kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

খোজা

বিশ্বজিৎ চৌধুরী   

১৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



খোজা

অঙ্কন : মাসুম

শোনা যায় দ্রুত আগুয়ান অশ্বক্ষুরধ্বনি। রাজপথ ধূলিধূসর করে ছুটে আসছে এক প্রবল অশ্বারোহী। নিকটতর হলে একটা হাওয়ার ঝাপটা যেন লাগে হাট-বাজারে সদাই করতে আসা মানুষের গায়ে। দ্রুত সরে গিয়ে পথ অবাধ করে রাখে তারা। হাওয়ায় একটা ঢেউ উঠে আবার মিলিয়ে যায় মুহূর্তে। তাতে একনজর দেখার সুযোগ পাওয়া গেল অশ্বারোহীকে। এক কন্দর্পকান্তি তরুণ, কিশোরও বলা যেতে পারে। সবে গোঁফ গজিয়েছে, ঝাঁকড়া মাথার চুল, সুঠিত দেহ আর নীল দুটি চোখে তীক্ষ দৃষ্টি।

কে এই অশ্বারোহী? শাহজাদা? সম্রাট শাহজাহানের কোন বেগমের পুত্র? ‘শাহজাদা না ছাই’—মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল এক বৃদ্ধের মুখ থেকে। কিন্তু মুহূর্তেই চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিজের কথাটি গিলে ফেলল। সাধারণ মানুষের ভিড়ে সম্রাটের গুপ্তচরও মিশে আছে, কোন কথা কোথায় গিয়ে পৌঁছায় তার ঠিক নেই, মুখের একটি কথার জন্য হয়তো গলায় পোঁচ পড়বে। শাহজাদা হোক বা না হোক, রাজকর্মচারী তো নিশ্চয়, নইলে ঘোড়সওয়ারের ডান হাতে কেন উড্ডীন দরবারি-নিশান? যারা জানে না, তারা তো জানেই না, যারা জানে তারা মুখ টিপে হাসে। সেই হাসিতে একটু বিদ্রূপও থাকে। এই কিশোরের নাম দুলেরা। রাজকর্মচারী নয়, শাহজাদী জাহানারার প্রাসাদের খোজা প্রহরী। আরে বাবা, শাহজাদীর নেক নজরে আছিস ভালো কথা, তোকে তাঞ্জাম আর নিশান ব্যবহারের অনুমতিও দিয়েছেন, তাই বলে নিশান উড়িয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে রাজ্যের মানুষের মাথার ওপর দিয়ে ছুটে চলতে হবে তোর? শাহজাদীর মতিগতিরই বা কী ঠিক আছে, আজ হাওয়ায় উড়ছে, কাল ধুলায় গড়াবে না কে বলতে পারে? আরে বাপ, অন্তঃপুরে যতই অবাধ চলাফেরা করো না কেন, খোজাই তো তুমি, তোমার তো ওইটা নাই, হা হা হা। এসব কথা বুঝদার মানুষের মনের ভেতর গুড়গুড় করে, গোপনে দু-একজনকে জানায়ও বটে; কিন্তু প্রকাশ্যে মুখে কুলুপ!

রাজপ্রাসাদে নয়, দুলেরার ঘোড়া থামে শাহজাদীর প্রাসাদ প্রাঙ্গণে। শাহজাদী তাঁর খাসকামরার ঝরোকা থেকে দেখলেন, দুলেরা নামছে ঘোড়া থেকে। তাঁকে দেখতে পাচ্ছে না সে, তিনিই তাকালেন সতৃষ্ণ নয়নে। একটা বেপরোয়া হাওয়া এসে লাগে; গবাক্ষে, না বুকের ঝরোকায় কে জানে!

