kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

সাদা পাজামার পা নেমে আসবে মাটিতে

রিয়াজ আহমেদ

২৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



সাদা পাজামার পা নেমে আসবে মাটিতে

অঙ্কন : মাসুম

থানায় ঢুকলেন আব্দুর রহমান। গতকালের খবরের কাগজ এখনো আসেনি। কালকে ঘটনার পর ঢাকায় কী হচ্ছে—কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। রেডিওতে শুধু কোরআন তিলাওয়াত আর মেজর ডালিম নামের এক লোকের ভাষণ শোনাচ্ছে। নিজের চেয়ারটায় গিয়ে বসে আব্দুর রহমান।

ফোনটা বেজে উঠল... ক্রিং ক্রিং।

জীবনের ভয়ংকরতম দুঃস্বপ্নের একটা দিন। সকালে বাচ্চাটাকে আদর করে অফিসে আসার জন্য তৈরি হচ্ছিল সে। থানা থেকে দুজন কনস্টেবল নিয়ে উত্তরের পাড়ায় যেতে হবে। মার্ডার কেস। মেজাজটাও বিগড়ে ছিল। প্রথমে সাইকেলে, পরে হেঁটে যেতে হবে অনেকটা পথ।

তখন সকাল ৭টা। কনস্টেবল রজব সাইকেলটা ধরে উঠোনে দাঁড়িয়ে। তাড়াতাড়ি থানায় যেতে হবে। মীনা উঠোনের ওপাশটায় রান্নাঘরে মজিদের মায়ের সঙ্গে হাত নেড়ে নেড়ে কী যেন বলছে! দূর থেকে বেশ উত্তেজিত মনে হচ্ছে দুজনকেই। মজিদ কি আবার কোনো ঝামেলায় পড়েছে?

ঘর থেকে সবই দেখছে রহমান। মীনা হঠাৎ ঘরে ছুটে আসে। ভয়ার্ত চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে আলমারির ওপর রাখা রেডিওটা চালু করে। এক নিষ্ঠুর ভরাট কণ্ঠ শুনতে পায় সে, ‘আমি মেজর ডালিম বলছি...।’

শুনে মাথাটা বনবন করে ওঠে রহমানের। উদ্ভ্রান্তের মতো বউ বলে, ‘দেশ আবার পাকিস্তান হইয়া গেছেগা। শেখ মুজিবরে মাইরা ফালাইছে।’

কিংকর্তব্যবিমূঢ় গোপালগঞ্জ সার্কেল ইন্সপেক্টর আব্দুর রহমান।

‘হ্যালো? এসডিপিও গোপালগঞ্জ?’

উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে আব্দুর রহমান। ‘স্যার... স্যার... জি স্যার... আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি স্যার।’

ওপাশে ফরিদপুরের এসপি।

‘শেখ মুজিবের লাশ টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’

নির্দেশ, টুঙ্গিপাড়ায় দাফন করার জন্য কবর খুঁড়তে হবে। লাইন কেটে যায়। ধপ করে চেয়ারটায় বসে পড়ে আব্দুর রহমান। গ্লাসের পানি ঢকঢক করে গিলে ফেলে এক নিঃশ্বাসে। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে ফোনটা তুলে নম্বর ঘোরায়। এনগেইজড, আবার চেষ্টা করে।

ওয়ার্ড বয় আবদুল হাই শেখ। শেখ সাহারা খাতুন রেডক্রস হাসপাতাল, টুঙ্গিপাড়া। পর পর পাঁচ রাত ডিউটি করেছে। ঠিকমতো ঘুমায়নি। কদিন ছুটি চেয়েছিল; লাভ হয়নি। ওয়ার্ডের এক কোণে টুলে বসে বসে ভাবছে কিভাবে দুই দিন ‘গাপ মারা’ যায়। ডাক্তার সাহেব থাকেন গোপালগঞ্জ। ঠিক ৯টায় আসবেন। ক্লিনার নুরী বুকে খেয়াল রাখতে বলে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে আবদুল হাই। হাসপাতালের গেটে নুরুল হকের মুদি-কাম-হোটেল দোকানটা। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। ‘কাকা কড়া এক কাপ চা আর দুটা টোস্ট। ’

চায়ে একটা টোস্ট বিস্কুট ডুবিয়ে মাত্র মুখে দিয়েছে...

