kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

যুগল হ্রদের পারে সারেঙ্গির সংলাপ

মঈনুস সুলতান

২৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



যুগল হ্রদের পারে সারেঙ্গির সংলাপ

বেগনাসতাল হ্রদের পর্যটকি নৌকা

পাহাড় এখানে তেমন উঁচু নয়, গাছপালার সংখ্যাও কম। গাইড বোম বাহাদুর আমার তাঁবু ও বেডরোলের বান্ডেল নিয়ে লাঠি হড়কিয়ে অবলীলায় ওপরে উঠছেন। মাঝে মাঝে তিনি দাঁতে খৈনি গুঁজে থু থু করে ঝোপঝাড়ে পিক ফেলেন।

ঘণ্টা দেড়েক আগে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে বেগনাসের বাজারে। নেপালি টুপি পরা এই আধবুড়ো খুব শুকনা মুখে চায়ের দোকানে বসে ছিলেন। তাঁকে চিড়া-গুড়-দধি ও এক পেয়ালা চা খাওয়াতে কথাবার্তায় বাতচিতে তিনি ফরফরিয়ে ওঠেন। তাঁর কুর্তার পকেটে আছে তন্ত্রমন্ত্রের নকশা করা বেশ কিছু কাগজপত্র। তা ঘেঁটে নিশ্চিতভাবে জানান যে সঠিক জায়গায় তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটাতে পারলে চাঁদের আলোয় হিমালয়ের গিরিশৃঙ্গ মনাসলু অতি অবশ্যই দেখা যাবে। চাঁদ উঠবে বেশ রাত করে, তার খানিক আগে তারাভরা রাত প্রতিফলিত হবে মনাসলুর ধবল তুষারে; সে আলোয় দু-দুটি গ্রহকে শনাক্ত করাও কঠিন কিছু হবে না।

আমি এই মুহূর্তে ভারি সংকটের ভেতর নেপালের পোখরা এলাকায় দিন যাপন করছি, আরো সপ্তাহখানেক এ অঞ্চলে থেকে যাব কি? নাকি দিল্লি এসে কোনো ট্যুর কম্পানির হিল্লা ধরে উড়ে যাব লাদাখের দিকে? ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। এদিককার ফুটহিলসে প্রসারিত উপত্যকায় ট্রেকিং কিছু করতে হলে গ্রীষ্ম অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই কিন্তু উদ্যোগ নিতে হয়।

বোম বাহাদুর মানুষ হিসেবে বেশ ইন্টারেস্টিং। খুব অল্প সময়ের পরিচয়ে চাখানায় দোসরা পেয়ালা চা খেতে খেতে কিভাবে যেন তাঁর সঙ্গে বিবিধ বিষয়ে আলাপ হয়ে গেল। তিনি কুর্তার পকেট থেকে আরেক প্রস্থ তান্ত্রিক নকশাদি বের করে আমাকে দেখান। তারকামণ্ডলের আশপাশেই আছে জোড়া গ্রহের স্বর্গীয় জুটি। বাতচিতে মনে হলো, এদের প্রতিফলন একত্রে দেখা চাই। স্বর্গের যুগল-জ্যোতির সাক্ষাৎ দর্শনে বলা তো যায় না, ছুটলে—ছুটেও যেতে পারে আমার সংকটের জট।

বোম বাহাদুরের বক্তব্য, গ্রহযুগলকে দর্শন করতে হলে পাহাড়ের ওপরে ওঠা চাই। তাঁবু খাটানো চাই সঠিক জায়গায়। এ মুহূর্তে আমি তাঁর তাবৎ প্রস্তাবে রাজি আছি, বুঝতে পেরে হাতের তালুতে চাটি মেরে বোম বাহাদুর খৈনির চুন মিশ্রিত গুঁড়া ঝোপঝাড়ের দিকে উড়িয়ে দেন। তারপর জোড়হাতে অদৃশ্য দেবতাকে প্রণাম করে খাড়াই ভেঙে হনহনিয়ে উঠে যান পাহাড়ের বেশ খানিক ওপরে। তিনি পাহাড়ের রিজের দিকে কদম ফেলতে ফেলতে খানিক হিন্দি ও খানিক ইংরেজিতে পোখরা অঞ্চলের বিস্তারিত বাখানি পেশ করেন। নেপালের এ আতরাফে বরফগলা জলে সৃষ্টি হয়েছে মোট আটটি বিরাট পুকুর বা সরোবরের। পোখরা নামের উৎপত্তিতেও আছে পুকুরের প্রসঙ্গ। বোম বাহাদুর আমাকে সব সরোবর ঘুরেফিরে দেখানোর প্রস্তাব এরই মধ্যে দিয়েছেন। আপাতত আমরা পয়দলে চলছি বেগনাসতাল ও রূপাতাল নামে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত যুগল সরোবরের সন্ধানে।

