kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

আলাউদ্দিন আল আজাদ

সৃজনের বিচিত্র কারিগর

মনি হায়দার

২ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সৃজনের বিচিত্র কারিগর

লিখিত শিল্পের যত প্রকরণ রয়েছে, ছোটগল্প অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকরণ। বিচিত্র বৈভব আর অজস্র ধারার স্রোতের কারণে ছোটগল্পের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা কঠিন। অনেকে ছোটগল্পের সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টাও করেছেন; কিন্তু সময়ের গল্পধারায় পাল্টে নতুন নতুন ধারণার জন্ম হয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট ছকে ছোটগল্প আটকে থাকেনি। প্রতি মুহূর্তের পরিবর্তনের ধারায় ছোটগল্প নিজেকে পরিবর্তন করে পরিবর্তিত পথে নতুন রেখায় বাঁক নিচ্ছে। বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্প বিশেষ একটি ক্ষেত্র অধিকার করেছে সাহিত্য যাত্রার শুরু থেকেই। অনেক প্রকরণের ফল্গুধারায় কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতেই বাংলা ছোটগল্প প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তাঁরই দেখানো পথ ধরে বাংলা ছোটগল্প অনেক পথ পাড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে এখন শ্রেষ্ঠত্বের অবাক মহিমা অর্জনের পথে শিল্পময়তার সঙ্গে চলছে। মহিমার বয়নে অনেক গিরিপথ পাড়ি দিয়ে বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের পৃথিবী যাঁরা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, সেই সব অকৃত্রিম শক্তিমান গল্পকারের অন্যতম আলাউদ্দিন আল আজাদ।

আলাউদ্দিন আল আজাদের জন্ম ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে নরসিংদীর রায়পুরার রামনগর গ্রামে। শৈশবেই তিনি হারিয়েছেন মা ও বাবাকে। কিন্তু নিজেকে খুঁড়ে খুঁড়ে আবিষ্কারের শিল্পী পড়াশোনা শুরু করেছেন গ্রামীণ মাদরাসায়; যদিও মাদরাসায় পড়েছেন কিন্তু ভেতরে ছিল বই পাঠের প্রবল তৃষ্ণা। সেই তৃষ্ণার জল মেটাতে যেতেন গ্রামের পাঠাগারে, বিচিত্র ধরনের বই পড়তেন। তৃষ্ণার সঙ্গে শিল্পের পরাগায়ণে নবম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায়ই তাঁর গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা কলকাতা থেকে প্রকাশিত মাসিক সওগাতসহ বিভিন্ন পত্রিকায় মুদ্রিত হতে থাকে।

‘জানোয়ার’ গল্প প্রথম ছাপা হয় ‘সওগাতে’ ১৯৪৬ সালে। গল্পটি পাঠ করে সেই সময়ের খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন আবুল কালাম চিঠিতে লিখেছেন—‘লেখা ছাড়বেন না। আপনার গল্পে যে অভিজ্ঞতা, শক্তি ও সম্ভাবনা লক্ষ করেছি, তাতে আমাদের সাহিত্য ভবিষ্যতে বিপুল সমৃদ্ধি লাভ করবে, আমি নিঃসন্দেহ।’

১৯৪৬ সালে ‘সওগাতে’ গল্প বের হওয়ার পর আলাউদ্দিন আল আজাদের গল্পগ্রন্থ ‘জেগে আছি’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৫০ সালে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে। ‘জেগে আছি’ গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো সেই সময়েই বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক সভায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। সওগাতের সহকারী সম্পাদক শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার সত্যযুগ পত্রিকায় লেখেন—“বিনাদ্বিধায় স্বীকার করতে পারি ‘জেগে আছি’ সাম্প্রতিক সময়ের মুসলিম সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ গল্পগ্রন্থ এবং সমগ্রভাবে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা বই।”

