kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

সমাজ ও সাহিত্য সম্পর্কে ফুয়েন্তেসের নিজস্ব ভাবনা

দুলাল আল মনসুর

২৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সমাজ ও সাহিত্য সম্পর্কে ফুয়েন্তেসের নিজস্ব ভাবনা

মেক্সিকোর কথাসাহিত্যিক কার্লোস ফুয়েন্তেসের জন্ম পানামা সিটিতে। বাবা ছিলেন মেক্সিকোর কূটনীতিক। বাবার কর্মসূত্রে ফুয়েন্তেস ছেলেবেলা কাটিয়েছেন লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের রাজধানী শহরে। এই অভিজ্ঞতার সুবাদে তিনি লাতিন আমেরিকাকে একজন বহিরাগতের দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। ১৯৩৪ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত তাঁর বাবার কর্মস্থল ছিল ওয়াশিংটন ডিসির মেক্সিকান দূতাবাস। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অবস্থায়ই তাঁর লেখালেখির শুরু। ১৯৪০ সালে বাবার বদলি উপলক্ষে তাঁদের পরিবার স্থানান্তরিত হয় চিলির সান্তিয়াগোতে। চিলিতে থাকা অবস্থায় প্রথম তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সমাজতন্ত্র। পরে পাবলো নেরুদার কবিতার মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়ে। নিজের দেশ মেক্সিকোতে প্রথম বসবাস করেন ১৬ বছর বয়সে। ফুয়েন্তেস নিজেও কিছুদিন কূটনীতিক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর অভিজ্ঞতায় দেখা চলমান বিশ্ব পরিস্থিতি এবং সাহিত্যজগতের নানা বিষয় নিয়ে ছিল নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। ন্যায় ও স্বচ্ছতার সমর্থক ছিলেন আজীবন। মানুষের স্বাধীনতার স্থান দিয়েছেন সব কিছুর ওপরে। তাঁর দৃঢ় মনোভাব ও স্বচ্ছ দৃষ্টির মাত্র কয়েকটি প্রসঙ্গ এখানে আলোচনায় আনা হলো—

লাতিন আমেরিকান লেখকদের একটি লক্ষণীয় ঐতিহ্য হলো চলমান রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে সচেতন সমালোচনামূলক লেখা প্রকাশ করা। কার্লোস ফুয়েন্তেস এ ধারা যথারীতি বাজায় রেখে সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে লেখার মধ্য দিয়ে মেক্সিকোর একদলীয় সরকারের দীর্ঘ সময়ের দমন-পীড়নের সমালোচনা করেছেন। ফুয়েন্তেসের কাছে রাজনৈতিক নয়, বরং সামাজিক আদর্শ বড় ছিল। তিনি রাজনৈতিক পরিচয়ের লেবাস পরেননি। তিনি ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের জন্য উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। 

এফবিআই দীর্ঘদিন মনে করেছে, ফুয়েন্তেস কমিউনিস্ট লেখক এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে নাশকতামূলক পরিকল্পনার সঙ্গে তাঁর যোগ আছে। তাঁকে ১৯৬০-এর দশক থেকেই এফবিআই নজরে রাখা শুরু করে। বেশ কয়েক দশক তাঁকে অনুসরণ করতে থাকে গুপ্তচরের দৃষ্টি, বিশেষ করে তাঁর আমেরিকায় অবস্থানের কালে। বেশ কয়েকবার তাঁর ভিসার আবেদনে সম্মতি দিতে বিলম্ব করা হয়েছে কিংবা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ফুয়েন্তেস কমিউনিস্ট ছিলেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তাঁর জীবনীকার ও সহকর্মী হুলিও ওর্তেগা জানান, ‘মোটেই না। তিনি কমিউনিজমের সমালোচক ছিলেন। তিনি মিলান কুন্ডেরার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সমর্থক ছিলেন। কমিউনিস্ট চেকোস্লোভাকিয়ায় মিলান কুন্ডেরার দুঃসময়ে তাঁর লেখা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এ কথা সত্যি, ফুয়েন্তেস কিউবার বিপ্লব এবং নিকারাগুয়ার সান্ডিনিস্টাস বিপ্লব সমর্থন করেন। তবে সমর্থন করার কারণ হলো, দুটিরই শিকড় ছিল লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের বাঞ্ছনীয় ইচ্ছা এবং মুক্তির আদর্শের ভেতরে।’ ১৯৬৩ সালে নিউ ইয়র্কের এক বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করেন তিনি। কিন্তু তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, ‘আসল বোমা আমি নই, আসল বোমা আমার বই।’

