kalerkantho

শুক্রবার । ৬ কার্তিক ১৪২৮। ২২ অক্টোবর ২০২১। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

একজন হুমায়ূন এবং সৈকতে সারপ্রাইজ

মাজহারুল ইসলাম   

১৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



একজন হুমায়ূন এবং সৈকতে সারপ্রাইজ

‘দখিন হাওয়া’য় আর্কিটেক্ট ফজলুল করিমের বাসায় আড্ডা চলছে। দুই দিন পর ৭২ ঘণ্টার লাগাতার হরতাল শুরু হবে। আড্ডার একপর্যায়ে হুমায়ূন আহমেদ জানালেন, তাঁর কন্যা বিপাশা ও পুত্র নুহাশ কক্সবাজার যেতে চায়। তাই তিনি ঠিক করেছেন হরতালের এই সময়টাতে দুই সন্তানকে নিয়ে কক্সবাজার যাবেন। যাওয়া-আসা করবেন বিমানে এবং থাকবেন হোটেল সায়মনে। আমার দায়িত্ব হলো বিমানের টিকিট এবং হোটেল বুক করে দেওয়া।

সাধারণত হুমায়ূন আহমেদ বন্ধুবান্ধব ছাড়া একা কোথাও যান না। আমি আশঙ্কা করছিলাম যে আমাদেরও কাউকে হয়তো তাঁর সঙ্গে যেতে বলবেন। আড্ডা শেষ হয়ে গেল; কিন্তু তিনি তেমন কিছুই বললেন না।

আড্ডা থেকে বেরিয়ে হুমায়ূন আহমেদ আমাকে তাঁর সঙ্গে কক্সবাজার যেতে বললেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে আমার অপারগতার কথা তাঁকে বুঝিয়ে বললাম। এরপর বললাম, বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটাতে যাচ্ছেন। সেখানে মনে হয় আমার না যাওয়াই ভালো হবে।

হুমায়ূন আহমেদ আমার কথার কোনো উত্তর দিলেন না। পরদিন আমি সব ব্যবস্থা করে দিলাম, শুধু সঙ্গে গেলাম না। বাংলাদেশ বিমানে কক্সবাজার যাওয়া-আসার টিকিট এবং হোটেল সায়মনে চার রাত থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম। সায়মনের ম্যানেজার আমার পূর্বপরিচিত। তাঁকে ফোন করে বললাম, হুমায়ূন আহমেদ যাবেন বাচ্চাদের নিয়ে। কাজেই একটা ভালো রুমের ব্যবস্থা যেন করে রাখেন।

দুই হাজার সালের অক্টোবর মাসের ঘটনা। হরতালের দ্বিতীয় দিন হুমায়ূন আহমেদ টেলিফোন করে বললেন, মাজহার, আমি খবর নিয়ে জেনেছি হরতালে বিমান চলাচল করছে। কাজেই একটা টিকিট করে চলে আসো, একসঙ্গে আনন্দ করি। আমি কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ ফোন ধরে আছি। কী বলব ঠিক বুঝতে পারছি না। বিয়ে করেছি মাত্র ছয় মাস আগে। এ অবস্থায় হরতালের মধ্যে একা কক্সবাজার যাই কী করে! এ ছাড়া হুমায়ূন আহমেদ সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, সেখানে আমার যাওয়াটা কতটা শোভনীয় বুঝতে পারছি না। তার পরও সাতপাঁচ ভেবে শুধু বললাম, স্যার দেখি।

হুমায়ূন আহমেদ গম্ভীর হয়ে ফোনটা রেখে দিলেন। আমি বুঝে গেলাম আমার উত্তরে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি।

টেলিফোন রাখার পর কয়েক মিনিট চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলাম, যেকোনোভাবেই হোক কক্সবাজার যাবই। কিন্তু বিমানে না। আজ রাতে গাড়ি নিয়ে সরাসরি চলে গেলে কেমন হয়? হরতালের রাতে রাস্তা ফাঁকা থাকবে। কাজেই অল্প সময়ে চলে যাওয়া যাবে। হুমায়ূন আহমেদ অন্যদের সারপ্রাইজ দিতে যেমন পছন্দ করেন, তেমনি সারপ্রাইজড হতেও পছন্দ করেন। অভিনেতা চ্যালেঞ্জারকে ‘অন্যদিন’ অফিসে ডেকে এনে আমার প্ল্যানের কথা বললাম। মাসুম, নাসের, কমলসহ দীর্ঘ আলোচনা। হরতালের মধ্যে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার বিপক্ষের মতই জোরালো। একে তো হরতাল, তার ওপর দীর্ঘপথ গাড়ি চালিয়ে যাওয়া যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু আমি নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। চ্যালেঞ্জার রাজি হয়ে গেলেন আমার সঙ্গে যেতে। কমল ভীতু প্রকৃতির। কাজেই তার সাফ জবাব—লাইফ রিস্ক নিয়ে তোমার এসব পাগলামির মধ্যে আমি নাই। যেতে হলে তুমি প্লেনে যাও।

