kalerkantho

রবিবার । ৬ আষাঢ় ১৪২৮। ২০ জুন ২০২১। ৮ জিলকদ ১৪৪২

বই আলোচনা

রুমির খোঁজে এক একাকী পরিব্রাজক

আহমাদ মোস্তফা কামাল

১৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রুমির খোঁজে এক একাকী পরিব্রাজক

মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির খোঁজে তুরস্কে : ফাতিমা জাহান। প্রকাশক : অনুপ্রাণন প্রকাশন। প্রচ্ছদ : কারু তিতাস। মূল্য : ৪৭৫ টাকা

ফাতিমা জাহানের ভ্রমণগদ্যের বই ‘মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির খোঁজে তুরস্কে’ বেশ আনন্দ নিয়ে পড়া হলো। তিনি ভ্রমণ করেন একা। ইংরেজিতে সলো ট্রাভেলার বলতে যা বোঝায়, তিনি তাই। তাঁর কিছু ভ্রমণ-গল্প বইটি প্রকাশিত হওয়ার আগেই পড়ার সুযোগ হয়েছিল এবং তাঁর আকর্ষণীয় গদ্যভঙ্গি ও সরস বর্ণনা আমার পাঠক মনকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল। এ প্রশ্নও জেগেছিল মনে, কেন এই একাকী ভ্রমণ? উত্তর পেলাম তাঁর বইটি পড়ে—ভ্রমণ তাঁর কাছে শুধু চোখে দেখার ব্যাপার নয়, বরং প্রেম-ধ্যান-মগ্নতা আর প্রার্থনার অন্য নাম।

তুরস্ক বিবিধ ঐতিহাসিক ঘটনা ও ঐতিহ্যকে যেমন ধারণ করেছে, তেমনি সুফিদের এক চারণভূমি হিসেবেও সমৃদ্ধ হয়েছে। কয়েক হাজার বছর ধরে যে উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে গেছে তুরস্ক, বিশেষ করে ইস্তাম্বুল শহরটি, বইয়ের শুরুতেই তার মনোজ্ঞ বিবরণ দিয়েছেন ফাতিমা জাহান। যেমন—হাজার বছরের পুরনো আয়া সোফিয়ার নাম আর সামান্য ইতিহাসই জানতাম শুধু। এবার জানা গেল, এটি ইতিহাসের নানা পর্বে কখনো গির্জা, কখনো মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, আবার কখনো বা জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে। একটিমাত্র স্থাপনার এত রূপ! তার চেয়ে অবাক হলাম এই জেনে (এবং একটি ছবি দেখে) যে আয়া সোফিয়ার দেয়ালে ‘একপাশে বড় করে গোলাকারে লেখা আল্লাহু, অন্যপাশে মুহাম্মদ আর ঠিক তার মাঝখানে ছবি—মা মেরি শিশু যিশুখ্রিস্টকে কোলে নিয়ে শান্তভাবে বসে আছেন।’ আয়া সোফিয়া রোমান সম্রাটদের তত্ত্বাবধানে গির্জা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয় ৩৬০ খ্রিস্টাব্দে। ১৪৫৩ সালে তুরস্কে অটোমান সম্রাটের শাসন শুরু হলে এটি মসজিদে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে, মসজিদে রূপান্তর করলেও মা মেরির ছবি সম্র্রাটরা মোছেননি সেখান থেকে! ঐতিহ্যের কী অপূর্ব সহাবস্থান! ১৯৩১ সাল পর্যন্ত এটি মসজিদ হিসেবেই ব্যবহৃত হতো, ১৯৩৫ সালে কামাল আতাতুর্কের নির্দেশে এটিকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে খ্রিস্টান সম্রাট ও মুসলমান সুলতানদের তত্ত্বাবধানে থাকার ফলে এই স্থাপনায় ঘটেছে দুই ঐতিহ্যেরই অপূর্ব সমন্বয়।

