kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৮। ৫ আগস্ট ২০২১। ২৫ জিলহজ ১৪৪২

মুক্তির লড়াই

সানজিদা আকতার আইরিন

৭ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মুক্তির লড়াই

অঙ্কন : মাসুম

বিঘা দুয়েক জমি ছিল করিম মুন্সির। স্বামী-স্ত্রী খাটাখাটনি করে সংসারে শান্তির গতি বাড়াতে কখনো আলসেমি করেনি বলে খেয়েপরে ভালোই কাটছিল দিনগুলো তাদের। বেশি খাটনির ধকলে করিম মুন্সির স্ত্রী নেতিয়ে পড়ে খানিকটা, ফলে শরীরে বাসা বাঁধে নানা জটিলতা। যার খেসারতে রুগ্ণ কায়া দেহখানা ফেলে তার আত্মা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে খুব সহজে। ছেলে-মেয়ে দুটির যত্নের ভার সত্মাকে দেওয়া হয় অল্প কয়েক দিনেই। জমিলার তিল তিল করে জোড়ানো সংসার মাজেদার দখলে যাওয়ায় অধিকারের তুলনায় ক্ষমতার দাপট বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। নির্যাতন আর নিপীড়নের ভারে কচি ছেলে-মেয়ে দুটি কোণঠাসা হয়ে থাকলেও কিছুই করার থাকে না বাবা করিমের। ক্ষমতা যার আইন তার বলেই শিশু দুটির সহ্যের সীমা পার হয়ে যাওয়া অত্যাচারও বাবা হয়ে সে মুখ বুঝে সয়ে নেয়। কিছুতেই বউকে সামলাতে পারছিল না বলে সন্তানদের ওপর অত্যাচার হয় জেনেও না জানার ভান করে সব সময়। এ যেন নিজের ঘরে পরবাস। ছয় বছরের মেয়ে সুমনা কিছুই বোঝে না বলে নিরীহ বোবা প্রাণীর মতো মার খেয়ে লুকিয়ে কাঁদে। দিনের পর দিন অত্যাচার সইতে সইতে একদিন বড় ছেলে তমাল তেড়ে ওঠে সত্মাকে। স্ত্রীকে শান্ত রাখতে নিজের ছেলেকে থামিয়ে উল্টা তাড়া করে বলে রাগে যন্ত্রণার মাত্রা দ্বিগুণ হয়ে বুকের মাঝে জ্বলতে থাকে তমালের। মা বেঁচে নেই বলে বাবাও এমন পর হয়ে গেল? ছোট বোনটার কথাও ভাবে না বাবা। চোখ থেকে প্রতিশোধের আগুন ঠিকরে বের হতে চায় তার। ছোট বোনের জন্য সে কিছুই করতে পারে না। এই যন্ত্রণায় ছটফট করে দিন কাটে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারলে নিজের ও বোনের অধিকার রক্ষা করা সহজ হবে, তাই একদিন প্রতিশোধের আগুনকে অবলম্বন করে ঘর ছাড়ে তমাল।

ঢাকায় একটি বাড়িতে আশ্রয় পায় তমাল। সবার আদর পেয়ে তমাল এ বাড়ির একজন হতে পেরেছে সহজে। বাড়ির একমাত্র ছেলে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়া সবুজের হাত ধরে এ বাড়িতে এসেছে বলে তার খুব ভক্ত তমাল। সারাক্ষণ তার কাজগুলো আগে আগে করে দেয়। নিজের জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর তাড়নায় সবুজের আশ্রয়টুকু তমালের প্রয়োজন। ছোট বোনকে স্বাধীন করতে নিজেকে সাবলম্বী হওয়ার জন্য সবুজের মতো কাউকে পাশে পাওয়া দরকার। সবুজের বন্ধুরা বাড়িতে এলে চা-নাশতা এগিয়ে দেওয়ার ফাঁকে তমাল ওদের কথায় কান পাতে। কিছুদিন পর সবুজ বন্ধুদের নিয়ে দরজা বন্ধ করে রেডিওতে এক ভাষণ শুনছিল। কী যে অদ্ভুত কণ্ঠ। দরাজ গলায় সবাইকে অধিকার রক্ষার ডাক দেন। ভাষণে যখন বলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দেব। এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ’। তখনই তমালের শিরদাঁড়া শক্ত হয়ে ওঠে। তাঁর কথায় রক্তে বিজলি খেলে। বুকের মাঝে তাজা রক্তের প্রবাহ অনেক কিছু করার তাড়া দেয়। শত্রুর সঙ্গে মোকাবেলা করার সাহস জুগিয়ে দিয়ে মৃত্যুভয়কে জয় করতে শেখায়। একদিনে অধিকার, দেশমাতৃকা, ভোট সব কিছু বুঝতে না পারলেও আজ বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১২ বছরের তমাল শত্রু তাড়ানোর শপথ নেয়। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি এক রাতে তমাল সশরীরে যুদ্ধদলে যোগ দেয়।

