kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

হঠাৎ একদিন

সিরাজউদ্দিন আহমেদ

২ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



হঠাৎ একদিন

অঙ্কন : মাসুম

নয়নতারাকে এইভাবে দেখিব আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই।  আমি কলিকাতায় চিকিৎসার জন্য আসিয়াছি। সঙ্গে স্ত্রী-কন্যা আছে। নিউ মার্কেটের কাছে একটি হোটেলে আশ্রয় লইয়াছি। আমার সমস্যা হৃদয়সংক্রান্ত। সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হইয়াছে। ডাক্তার বাইপাস করিতে পরামর্শ দিয়াছেন। আগামীকল্য হাসপাতালে ভর্তি হইব। তাহার পর অপারেশন। সকলের মন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। স্ত্রী তনিমা বলিল, চলো, গঙ্গার ধারে ঘুরিয়া আসি। তোমার ভালো লাগিবে।

 আমার মনে পড়িল, কলিকাতায় প্রথমবার আসিয়া তনিমার সহিত আমি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ও গঙ্গার ধারে ভ্রমণ করিয়াছি। আমার মন কিছুটা হইলেও বিষণ্নতা মুক্ত হইল। মনের গভীরে সুখস্মৃতির দোলা লাগিল। গঙ্গার ধারে হাঁটিতে হাঁটিতে কত স্মৃতি ভিড় করিল। সেই সব স্মৃতিতে আমি কত সুখের ছবি দেখিতে পাইলাম। কিন্তু যখনই অপারেশনের কথা মনে হইল, সুখস্মৃতি বেদনার অশ্রু হইয়া ঝরিতে লাগিল।

তনিমা হঠাৎ চপলা বালিকার মতো আহ্লাদী কণ্ঠে বলিল, এই, আমি ফুচকা খাইব, প্লিজ।

বিবাহের পর প্রথমবার যখন কলিকাতায় আসি, গঙ্গার ধারে ভ্রমণ করিতে করিতে তনিমা ঠিক এই ঢঙে আবদার করিয়াছিল। আমি নববিবাহিত স্বামীর মতো ফুসকা কিনিতে ছুটিলাম।

সন্ধ্যা নামিয়াছে কিছুক্ষণ হয়। দূরে লাইটপোস্টের আলোয় ফুচকা বিক্রি হইতেছে। মাঝের লাইটপোস্টটি অন্ধের মতো দাঁড়াইয়া আছে। তাহার চোখে আলো নাই। স্থানটি আলো-আঁধারের খেলা। আমি যখন ফুচকাওয়ালার কাছে যাইতেছি, অন্ধ লাইটপোস্টের কাছে আলো-আঁধারে নারী কণ্ঠে কেহ আমাকে ডাকিল।

আমি চমকাইয়া থমকাইয়া দাঁড়াইলাম। ভাবিলাম ভ্রম হইয়াছে। এই স্থানে আমি অপরিচিত। আমাকে কেন ডাকিবে? চারিপাশে তাকাইয়া আমি কোনো মনুষ্যজন দেখিতে পাইলাম না। ভূত-প্রেতে বিশ্বাস নাই। অসুস্থ দেহ-মনে অনেক সময় রজ্জুকে সর্প বলিয়া ভ্রম হয়। আমার তাহাই হইল। গা ছমছম করিতে লাগিল।

পুনরায় ফিরিয়া তাকাইলাম। অন্ধ লাইটপোস্টের কাছে একজন তরুণী দাঁড়াইয়া আছে। বেশভূষায় সুসজ্জিত। ফরসা মুখখানিতে সকরুণ ডাগর আঁখি।

পুনরায় মেয়েটি বলিল, দাদা, আপনাকে ডাকছি।  আমার মনে হইল মেয়েটির কোনো বিপদ হইয়াছে। সে আমার সাহায্য প্রার্থী।

আমি দুই কদম আগাইয়া থমকাইয়া দাঁড়াইলাম। হৃদয় বলিল, তুমি ফুচকা লইয়া ফিরিয়া যাও। তনিমা তোমার অপেক্ষা করিতেছে। বিবেক বলিল, তুমি কেমন পুরুষ, নারীকে বিপদে রাখিয়া পলাইয়া যাও। ধিক!