পাহাড়ের রিজে উঠে একটু থিতু হতেই বোম বাহাদুর ঘাসে শতরঞ্জির আসন বিছিয়ে দেন। তাতে আরাম করে বসে আমি হ্রদ দুটির দিকে তাকাই। বোম বাহাদুর ফ্লাস্ক থেকে মাখন মেশানো লবণ-চা ঢালেন। এই স্পটের একটি বিশেষত্ব হচ্ছে, শুধু এখানকার বিশেষ অ্যাঙ্গেল থেকে দুটি লেককে একত্রে চাক্ষুষ করা যায়। আমরা এ মুহূর্তে পোখরা শহরের হৈ-হট্টগোল, হরেক কিসিমের হাসোল-বাসোল থেকে পনেরো কিলোমিটার দূরে আছি। মোটর চলাচলের রাজপথ থেকে সরে এসে বনানীর অন্দরমহলে আসন গেড়েছি, তাই এ স্থানের নির্জনতা অসাধারণ। আমাদের চোখের সামনে যুগল হ্রদ যেন স্বর্গীয় কোনো মরালের দুটি রুপালি ডানার মতো রোদে ঝলসাচ্ছে। বেগনাস হ্রদে প্রতিফলিত হচ্ছে আকাশ এবং তার প্রেক্ষাপটে হিমালয়ের দৌলাগিরির তুষারঢাকা শৃঙ্গের খানিকটা। খানিক দূরে রূপাতাল জলজ গুল্মে আচ্ছন্ন হয়ে নীল আকাশের নিচে ছড়াচ্ছে কালচে সবুজ দীপ্তি।

বেগনাসতালের বালুকাময় তীরে খানকয়েক লাল, নীল, হলুদ বর্ণের পর্যটকি নৌকা। আমরা তাতে চাপলে বোম বাহাদুর রূপাতাল দিয়ে যাত্রার বউনি করতে চান। রূপাতাল এ মুহূর্তে প্রাকৃতিকভাবে নির্জন হয়ে আছে। পর্যটকরা এখানে তেমন একটা আসে না। আমরা কিছুক্ষণ জলজ গুল্ম ছুঁয়ে ভেসে যাই। আসমানি রঙের পদ্ম বেলা শেষে কোরক গুটিয়ে ম্রিয়মাণ হয়ে আসছে। খানিক দূরে পরিচ্ছন্ন জলে ভাসছে শুভ্র সব মরাল। বোম বাহাদুর পাতায় মুড়ে নিয়ে এসেছেন পিঁপড়ার ডিম, পদ্মকলি ও যবের ভূষির মণ্ড। নাও কাছাকাছি হলে হাঁসগুলো উড়ে যাবে। তাই তিনি অদৃশ্য কাকে যেন প্রণাম করে আধার ভাসিয়ে দেন জলে। আমরা বৈঠা বেয়ে খানিক দূরে গিয়ে অপেক্ষা করি। ফিসফিসিয়ে তিনি জানান, সরস্বতীর বাহন এই শ্বেতশুভ্র মরাল আধারে চঞ্চু ছোঁয়ালে মনাসলুর তুষারশৃঙ্গে নিশ্চিত হবে গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতিফলন।

হাঁসদের নির্জনতা দেওয়ার জন্য আমরা অতঃপর ফিরে আসি বেগনাসতাল হ্রদে। তুষারে ঢাকা গিরিশৃঙ্গের প্রতিবিম্ব কেটে কেটে নাও ভাসাই। রূপাতাল থেকে চয়ন করে নিয়ে এসেছেন বেশ কিছু জলজ গুল্ম, বোম বাহাদুর তা দিয়ে বোঁচকা বাঁধেন।

আমরা উঠে আসি হ্রদের তীরে কাঠের মাচায় খোলামেলা একটি চায়ের দোকানে। এদিককার পাহাড়ি পল্লীতে গন্ধর্ব সম্প্রদায়ের বাস। শুনেছি এই গোত্রের নারীরা নৃত্যপটীয়সী, পুরুষরাও গান-বাজনা করে পেশা হিসেবে। আমি এদের সঙ্গে কথা বলতে চাই, তো আমাকে চায়ের দোকানে বসিয়ে বোম বাহাদুর গ্রামে যান একজন গন্ধর্ব গায়ক ধরে আনতে।