আর জোহরা বাঈয়ের চোখ জুড়িয়ে যায় নিজের সন্তানের দিকে তাকালে, কত স্বপ্ন ও শঙ্কা ভিড় করে সেখানে। কিন্তু নিজের মহলে বসে দুশ্চিন্তায় ভোগেন রাজ্যের প্রধান হেকিম নূর মোহাম্মদ খাঁ। রাতে স্বপ্ন দেখবেন কী, ঘুমের দাওয়াই সেবন করেও নিদ্রাই ধরা দেয় না তাঁর দুই চোখের পাতায়।

সম্রাট বললেন, ‘কী ব্যাপার মহব্বত খাঁ, আপনাকে বড় বেখেয়াল মনে হচ্ছে। তবিয়ত ঠিক আছে তো? আপনার তাঞ্জামেও নাকি নিশান ছিল না আজ?’

‘আপনার দোয়ায় তবিয়ত বিলকুল সহি আছে জাহাঁপনা,’ বিনীত স্বরে এবার নিজের অভিযোগ জানালেন শাহজাহানের অমাত্য, ‘কিন্তু দিলটা একটু বেজার।’

‘কেন, কেন? সম্রাটের খাস-আদমির দিল বেজার হলে সম্রাটের দিল তো নাখোশ হয়ে যায় মহব্বত খাঁ... কী সমস্যা খুলে বলুন।’

এই খাতিরটুকু প্রত্যাশা করেছিলেন মহব্বত, এবার খোলাখুলি নিজের বিরক্তির কথা প্রকাশ করলেন, ‘যদি সামান্য এক নর্তকীর ছেলেও নিশান উড়িয়ে ঘোড়া ছোটায় জাহাঁপনা, মোগল বাদশাহর নিশানের ইজ্জত আর কোথায়?’

জাহানারা! সম্রাট শাহজাহানের এই কন্যাটি বিদ্যায়-বুদ্ধিতে যেমন অসামান্যা, তেমনি অপূর্ব তার খুবসুরতি। কিন্তু প্রগলভা। শাহজাদীর জন্য দুটি যুবকের জীবনের চেরাগ নিভিয়ে দিয়েছেন বাদশাহ। প্রথমবার খোজা গুপ্তচরের কাছে শুনেছিলেন, শাহজাদীর সঙ্গে গোপনে দেখা করতে আসে এক যুবক। তার পরিচয় উদঘাটনেরও প্রয়োজন পড়েনি, রাগে উন্মত্ত বাদশাহ গিয়ে হাজির হয়েছিলেন শাহজাদীর প্রাসাদে। হামামের একটি বড় ডেকচিতে প্রেমিককে লুকিয়ে রেখেছিলেন শাহজাদী। ক্রোধোন্মত্ত বাদশাহ মুখের হাসি অবিকৃত রেখে শাহজাদীর গোসলের জন্য সেই ডেকচিতেই পানি গরম করতে বলেছিলেন। বেচারা, বাদশাহকন্যার অজ্ঞাতকুলশীল প্রেমিক, দুর্বাসনার মূল্য পরিশোধ করে গেল প্রেমিকার চোখের সামনেই। ফুটন্ত পানিতে সিদ্ধ হয়ে গেল একজন জলজ্যান্ত মানুষ।