মেয়েটি আগাইয়া আঁধার হইতে আলোতে আসিল। চারিদিকে ইতিউতি তাকাইয়া বলিল, বাবু, আমি ভদ্রঘরের মেয়ে। কোনো অসুখ নেই। বড় বিপদে পড়ে আজ পথে নেমেছি।

এই কথা শুনিবামাত্র ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়ন আমার জন্য বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু আমি পলাইতে পারিলাম না। মেয়েটি কোন মন্ত্রবলে আমাকে আটকাইয়া রাখিল। আমি সভয়ে মেয়েটির দিকে তাকাইলাম। দূর হইতে মেয়েটিকে যেরূপ রূপসী মনে হইতেছিল, নিকটে তাহা মনে হইল না। সস্তা দামের রংচঙে চমকদার শাড়ি ও মুখমণ্ডলের প্রভা বাড়াইবার জন্য কড়া প্রসাধনের ব্যবহারের মাঝে ভেসে থাকা বড় বড় দুটি চোখের মায়াবী আকর্ষণে তাকাইয়া থাকিতে ইচ্ছা করে। মেয়েটির শরীর-স্বাস্থ্য পুষ্টিহীনতার কথা জানান দিতেছে।

মেয়েটিকে কেন চেনা মনে হইতেছে? যেন কত বর্ষাকাল তাহাকে আমি চিনি! তাহার চক্ষুদ্বয় তো ভুলিবার নয়! কত স্বপনে-জাগরণে এই চোখের মোহ আমাকে আবিষ্ট করিয়া রাখিয়াছে। হৃদয়ে কতশত ফুল ফুটাইয়াছে। কিন্তু ইহা কিভাবে সম্ভব? উহা দূর অতীত। বাংলাদেশের গল্প।

আমার নীরবতায় মেয়েটি আরো নিকটবর্তী হইল। পরম আগ্রহে সকরুণ কণ্ঠে নিবেদন করিল, বাবু, আপনার সঙ্গে আমি যেতে রাজি। আপনার যা দয়া হয় দেবেন। আপনার জায়গা না থাকলে আমার সঙ্গে যেতে পারেন। রুম ভাড়া পঞ্চাশ টাকা দিতে হবে। বিশ্বাস করুন, কোনো ভেজাল হবে না।

মেয়েটি সকাতর চক্ষু মেলিয়া আমার করুণা ভিক্ষা মাগিতে লাগিল। তাহার চক্ষুদ্বয় এমনই সজল যে মনে হয় ভিজিয়া আছে, মেঘ ভাসিতেছে, যেকোনো মুহূর্তে বর্ষণ হইতে পারে। এ চোখ তো ভুলিবার নয়। সুদূর অতীতের চেহারার কিছুই আজ অবশিষ্ট নাই। কালের নিষ্ঠুর থাবা ও দারিদ্র্য সবটুকু হরণ করিয়াছে। কিন্তু কণ্ঠস্বর ও চোখ দুটিতে কিছু স্মৃতি অবশিষ্ট আছে। ডুবুরির মতো স্মৃতির গভীর হইতে আমি তাহাদের পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করিতে লাগিলাম।

ক্ষণে ক্ষণে আমি উত্তেজিত হইতেছি। আমি চমকিত ও বিস্মিত। বিড়বিড় করিয়া বারবার নিজেকে বলিতে লাগিলাম, এইতো সেই কণ্ঠস্বর! জলে ভেজা ডাগর আঁখি!  নয়নতারা! আমার নয়ন। মেয়েটি আরো নিকটবর্তী হইয়া আমার হাত ধরিল।

আমি মৃদু স্বরে ডাকিলাম, নয়ন... নয়ন... নয়নতারা...

নয়ন বলিল, তুমি এত বোকা কেন? 

আমি নয়নের দিকে ফিরিয়া মৃদু হাসিলাম। নয়ন আরো ক্রুদ্ধ হইল। বলিল, তোমাকে বোকা বললে হাসো কেন? রাগ করতে পারো না? তোমার কপালে অনেক দুঃখ আছে। তোমার বউ তোমাকে শিলনোড়ায় পিষবে। তখন মজা বুঝবে। বয়সের তুলনায় নয়ন বড্ড পাকামো করিত। বাড়িতে মা-পিসিদের যাহা বলিতে শুনিত, তাহা আমার উপর প্রয়োগ করিত।

সেটা আবার কী? আমি হাসিয়া জানিতে চাই।

তুমি একটা হাঁদাবোকা। কিচ্ছু বোঝো না। তোমার সঙ্গে খেলব না। গাধা কোথাকার! ক্রুদ্ধ নয়ন আমাদের খেলাঘরের রান্নাবান্নার সকল আয়োজন লণ্ডভণ্ড করিয়া বাড়িতে প্রস্থান করিল। আমি বিমূঢ় বিস্ময়ে কিছুক্ষণ ভাঙা খেলাঘরের দিকে তাকাইয়া বিষণ্ন মনে বাড়ির পথ ধরিতাম।

