kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ মাঘ ১৪২৮। ২৭ জানুয়ারি ২০২২। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

আল মাহমুদের কবিতার বিনির্মাণকলা জন্মস্মরণ

তুহিন ওয়াদুদ

৯ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আল মাহমুদের কবিতার বিনির্মাণকলা জন্মস্মরণ

‘পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি বুকের ওপর রেখে/আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হয় এ ছিল সত্যিকার ঘুম/কিংবা দুপুরে খাওয়ার পর ভাতের দুলুনি। আর ঠিক তখুনি/সেই মায়াবী পর্দা দুলে উঠলো, যার ফাঁক দিয়ে/যে দৃশ্যই চোখে পড়ে, তোমরা বলো, স্বপ্ন। ’ আল মাহমুদের কবিতার বিষয়গত বাঁক পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী চরণ এসব।

বিজ্ঞাপন

১৯৭৬ সালে প্রকাশিত কবির ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কাব্যগ্রন্থে কবির দর্শনগত এই রূপ আমরা পাই। যদিও কবির শাস্ত্রবাদী হয়ে উঠতে আরো কয়েক বছর লেগেছে। এ কাব্যগ্রন্থের আগেও কবির আরো তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ‘লোক লোকান্তর’ (১৯৬৩), ‘কালের কলস’ (১৯৬৬) ও ‘সোনালী কাবিন’ (১৯৭৩)। পঞ্চাশের দশকে কবিতা লেখা শুরু করলেও ষাটের দশকে এসে কবিতায় সংহত হতে থাকেন। এসব কাব্যগ্রন্থে কবি সময় ভাঙার গান গেয়েছেন। রসবোধের স্বাধীনতা দিয়েছেন ইচ্ছামতো। ‘আদি রসাত্মক’ ভাব বিস্তারেও কোনো কার্পণ্য করেননি।

কবিতা শিল্পদর্শন কপচানোর জন্য উপযুক্ত ভূমি নয়। কবিতার বিনির্মাণকলা কখনোই নীতিপ্রচারবাহী নয়। কবিতা অনেকটা রূপ-অরূপের খেলা। এখানে কবি কখনো উত্তম পুরুষে, কখনো নৈর্ব্যক্তিকরূপে চয়নকৃত শব্দে, চরণে, পঙক্তিতে; কখনো সম্পূর্ণ কবিতায় থাকেন ভাবকাঠামোর হাত ধরে। আল মাহমুদ কাব্যকলার এই সীমানায়ই ছিলেন। তিনি কবিতা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। ‘আমরা পারি না’, ‘অবুঝের সমীকরণ’ ও ‘কবিতা এমন’ কবিতায় কবির কবিতাবিষয়ক গভীর অনুধ্যানের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। ‘আমরা পারি না’ কবিতাটি কবির অতৃপ্তির আখ্যান। উত্তম পুরুষের বহুবাচনার্থে সেই অতৃপ্তির কথা বলা হলেও পক্ষান্তরে কবির নিজের কথাটাই এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে, যা বলতে চাওয়া—তা যেন কবিতায় পূর্ণরূপে ফুটে উঠছে না। প্রকৃতি যা প্রাকৃতিকভাবে পারছে, অনেক চেষ্টা করেও শিল্পীরা তা করতে পারছে না। ‘মানুষের শিল্প সে তো নির্বোধের নিত্য কারিগরি’ হিসেবে কবির কাছে মূল্যায়িত। দিনে দিনে কবি যে পরিণত হয়েছেন এটিও তার একটি অন্যতম কারণ। কবিতাকে একটি উচ্চতর মানদণ্ডে নিয়ে আসার জন্য নিজের সৃষ্ট শিল্পের প্রতি অতৃপ্তির আক্ষেপ এবং তৃপ্তির ঢেকুর তোলার চেয়ে নিশ্চয়ই ভালো। আল মাহমুদ সেটিই করেছেন।

‘কবিতা এমন’ কবিতায় কবি কবিতার সংজ্ঞায়ন না করলেও কবিতা কী সে বিষয়ে যে আলোকপাত করেছেন, তা কবিতার সংজ্ঞায়নের চেয়েও অধিক মাত্রা লাভ করেছে। এর চেয়ে সংক্ষেপে আর কবিতা কী সেটি বলা সম্ভব নয়। কবি বলেছেন, ‘কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার। ’ এ কবিতায় কবি আরো অনেক কিছুকেই কবিতা বলেছেন। তাঁর বলার ধরনেই রোপিত আছে কবিতা মানে জগতের সমস্ত উপাদান। কবিতার পটভূমিতে স্থানিক ও কালিক বিষয়গুলো সুবিস্তৃত।

