kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

তাঁর দীর্ঘ ছায়ায়

আহমাদ মোস্তফা কামাল   

২৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



তাঁর দীর্ঘ ছায়ায়

শঙ্খ ঘোষ চলে গেলেন। কখনো কথা বলার সুযোগ হয়নি তাঁর সঙ্গে। কেবল একবার, একবারই, তাঁকে দেখেছিলাম দূর থেকে। বাংলাদেশে তিনি এসেছেন অনেকবার; কিন্তু নিজেকে আড়ালে রাখার অদম্য স্বভাবের জন্য কিংবা স্বভাবসুলভ দ্বিধা, সংকোচ আর সংশয় পেরিয়ে তাঁর কাছে যেতে পারিনি, বলতে পারিনি—আপনার প্রায় সব লেখা আমি পড়েছি। বললেই বা কী হতো? তিনি যেমন মানুষ, হয়তো স্মিত হেসে চুপ থাকতেন, আর আমিও কথা হারিয়ে ফেলতাম। অথচ কত কথাই না বলেছি তাঁর সঙ্গে, লেখাগুলো পড়তে পড়তে। তাঁর বাক্যগুলো, শব্দগুলো, এমনকি অক্ষরগুলোও যেন কথা বলত আমার সঙ্গে। আমাদের কথোপকথন তাই হয়েই গেছে, সকলের অলক্ষ্যে। যেবার তাঁকে দেখেছিলাম, এই ঢাকাতেই, আজিজ মার্কেটের দোতলায় ফ্লোরে মাদুর বিছিয়ে বসে কথা বলছিলেন, বহু শ্রোতা কান পেতে শুনছিল তাঁর অলৌকিক কণ্ঠস্বর, আমিও কোনো এক কোণে চুপচাপ বসে পড়েছিলাম, নিজেকে প্রায় লুকিয়ে, যেন চোখাচুখি হলেই ধরা পড়ে যাব—তিনি বুঝে ফেলবেন, কী তীব্রভাবে ভালোবাসি আমি তাঁকে; তাঁর শব্দ আর অক্ষরগুলো কী গভীর যত্নে সাজিয়ে রেখেছি বুকের ভেতর। যদি বুঝে ফেলতেনও, কী এমন হতো? না, হতো না কিছুই। তবু তখন মনে হয়েছিল—এভাবে ধরা পড়ে যাওয়া ঠিক হবে না। ওই যে, আমার স্বভাব!

কিন্তু কিভাবেই বা গড়ে উঠেছিল তাঁর সঙ্গে আমার এই প্রীতিময় সম্পর্ক? বলাই বাহুল্য, তাঁর লেখার মাধ্যমে। কবি হিসেবেই চিনতাম তাঁকে, তাঁর কবিতার বই প্রথম পড়েছি অন্তত তিরিশ বছর আগে; কিন্তু সত্যি বলতে কী, তাঁর গদ্যের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পরই আমার জগৎ পাল্টে যায়। কবিদের গদ্য অন্য রকম হয়, সে কথা জানতাম বলেই হয়তো কৌতূহলবশত কোনো একটি বই তুলে নিয়েছিলাম হাতে, পড়বার জন্য, অন্তত পঁচিশ বছর আগে। সেই যে শুরু হলো, তার পর থেকে আর তাঁর কোনো লেখা এড়িয়ে যেতে পারিনি। এবং আশ্চর্য বিস্ময়ে লক্ষ করেছি, তাঁর কোনো লেখাই আমাকে ঠকায়নি, প্রতিটিই কিছু না কিছু আমাকে উপহার দিয়েছে। আমি ঋদ্ধ হয়েছি, ঋণী হয়েছি, মুগ্ধ হয়েছি, বিস্মিত হয়েছি। জীবনের নানা সংঘাতমুখর সময়ে, নানা বিপর্যের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে তাঁর লেখার কাছে ফিরে গেছি। আশ্রয় পেয়েছি, সান্ত্বনা পেয়েছি, সাহস পেয়েছি।

 

২.

