kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

লাল মাস্কের আড়ালে

মাহফুজ রিপন

২৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



লাল মাস্কের আড়ালে

অঙ্কন : মাসুম

রাজপথে দারোগা সাহেব চেয়ার পেতে বসে আছেন। সিপাহির হাতে গোলবাহার সাপের মতো ডোরাকাটা বেতের লাঠি। সেদিন শুক্রবার ছিল। মুকসুদপুর উপজেলায় সেদিন হাট বসে। করোনা মোকাবেলায় সমগ্র বিশ্বের মতো আমাদের এখানেও সব বন্ধ। সীমিত আকারে হাট বসেছে। বিকেলবেলা আম্মার ওষুধ আনতে পা বাড়ালাম। বাজারে ঢুকতেই নাট্যকর্মী রাব্বীর সঙ্গে দেখা, সে বলল, ‘মামা কেমন আছেন, কবে আসলেন ঢাকা থেকে। মাস্ক পরেন নাই! মাস্ক না পরলে পুলিশ ধরছে।’ রাব্বীর প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে পকেট থেকে মাস্কটা বের করে পরে নিলাম। কিছুদূর এগোতেই দেখি ১২-১৩ বছরের এক কিশোর মাস্ক না পরার জন্য রাজপথে কান ধরে উঠবস করছে। হাসি-খুশি তার মুখ, যেন মজাই লাগছে তার কানে ধরতে। হাটের মানুষ গোল হয়ে কান ধরা উপভোগ করছে। দু-একজন জননেতা পুলিশকে বাহবা দিচ্ছেন। আমার বুক অনেকটাই ফুলে উঠল, যাক করোনাসচেতনতা বৃদ্ধি করতে আমাদের এলাকার প্রশাসন ও জনতা এক হয়ে কাজ করছে। আম্মার ওষুধ পকেটে ভরে সনোজদাকে ফোন করলাম। সে বলল, ‘ভাত ঘুম দিয়েছিলাম ভাই, ১০ মিনিট অপেক্ষা করো, আসছি। দুজন মিলে লখেচ্চর চলে যাব, হাঁটাও হবে, ওখানে রেলস্টেশন তৈরির কাজ চলছে সেটাও দেখে আসব।’

সনোজদার কথায় উষ্ণ হলাম। আমরা রেলস্টেশন পাচ্ছি, স্বপ্নের পদ্মা সেতু তৈরির কাজ চলছে। কল্পনায় রেলগাড়িতে চড়ে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে কিছু সময়ের জন্য ভ্রমণ করে নিলাম। একসময় আমাদের এলাকার মানুষ কত কষ্ট করে রাজধানীতে যাতায়াত করত। সেই কষ্ট এখন অনেকটাই চলে গেছে। সামনে আরো সুন্দর ও সহজ হবে আমাদের পরিবহনব্যবস্থা স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হলে। আমার সব কল্পনা গলার কাছে এসে জমা হয় করোনাভাইরাসের মরণ ছোবলের কথা চিন্তা করলে।

 আসরের আজান দিয়েছে। মুরাদ মামার ওষুধের ডিসপেনসারির সামনে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব রেখে পরিচিত মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছি। সেসব মানুষের মধ্যে অনেকেই আমার স্কুলজীবনের বন্ধু, বিগত দিনে যাদের সঙ্গে দেখা হলে বুকে জড়িয়ে ধরতাম। বাল্যবন্ধুর ভালোবাসার ছোঁয়া থেকে আমাকে বঞ্চিত করল করোনাভাইরাস। ঘাড় ঘোরাতেই চোখ গেল ছোট্ট একটি পরিবারের দিকে। স্বামী ও স্ত্রী কোলে তাদের একমাত্র দুধের শিশু। আপন মনে তারা ফিসফিস করে কথা বলতে বলতে মন্দিরের সামনে দিয়ে, অখিল শাহর দোকান হয়ে টিপু মিয়ার ওষুধের ডিসপেনসারির সামনে এসে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে সিপাহি তার হাতের ডোরাকাটা বেত উঁচু করে হাঁক ছাড়ল—‘এই তোমার মাস্ক কই, মাস্ক পরো নাই কেন?’ দারোগা সাহেবকে লক্ষ্য করে বলল—‘স্যার আর একটা পাওয়া গেছে।’ একজন জননেতা উৎসাহ নিয়ে বলেন, ‘দারোগা সাহেব করোনা কাউরে ছাড়ব না, তাই আপনারাও কাউরে ছাড়বেন না।’ দারোগা ঘুম ঘুম চোখে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে বললেন, ‘তোর মাস্ক কই। মাস্ক ছাড়া হাটে আসছিস কেন? বাচ্চারে ওর মায়ের কোলে দিয়ে আমার কাছে আয়।’ বোরকা পরা স্ত্রীর কাছে বাচ্চাটাকে দিয়ে লোকটা দারোগার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে কোলের বাচ্চাটা চিৎকার করে কান্না শুরু করল। ‘দুই-একবার ও-ও সোনা কাঁদে না’ বলে বাচ্চাটিকে দু-হাতে দোল খায়িয়ে কান্না থামাতে ব্যর্থ হলো, তারপর রাগে-দুঃখে টাস টাস করে চড় বসিয়ে দিল বাচ্চার গালে। দুধের বাচ্চা আরো জোরে চিৎকার করে কান্না শুরু করল।