কয়েক দিন নয়নদের বাড়িমুখী হইতে আমার সাহস হইত না। নয়নের বাবা শহরের নামকরা উকিল। আমাদের জিলা শহরের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। ওদের পাকা দালানকোঠা। আমাদের টিনের বাড়ি। ছোটবেলা হইতে বৈষম্যের এই ব্যবধান আমি বুঝিতে শিখিয়াছি।

আমাদের বাড়ির দুইটি বাড়ির পরই নয়নতারাদের বাড়ি। তিন দিন অতিক্রম হইতে না হইতে কখনো কমলা কখনো পেয়ারা কিংবা আমার জন্য লোভনীয় কোনো খাদ্য হাতে নয়ন আমাদের বাড়ি হাজির হইত। একটি কমলা আমাকে দিত, অন্যটি নিজের কাছে রাখিত। কমলা  ছিলিতে ছিলিতে নয়ন আড়চোখে আমাকে দেখিয়া মৃদু হাসিয়া বলিল, তোমাকে আজ কমলা খাওয়াব।

বলিলাম, তোমারটা তুমি খাও, আমারটা আমি খাই।

নয়ন ক্রুদ্ধ চোখে আমার দিকে তাকাইল, তুমি কি জানো কিভাবে কমলা খেতে হয়? 

আমি সভয়ে দুই পাশে মাথা নাড়িতাম, না।

আমি জানি। মাকে দেখেছি বাবাকে কমলা খাইয়ে দিতে। আমি তোমাকে সেভাবে কমলা খাইয়ে দেব। নাও, হাঁ করো।

আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা নয়ন কখনো চিন্তা করিত না। আমাকে হাঁ করিতে হইত।

নয়নের মাকে আমি মাসি বলিতাম। আমার ধারণা, তিনি নয়ন অধিক আমাকে পছন্দ করিতেন। খেলা শেষে তিনি প্রায়ই আমাদের থালাভর্তি মিষ্টি-মণ্ডা ও গ্লাসভর্তি দুধ খাইতে দিতেন।

নয়নের চেয়ে আমার থালায় অধিক মিষ্টি থাকিত।

আমাদের পুতুলখেলা দেখিয়া বাড়ির মাসি-পিসিরা যেসব মন্তব্য করিতেন মাঝে মাঝে তাহা শুনিতে পাইতাম। একদিন পিসি নয়নের মাকে বলিলেন, তোমার মেয়ের যে রাগ, অপুর মতো একটি শান্ত ছেলে ওর বর হলে ভারি মানাত।

নয়নের মা বলিলেন, নয়নকে নিয়ে আমার ভয় হয় দিদি। স্বভাব পেয়েছে বাপের মতো। কথায় কথায় জেদ আর রাগ। মেয়েদের এত রাগ থাকতে নেই। দেখেন না খেলতে বসে অপুকে রোজ রোজ কেমন হেনস্তা করে। ওর ভাগ্যে কী আছে ভগবান জানেন।

দেখি তো, দুজনের মধ্যে মিলও খুব। ঠাকুরঘরে বসে ভগবানকে ডাকব কী, রোজই ওদের পুতুলখেলা দেখি। আর ভাবি, ছেলেটি যদি আমাদের জাতের হতো।

ও তো হওয়ার নয়, দিদি। এ ভাবাও পাপ।

একদিন খেলিতে খেলিতে নয়ন মাসিমার সম্মুখে আমাকে চরম লাঞ্ছনা করিল। খেলাঘরের সকল উপকরণ ভাঙিয়া বিনাশ করিল। ক্রোধে এই বলিয়া চিৎকার করিতে লাগিল, মিষ্টি খাওয়ার লোভে তুমি আমাদের বাড়ি আসো। পেটুক কোথাকার! তোমার সঙ্গে কোনো দিন খেলব না।

চিরদিনের আড়ি। লাঞ্ছনায় অপমানে আমার চোখে জল আসিল। শান্তশিষ্ট মাসি অগ্নিমূর্তি ধারণ করিলেন। মেয়ের গালে মৃদু চপেটাঘাত করিয়া ভর্ত্সনার স্বরে বলিলেন, রাক্ষুসী, এত যে ঘর ভাঙিস, দেখবি তোর কপালে ঘর জুটবে না।

নয়ন তেমনি জেদি গলায় বলিল, চাই না আমার ঘর। ওই বোকা হাবার সঙ্গে কে করবে ঘর?