আশ্রয়ের জন্য কতবার যে তাঁর দ্বারস্থ হয়েছি! কখনো কখনো আমার এমন হয় যে কিছুই লিখতে পারি না, এমনকি পড়তেও পারি না। নিরক্ত-নির্জীব-শুষ্ক-শূন্য সময় মনে হয় সেটিকে। তখন শুনি না নতুন কোনো গানও, দেখি না কোনো সিনেমা-নাটক, এমনকি যাওয়া হয় না কোনো আড্ডায়, কথা বলি না কারো সঙ্গে, মন পড়ে থাকে অন্য কোথাও কিংবা কোথাও থাকে না। নীরবতা আর নৈঃশব্দ্যের কাছে সমর্পণ করি নিজেকে। কিন্তু কথাটা যত সহজে বলা গেল, আদতে ততটা সহজ নয়। নৈঃশব্দ্যের কাছে সমর্পণ করতে পারলে তো জীবনের মোক্ষ লাভ ঘটেই যেত! আমি জানতাম, নিশ্চয়ই জানতাম, এখনো এই জানার ভেতরে কোনো ভুল ধরা পড়েনি যে নীরবতা আর নৈঃশব্দ্যের মধ্যে, নির্জনতা আর নিশ্চুপতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে জগৎ আর জীবনের গভীর-গভীরতর রহস্যময়তা ভেদ করার সূত্রসমূহ। হয়তো সে জন্যই এই কোলাহলময় পৃথিবীর নিরুপায় বাসিন্দাদের জন্য রচনা করতে চেয়েছিলাম এক অপরূপ নৈঃশব্দ্যের জগৎ। তা আর পারলাম কই? এই সব ভাবি আর ইচ্ছা করে, বদলে ফেলি এই সব বলাবলির ধরন। আর তখন শঙ্খ ঘোষকে মনে পড়ে, কী অসামান্য করে লিখেছিলেন তিনি ‘নিঃশব্দের তর্জনী’তে—

‘এখন ইচ্ছে করে যেমন-তেমন বলতে, খুব আপনভাবে, কাঁচা রকমে। এমন, যে পড়ে মনে হবে কিছুই নেই-বা এর মধ্যে, মনে হবে যে আধুনিকতার নাম শোনা হয়নি যেন-বা, পড়া হয়নি কোনো সামপ্রতিক। মনে হবে তাহলে আর লেখা কেন এ কবিতা? বড়ো বেশি বেড়ালের চোখে ভরে গেল সমাজ, চাতুর্য বড়ো অনায়াস, সুলভ, সর্বসাধ্য—খোলা করে একজন আরেকজনের চোখে তাকাবে এইটেই হয়ে উঠলো শক্ত। তাই অপ্রতিভ মুখ নিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে হয় সবার সামনে, অপরিচিতদের মধ্যে হঠাৎ ঢুকে পড়ার মতো।... মনে হয় যেন খুব বেশি বলা হয়ে গেল এই কতদিনে। সমস্ত দিনের পর গভীর রাতে বাড়ি ফিরে গ্লানির মতো লাগে। কথা, কথা। যেন একটু চুপ ছিল না কোথাও, থাকতে নেই, হাতে হাত রাখতে নেই।...’

কথাগুলো পড়তে পড়তে চমকে উঠি। ভাবি, কী করে মিলে গেল এতটা? আসলেই তো ‘খুব বেশি বলা হয়ে গেল’ আর ‘সমস্ত দিনের পর গভীর রাতে বাড়ি ফিরে গ্লানির মতো লাগে।’ হ্যাঁ, মিলে যাচ্ছে তো! আমিও তো ভাবছি—‘অপ্রতিভ মুখ নিয়ে’ দাঁড়াব একদিন সবার সামনে। নিজের লেখালেখি নিয়ে ভাবছি অনেক দিন ধরে যে আমি আরো সহজ করে লিখতে চাই। গভীরতর উপলব্ধির বর্ণনা, সরলতর উপস্থাপনায়। নিরাভরণ, অলংকারহীন—যেখানে শব্দেরা ঝংকার দিয়ে উঠবে না, বরং মোলায়েমভাবে লেপ্টে থাকবে বাক্যের শরীরে, আর পড়ে মনে হবে যেন অপূর্ব এক নৈঃশব্দ্য নেমে এলো। নীরবতা, নৈঃশব্দ্য ও নির্জনতা। যার ভেতরে বসে মানুষ নিজ অন্তরের সঙ্গে কথা বলে। এই কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতে সেই বিরল নির্জনতা আর অপরূপ নৈঃশব্দ্যের সন্ধান করেছিলাম, হয়তো পাঠককেও দেখা করিয়ে দেওয়ার অসম্ভব স্বপ্ন দেখেছিলাম। হয়নি, হলো না। হয়তো সে জন্যই নিজের জন্য আড়াল খুঁজি তখন, খুঁজি অন্তরাল। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ যে বলেই চলেছেন—