খুব কী আফসোস হয়েছিল বাদশাহজাদীর? পিতার ওপর ক্ষোভ-অভিমান হয়তো হয়েছিল; কিন্তু ভেঙে যে পড়েননি তার বড় প্রমাণ তো পাওয়া গেল অল্প দিন পরই। শাহি রক্ত যাঁদের শরীরে, পুরুষ হোক বা নারীই, এত সহজে ভেঙে পড়লে তাঁদের চলে না, ঘুরে দাঁড়াতে হয়, নিজের হিস্যাটা বুঝে নিতে হয় নিজেকেই। এবার প্রেমে পড়েছেন সম্ভ্রান্ত সুদর্শন এক তরুণের। নজর খাঁ, খানদানি বংশের সন্তান। জাহানারা আশা করেছিলেন বাদশাহ হয়তো শাহজাদীর শাদির জন্য উপযুক্ত পাত্র হিসেবেই বিবেচনা করবেন নজর খাঁকে। নিজেই তিনি আব্বাজানের সঙ্গে পরিচয় করিয়েও দিয়েছিলেন। বাদশাহ জানেন, বয়ঃপ্রাপ্ত, তদুপরি রূপে-গুণে উপযুক্ত কুমারীর প্রেমাকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক, তা সে শাহজাদী হোক বা ঘুটেকুড়ানি। কিন্তু তিনি ক্ষমতাবান শাহেনশাহ, অসহায় পিতা। প্রজ্ঞাবান পূর্বপুরুষ আকবরের সুচিন্তিত উপদেশ তিনি বিস্মৃত হতে পারেন না। রাজকন্যাদের বিয়ে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাতে সিংহাসনের উত্তরাধিকারের দাবি বিস্তৃত হতে পারে শাখা-প্রশাখায়। আলাপ-পরিচয়ের পর বাদশাহ নিজের হাতে একটা পান তুলে দিয়েছিলেন আমিরপুত্রের হাতে। রাজকীয় সৌজন্যে মুগ্ধ বিগলিত নজর খাঁ সুবাসিত পানটি মুখে পুরে নিজের তাঞ্জামে চড়ে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু পথ ফুরোবার আগেই জীবন ফুরিয়ে গিয়েছিল শাহজাদীর প্রেমিকের। মনে পড়লে এখনো রাগে-ক্ষোভে শরীর জ্বলে ওঠে জাহানারার। তখন নিজের হামামে যমুনা নদী থেকে আনা নীল পানিতে ভেসে ডুবে শরীরের জ্বালা জুড়ান জাহানারা।

মহব্বত খাঁর দিকে নির্বাক তাকিয়ে আছেন সম্রাট। মনের ভেতর অজস্র ভাবনার তোলপাড়। জাহানারা কি আরো একবার বাঁধা পড়ল প্রণয়ানুরাগে! কিন্তু দুর্ভাবনার জমাট মেঘে বিজলির রেখা খেলে গেল হঠাৎ। দুশ্চিন্তার মধ্যে সামান্য স্বস্তি, দুলেরা খোজা।

তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘দুলেরা।’

মহব্বত খাঁ বললেন, জি হাঁ জাহাঁপনা, তরুণের নাম দুলেরা, শাহজাদীর দরবারের এক নর্তকীর সন্তান।’

‘কিন্তু খোজা...।’ অনুচ্চ স্বরে বললেন সম্রাট। ঔদ্ধত্যের জন্য ছোটখাটো শাস্তি তো দেওয়াই যায়; কিন্তু বিপজ্জনক সে নয়। আরো একবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন বাদশাহ।

‘আয়, এদিকে আয়...।’ ইশারায় ছেলেটাকে কাছে ডাকলেন জাহানারা। মুখ তুলে তাকাতে পারছে না, শাহজাদীর প্রহরী ও সেবক দলের নতুন খোজা। কম বয়সী মায়াবী চেহারা; কিন্তু মাশাআল্লাহ বেশ শক্তপোক্ত গৌরবর্ণ দেহ, নীল দুটি চোখের দিকে তাকালে শরীর-মন কেমন যেন করে! কামনা, না স্নেহ কে জানে। জোহরা বাঈয়েরই তো ছেলে। খাসকামরা থেকে হামাম পর্যন্ত সর্বত্র অবাধ যাতায়াতের অধিকার দিয়েছেন। কিন্তু দুলেরা এখনো আড়ষ্ট।

ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। হামামের জলাধারের পাশে ঘাসগালিচায় আধশোয়া হয়ে আছেন শাহজাদী। পরনে শুধুই একটি খাটো সেমিজ। এটুকু মসলিনের আবরণে শরীরের প্রায় কিছুই ঢাকা পড়ে না। একবার মাত্র দৃষ্টিপাতে পা থেকে মাথা পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে দুলেরার। এই শোভন-লোভন দেহসৌন্দর্যের প্রশংসার ভাষা শেখার সময়-সুযোগ কোথায় আর পেল সে! শুধু শরীর দিয়েই অনুভব করে শরীরের ব্যাগ্র বাসনা।