‘আমি মেজর ডালিম বলছি...।’

‘কী কয় এই সব? শেখ মুজিবরে মাইরা ফালাইছে!’

আবদুল হাই শেখ বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে রেডিওটার দিকে। বিস্কুট হাতে চাটা ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

ফজর পড়ে আর ঘুমান না মৌলভি আবদুল হালিম শেখ। দুই পারা কোরআন পড়ে হাঁটতে বের হন বাইগারের পার ধরে। প্রতিদিনের মতো সাড়ে ছয়টার দিকে শেখের বাড়ির দিকে রওনা হন হালিম শেখ। সকালে কাকা-কাকির কবর দুটি নিজ হাতে পরিচর্যা করেন। তাঁদের কাছে তাঁর ঋণের যে শেষ নেই! মিঞাভাই ঢাকায়। দেশ নিয়ে মহাব্যস্ত। বেশ কিছুদিন বাড়িও আসতে পারেন না। কাকাকে মার্চ মাসে কবর দিয়ে যাওয়ার সময় মিঞাভাইয়ের হাত ধরে হালিম শেখ বলেছিলেন, ‘মিঞাভাই, আমি যত দিন আছি, কাকা-কাকির সব দায়িত্ব আমার। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।’

ধীর পায়ে হাঁটছেন হালিম শেখ। দোকানের সামনে এত ভিড় কিসের? হালিম শেখ দোকানের দিকে হাঁটতে থাকেন। তাঁর কানে ভেসে আসে একটা কণ্ঠ : ‘আমি মেজর ডালিম বলছি...।’

হাত-পা ঠাণ্ডা, কেমন যেন অবশ হয়ে আসে হালিম শেখের। কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়েন দোকানের সামনে তক্তার বেঞ্চিটায়। বুকটা বেধড়ক ধুকপুক করেছে। কী বলে এসব কথা?

‘ভাবি, জামাল, কামাল, রাসেল ওরা কই? কী অবস্থায় আছে ওরা? বেঁচে আছে? নাকি মেরে ফেলছে?’

কামাল-জামালের বিয়েতে যেতে পারেননি হালিম শেখ। দোকানি নুরুল হক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘খবর তাইলে সত্যি!’ স্তব্ধ হয়ে সে বসে থাকে নুরুল হকের রেডিওর মুখোমুখি। কতক্ষণ, তা ঠাওর করে উঠতে পারে না।

ছয়বারের বার লাইনটা পাওয়া গেল।

‘হ্যালো, ওসি টুঙ্গিপাড়া?...ওয়ালাইকুম।’

‘ওসি সাহেব এখনই কয়েকজন লোক নিয়ে শেখ মুজিবের বাড়িতে চলে যান। শেখ মুজিবের লাশ টুঙ্গিপাড়ায় আসছে, বাড়িতেই কবর হবে। মা-বাবার কবরের পাশে যে খালি জায়গাটা আছে, সেখানেই কবর দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা নেন... আমি আসছি।’ লাইন কেটে দেয় আব্দুর রহমান।