আমি একা যেতে রাজি না। নাসেরও কমলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলল, হরতালের মধ্যে এভাবে যাওয়াটা ঠিক হবে না মনে হয়। মাসুম প্রথমদিকে সিদ্ধান্তহীনতায় থাকলেও শেষ মুহূর্তে রাজি হয়ে গেল।

পরিবারের প্রবল আপত্তির মুখে রাত ১০টায় আমরা তিনজন কক্সবাজার রওনা হলাম। হরতালের রাত। রাস্তা ফাঁকা। চারদিকে অন্ধকার। হঠাৎ দু-একটা গাড়ি চলাচল করছে। মাঝে মাঝে কিছু জটলা। কোথাও কোথাও টায়ার পোড়ানো হয়েছে দিনের বেলায়। রাস্তায় ইটপাটকেল পড়ে আছে। দিনের বেলা হয়তো পিকেটারদের সঙ্গে সরকারি দলের লোকজনের অথবা পুলিশের সংঘর্ষে এসব ব্যবহৃত হয়েছে। আমাদের গাড়িতে সংবাদপত্র স্টিকার লাগানো থাকায় দু-একবার পুলিশের মুখোমুখি হলেও কুমিল্লা পর্যন্ত নির্বিঘ্নেই চলে এলাম। তেমন কোনো সমস্যা হলো না। কুমিল্লায় এসে পড়ে গেলাম মহাবিপদে। এখান থেকে চট্টগ্রামের রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে পুলিশ। খবর নিয়ে জানলাম, সারা দিনই বিরোধী দলের কর্মীরা রাস্তায় অনেক গাড়ি ভাঙচুর করেছে। দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এত রাতেও রাস্তা পিকেটারদের দখলে। তাই পুলিশ রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে।

আমরা শহরের ভেতর দিয়ে পুরনো রাস্তা ধরে এগোতে লাগলাম। এই রাস্তা দিয়ে শহর পেরিয়ে আবার ঢাকা-চট্টগ্রাম রাস্তায় উঠে যাওয়া যায়। যে করেই হোক আমাদের কক্সবাজার পৌঁছাতেই হবে। রাত তখন প্রায় সাড়ে ১২টা বাজে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাঝেমধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ এবং জোনাকির আলো চোখে পড়ছে। রাস্তায় কোনো রকম যান চলাচল নাই। নৈঃশব্দ্যের মধ্যে আমাদের গাড়ি চলছে। একপর্যায়ে একটা পুলিশের গাড়ি এসে আমাদের আটকে দিয়ে বলল, এদিক দিয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ জানতে চাইলে বলল, দুই-তিন কিলোমিটার পর থেকে রাস্তা একদম নিরাপদ নয়। প্রায়ই সেখানে ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।

আমি বললাম, আপনাদের কাজই তো মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া। তো আমাদের সঙ্গে এসে অনিরাপদ জায়গাটা পার করে দিন। আমাদের যেভাবেই হোক চট্টগ্রাম পৌঁছাতে হবে। জরুরি কাজ আছে।

কক্সবাজার যাওয়ার কথা পুলিশ অফিসারকে বললাম না।

দয়াপরবশ হয়ে পুলিশের গাড়ি আমাদের প্রধান সড়ক পর্যন্ত পৌঁছে দিল। এরপর একটানে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বাইপাসে পৌঁছে গেলাম। রাস্তার মোড়ের টি-স্টলে গাড়ি থামিয়ে গরম চা পান করে আবার ছুটতে শুরু করলাম গন্তব্যের উদ্দেশে। এই পর্যায়ে চ্যালেঞ্জার গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসতে চাইলে তাকে না করলাম। কেননা পুরো জার্নিটায় আমি একাই গাড়ি চালাতে চাই, একটা রেকর্ড তৈরি করার জন্য। এ ছাড়া চ্যালেঞ্জার রাতে চোখে খানিকটা কমও দেখে।

কক্সবাজার পৌঁছানোর এক ঘণ্টা আগে থেকে আমি আর চোখ খুলে রাখতে পারছিলাম না। চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসছে। তার পরও স্টিয়ারিং শেয়ার করতে রাজি না। জোর করে চোখের পাতা খোলা রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাচ্ছি। চ্যালেঞ্জার বিষয়টা বুঝতে পেরে ক্রমাগত আমার সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছে আমাকে জাগিয়ে রাখার জন্য, যদিও গাড়িতে তখন রবীন্দ্রসংগীত বাজছে।