নিজেকে শাসন করে, নতমস্তকে গিয়ে দাঁড়ায় মালকিনের সামনে। স্নানঘরের অনাচ্ছাদিত অংশে জলাধারের পাশে ঘাসের গালিচায় অপূর্ব ভঙ্গিমায় গা এলিয়ে দিয়েছেন বেহেশতের হুরি। রুসমার পাত্রটি হাত ইশারায় দেখিয়ে দেন তিনি। এই সুগন্ধি তরলটি দুহাতের তালুতে ঢেলে নিয়ে ধীরে ধীরে মাখিয়ে দিতে শুরু করে দুলেরা। হাঁটু-জানু-কটি, নাভির চারপাশ, কাঁধ-বাহু-পিঠের মসৃণ ত্বকে মালিশ দিতে থাকে। সতর্ক থাকে, ভুল স্পর্শ না হয়ে যায়! এই সুখ স্পর্শের মধ্যেও শাহজাদী অনুভব করতে পারেন দুটি হাত কেঁপে কেঁপে উঠছে। একবার চোখ মেলে তাকালেন কিশোরের দিকে, তার দুই চোখ মুদ্রিত। ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসি খেলে যায় জাহানারার। তরুণের চিত্তচাঞ্চল্য, দৈহিক উত্তেজনা টের পান, ভাবেন, স্বাভাবিক। অগ্নিশিখার সামনে পতঙ্গের মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষাই স্বাভাবিক। কিন্তু বেচারা অসম্পূর্ণ মানুষ, খোজা!

‘ঠিক আছে, এবার যা। আমি গোসল করব।’

নির্দেশ পাওয়া মাত্র উঠে চলে গেল দুলেরা। এবার মসলিনের সেমিজটিও খুলে নিরাবরণ শাহজাদী হামামে টেনে আনা যমুনার জলপ্রবাহে নেমে পড়ল। দুলেরাকে চলে যেতে বলেছিল; কিন্তু জাহানারা জানে, যেতে সে পারবে না, হামামের দরজার ওপার থেকে গোপনে চোখ রাখবে জলাধারে ভাসতে থাকা রাজহংসীর দিকে। ঠোঁটের কোণে আবার দুষ্টুমির হাসি খেলে যায়, বেচারা অর্ধপুরুষ, বেচারা খোজা!

সেবার হঠাৎ খোজার আকাল পড়ে গিয়েছিল হেরেমে, তা-ও বছর তিরিশেক তো হবেই। সুন্দরীর সরবরাহ বন্ধ ছিল না, হেরেম ভর্তি নবযৌবনা; কিন্তু তাদের দেখভাল করার জন্য খোজাও তো চাই। দাসবাজারে নতুন দাস পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ পুরনোরা মারা যাচ্ছে। তাই নবীন কিছু খোজা চাই। রাজ্যের বেশ কিছু তাগড়া কিশোর-যুবক বাছাই করা হলো। তাদের খোজা বানানোর দায়িত্ব পড়ল প্রধান হেকিম নূর মোহাম্মদ খাঁর ওপর। ধরে-বেঁধে শখানেক আনা হয়েছিল। কাজটা বড় সহজ কিছু নয়। ১০০ জনে ২০-৩০ জন বাঁচলে খোজা হয়ে বাঁচবে, বাকিরা শল্যচিকিৎসার সময় মরে গিয়ে বেঁচে যাবে। সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছিল, নূর মোহাম্মদের অধীনে আরো চার-পাঁচজন হেকিমও প্রস্তুত। ছুরি-কাঁচি, ভেষজ ওষুধ সাজিয়ে বেরামখানাকে মোটামুটি তৎপর করে তোলা হয়েছে। ঠিক আগের রাতে, গভীর রাতে নূর মোহাম্মদের মহলের দরজায় টোকা পড়ল। প্রহরী দরজা খুলে যাকে নিয়ে এলো, তিনি বোরকায় আবৃতা, মুখের কাপড় সরানোর পর তাকে দেখে রীতিমতো চমকে উঠেছিল হেকিম। এককালে এই জোহরা বাঈয়ের তাঞ্জাম রাতবিরাতে তাঁর মহলের সামনে এসে দাঁড়াত বটে; সে-ও তো বহুকাল আগের কথা। সেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অনেক দিন! আজ তার কাছে কী চায় রাজপ্রাসাদের নর্তকী? জোহরা বাঈ শুধু একটি কথা জানাতে এসেছে, আগামীকাল যাদের খোজা করার জন্য বাছাই করে আনা হয়েছে, তাদের ভিড়ে তার সন্তানটিও আছে। এই একটিই পুত্রসন্তান জোহরার, এই করুণ তথ্যটি দেওয়ার পর জানিয়েছিল, ছেলেটি নূর মোহাম্মদ খাঁর ঔরসজাত। দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ ও প্রায় নিঃসাড় থাকার পর একটি মাত্র প্রশ্ন করতে পেরেছিলেন হেকিম, ‘তাকে চিনব কী করে?’

