরদিনই মধুর ছিল। মামা-খালা এবং তাঁদের সন্তানদের কাছ থেকে তুলনাহীন ভালোবাসা পেয়েছেন সিমোঁ।

স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় রিপাবলিকানদের সমর্থন করতে যান সিমোঁ। এ বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা বেশ কঠিন ও তিক্ত। এ প্রসঙ্গে জানান, ১৯৩৬ সালে তিনি বার্সেলোনায় পৌঁছেন। সেখানে গিয়ে বুঝতে পারেন, দুই পক্ষই ফাঁপা বুলি আওড়াচ্ছে; দুই পক্ষেরই উচ্চাভিলাষ প্রধানত স্বার্থপরতায় ভরা। তাঁর ধারণা বদলে যায় এবং  ফিরে আসেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধকে ভয়াবহ রক্তাক্ত কমেডিও বলেন।

তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা কাকতালীয়ভাবে ঘটেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালে শত্রুপক্ষের হাতে একবার ধরা পড়েছিলেন সিমোঁ। জার্মান বন্দিশালা থেকে কৌশলে পালিয়ে আসেন। ১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধে যে ময়দানে তাঁর বাবা নিহত হন, সেখানেই ১৯৪০ সালে সিমোঁও যুদ্ধ করেন। তিনি বলেন, তাঁর জীবনে অপ্রত্যাশিত অনেক ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাগুলো সাধারণত শুভ বলেই সৌভাগ্য হিসেবে মেনেছেন। সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে ১৯৪০ সালের যুদ্ধের ময়দানের সেই ঘটনা। ১৯৪০ সালের মে মাস। তাঁর স্কোয়াড্রন জার্মান ট্যাংকের অতর্কিত আক্রমণের মুখে পড়ে যায়। ওই মুহূর্তে তাঁদের জন্য আদেশ আসে, ‘ফাইট অন ফুট!’ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আদেশ বদলেও যায়, ‘অন হর্সব্যাক, অ্যাট আ গ্যালোপ!’ সিমোঁ রেকাবে পা রাখতেই জিন পিছলে সরে যায়। তিনি ঘোড়ায় আর উঠতে পারেন না। এই ময়দানে তাঁর বাবা মারা গেলেও সিমোঁ ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই বেঁচে যান। কারণ যাঁরা ঘোড়ায় উঠে শত্রুপক্ষের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই জার্মানদের আক্রমণে নিহত হয়েছিলেন। দ্য প্যারিস রিভিউ পত্রিকাকে সিমোঁ জানান, তাঁর জীবনের এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনা গুনে শেষ করা যাবে না।



সাতদিনের সেরা