kalerkantho

সোমবার । ৫ আশ্বিন ১৪২৮। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১২ সফর ১৪৪৩

মুখ ও মুখোশ

হাসনাত মোবারক   

১৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মুখ ও মুখোশ

অঙ্কন : মাসুম

বুড়ি আমার মামাতো বোন। বয়স পাঁচ বছর। আসল নাম রিমা। পাকা পাকা কথা বলে, এ জন্য নাম দিয়েছে বুড়ি। বুড়ি অন্যদের সঙ্গে বুড়ির মতো কথা বললেও আমার সামনে আসতে ও নাকি লজ্জা পায়। ওর কথা শোনার আমার খুব আগ্রহ। কিন্তু সে কিছুতেই আমার সামনে মুখ থেকে টুঁ-শব্দটি করে না। সে যা হোক। টানা ৬৭ দিন বাড়িতে ছিলাম। কোথাও যাইনি। করোনা ম্যানিয়ায় ঘোরগ্রস্ত ছিলাম অন্যদের চেয়ে বেশি। এ জন্য একটা মাত্র টি-শার্ট নিয়ে বাড়িতে এসেছিলাম। এটা নিয়ে মা খুব বিরক্ত ছিল। একটা কাপড় কেন নিয়ে এসেছি। শোকেসের পুরনো শার্ট আর পাঞ্জাবি দিয়ে দীর্ঘ সময় পার করছি। সেদিন হঠাৎ কর্মস্থল থেকে তলব। আগামীকালই অফিসে যোগদান করতে হবে। জরুরি তলবে হুড়মুড় করে বাড়ি থেকে ঢাকায় চলে যাই। ঢাকা টু সিরাজগঞ্জ। সিরাজগঞ্জ টু ঢাকা। বেশি দূরের পথ নয়। এতটুকু পথ পানি-পান্তা ঢাকার জ্যাম-যাতনার কাছে। স্বাভাবিক দিন থাকতে ঢাকার মিরপুর থেকে সদরঘাট যেতে সময়টুকু লাগে। এর চেয়ে কম সময় লাগে ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ পৌঁছতে। দিনে দুইবার ঘুরে আসা যায়। এবার আমার ঢাকা পৌঁছানোর পরের দিন বুড়ি ওর আপাকে বলেছে—রঞ্জু ভাই কই? দেখতেছি না যে। তোমার কাছে এসে সব সময় বসে থাকে। আজ এখনো আসে নাই। বুড়ির মুখে অমন কথা শুনে আপা লজ্জায় মরি মরি। সেসব কথা বুড়ির আপা আমাকে ফোনে জানাইছে।

ওরে আমার পাঁচ বছর বয়সের বুড়ি। কেউই তো অমন করে খোঁজ নিয়েছে কি না জানি না। বুড়ি এ-ও বলেছে, রঞ্জু ভাই ঢাকায় গেল। কী পরে গেছে? বুড়ির শিশুমানসের এমন সন্দিহান! ওর দিব্যিমূল ধারণা, নতুন জায়গায় যেতে হলে তো নতুন পোশাক পরেই যেতে হবে। সেই সেন্স থেকে বলেছে, ভাই ঢাকায় গিয়েছে কী পরে।

—তাই তো বুড়ি সোনা। তুমি আমার সঙ্গে যে কথাই বলো না, খুব শুনতে ইচ্ছা করে তোমার পটর পটর করে বলা কথা।

যা হোক, আজকে ঢাকা থেকে ফেরার সময় ব্যাগে সব কাপড় তো ধরবে না, কিছু কাপড় বুড়িকে দেখানোর জন্য নিয়ে আসব। এমন ভাবনাটা তো ছিল। কাপড়চোপড় তুলতে হঠাৎ শখের বাঁশিটা নজরে এলো। বুড়িকে দেখানোর জন্য। তার ভাইয়ের তোলা বাঁশির সুরে সব রাঁধাচূড়া ঘরের বাহির হবে। সিরাজগঞ্জ রোডে গাড়ি যাত্রাবিরতি দিয়েছে। মনের ভেতরে আতঙ্ক। তবু গাড়ি থেকে নেমে এদিক-সেদিক পায়চারি করছি। নিজের সুরক্ষা যতটুকু সম্ভব বজায় রাখছি। সেটা শুরু থেকেই। আজকে দেখি রোডে গাড়িও কম। যাত্রীও কম। গাড়িপ্রতি দু-একজন যাত্রী। যাত্রীরা নেমে নিজ অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ খাওয়াদাওয়া বা কেনাকাটায় ব্যস্ত নেই। বিরতির ৩০ মিনিট পার হওয়ার প্রহর গুনছে। সিরাজগঞ্জ গোলচত্বরের পরিবেশটা অনেক সুন্দর। সারা বাংলাদেশের কোথাও গাড়ির বিরতির জন্য এমন সুন্দর পরিবেশ নেই। সিরাজগঞ্জ আমার জন্ম জেলা বলে বলছি না। গভীর রাতে যাঁরা গাড়ির যাত্রাবিরতির জন্য ফুড ভিলেজের সামনে নেমেছেন, তাঁরা অবশ্যই বাগানবিলাসের ওই ঘন ডালে হাজার হাজার লক্ষাধিক চড়ুই পাখির খুনসুটি দেখেছেন। এক অপূর্ব মোহনীয় দৃশ্য।