‘বাঁ বাহুতে কালো তাগা বাঁধা আছে।’

সারা শরীর কেঁপে উঠল শাহজাদীর। অন্যান্য দিনের মতো গায়ে রুসমা মাখিয়ে দিচ্ছিল দুলেরা। শাহজাদী উপুড় হয়ে শুয়ে ছিলেন হামামের ঘাসগালিচার ওপর। ওপর-নিচে উবু হয়ে রুসমার মালিশ দেওয়ার সময় হঠাৎ দুলেরার শরীরের একটা অদ্ভুত স্পর্শ পেয়ে রাজকুমারীর দেহ যেন বেজে উঠল ঝনঝন করে। এক ঝটকায় উঠে বসে তীব্র দৃষ্টিতে তাকালেন দুলেরার দিকে। ছেলেটার মাথা নিচু। হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে এলেন ফোয়ারাঘরে, দরজা বন্ধ করে নির্দেশ দিলেন, ‘খোল।’ বিবর্ণ চেহারা ছেলেটার, দ্বিধাগ্রস্ত। শাহজাদী আবার হুকুম করলেন, ‘খোল।’

দুলেরা সরিয়ে নিল তার শক্ত করে বেঁধে রাখা নিম্নাঙ্গের বস্ত্র। মুগ্ধ-বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলেন শাহজাদী। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, পরে সংবিৎ ফিরে পেয়ে বলেছিলেন, ‘এটা কী করে সম্ভব?’

পুরুষাঙ্গ অপসারণের পর ভেষজ ওষুধে ভেজানো কাপড়ের পট্টি জড়িয়ে পুরো দুই দিন বেরামখানায় সেবা-যত্ন করার পরও ১০০ জনের মধ্যে মাত্র ১৭ জন তরুণ খোজা হয়ে বেঁচেছিল সেবার। বাকিরা মারা গিয়েছিল অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে। শুধু বাঁ হাতে তাগা বাঁধা ছেলেটির লিঙ্গ কর্তনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন নূর মোহাম্মদ একা, সহকারীদের সরিয়ে দিয়েছিলেন। নিজ হাতে ওষুধ ভেজানো বস্ত্রখণ্ড পেঁচিয়ে দিয়ে কানে কানে বলেছিলেন, ‘তোমাকে খোজা বানানো হলো না। সাবধানে থাকলে বাঁচবে, কেউ দেখে ফেললে তোমার লিঙ্গ কাটা পড়বে, আর আমার মুণ্ডু!’ কেন হেকিম এই দয়া দেখিয়েছিলেন দুলেরা তা জানে না! কিন্তু হেকিম নূর মোহাম্মদ খাঁ এখনো বিনিদ্র রাত কাটান ভয়ে ও তরাসে।