টুঙ্গিপাড়া থানার সামনে ভিড় বাড়তে থাকে। গ্রামের মানুষ আজ থানার মাঠে। বঙ্গবন্ধু আসবেন। হেলিকপ্টার থেকে নেমে জনে জনে জিজ্ঞেস করবেন ‘কেমন আছিস? তোর মা কেমন আছে ?’ তিনি যে গাঁয়ের সবাইকে নামে নামে চেনেন। আবদুল হাই শেখ, মৌলভি শেখ আবদুল হালিম, রজ্জব আলী, সুজিত, গফুর... আরো কত কে। সবাই এতক্ষণে জেনে গেছে, বঙ্গবন্ধুকে টুঙ্গিপাড়ায় আনা হচ্ছে। প্রতিবারের মতোই বঙ্গবন্ধু আসবেন, তবে আগের মতো এবার আর কারো সঙ্গে কথা বলবেন না। কান্না আটকাতে পারে না আবদুল হাই।

সাড়ে ১১টার মধ্যে টুঙ্গিপাড়া থানায় পৌঁছে যান আব্দুর রহমান। সঙ্গে এসডিপিও নুরুল আলম আর ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল কাদের। তাঁদের থানায় রেখে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে দ্রুত হাঁটতে থাকেন। হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে বারবার, মাথাটাও বনবন করছে সকাল থেকে। চাকরির এতটা বছর এই অবস্থায় কখনোই পড়তে হয়নি তাকে। ৮ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছে সে। মুক্তিযুদ্ধে আর্মি সদস্যদের দেখেছে। কী নির্ভিক, কী অসাধারণ দেশপ্রেম! আজকে এরা কারা? মেলাতে পারে না আব্দুর রহমান।

শেখ মুজিবের বাড়ির উঠোনে গ্রামের কয়েকজন মুরব্বিকে দেখা গেল। হালিম, আইয়ুব মিস্ত্রি ও অন্যরা তখন মাটি কাটা আর কবর খোঁড়ার কাজ শেষ করে এনেছে।

‘কবর রেডি স্যার!’ ওসি মান্নান শেখ রিপোর্ট করেন। জানানো দরকার এসডিপিও ও ম্যাজিস্ট্রেটকে।

‘আপনি এখনই হেলিপোর্টে চলে যান, আমি এসডিপিও আর ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে আসছি।’ ওসিকে নির্দেশ দেয় আব্দুর রহমান।

পুলিশের হাবিলদার ইছহাক, সার্কেল ইন্সপেক্টর (সিআই) শেখ আব্দুর রহমান, এসডিপিও গোপালগঞ্জ এবং থানার ওসিসহ আরো কয়েকজন অফিসার থানার বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে। মাঠে  হেলিকপ্টার নামবে। বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখার জন্য ভিড় জমাচ্ছে গ্রামের লোকজন। ইলিয়াস হোসেন, সোহরাব মাস্টার, আকবর গাজী, নুরুল হক, আব্দুল মান্নান কয়েকজনকে নিয়ে আবদুল হাই শেখ ও আরো অনেকে। টান টান উত্তেজনা আর ভয়, কী হতে যাচ্ছে? সবার মনে একই প্রশ্ন।

দুপুর তখন ২টা হবে। দূর থেকে আকাশ ফাটিয়ে হেলিকপ্টারের উড়ে আসার শব্দ কানে আসে। মাথার ওপর হেলিকপ্টারের শব্দে বুকটা ধুকধুক করে ওঠে আবদুল হাই শেখের। কে যেন বলে, ‘ডাকবাংলোয় নামবে।’

হেলিকপ্টারের পাখার বাতাসে ডাকবাংলোর মাঠে ধুলো উড়তে থাকে। হেলিকপ্টারটা আস্তে আস্তে মাটিতে নেমে আসে। চোখ যেন হেলিকপ্টারের দরজায় আটকে গেছে। চিরচেনা দৃশ্য। দরজা খুলে সাদা পাজামার পা প্রথমে মাটিতে নামবে। সেই আশাতে সবাই তাকিয়ে থাকে হেলিকপ্টারটার দিকে। কিন্তু আজ আর তা হলো না। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন মিলিটারি সেনা লাফিয়ে পড়ল মাটিতে। হাতের অস্ত্রগুলো তাক করে চারদিকে পজিশন নেয় তারা। যেন যুদ্ধ চলছে।