আল মাহমুদ কবিতা, কবি ও ভোক্তা—এই তিন বিষয় নিয়ে তিনটি কবিতা লিখেছেন। সেখানে কবি হিসেবে কাঙ্ক্ষিত মানে উত্তীর্ণ হতে না পারার আক্ষেপ আছে। তিনি ‘কবিতা’ বলতে জীবনের যেকোনো উপাত্তই কবিতা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আর ভোক্তারা যে কবিতার বিষয়ে অনুত্তীর্ণ সে কথাও তিনি বলেছেন। কবি-কবিতা-ভোক্তা সব কিছুই মননে নিয়ে কবি কবিতার উৎকর্ষ সাধনে দীর্ঘ জীবন নিবেদিত থেকে গেছেন।

আল মাহমুদের কবিতার বিনির্মাণকলা কিংবা করণকৌশল উচ্চতর শিল্পব্যঞ্জনায় ঋদ্ধ। সরস পথে তিনি কবিতার গভীরতা সৃষ্টি করেছেন। তাঁর অনেক কবিতার শব্দসমূহ একত্র করে যদি সেগুলোকে উপকরণ হিসেবে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে দেখা যাবে স্বল্পপরিসরে তিনি আবদ্ধ থেকেছেন। ধরা যাক, কবির ‘তিতাস’ কবিতাটির কথা। এ কবিতায় যত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো সবই নদী থেকে শহরের উপকণ্ঠে তাঁর বাড়ি পর্যন্ত। স্থানিক পরিসীমা ও কালিক পরিসীমা এখানে সামান্যই। কবির স্পটলাইট সুদূর বিস্তৃত নয়। কবিতাটিতে ভাবের গতি আছে; কিন্তু কোনো জটিল পথ মাড়িয়ে সেই গতি নয়। তিতাস নদের প্রতি কবির ভালোবাসাই এ কবিতার প্রাণ। সেই প্রাণ প্রতিষ্ঠার জন্য কবির বিশেষ কোনো আয়োজন নেই। নদী, নৌকা, সলিমের বউয়ের ভিজে দুটি পা, বিভিন্ন পাখি, কাশফুল—এ সবই এই কবিতার প্রধান শব্দসম্ভার। নদীর পারে বুকভরে বাতাস নিয়ে ঘরে ফিরে আসার পরে যে অনুভূতির ব্যাপ্তি সেটাই কবিতাকে দান করে নিবিড় ব্যঞ্জনা—‘সোনার বৈঠার ঘায়ে পবনের নাও যেন আমি/বেয়ে নিয়ে চলে একা অলৌকিক যৌবনের দেশে। ’

আল মাহমুদ কবিতার স্পটলাইট যেখানে ফেলেছেন তার পরিপার্শ্ব রচনার ক্ষেত্রে তিনি সময় ও স্থান বিবেচনায় কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর সামগ্রিক কবিতার আলোচনায় বিষয়ের দীর্ঘ বৈচিত্র্য থাকলেও স্বতন্ত্র কবিতার মধ্যে সেটি তিনি সব সময় রাখেননি। ‘আমার গন্তব্যে’ কবিতায় তিনি নিজের যাওয়ার কোনো ঠিকানা নেই, সে কথা বলতে গিয়ে অনেকের কথাই বলেছেন। কিন্তু সর্বত্রই ‘আমার’ শব্দটি এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যে বারংবার কবিতায় পাঠকও ‘আমার’ অবস্থার সঙ্গে গতিময় হয়ে উঠবেন।

অপরাপর যেকোনো কবির মতোই আল মাহমুদের কবিতায়ও রূপক, সংকেত, প্রতীকের ব্যঞ্জনা আছে। তবে তাঁর কবিতার বিনির্মাণে এসবের ব্যাপ্তি পরিমিত পরিসরে হয়েছে। রূপক, সংকেত, ইঙ্গিত, প্রতীকের ভারে কবিতার তলদেশ সন্ধান কঠিনতর হয়ে পড়েনি; বরং এসবের পরিমিত ব্যবহারে কবিতা হয়ে উঠেছে পাঠকস্পর্শী। আল মাহমুদের কবিতা জটিল শব্দের ভারে ভারাক্রান্ত নয়, ভাবকাঠামোর পরোক্ষতর ভঙ্গিতে দূরবাসিনী নয়; বরং সরল ভাষ্যে সাধারণ কল্পচিত্রে তিনি যে কবিতাকাঠামো নির্মাণ করেছেন তাতে পাঠক অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে কবিতর অন্তরাঙ্গনে।

কবিতার বিষয় ও বোধ বিনির্মাণে আল মাহমুদ অনন্য মাত্রায় উন্নীত কবি। তিনি কবিতাকে দান করেছেন পাঠকস্পর্শী পরম ব্যঞ্জনা। তাঁর এই ব্যঞ্জনা সৃষ্টি শুরু হয়েছে কবিজীবনের প্রথম ভাগেই। অনবরত তিনি সেই ধারার মধ্যেই থেকে গেছেন। আমৃত্যু তিনি কবিতার শিল্পরূপ সৃষ্টির দক্ষ কারিগরই থেকে গেছেন। কবির জন্মস্মরণে পাঠকের পক্ষে বিনম্র প্রণতি।



সাতদিনের সেরা