সুলতানদের তৈরি করা নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন, বসফরাস প্রণালি, মসজিদ-গির্জা, বাজার, মিউজিয়াম, কবরস্থান, কাপাদোকিয়া নামের কোল্ড ডেজার্ট প্রদেশ, পাহাড়, আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি, আনতালইয়া, অলিম্পাস, রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটার, ফেথিয়ে, এইডেন, প্রাচীন নগরী এফেসাস, পামুক্কালে, ইতিহাসখ্যাত ট্রয় নগরী, আংকারা এবং অতি অবশ্যই মওলানা রুমির সমাধি—কত কিছুর বর্ণনা যে আছে এই বইয়ে! নিজে যেমন খুঁটিয়ে দেখেছেন তিনি, তেমনই দেখিয়েছেন তাঁর পাঠকদেরও। আর হ্যাঁ, এই সব দেখতে দেখতে মিশেছেন মানুষের সঙ্গে, লক্ষ করেছেন তাদের আচার-আচরণ, বিশ্বাস-ভালোবাসা, রীতি ও ঐতিহ্য। নারীদের দেখার চোখ পুরুষের চেয়ে অতি অবশ্যই সূক্ষ্ম ও গভীর, বিশেষ করে এ দেশের নারীরা সামাজিকভাবে একরকম পরাধীন জীবন কাটান বলে কৈশোর থেকেই নানা রকম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অন্য দেশে গিয়ে এই বিষয়গুলো তাঁদের চোখে পড়ে সূক্ষ্মভাবে, পুরুষরা যা বুঝতেই পারেন না। যে দেশে নারীদের জন্য আছে নিরাপত্তা ও সম্মান, ভালোবাসা ও মর্যাদা, স্বাধীনতা ও মুক্ত পরিবেশ—সে দেশের নারীরা তো অন্য রকম হবেনই, অন্য রকম হবেন পুরুষরাও। তুরস্কে সেটিই দেখেছেন ফাতিমা। এ রকম হয়ে ওঠার পেছনেও আছে রুমির মতো সুফি-সাধকদের গভীর প্রভাব। প্রকাশ্যে না হলেও রুমি এদের অন্তরের সঙ্গে কথা বলে চলেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। ভালোবাসার কথা বলেন, প্রেমের কথা বলেন, সহনশীলতা-সহিষ্ণুতা এবং অপরকে গ্রহণ করার উদারতা শিক্ষা দেন। আর আমাদের ফাতিমা সেসব খুঁটিয়ে দেখে জানিয়ে দেন, এইভাবে ভালোবাসতে হয়।

নিসর্গের রূপ-সৌন্দর্য, বিত্ত-বৈভব আর মানুষের নির্মিত সভ্যতার নিদর্শনগুলো তিনি শুধু দেখেনই না, উপলব্ধি করতে চান এসবের অন্তর্নিহিত অর্থ ও ব্যঞ্জনা এবং সেগুলো বর্ণনা করেন এক গভীর অনুভূতিসঞ্জাত দরদি ভাষায়। তাঁর গদ্য এত নিমগ্ন  যে তা কবিতা পাঠের আনন্দ দেয়। মরমি এক চোখ আর হৃদয় আছে তাঁর। রুমির কাছে পৌঁছার যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, পড়ে মনে হয়েছে, তিনি যাননি; বরং রুমিই এসে বসেছেন তাঁর কাছে, একান্ত আপনজনের মতো। এই বইয়ের লেখাগুলো সেই মরমি ভ্রমণেরই মনোজ্ঞ বর্ণনা।

ফাতিমা জাহান ভ্রমণ করেন একা; কিন্তু সঙ্গীবিহীন নন। সঙ্গে থাকে তাঁর প্রেম, মগ্নতা, ধ্যান, প্রার্থনা ও মরমিয়া উপলব্ধি। ভ্রমণ গদ্যের বই হলেও এ শুধু দেখার বর্ণনা নয়, বরং এ এক অন্বেষণ। বৈচিত্র্যপূর্ণ  নিসর্গের বৈভব আর মানবীয় সভ্যতার নানা নিদর্শনের ভেতরে লেখক খুঁজে দেখেছেন জীবন ও জগতের রহস্যময়তার অর্থ।