সাহিত্য সম্পর্কেও রয়েছে ফুয়েন্তেসের নিজস্ব স্বচ্ছ দৃষ্টি। তাঁর প্রজন্মের লাতিন আমেরিকার লেখক ও তাঁদের লেখার প্রভাব সম্পর্কে ফুয়েন্তেসের মতামত হলো, তাঁদের প্রজন্ম একটা ব্যতিক্রমী প্রজন্ম। মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল আস্তুরিয়াস, আলেহো কার্পেন্তিয়ের, হুলিও কোর্তাসার, হোসে দোনোসো, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, হুয়ান রুলফো, মারিও বার্গাস য়োসা এবং ফুয়েন্তেস নিজে এই প্রজন্মের অন্যতম প্রতিনিধি। তাঁর বোঝার বয়স থেকে সেখানে দেখেছেন কার্পেন্তিয়েরের মতো বর্ষীয়ানকে, আবার নবীন মার্কেসকেও। অন্য দিক থেকে ব্যাখ্যা করে বলেন, এটা আসলে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রজন্মই নয়। তিনি মনে করেন, লাতিন সাহিত্যে একটা বিশেষ সময়ে অনেক কাকতালীয় বিষয় ঘটে গেছে। কারণ ওই সময়ে অতীতের কণ্ঠস্বর বারবার ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। অগ্রজ লেখকদের থেকে শুরু করে তাঁর সময়ের লেখকদের মধ্য দিয়ে একটা বিশাল বৃত্তের সূচনা হয়েছে। বৃত্তের পূর্ণতা পেতে আরো কিছুটা সময় লাগবে। বোর্হেস থেকে শুরু হয়েছে বৃত্ত। ফুয়েন্তেস মনে করেন, বোর্হেস ও হুয়ান কার্লোস ওনেত্তির বৃত্তরেখা এগিয়ে নিয়ে যান হুয়ান কার্লোস পাজ, কোর্তাসার প্রমুখ। বৃত্তের পরিপূর্ণতা আসেনি বলেই ফুয়েন্তেসের বিশ্বাস। লাতিন সাহিত্যের বিস্ফোরণ বলে কিছু নেই মনে করেন ফুয়েন্তেস। এসব প্রচার বই বিক্রেতাদের ও নগণ্যসংখ্যক লেখকের। আর তাঁদের সাহিত্য তো হঠাৎ করে শুরু হয়নি। দীর্ঘ পথচলার পরই তাঁর সময়ের বা তাঁর অগ্রজদের সময়ের উত্কৃষ্ট লেখা মানুষের চোখে পড়েছে।

লাতিন আমেরিকার উপন্যাসের ঐক্য সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে গার্সিয়া মার্কেসের মন্তব্য উল্লেখ করে ফুয়েন্তেস বলেন, লাতিন আমেরিকায় একটি উপন্যাসই লেখা হয়েছে। তার এক অধ্যায় লিখেছেন আর্জেন্টিনা থেকে কোর্তাসার, আরেক অধ্যায় কিউবা থেকে লিখেছেন কার্পেন্তিয়ের, আরেক অধ্যায় পেরু থেকে লিখেছেন য়োসা এবং অন্যান্য দেশ থেকে আরো কয়েকজন। ভিন্ন ভিন্ন লেখক বিশাল এক উপন্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ লিখেছেন। শত শত হাজার হাজার পৃষ্ঠার এই উপন্যাস পড়তে হবে একক উপন্যাস হিসেবে।

নিজের লেখা থেকে পাওয়া সন্তুষ্টি সম্পর্কে ফুয়েন্তেসের মন্তব্য হলো, তাঁর কোনো লেখা থেকেই সন্তুষ্টি পাননি তিনি। তার প্রধান কারণ হলো, অবচেতনেই তিনি চান তাঁর লেখা অসম্পূর্ণ হোক। অসম্পূর্ণ হলে পরবর্তী সময়ে তাঁর ঝুঁকি নেওয়ার পরিধি বাড়বে বলেই তাঁর বিশ্বাস। তাঁর দৃষ্টিতে ঝুঁকির উপাদান সাহিত্যের জন্য মৌলিক বিষয়। লেখক হিসেবে নতুন নতুন ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন এ রকম অসম্পূর্ণ লেখার মধ্য দিয়ে। এমনই অনন্য ছিল ফুয়েন্তেসের দৃষ্টিভঙ্গি।