ভোর সাড়ে ৫টায় কক্সবাজার পৌঁছলাম। হোটেলে না গিয়ে সরাসরি সৈকতে চলে গেলাম। গাড়ি পার্ক করে হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। অসীম নীল জলরাশি আর সমুদ্রের গর্জনের কাছে রাতভর গাড়ি চালানোর সব ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই উবে গেল। ভোরের স্নিগ্ধ আলো এবং ঝিরিঝিরি বাতাসে শরীর ও মন জুড়িয়ে গেল। প্রায় এক ঘণ্টা কাটিয়ে হোটেল সায়মনের উদ্দেশে রওনা হলাম।

 

হোটেলে চেক-ইন করে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এক কাপ চা অর্ডার দিলাম। পনেরো মিনিটের মধ্যে চলে এলো চা। আগেই ঠিক করা ছিল আমার হাতে থাকবে আজকের দৈনিক পত্রিকা, মাসুমের হাতে গরম চায়ের কাপ এবং চ্যালেঞ্জারের হাতে এক প্যাকেট সিগারেট। হুমায়ূন আহমেদ যত রাতেই ঘুমান না কেন, খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়েন। এরপর বসে যান দৈনিক পত্রিকা ও গরম চা নিয়ে। সঙ্গে সিগারেট। সকাল সাড়ে ৭টায় তাঁর রুমের দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন হুমায়ূন আহমেদ। খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে আমাদের কাছে ঢাকার খবর জানতে চাইলেন। রুমের সামনের টানা বারান্দায় মেঝেতে বসে চা খেলেন, পত্রিকার পাতায় চোখ বোলালেন। দু-একটি সাধারণ কথাবার্তা হলো আমাদের মধ্যে। কাল রাতে রুমের এসি ঠিকমতো কাজ করেনি বলে ঘুমাতে সমস্যা হয়েছে বলে জানালেন। ছেলে-মেয়ে দুটি সারা দিন সাগরের পানিতে লাফালাফি করেছে। দূর থেকে বাবা হিসেবে এ দৃশ্য দেখতে তাঁর খুব ভালো লেগেছে। একপর্যায়ে তিনি বললেন, তোমরা হাত-মুখ ধুয়ে রেস্টুরেন্টে আসো। আমি বাচ্চাদের নিয়ে আসছি। একসঙ্গে নাশতা খাব। এরপর তিনি পত্রিকা নিয়ে রুমে ঢুকে গেলেন।

আমার খুব মন খারাপ হলো। চ্যালেঞ্জার ও মাসুমের অবস্থাও একই রকম। এতটা ঝুঁকি নিয়ে হরতালের মধ্যে সারা রাত গাড়ি চালিয়ে এলাম। আর হুমায়ূন আহমেদ একটুও খুশি হলেন না? একবারও মুখে বললেন না যে তিনি খুশি হয়েছেন! আমরা যে আসব এ কথা তো তিনি জানতেন না। গতকাল টেলিফোনে শুধু বলেছি, স্যার দেখি। কী আশ্চর্য আমাদের দেখে একটুও সারপ্রাইজড হলেন না তিনি? চ্যালেঞ্জার বলল, স্যার মনে হয় আমাদের আসাটা পছন্দ করেননি। আমি কোনো উত্তর না দিয়ে রুমের দিকে হাঁটা শুরু করলাম।

নাশতার টেবিলে বসে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, মাজহার, আমাদের বিমানের টিকিট বাতিল করার ব্যবস্থা করো। আমি তোমাদের সঙ্গে গাড়িতে ঢাকা ফিরব।

আমি খানিকটা বিস্মিত হয়ে বললাম, স্যার, আপনার কষ্ট হবে, আপনি বিমানেই যান। এ ছাড়া এত দূরের রাস্তায় এক গাড়িতে ছয়জন...।

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই একরকম ধমক দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, যা বলেছি সেটা করো। তোমাকে এত কিছু নিয়ে ভাবতে হবে না।

আমি ‘জি আচ্ছা’ বলে নাশতা খাওয়ায় মনোযোগ দিলাম। চ্যালেঞ্জার ও মাসুম চুপচাপ মাথা নিচু করে খেয়ে যাচ্ছে।

হুমায়ূন আহমেদের নাশতা খাওয়া শেষ। তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, তোমরা এত কষ্ট করে আমাকে আনন্দ দিতে এসেছ, আর আমি তোমাদের সঙ্গে না গিয়ে বিমানে যাব? এটা হতেই পারে না।

তারপর বললেন, শোনো, আমি অসম্ভব খুশি হয়েছি তোমাদের দেখে। আমি চিন্তাই করিনি হরতালের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তোমরা চলে আসবে। আমার আনন্দটা তখন ইচ্ছা করেই প্রকাশ করিনি, তোমাদের রি-অ্যাকশন দেখব বলে। এটাই লেখকদের কাজ। যাও টিকিট বাতিল করে আসো।

আনন্দে আমার চোখ ভিজে এলো।



সাতদিনের সেরা