বাঁশি বাজাতে থাকে পুলিশ। কাছে যাওয়ার জন্য কেউ চেষ্টাও করে না। কী একটা অজানা ভয় যেন পেয়ে বসেছে সবাইকে।

‘সিআই সাহেব, এসডিপিও সাহেব এগিয়ে যান।’ দুহাত ওপরে তুলেন, দুরুদুরু বুকে ওসি হেলিকপ্টারের দিকে এগোতে থাকেন।’

‘দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে দেখেন কী? ভেতরে একটি কফিন আছে, নামান জলদি।’ খেঁকিয়ে উঠে এক সেনা।

ততক্ষণে সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার কাসেম, ক্যাশিয়ার, পোস্টমাস্টার আনোয়ার হোসেন, মেম্বার আবদুল হাই শেখ, সোহরাব মাস্টার, আকবর গাজী, নুরুল হক, আব্দুল মান্নান ও থানার জনকয়েক সিপাই পৌঁছে গেছে হেলিকপ্টারটার কাছে। কফিনটা নামিয়ে আনে তারা।

 ‘এখানে না, সোজা শেখ মুজিবের বাড়িতে নিয়ে যান। যেখানে কবর খোঁড়া হয়েছে।’ আবার চিৎকার করে ওঠে আর্মির লোকটা। কফিন বাক্সটা কাঁধে করে রওনা দেয় তারা। হাঁটতে থাকে সবাই শেখের বাড়ির দিকে। বুক ফেটে যাচ্ছে কান্নায়, শব্দ নেই। নীরবে হাঁটতে থাকে সবাই। উঠোনে আসতেই কান্নার গুঞ্জন শুনতে পেলেন আব্দুল হাই শেখ। দাঁড়ানো লোকজন কাঁদছে। বাক্সটা নামিয়ে রাখে সদ্য খোঁড়া কবরটার পাশে।

‘ইমাম সাব কোথায় ডাকো জলদি।’ কে যেন চিৎকার করে বলে উঠল। মসজিদের ইমাম আব্দুল হাই এগিয়ে এলেন, চোখের পানি কিছুতেই ধরে রাখতে পারছিলেন না। চাপা কান্নায় চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে আসছে বারবার।

গ্রামের একমাত্র কাঠমিস্ত্রি, বৃদ্ধ হালিম শেখ। বয়সের ভারে শরীরটা ভেঙেছে আগেই। আজ সকালে থানা থেকে ডাক আসে, কফিন বাক্স খুলে দিতে হবে, ১০ বছরের ছেলে আয়ুবকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। কফিন বাক্সটা খুলতে হবে, ভেতরে নাকি শেখ মুজিবের লাশ আছে। কেমন একটা ঠাণ্ডা শিহরণে আয়ুব আলীর শরীরটা কাঁপতে থাকে। তার এইটুকু বয়সে বাক্সের মধ্যে কখনো লাশ দেখেনি। মিলিটারি লোকটা হঠাৎ ধমকে উঠলে হাত থেকে শাবলটা পড়ে যায়। হাতুড়ি আর শাবলটা ভয়ে ভয়ে মাটি থেকে তুলে নেয় আয়ুব। হাতুড়ির বাড়ি মেরে ঢাকনাটা আলগা করে ফেলে। ঢাকনাটা আস্তে আস্তে কাত করে তুলে ফেলে বাপ-বেটায়।  দাঁড়ানো মানুষজন নিজেদের আর ধরে রাখতে পারে না, কান্নায় ফুঁপিয়ে ওঠে। বাঁধভাঙা জলের মতো চোখে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। বিশ্বাস হয় না, প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে ওরা মেরে ফেলেছে। আয়ুব আলী কাজের কথা ভুলে ফ্যাল ফ্যাল করে মৃত দেহটার দিকে তাকিয়ে থাকে।