খুঁটিতে হেলান দিয়ে হ্রদের মৃদু হাওয়ায় কম্বলের কুশনে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গান-বাজনার লোকজন নিয়ে বোম বাহাদুরের গন্ধর্ব পল্লী থেকে ফিরে আসতে আসতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হওয়ার উপক্রম। জনা দুই মাঝি, একজন গণক ও ভেটের খই বিক্রেতাও এসেছেন বাদ্য-বাজনায় শরিক হতে। এসব কাজে দুই ফোঁটা রক্সিতে গলা না ভেজালে আসর ঠিক জমে না। তো আমি একটি বোতলের দাম দিই, সঙ্গে সঙ্গে বোম বাহাদুর দক্ষ হাতে চরসের কল্কি সাজান। ঠিক তখনই নাতনির কাঁধে ভর দিয়ে থুড়থুড়িয়ে এসে উপস্থিত হন গন্ধর্ব পল্লীর মোড়ল। সবাই নত হয়ে তাঁকে প্রণাম করেন। বুঝতে পারি, পাড়াগাঁর গান-বাজনায় তিনি গুরুমশাইয়ের গরিমায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁর সঙ্গে এসেছে দারুণভাবে সাজগোজ করা এক কিশোরী নাতনি, বছর কয়েক আগে মেয়েটি নাকি কুমারীপূজায় প্রতিমা সেজেছিল। যতটা না রূপ তার চেয়ে ঢের বেশি বালিকাটির শরীরে গিল্টি করা অলংকারের বাহার। শ্রোতারা তার দিকে ফিরে ফিরে তাকায়, তাতে সে লজ্জায় যেন কুঁকড়ে যেতে থাকে।

জানতে পারি, জিন্দেগিভর গাঁয়ের সবাইকে গান-বাজনার তালিম দিলেও গাঁওবুড়ো আজকাল আর গাইতে পারেন না। গেল তেরো-চৌদ্দ মাস হলো তাঁর কাশির সঙ্গে গলা দিয়ে রক্ত উঠছে। তাই নাতনি তাঁর সামনে উগলদানি রাখে। কিছুদিন আগেও তিনি কণ্ঠের ব্যবহার না করে সারেঙ্গি বাজিয়ে শোনাতেন। মাস তিনেক হয়—তাও আর বাজাতে পারছেন না, তাঁর আঙুলের ডগা পেকে গিয়ে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে বিষ। গাঁয়ের তরুণ গাইয়ে-বাজিয়েরা পোখরা শহরে গেছে পর্যটকদের মনোরঞ্জন করে দুই পয়সা কামাই করতে। সংগীতে কেউ স্মরণ করলে গন্ধর্বদের আচার-বিচারে না বলার উপায় নেই, তাই তিনি নিজে ছুটে এসেছেন। দেবতার ইচ্ছা নয়—তিনি গলা খোলেন বা তারের বাজনা বাজান। তবে তিনি একটি সারেঙ্গি নিয়ে এসেছেন।

খিরোগাছের কাঠে তৈরি এই বাদ্যযন্ত্রের চার-চারটি তার মেষের অন্ত্রের শিরা দিয়ে তৈরি। যন্তরটির ছড়ে আছে ঘোড়ার লেজের চুল। হালফিল জীবনযাপন বদলে গেলেও তিনি এখনো তাঁর যন্ত্রে নাইলনের তার ব্যবহার করেননি। বুড়ো মৃদু কেশে খুব নরম জবানে বলেন, সারেঙ্গি শব্দটি এসেছে ‘শ’রঙি’ থেকে। দেবতার কৃপা হলে এ বাজনায় ছড়াতে পারে মানবমনের হরেক রঙের বিভা। তিনি আজ বাজাতে পারবেন না বটে; তবে অসুবিধা কী, তাঁর ইশারায় নাতনি বাজিয়ে শোনাবে। মৃত্যুর আগে এ দক্ষতা নাতনিকে দিয়ে যেতে চান।

গাঁওবুড়ো রক্সিতে একটুখানি ঠোঁট ভিজিয়ে পুরা মগটি দেন কিশোরী নাতনির হাতে। মেয়েটি তা পান করে কিছুক্ষণ হ্রদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তিনি চরসের কল্কে কপালে ঠেকিয়ে ভুরু কাঁপিয়ে ইশারা করেন। তো বালিকা চোখ মুদে আলতো হাতে বোল তোলে। সে ‘গহিন গীত’ বলে পরিচিত একটি গৎ বাজায়, সমগ্র প্রতিবেশ তাতে ছেয়ে যায় সুরজালে। বৃদ্ধ হাত ও ভুরুর ইশারায়, আবার কখনো মুখের অভিব্যক্তিতে মেয়েটিকে বাদনের গতিপথ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। সে তা অনুসরণ করে সারেঙ্গিতে সৃষ্টি করে চলেছে ধ্বনি তরঙ্গ। কান পেতে শুনতে শুনতে মনে হয়, ক্রোঞ্চ মিথুনের পাখসাটে আলোড়িত হচ্ছে হ্রদের জল। বাজাতে বাজাতে দু-গুছি কোঁকড়া চুল নেমে এসে ঢেকে দেয় তার আধবোজা চোখ।

সারেঙ্গির বাজনা শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে বসেছিলাম, কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে ঠিক বুঝতে পারিনি। দূরে পঞ্চভাইয়া পাহাড়ের ওপর দিয়ে শেষ হয়ে আসা গোধূলির আলোয় রাঙা হয়ে উঁকি দিচ্ছে মনাসলুর তুষার ধবল চূড়া, আর তাতে প্রতিফলিত হচ্ছে সন্ধ্যাতারার সোনালি আলো।