আনন্দে মাতোয়ারা শাহজাদী। দুলেরা তাঁর কাছে ঈশ্বরের উপহার। তিনিও পার্থিব-অপার্থিব নানা উপহারে সয়লাব করে দিয়েছেন ছেলেটাকে। ঘুমে-জাগরণে তাঁর দিকে ছুটে আসে এক প্রবল অশ্বারোহী; দুলেরা।

‘শাহজাদীর আশকারা পেয়ে ছেলেটার মাথা বিগড়ে গেছে হুজুর, কোনো কিছুরই পরোয়া করছে না।’ মহব্বত খাঁ উপর্যুপরি অভিযোগ জানিয়েই যাচ্ছেন।

কিন্তু শাহজাদীই বা তাকে এত আশকারা দেওয়ার কারণ কী, মাথায় ঢুকছে না সম্রাটের। তাহলে কী তৃতীয়বারের মতো প্রেমে পড়ল জাহানারা? সেটাই বা কী করে সম্ভব, আগের দুজন ছিল স্বাভাবিক মানুষ; কিন্তু এই ছেলে তো খোজা। শাহজাহানের হেরেমে নারীর সঙ্গে খোজার প্রেমের সম্পর্ক যে দু-একবার হয়নি তা নয়, তার জন্য চরম মূল্যও দিতে হয়েছে প্রেমিক যুগলের। কিন্তু শাহজাদী কি...। না, গুপ্তচর লাগিয়ে কাজ হবে না, শাহজাদী বেইজ্জতি হবে তাতে, নিজেকেই খুলতে হবে রহস্যের জট।

হেকিম নূর মোহাম্মদ এবার নিজেই বহু কষ্টে লোকচক্ষু বাঁচিয়ে দেখা করলেন জোহরা বাঈয়ের সঙ্গে। ‘ছেলেকে সামলাও বিবি।’

বিবি সম্বোধনে এই বয়সেও সম্মানিত বোধ করল জোহরা, পুত্রগর্বে অন্ধ জননী বললেন, ‘আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না খাঁ সাহেব, দুলেরা এখন শাহজাদীর খাস আদমি, তাঁর চোখের মণি।’

জোহরার এই অভয়বাণী মোটেও স্বস্তি দিতে পারেনি রাজ্যের প্রধান হেকিমকে। শুধু নর্তকীর কাছে তাঁর অভিজ্ঞতার যথার্থ মূল্য পেলেন না বলে আফসোস করে ফিরে এসেছিলেন।

সম্রাটের প্রাসাদ থেকে শাহজাদীর প্রাসাদে যাওয়ার গোপন একটি পথ আছে, এ কথা শাহজাদী জানেন। কিন্তু খাসকামরা থেকে শয়নকক্ষ পর্যন্ত সর্বত্র দৃষ্টিপাত করার যে গোপন রন্ধ্র আছে এ কথা সম্রাট ছাড়া আর কেউ জানে না। জানতেন এই ভবনের নকশাকার, নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর নিজের হাতে এই আপাত অদৃশ্য ঘুলঘুলি তৈরি করে দিয়েছিলেন গুণী স্থপতি। গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থেই তাঁকে হত্যা করেছিলেন নিরুপায় সম্রাট। এত দিন পর সেই গোপন ছিদ্রটিতে দৃষ্টি রাখার প্রয়োজন পড়ল। অতিক্রান্ত সন্ধ্যায় গোপন পথ ধরে শাহজাদীর প্রাসাদে হাজির হলেন বাদশাহ। সামান্য দ্বিধা অগ্রাহ্য করে একাগ্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন কন্যার শয়নকক্ষে। ঝাড়বাতির আলোর ফোয়ারা নয়, বরং পুরো ঘর কম্পমান প্রদীপের শিখা। শাহজাদীর শয্যায় চোখ পড়তেই মুহূর্তে যেন এক মরুঝড়ের কবলে পড়লেন তিনি। তোলপাড় শাহজাদীর শয্যা। তীব্র আশ্লেষে পরস্পরকে পিষে মারছে একজোড়া নগ্ন নারী-পুরুষ। নিজের কন্যার এই যৌনতা অবলোকন নিঃসন্দেহে একজন পিতার পক্ষে চরম অশ্লীল ও অশোভন। কিন্তু সম্রাটের দায়িত্ব পিতার চেয়েও বেশি, তাঁর ঔচিত্য-অনৌচিত্য সাধারণের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে না।