‘জলদি।’ আর্মিটার ধমকে চেতনায় ফিরে আসে আয়ুব। সুবেদার ইসহাকে নিয়ে কফিনের বরফগুলো দ্রুত বের করে ফেলে আব্দুর রহমান শেখ। পাঁচ-ছয়জনে মিলে নিথর দেহটা তুলে গোসলের চৌকিতে নামায়। বেশ ভারী! মৃত্যুর পর শরীর শক্ত আর ভারী হয়ে যায়। পুলিশের চাকরিতে কম লাশ দেখেনি রহমান শেখ, নিজের হাত দুটা যেন অবশ, ধরে রাখতে পারছে না এই দেহটা।

মৌলভি আবদুল হালিম শেখ, পাশে দাঁড়িয়ে তার মিঞাভাইয়ের শরীরটা দেখছে, বুকে এত গুলির চিহ্ন, গুলিতে বুকটা ঝাঁঝরা হয়ে আছে। গায়ে সাদা গেঞ্জি আর পাঞ্জাবিটা রক্তে লাল। গুলি বুকের দিক দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বের হয়ে গেছে। শরীর থেকে এখনো রক্ত ঝরছে। হাতেও গুলি লেগেছে। দুই পায়ের গোড়ালির ওপরের রগগুলো কাটা। ডান হাতের তর্জনীটা ছেঁড়া দেখে আঁতকে উঠে হালিম শেখ। যে আঙুলের ইশারায় ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মিঞাভাই ডাক দিয়েছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ঘাতকরা তাঁর সেই আঙুলটাও কেটে দিয়েছে। মাথাটা ঘুরছে, নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে নেন মৌলভি হালিম শেখ। এখন ভেঙে পড়লে চলবে না। বন্ধুকে তাঁর যথাসম্ভব পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে দাফন করতে হবে। নইলে শয়তানগুলো চরম অপমান করতে ছাড়বে না। এরা শয়তানেরও অধম, নিষ্ঠুর।

‘যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায় কবর দিয়ে দেন কিচ্ছু করতে হবে না।’ পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠল এক মেজর।

‘হেরা কী চায়? কোনো মতে লাশটারে মাটিচাপা দিয়া কাইট্টা পড়ব? হেরা কি মুসলমান?’

‘মুসলমানরে বিনা জানাজায়, বিনা গোসলে দাফন দেওয়া যায় না। মুসলমানের লাশ জানাজা, কাফন ছাড়া দাফন করলে হাশরের মাঠে আল্লাহর কাছে ঠেকা থাকতে হবে। পবিত্র কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা দিয়ে আর্মিদের বোঝানোর চেষ্টা করেন মৌলভি সাহেব।

ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন ইংরেজিতে মৌলভি আব্দুল হালিমের সঙ্গে এ নিয়ে তর্ক আরম্ভ করলে জেদ চেপে যায় মৌলভি হালিম শেখের। রাগে চোখ দুটি লাল হয়ে ওঠে তাঁর, প্রতিবাদ করে ওঠেন।

‘ফাইজলামি’, ইংরেজির জবাব ইংরেজিতে দিতে থাকেন তিনি। থতমত খেয়ে যায় আর্মির লোক দুইটা।

এই অজপাড়াগাঁয় সামান্য এক হুজুরের কাছে চোস্ত ইংরেজি আশা করেনি তারা।

‘আচ্ছা! আচ্ছা! ১৫ মিনিটের মধ্যে যা পারেন, জলদি করেন।’