‘অন্তরাল সহ্য করাই মানুষের পক্ষে সবার চেয়ে কঠিন। কবিকে তো আজ সবটাই খেয়ে ফেলছে মানুষ, তাই মানুষের এই শেষ দায়টা মেনে নিয়েও ঘুরছে সে, অন্তরাল ভেঙে দিয়ে এক শরীর দাঁড়াতে চাইছে অন্য শরীরের সামীপ্যে।... সুলভ, সুলভ, এত সুলভ বড়োবাজার! দিকদিগন্তে স্ফুলিঙ্গের মতো উিক্ষপ্ত হয়ে যাওয়া আজ এমন অকাতর বলেই আমরা ভেঙে পড়ছি বড়ো রাস্তার মাঝখানে। মজ্জার ভিতরে গর্ব কই, উপেক্ষা কই? মুখ ঘুরিয়ে উদাসীন সরে-দাঁড়ানো কই? এখন আমরা দাম্ভিক কিন্তু গর্বিত নই, নির্জীব কিন্তু উদাসীন নই, লুব্ধ কিন্তু লিপ্ত নই। পাঁচ মাথার ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ালে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে স্রোত, কেবল এই ভয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি কাগজের মতো ফুলের মতো খসখসে ব্যালকনিতে। কিন্তু ঐ রঙ্গিণী কাকলির মধ্যে তো থেকে যেতে হবে, তারই সংঘর্ষের ভিতর থেকে বাড়িয়ে দিতে হবে নিঃশব্দের তর্জনী। কবিতা এখন সেই তর্জনী খুঁজে বেড়ায়।’

না, অন্তরালের কথা বলেও তো তিনি রইলেন না সেখানে, ফিরে এলেন ‘রঙ্গিণী কাকলির’ মধ্যে, আর ‘সংঘর্ষের ভিতর থেকে’ বাড়িয়ে দিতে চাইলেন ‘নিঃশব্দের তর্জনী’। এ-ও কি সম্ভব? এত কোলাহল, এত হল্লা, এত চিৎকারের ভেতর থেকে কি নিঃশব্দের তর্জনী বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব? হয়তো সম্ভব, কিন্তু সেটি শুধুমাত্র তাঁর মতো বা জীবনানন্দের মতো সন্তকবিদের পক্ষে। আর কী সহজ তাঁর উপস্থাপন! আমি তো বরাবর বিশ্বাস করে এসেছি, সরলভাবে জটিলতর ভাবনা প্রকাশ করার মতো সক্ষমতা অর্জন করার মাধ্যমেই একজন মানুষ শিল্পী হয়ে ওঠেন। আর  এ-কথা তো সর্বজনবিদিত যে, যিনি যত বড় শিল্পী তাঁর ভাবনার জগিট ততটাই জটিল আর গভীর, কিন্তু প্রকাশটি ততোধিক সরল। সরলতার ভেতর দিয়ে সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটানো বা রহস্যের অনুসন্ধান করা কেবল মহত্তম শিল্পীদের পক্ষেই সম্ভব। যেমনটি পারতেন শঙ্খ ঘোষ। 

 

৩.