আজকে যখন ফুড ভিলেজে যাত্রাবিরতি, তখন বিকেল ৫টা পার হয়েছে। চড়ুই পাখি দেখা মিস। ওরে নারে। এরই মধ্যে দেখি একটা সারস পাখি। সামনে দিয়ে পায়চারি করছে। সুস্বাস্থ্য, পোশাকে তার পরিপাটি। বয়স বোঝা মুশকিল। সে করোনার আতঙ্কে ব্যক্তিগত যত প্রটেকশন সব লাগিয়ে রেখেছে। ওহ মাইরি! কেউ আমার এদিকে এগিয়ে আসছে। এমনটা খেয়াল করার সঙ্গে সঙ্গে আমি দূরে চলে যাই। আমার ব্যাগের সরু পকেটে গুঁজে রাখা বাঁশের বাঁশিটি হাতে রেখেছি। কোথাও পড়ে যেতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকে বাঁশিটি হাতে নিয়েছি। ওদিকে ওই মেয়েটি আমাকে ফলো করছে। আমি যেদিকেই যাই মেয়েটির নজর আমার দিকে।

কেন যেন মনে হলো, সে আমাকে হয়তো চেনে। পরিচিত, কী আধাপরিচিত! বা আমার হাতে বাঁশি। এমন আর্টিস্টিক মেয়ে বঙ্গদেশে দু-চারজন আছে। আমি অস্বীকার করছি না। এই মেয়েও যে সেই উদারচিত্তের কেউ একজন হবে। এমন ভাবনা থেকে নয়; বরং মেয়েটি আমার পরিচিত বা আমিই তার পরিচিত এমন ভাবনা নিয়েই আমি অগ্রসর হলাম। হ্যাঁ, আমি তার সঙ্গে কথা বলতে চাই। চতুর মেয়েটি বুঝতে পেরে আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম। আপনি কী আমাকে কিছু বলতে চান?

মেয়েটির নামধাম, কোথা থেকে এসেছে বা কোথায় যাচ্ছে—এমন সব জিজ্ঞেস করিনি। এর আগেই মেয়েটি বলছে হ্যাঁ। আপনার বাঁশিটির জন্য আপনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বাঁশিটি আমার খুব দরকার। আমি বললাম, বাঁশিটি তো আমি শখের বশে নিয়ে এসেছি। আমার পাঁচ বছর বয়সী মামাতো বোন বুড়িকে দেখানোর জন্য। আমার কথা শেষ হতেই মেয়েটির মুখভঙ্গি যে কেমন হয়েছিল—সেটা দেখা থেকে বঞ্চিত হলাম। যদি না সে চোখে-মুখে মুখোশ না পরত। আই রিয়েলি। তবে আমি অনুমান করেছি সেই সুন্দরীতমার মুখাবয়ব।

নীরবতা ভেঙে মেয়েটি আমাকে বলল, ভাই শোনেন, আমার পিঠ চুলকানোর অসুখ আছে। আপনার হাতের বাঁশিটি পেলে আমার পিঠটা চুলকাতে পারতাম। আমি তৎক্ষণাৎ থ মেরে যাইনি। বারো দোকানের চাল-ডাল খেয়ে বড় হয়েছি। বুঝলাম, মেয়েটিকে বাঁশিটি না দেওয়ায় বা আমি তাকে গুরুত্ব না দেওয়ায়, সে বাঁশি দিয়ে পিঠ চুলকানোর অজুহাত জানাল। অর্থাৎ আমার মাইন্ডে লেগেছে। আমিও তাকে বললাম, দিদি এই যে, পোড়া বাঁশের বাঁশি। এই বাঁশির সুরে রাঁধাচূড়াদের রাতের ঘুম হারাম করার জন্য এর জন্ম। কারোর পিঠ চুলকানোর জন্য নয়। এর মধ্যেই আমার গাড়ির যাত্রাবিরতির শেষ হুইসল বেজে উঠল। কৃত্রিম ওই হুইসল অবশ্য কর্কশই ছিল।