হাই স্কুলে উঠিয়া ভালো স্কুলে পড়িতে আমি মামার বাড়ি চলিয়া গেলাম। ১৯৭১ সালে আমি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ সারা দেশে কূলে-উপকূলে ঘাত-প্রতিঘাতে জনমানুষ উদ্বেলিত। সবাই অপেক্ষায় আছে একটি অগ্নিশিখার। এমনি টালমাটাল আশা-নিরাশার মধ্যে বাবা-মার কাছে ফিরিয়া আসিলাম।

পথের মাঝে নয়নের সহিত হঠাৎ দেখা হইয়া গেল। নয়ন এখন দশম শ্রেণির ছাত্রী। পরস্পরের দিকে তাকাইয়া পরম বিস্ময়ে কয়েকটি নীরব মুহূর্ত কাটিল। মুগ্ধ-অভিভূত দৃষ্টিতে অপলক চাহিয়া রহিলাম। যেন কেহ কাহাকে চিনিতে পারিতেছে না। কবে কোনকালে আমাদের দেখা হইয়াছিল। আমরা একসঙ্গে হঠাৎ হাসিয়া উঠিলাম।

নয়ন বলিল, তুমি অনেক বড় হয়ে গেছ!

আমি হাসিলাম, তুমিও।

নয়নও মৃদু হাসিল, তুমি দেখছি কথা বলতে শিখেছ!

তুমি কি এখনো ওই রকম রাগ করো? যা জেদি ছিলে।

যাহ! তখন তো ছোট ছিলাম।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরপর অধিক নিরাপদ মনে করিয়া সপরিবারে আমরা মামার বাড়ি চলিয়া গেলাম। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে নিজ বাড়িতে বিজয়ের বেশে ফিরিলাম। নয়নের জন্য চিন্তায় ছিলাম। ছুটিয়া তাহাদের বাড়ি গেলাম। সারা বাড়িতে লুটপাটের নগ্ন চিহ্ন। জমজমাট বাড়িটি দরজা-জানালাশূন্য হইয়া পোড়োবাড়ির মতো দেখিতে হইয়াছে। খোঁজখবর করিয়া জানা গেল নয়নরা কলিকাতায় চলিয়া গিয়াছে। আবার অনেকে বলিল, উকিলবাবু ও তার মেয়েকে পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে নিয়া গেছে। তাহাদের কোনো খবর পাওয়া যায় নাই।

নয়ন আমার হাত ছাড়িয়া দিল। অবাক বিস্ময়ে আমার মুখপানে চাহিয়া রহিল। অলৌকিক প্রভায় তাহার অপরূপ জলে ভাসা নয়ন দুটিতে আমি দশম শ্রেণির নয়নকে দেখিতে পাইলাম। নয়ন বিড়বিড় করিয়া কিছু বলিল। আমি বুঝিতে পারিলাম না।

নয়ন, কিছু বললে?

অপু! অপু?

হ্যাঁ, আমি অপু। মাইজপাড়ার অপু। তুমি এখানে কেন?

নয়নকে এখন অস্বাভাবিক মনে হইতেছে। তাহার আচরণ-চাহনি পাল্টাইতেছে। হিংস্র দৃষ্টিতে আমাকে পর্যবেক্ষণ করিল। আমার কেমন ভয় ভয় করিতে লাগিল। পুতুলখেলার বয়সে নয়ন যেরূপ ক্রুদ্ধ ও জেদি ছিল, তাহাকে সেইরূপ মনে হইল।

নয়ন উচ্চ স্বরে হাসিয়া উঠিল। আমাকে অপ্রস্তুত করিয়া অন্ধকারে ছুটিয়া পালাইল।

অন্ধকারে নয়নের গমনপথের দিকে গভীর আবেগে আমি চাহিয়া রহিলাম। আমার মনের গভীরে এই প্রত্যাশা ছিল কি দশম শ্রেণির নয়ন অন্ধকার হইতে আলোকোজ্জ্বল জীবনে ফিরিয়া আসিবে? আমার চোখ ভিজিল। হৃদয়ের গভীর হইতে দীর্ঘশ্বাস বাহির হইল।

কাঁধে স্পর্শ পাইয়া চমকাইয়া ফিরিয়া তাকাইলাম। তনিমা জিজ্ঞাসা করিল, মেয়েটি কে?

পাগলি। সাহায্য চাইছিল।

কিছু দিলেই পারতে। বেচারা!

আমি কিছু বলিলাম না।



সাতদিনের সেরা