আট খণ্ডের গদ্যসমগ্র ছাড়াও তাঁর গদ্যের বই অনেক। এত লিখেছেন কিভাবে তিনি? তাও যেনতেন লেখা নয়, সব লেখাই গভীর চিন্তার উন্মেষ ঘটায়, নিবিড়ভাবে ভাবায়। তিন লাইনের মধ্যে তিন শ লাইনের ভাবনা পুরে দেন আর ওই যে ‘ইন বিটুইন লাইনস’ বলে কথাটি—ওরকম অদৃশ্য পঙিক্ত থাকে তিন হাজারটি। ফলে স্বাদু-প্রাঞ্জল গদ্য হলেও তরতর করে পড়ে ওঠা যায় না, চিন্তা এসে ভিড় করে মাথায়। এই বিপুল চিন্তা-উসকানি, ভাবনা-বিস্তারি লেখা তিনি লেখেন কী করে? হ্যাঁ, তাঁর আছে সেই আশ্চর্য সংযম ও সংহতি, কোথায় থামতে হবে তা ভালো করেই জানেন, আমাদের মতো নন যে অহেতুক বাকবিস্তার ঘটাবেন, ফলে কবিতার মতোই তাঁর গদ্য প্রচুর ইঙ্গিত ও ইশারা দেয়, ভীষণ ভাবিয়ে তোলে পাঠককে। তিনি চিন্তার সূত্রমুখ খুলে দেন, এক চিন্তা থেকে অন্য চিন্তায় যাতায়াত করেন অনায়াসে, পাঠককে সঙ্গে নিয়েই, পাঠের অভিজ্ঞতা তাই অন্য রকম হয়ে ওঠে।

যেমন, ‘বিশ্বাস-অবিশ্বাস’ শিরোনামে এক জরুরি প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন তিনি এবং যথারীতি সেটি আরো অনেক ভাবনাকে উসকে দেয়। প্রসঙ্গটি ‘গীতাঞ্জলি’ পাঠ নিয়ে। একজন অবিশ্বাসীর কি ভালো লাগতে পারে এরকম কবিতা? অশ্রুকুমার জিজ্ঞেস করেছিলেন শঙ্খকে। ঠিক একই প্রশ্ন আবু সয়ীদ আইয়ুব করেছিলেন বুদ্ধদেব বসুকে, সুনীলের লেখায় পড়েছি। এ প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করেছেন শঙ্খ-সুনীল দুজনেই। সুনীল জানিয়েছিলেন—অবিশ্বাসীর ভালো লাগে না, তবু আইয়ুবের ভালো লেগেছিল কারণ তিনি ঠিক ছেড়ে আসতে পারেননি তাঁর বিশ্বাসগুলো। কিন্তু শঙ্খ ঘোষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণই আলাদা। একজন সন্ত তিনি, এ কথা আমার মনে হয় তাঁর ব্যাখ্যা পড়ে। তাঁর মতে রবীন্দ্রনাথের মতো এই বিশ্বের একটা কল্যাণময় পরিণতির কথা বিশ্বাস না করলেও একজন মানুষ সব অর্থেই অবিশ্বাসী হয়ে যায় না, বা জগতের প্রতি বিবমিষা তৈরি হয় না। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সঙ্গে ভালোবাসা আর বিরাগের প্রশ্নটাকে এক করে ফেলি বলেই এই ধরনের সমস্যা হয় বলে তিনি মনে করেন। তিনি অবিশ্বাসের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন, কিন্তু প্রেমহীনতার পক্ষে নয়। বরং অবিশ্বাসীরা যে দায় থেকে ভালোবাসেন, এই পার্থিব জীবনের বাইরে আর কিছু নেই জেনে এখানেই সর্বস্ব সমর্পণ করে সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন, তিনি সেটিকেই খুব গুরুত্ববহ করে তুলেছেন।

 

৪.

আরেকটি লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিলে হয়তো আরো খানিকটা বোঝা যাবে তাঁর সন্তসুলভ ভাবনার ধরন। ‘মন’ নামের ছোট্ট একটি লেখায় তিনি বলছেন—

‘মনে মনে বলি : অন্যের কাছে যে আচরণ আশা করো, তেমনিভাবে গড়ে তোলো নিজের চলাফেরা। তাই বলে এর উলটোটা কিন্তু ঠিক নয়। যেমন আচরণ করতে চাও তুমি, ঠিক সেইটেই যেন আশা কোরো না অন্যদেরও কাছে। তেমন আশা করলেই আহত আর আক্রান্ত হবে মন।’

এ রকম করে কী ভাবি আমরা? না, বরং উল্টোটাই ভাবি। যেমনই হোক আমার চলাফেরা, আমার প্রতি অন্যদের আচরণ যেন আমার প্রত্যাশা-মতো হয়, এ রকমই তো ভাবতে অভ্যস্ত আমরা। কিংবা আমি যে আচরণ করি, সবার আচরণও যেন তেমনি হয়; সবাই যেন আমারই মতো হয়, এ রকমও তো ভাবি। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ আমাদের মতো নন, তিনি ভাবেন অন্য রকমভাবে।