২৭ জনের দলটির কারো প্রকৃত চেহারা বোঝার উপায় নেই। সবার মুখে লম্বা দাড়ি আর লম্বা চুল। নাওয়া-খাওয়ার বালাই নেই। চোখমুখে যেন প্রতিশোধের ক্রোধ। সবার চোখে ভয়াল শিকারি বাঘের তীক্ষ দৃষ্টি যেন শিকার খুঁজে ফেরে। সবুজ এই দলের কমান্ডার। গত সাতটি অপারেশনে ওরা ব্রিজ ভেঙেছে, হানাদারদের ক্যাম্প উড়িয়েছে, গ্রেনেড হামলায় সেনা দলের ট্যাংক হামলা করেছে বহু। এতে কত হানাদার লোপাট হলো বলা মুশকিল, তবে কাজের অগ্রগতি হয়েছে অনেক। তমাল মুক্তিযোদ্ধাদের সব কাজে সাহায্য করে, আর মাঝে মাঝে বন্দুক চালানো শেখে। গহিন জঙ্গলে তাদের ক্যাম্প। দিনের আলোও এখানে প্রবেশ করে না। যত্রতত্র সাপ-বিচ্ছুর ছড়াছড়ি থাকলেও সে নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। সবার মনে বঙ্গবন্ধুর একটাই স্লোগান, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব; এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লা।’ আজ ভোরে দলের সদস্যরা তমালকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যায়। নতুন টার্গেট, নতুন পরিকল্পনা। সবার রক্তে চাপা উত্তেজনা, আর চোখে প্রতিশোধের আগুন তাদের যুদ্ধের অনুপ্রেরণা। মাঝে মাঝে জায়গা বদল করে নতুন নতুন কৌশল এঁটে শত্রু ঘায়েল করাই তাদের লক্ষ্য।

মাসখানেকের মধ্যে তমাল হয়ে ওঠে এক দক্ষ যোদ্ধা। গত দুটি অপারেশনে তমালের চোখের আগুনে বুলেটের গতিকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে। হানাদারদের ঘায়েল করতে একটি অস্ত্র বরাদ্দ পায় সে।

ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ প্রায় সাত দিনের পরিকল্পনার আক্রমণ। খুব শক্তিশালী সেনা ঘাঁটি। ঘায়েল করা সহজ নয়। জীবন-মরণ লড়াইয়ে যা যা করণীয় সব কিছু করতে হবে। রাত পৌনে ১২টার পর আস্তে আস্তে পজিশন নেয় সবাই। খবর আছে ক্যাম্পে ৮০ জনের মতো সেনা আছে। মুক্তিদলের মাত্র ১১ জন। এর মধ্যে আহত আছে দুজন। তবু কারো ভয় নেই, কোনো শঙ্কা নেই। পরিকল্পনামাফিক পজিশন নিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর আক্রমণ করে মুক্তিদল। মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণে যুদ্ধ চলে ঘণ্টাখানেক। তারপর মুক্তিদল পরিকল্পনামাফিক ক্যাম্পের পেছন দিক থেকে পজিশন নেয়। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর গ্রেনেড হামলায় উড়ে গেল সেনা ক্যাম্প। সুনসান নীরবতায় আরো কিছু সময়। আবার চলল মুক্তিদলের গুলি। কিন্তু প্রতিপক্ষের কোনো সাড়া না থাকায় পরিকল্পনামাফিক আগাতে থাকে মুক্তিদল। কাছে যেতেই আহত জনাকয়েক পাকিস্তানি সেনা আবার গুলি ছুড়তে শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে দুই মুক্তিযোদ্ধার শরীর ঢলে পড়ে। সবুজের বাঁ হাতে গুলি বিদ্ধ হয়। মুক্তিদল আর দেরি না করে আবার গুলি চালাতে থাকে। দুটি তাজা প্রাণের বিনিময়ে দখল হলো ঘাঁটি।

গুলিবিদ্ধ আহত সবুজকে বহু কষ্টে নিয়ে আসা হলো ক্যাম্পে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে বলে তমালের ভেতরের ছোট্ট মনটা আজ জেগে ওঠে। বাড়ি ছাড়ার পর সবুজই তমালের একমাত্র আশ্রয়। এত দিন যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে মনকে শক্ত করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আজ সব গলে জল। কত মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখেছে। সবুজ আহত মাত্র। প্রচণ্ড তাপে সবুজের গা ফেটে যাওয়ার পালা। জ্বরের প্রকোপে জ্ঞান হারিয়েছে কয়েক ঘণ্টা হয়ে গেল। জ্ঞান ফেরার নাম নেই। তমাল ঠায় বসে আছে। হঠাৎ সবুজের জ্ঞান ফেরায় আহ্লাদে তমালের চোখে পানি ছলছল করে। যে চোখে প্রতিশোধের আগুন, সেই চোখে আজ পানির ফোঁটায় সহযোদ্ধার প্রতি আবেগের প্রকাশ হয়। সবুজ তার আশ্রয়। তমালের শক্তির অনুপ্রেরণা। বেলা গড়াতে না গড়াতে রেডিওতে বিজয়ের সংবাদ শুনে উল্লাস আর আনন্দে দিশাহারা হয়ে যায় তারা। আর যুদ্ধ নয়, এবার সবাই ঘরে ফিরবে যার যার আপনজনের মাঝে।



সাতদিনের সেরা