সেই থেকে শুরু এবং আমৃত্যু লিখে গেছেন শক্তিমান কথাশিল্পী আলাউদ্দিন আল আজাদ। দুই হাতে লিখেছেন প্রচুর গল্প! শুধু কী গল্প? গল্পের পাশাপাশি উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক। বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিল্প-সাহিত্যের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। শিল্পের নানা প্রকরণে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন দ্বিধাহীন চেতনায়, নির্মাণের শিল্পসুষমায়। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ছয়টি—জেগে আছি, ধানকন্যা, মৃগনাভি, অন্ধকার সিঁড়ি, উজান তরঙ্গে, যখন সৈকতে, আমার রক্ত স্বপন আমার এবং জীবন জমিন। ছয়টি গল্পের বই ও পাঁচটি গল্পসংকলন থেকে নির্বাচন করে ৩২টি গল্পের ‘নির্বাচিত গল্প’ বইটি প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। সম্পাদনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রাবন্ধিক গবেষক সৈয়দ আজিজুল হক। 

আলাউদ্দিন আল আজাদ বাংলার মানুষ, বাংলা ভাষার মানুষ। জন্ম নিয়েই দেখেছেন ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি। সুতরাং গল্পের আখ্যান কেন্দ্রে চারপাশের ভেঙে পড়া জীবনের আর্তলড়াই, বিক্ষুব্ধ যাতনার মসলাপাতি, ঘনায়মান অন্ধকারের লোলুপ দাঁত ও দাঁতের দংশন আজাদের গল্পে জায়গা করে নিয়েছে স্বাভাবিক চৈতন্যে। ‘দুপুরে প্রস্থান’ গল্পটার মধ্য দিয়ে গোটা উপমহাদেশের রাজনীতি আর প্রেমের কুহক একই সঙ্গে যাত্রা করে, শেষ করেছেন দুপুরের প্রস্থানের দরজায়।

আলাউদ্দিন আল আজাদের উপন্যাস ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ নিয়ে তৈরি হয়েছে অসম্ভব শিল্পসম্মত ছবি, ‘বসুন্ধরা’। নদী আজাদের প্রিয় চরিত্র—গল্পের ও উপন্যাসের। তিনি কর্ণফুলীকে কেন্দ্র করে লিখেছেন উপন্যাস—‘কর্ণফুলী’। কাব্য : মানচিত্র, ভোরের নদীর মোহনায় জাগরণ, সূর্যজ্বলার সোপান, লেলিহান পাণ্ডুলিপি। নাটক : ধন্যবাদ, মরোক্কোর জাদুকর, মায়াবী প্রহর। প্রবন্ধ : শিল্পীর সাধনা, সাহিত্যর আগন্তুক ঋতু।

গত শতকের ষাটের দশক আমাদের শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির বনিয়াদি সময়। সেই সময়ের নায়করা সৃষ্টির জোয়ারে সব কূল নদীরেখা তট ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। যেমন শিল্প সৃজনের সঙ্গে ছিলেন, আবার উল্টোপথে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনও চালিয়েছেন। আর ভাষা আন্দোলন তো ছিল বাঙালির অস্তিত্বের লড়াই। ভাষা আন্দোলনের সবচেয়ে দায় পালন করেছিলেন লেখক-সংস্কৃতিকর্মীরা। সেই সময়ের চেতনার চাবুক ধারণ করে আলাউদ্দিন আল আজাদ লিখেছেন চিরস্মরণীয় স্মৃতিস্তম্ভ্ভ কবিতায়—

স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু—/আমরা এখনো চারকোটি পরিবার/খাড়া রয়েছি তো! যে ভিৎ কখনো কোনো রাজন্য/পারেনি ভাঙ্গতে...।

একটি কবিতার মধ্য দিয়ে আলাউদ্দিন আল আজাদ বাংলা ও বাঙালির সব গৌরবের ইতিহাস তুলে ধরেছেন সফলতার চরম উৎকর্ষে। আজীবন সৃজন ধ্যানী আলাউদ্দিন আল আজাদ বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৬৪ সালে, একুশে পদক পেয়েছেন ১৯৮৬ সালে।

তিনি ২০০৯ সালের ৩ জুলাই প্রয়াত হন। আলাউদ্দিন আল আজাদের সৃজনসত্তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা!



সাতদিনের সেরা