একবার একটি শিকারি বাঘ টুঁটি চেপে ধরছে হরিণীর, কয়েক মুহূর্ত পর সেই শিকারই উল্টো চেপে বসেছে শিকারির বুকে। এ এক অক্লান্ত, অদ্ভুত উন্মাদনা!

সম্রাট স্পষ্ট দেখতে পেলেন দুলেরা খোজা নয়, পূর্ণাঙ্গ পুরুষ। এটা কী করে সম্ভব! তাঁর হুকুমের অন্যথা করার সাহস তো এই রাজ্যে কারোর নেই। দুলেরার অঙ্গ অক্ষত রইল কী করে! অনেক সময় খোজাদের কর্তিত অঙ্গে পূর্বের ভাব ফিরে আসে এ রকম তিনি শুনেছেন। এটি সে রকম কিছু, নাকি অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে? যা-ই হোক, তার ব্যবস্থা তিনি নিতে পারবেন। দুলেরাকে পুনরায় খোজা করার আদেশ দিতে পারেন, এমনকি প্রাণদণ্ড দিলেও প্রশ্ন তোলার কেউ নেই। কিন্তু এ মুহূর্তে এই সব কিছু ছাপিয়ে তাঁর মন আচ্ছন্ন করে রেখেছে অন্য এক চিন্তা। সম্রাটের হেরেমে সহস্রাধিক নবযৌবনা রূপসী আছে। সম্রাটের রেশমি রুমাল উপহার পেলে, তাঁর শয্যায় রাত্রিযাপন করতে পারলে ধন্য হয়ে যায় তারা। কিন্তু আজ শৃঙ্গারে-শীৎকারে ভোগে-আনন্দে যে তুমুল যৌনতার রূপ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলেন সম্রাট, নিজের জীবনে একবারও সে রকম মুহূর্ত এলো না কেন! দেশ-বিদেশের কত ওষুধ সেবন করেছেন তিনি। আজ বুঝতে পেরেছেন এ সবই বৃথা। কোনো বেগম, হেরেমের কোনো নারীই কি পরিপূর্ণ তৃপ্তি নিয়ে ফিরে গেছে সম্রাটের শয়নকক্ষ থেকে? নিজেও কি মুক্তি পেয়েছেন অক্ষমতা ও অতৃপ্তি থেকে? হয়তো সর্বক্ষণ রাজ্য পরিচালনার দুশ্চিন্তা, কিংবা বয়ঃপ্রাপ্তির অনেক আগে থেকেই যথেচ্ছ ব্যভিচারের ফলস্বরূপ প্রকৃতির এই শাস্তি! প্রকৃত পুলক থেকে আজীবন বঞ্চিত হয়েছেন তিনি। কারণ যা-ই হোক, নেহাত জাত-কুলহীন এক তরুণ, সামান্য এক নর্তকীপুত্র আজ চোখে আঙুল দিয়ে তাঁর অপৌরুষকে চিনিয়ে দিল! তাহলে কেন লাখ লাখ মুদ্রা ব্যয় করে এই হেরেম? কেন অর্থহীন এসব অজস্র আয়োজন?

শাহজাদীর শয্যা তখনো উত্তাল। এই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে এখন একজন খোজার চেয়ে বেশি কিছু মনে হয় না সম্রাটের, খোজা!

* (ঋণ স্বীকার-হারেম : শ্রীপান্থ)



সাতদিনের সেরা