এই ঘটনা দেখে আমার ভেতরে তীব্র জ্বালাপোড়া শুরু হয়ে গেল। শান্ত পৃথিবীটাকে হঠাৎই অশান্ত করে দিয়েছে করোনাভাইরাস। 

লোকটা কান ধরে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে তার মুখ। হতাশা-দুঃখ-ক্ষোভে চিক চিক করছে চোখের জল। বাজ পড়া মানুষের মতো খাড়া হয়ে রইল মানুষটি। দারোগা সাহেব হাঁক ছেড়ে বললেন, ‘কি রে খাড়া হইয়া রইলি কেন? কানে ধইরা দশবার উঠবস কর।’ সিপাহির হাতের বেত আর চুপ রইল না, সপাসপ দুইবার পড়ল তার পিঠে। লজ্জায়-ঘৃণায় নীল হয়ে গেল তার সমস্ত শরীর। লোকটি কাঁদতে কাঁদতে শুধু একটি কথা বলল—‘স্যার, ছাওয়ালের নিমনিয়া হইছে ওষুধ নিতে আইছিলাম। এই দেখেন জেবে তিরিশ টাহা আছে। আমি ওষুধ কিনব না স্যার, আমারে ছাইড়া দেন। অহনি আমি মাস্ক কিনতাছি।’ কথা শুনে দারোগা ও সিপাহির মন নরম হলো, তারা দুজন দুজনের দিকে ফিরে তাকাল। লোকটা দারোগার সামনে থেকে সরে গিয়ে জড়ো হওয়া সব মানুষের চোখের দিকে একবার ঘুরে তাকাল; কিন্তু কোনো সহানুভূতি পেল না, তারপর হতাশ হয়ে মাথায় হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। শান্ত হয়ে এলো ভ্যানস্ট্যান্ডের পরিবেশ। অতঃপর বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনে ঘোর কেটে গেল লোকটার।

সে ওষুধ না কিনে মসজিদের সামনে থেকে ৩০ টাকা দিয়ে একটি লাল রঙের মাস্ক কিনে মুখে পরল। তারপর স্ত্রীর কোল থেকে বাচ্চাটাকে নিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটা শুরু করল বাড়ির দিকে। বউটা যেন বোবা হয়ে রইল, তার চোখে-মুখে এমন ভাব কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া কোনো বিষয়ই যেন তিনি দেখতে পান নাই, ওদিকে বাবাকে পেয়ে বাচ্চাটার কান্না থেমে গিয়ে তার সারা শরীরে আনন্দ বেরিয়ে এলো, বাবার মুখের লাল রঙের মাস্ক নিয়ে তার নতুন খেলা শুরু হলো। বিকেল গড়িয়ে পড়ছে। আমি দূর থেকে ওই পরিবারটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু মাস্ক ও বোরকায় তাদের মুখ ঢাকা ছিল। তাই দুজনের কোনো অনুভূতি চোখে পড়ল না। লোকটার সব দুঃখ ঢেকে গেল লাল মাস্কের আড়ালে।

কিছুক্ষণ পর মাথায় ক্যাপ আর নীল রঙের মাস্ক পরা সনোজদা আমাকে দেখে দূর থেকে হাত উঁচু করলেন। পড়ন্ত বিকেলে আমরা উপজেলা ডাকবাংলোর সামনে দিয়ে কুমার নদের পার ধরে হেঁটে চললাম লখেচ্চরের দিকে। বুকে আমাদের করোনার ছোবল থেকে বাঁচার তীব্র পানি ফোড়া, স্বপ্ন দেখি করোনামুক্ত একটি নতুন মানবিক পৃথিবীর।



সাতদিনের সেরা