কাফনের কাপড় লাগবে? রেডক্রস হাসপাতালে রিলিফের জন্য কাপড় এসেছিল কদিন আগে। রজ্জব আলী ও সিআই সাহেবকে নিয়ে দ্রুত চলে যায় হাসপাতালের দিকে। কিছু একটা তো পাওয়া যাবেই। স্টোর থেকে তিনটি মালা শাড়ি পাওয়া গেল। জমিনটা তো সাদা, তাতেই হবে। কোথা থেকে চাদর এনে গোসলের জায়গা করা হলো। গোসল দেওয়ার জন্য বালতি নিয়ে বাড়ির পুকুর থেকে পানি আনতে ছুটল নুরুল হক। বাড়িতে নিশ্চই গায়ে মাখুনি সাবান আছে? দেবে কে? বাড়িতে তো কেউ নেই।

‘আশরাফ মোল্লার দোকান থেকে দুইটা ৫৭০ সাবান আর আগরবাতি নিয়ে আয় জলদি।’ কাকে যেন বলল নুরুল হক।

‘হুজুর আসেন’... মৌলভি আবদুল হালিমকে নিয়ে সাদা শাড়ি কাপড় তিনটি দিয়ে কাফনের কাপড় বানাতে বসে আবদুল হাই। রিলিফের মালা শাড়ি। জমিনটা সাদা আর পাড়টা লাল-কালো। সেই পাড় ছিঁড়ে জমিনের সাদা অংশটা বের করে নিল তারা। বন্ধু মুজিবের শেষ কাপড়টা রিলিফের কাপড়। কান্নাটা গলায় আটকে যায় আবদুল হালিমের।

সেনারা কেন যেন অস্থির হয়ে ওঠে। আর্মির লোকগুলো আবার চেঁচাতে শুরু করে ‘তাড়াতাড়ি করেন।’

উঠোনে লোক আরো জড়ো হতে শুরু করেছে। মেজর সাহেব তাড়া অনুভব করেন। চোখে-মুখে অজানা শঙ্কা। যত জলদি সম্ভব বেরিয়ে যেতে হবে এখান থেকে।

‘নিয়ম অনুযায়ী গোসলের আগে মৃতদেহের সুরতহাল করা দরকার।’ এগিয়ে যায় আব্দুর রহমান।

মেজর আব্দুর রহমানের ওপর রেগে ওঠে, ‘সুরতহাল লাগবে না।’

কফিনের ভেতর বঙ্গবন্ধুর গায়ের পাঞ্জাবি, গেঞ্জি, প্ল্যাকার্ড চেক লুঙ্গি, পাঞ্জাবির পকেটে থাকা রুমাল, তামাকের কৌটা, পাইপ ছাড়াও একটি তোয়ালে ও একটি চাদর পাওয়া গেল।

‘ওসি সাহেব, এগুলো কোনো আত্মীয়ের জিম্মায় দিয়ে দেন।’ ওসির দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিলেন আব্দুর রহমান।

‘মান্নান মিঞা এদিকে আসেন, জিনিসগুলো বুঝে রাখেন।’ মান্নান শেখ পরিবারের আত্মীয়। চুপচাপ জিনিসগুলো নিয়ে যায় মান্নান। আপাতত ধুয়ে তুলে রাখবে। পরে তো কোনো সমস্যা হবে না মনে মনে ভাবে মান্নান।

পরম যত্নে প্রিয় বঙ্গবন্ধুর লাশ যথানিয়মে গোসল দিলেন আব্দুল মান্নান শেখ, ইমাম উদ্দিন গাজী, নুরুল হক শেখ, কেরামত হাজি। আজীবন বাংলার মানুষের জন্য, এই দেশের জন্য, মানুষটা যে কষ্ট করেছেন তার ঋণ কখনোই শোধ হওয়ার নয়। ঋণ শোধের এই সামান্য সুযোগও আর পাওয়া যাবে না।

‘এই কাগজটায় একটা সই করেন।’ আর্মির দুইজন ঘিরে ধরে একটা কাগজ এগিয়ে দেয় আব্দুর রহমানের দিকে।