এরকমভাবে আরো কত প্রসঙ্গ যে আসে!  দর্শন আর প্রেমকে, ভাববাদ আর বস্তুবাদকে, জগৎ আর জীবনকে তাদের সমস্ত বিচ্ছিন্নতা ও বিপরীতমুখিতা সত্ত্বেও মিলিয়ে দেন শঙ্খ ঘোষ এই সব লেখায়। আর আমরা, তাঁর পাঠকরা, বিস্ময় নিয়ে ভাবি—কী করে পারেন তিনি ছোট্ট একটি লেখায় এত ভিন্ন ভিন্ন চিন্তার বিবিধ গতিমুখকে একদিকে ধাবিত করে একটি সামগ্রিকতা তৈরি করতে? মনে কি হয় না, সাধারণ কোনো মানুষ নন তিনি? মনে কি হয় না, আমাদের এই সাদামাটা-আটপৌরে জাতির মধ্যেই বাস করছেন এক সন্ত, নীরবে-নিভৃতে?

আরেকটি উদ্ধৃতি দিই :

‘মৃত্যু রিলকের ভাবনায়, কোনো অবসান নয় তাহলে, যেন সেটা কোনো মানবোত্তীর্ণ অস্তিত্বও নয়। মৃত্যু যেন জীবনেরই এক চলমান এক স্তর। সেইভাবে দেখলে মানুষ তার মৃত্যুর অভিজ্ঞতাকে নিজেরই অন্তর্গত বলে জানতে পারে একদিন। যে-কোনো মানুষের মৃত্যু যেন আমারই এক টুকরো মৃত্যু, জীবন যে অন্তিমের জন্য প্রতীক্ষা করে আছে তার প্রস্তুতি হতে থাকে যেন এইসব মৃত্যুধারার মধ্য দিয়ে। মৃত্যু তখন আর ভয়ংকর হয়ে দেখা দেয় না রিলেকর কাছে, সেটা হয়ে দাঁড়ায় জীবনের সবচেয়ে বড়ো ঘটনা মাত্র।’

‘যে-কোনো মানুষের মৃত্যু যেন আমারই এক টুকরো মৃত্যু’— কী সুন্দর এই কথাটি! জন স্ক্যালজির সেই কথাটি মনে পড়ে যায়—‘When you lose someone you love, you die too, and you wait around for your body to catch up’। আর এইসব মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হতেই তো আমাদের প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়ে যায় চির-অবসানের জন্য।

তাঁর প্রস্থানের সংবাদ পেয়ে আমার প্রথম অনুভূতি ছিল ওরকমই—যেন আমারই এক টুকরো মৃত্যু হলো। কেনই-বা তা হবে না? আমার দগ্ধ-বিপন্ন জীবনে তিনি ছিলেন এক দীর্ঘ ছায়া হয়ে, একের পর এক স্বজন হারিয়ে বারবার ফিরে গেছি তাঁর লেখার কাছে। আশ্রয় পেয়েছি, সান্ত্বনা পেয়েছি, সাহস পেয়েছি। রবীন্দ্রনাথের পর এত বেশি আশ্রয় আর কোথাও পাইনি আমি। তাঁর প্রস্থান-সংবাদ পেয়ে মনে হয়েছিল, আমার মাথার ওপর থেকে সেই দীর্ঘ ছায়াটি সরে গেল। এরপর থেকে রৌদ্রদগ্ধ প্রান্তরে চিরকাল দাঁড়িয়ে থেকে পুড়ে যেতে থাকব আমি। কিন্তু এই লেখাটি লিখতে লিখতে মনে হলো—তিনি তো আমার সঙ্গে ছিলেন তাঁর লেখাগুলো নিয়ে এবং সেগুলো তো রয়েই গেল। যেন আমাদেরকে সেগুলো উপহার দিয়ে তিনি চলে গেলেন মহাকালের পথে, যেখানে তাঁর যথাযথ মর্যাদার আসন পাতা আছে। দীর্ঘ ছায়াটি তিনি নিশ্চয়ই সরিয়ে নেননি, যুগ যুগ ধরে আমার মতো দগ্ধ-পীড়িত-বিপন্ন পাঠকের জন্য সেটি অক্ষয় হয়ে রইল।



সাতদিনের সেরা