সরকারি প্যাডে শেখ মুজিবুর রহমানকে সাক্ষীদের মোকাবেলায় দাফন করা হয়েছে মর্মে কার্যসম্পাদননামা। নিচে লেখা রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ, বাংলাদেশ সরকার। সই করে দিলেন শেখ আব্দুর রহমান।

‘ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আপনিও সই করেন।’ ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল কাদেরও সই করে দিলেন।

কাশেম হাজি, নজির মোল্লা, ইমান গাজী, মান্নান শেখ আরো সাত-আটজন ধরাধরি করে লাশটা নামালেন সকালে খোঁড়া কবরটায়। মা-বাবার কবরের পশ্চিম পাশে। কান্নায় ভেঙে পড়ে দাঁড়ানো লোকজন।

‘চুপ ! সবাই চুপ!’ ধমকে উঠে আর্মির লোক ।

প্রিয় বন্ধু মুজিবের কবরে শেষ মুঠি মাটিটা দিয়ে উঠে দাঁড়ান মৌলভি আবদুল হালিম।

‘এখন জানাজা হবে, সবাই এক কাতার করে দাঁড়ান।’ উপস্থিত সবাইকে কাছে ডাকেন। সরকারি লোকজন, বাড়ির কয়েকজন, টুঙ্গিপাড়া, পাটগাতী ও পাঁচকাহনিয়া গ্রামের সব মিলিয়ে ২০-২৫ জন হবে। আর্মির নির্দেশে পুলিশ বাইরের কাউকেই জানাজায় শরিক হতে দিল না।

শেখ মুজিবের জানাজা। ঝাপসা চোখে মৌলভি শেখ আবদুল হালিম দুই হাত তুললেন সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে।

আরবিতে মোনাজাত ধরে মনে মনে বললেন, ‘হে মহান, যাঁর অস্থি-মজ্জা, চর্বি ও মাংস এই কবরে প্রোথিত। যাঁর আলোতে সারা বিশ্ব, ভারত ও পাকিস্তান, বিশেষ করে বাংলাদেশ আলোকিত হয়েছিল, আমি তাঁর মধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ দেখেছি ক্ষমা, দয়া ও দানশীলতা। নিশ্চয়ই তিনি বিশ্বের উত্পীড়িত ও নিপীড়িতদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেই হেতু অত্যাচারীরা তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে, আমি সর্বশক্তিমান তোমার কাছে তাদের বিচারের প্রার্থনা জানাই, আমিন...’

মিঞাভাইয়ের বজ্রকণ্ঠ শুনে পাকিস্তানি দুশমনরা বাংলার মাটি ছেড়ে পালিয়ে গেছে, সেই দয়ার সাগর এই মানুষটি, ঘরের শত্রু চিনে দমন করতে পারেননি কেন? মৌলভি আবদুল হালিমের দুই চোখ ভেসে যায় অঝোর ধারায়। কিসে থামবে সে জানে না।

ওরা স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। একজন মহাপুরুষকে হত্যা করে কাপুরুষরা কখনোই স্থির থাকতে পারে না, মহাপুরুষের ব্যক্তিত্বের কাছে হাঁটুবুদ্ধি, লোভী ও মূর্খ খুনিরা ও তাদের গডফাদাররা হতবুদ্ধি হয়েই পাড়াগাঁ টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে এসেছে, কোনো রকম মাটিচাপা দিয়ে মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলবে। কিন্তু সত্যকে কোনো দিন দুর্বৃত্ত দিয়ে চাপা দেওয়া যায় না।

স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, জনতার অবিসংবাদিত মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশের, প্রকৃতির প্রতিটি কণায় মিশে আছে, থাকবে যত দিন এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্ব থাকবে। জীবিত না থাকলেও যে তাঁর সম্মান ও সাহস-শক্তি বাঙালির চেতনায় অম্লান থাকবে।

পশ্চিম আকাশে তখন সূর্যটা অনেকটাই হেলে পড়েছে।

থানার পথে হাঁটা ধরে আব্দুর রহমান...