kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

নগর ও নাগরিকের গান

আরিফুল হাসান

১৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নগর ও নাগরিকের গান

তখন বসন্তকাল। আমরা তিনজন। একটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠলাম। সেখান থেকে একজন লাফ দিল। দ্বিতীয়জন যখন লাফ দিতে যাবে, তখন সে আমার চোখে চোখ রেখে বলল, ‘বিশ্বাস রেখো, অচিরেই আমরা মিলিত হব এমন এক স্থানে, যেখানে ব্যর্থতা আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না।’ আমি তার চোখে চোখ রেখে আশ্বস্ত করলাম; সে লাফিয়ে পড়ল।

আমি দেখলাম তাদের দুজনেরই করুণ মৃত্যু। তারা বলে গিয়েছিল আমি যেন সৎকার না করে তাদের অনুসরণ করি। কিন্তু একটি চিন্তা আমার মাথার মধ্যে খেলে গেল। চিন্তাটি পরে বলছি। আমাদের মাঝে কথা হয়েছিল তিনজনই পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ব এবং আমাদের মৃতদেহগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকবে। ভয়ানক অরণ্যের ভেতর কেউ আমাদের লাশগুলোর সৎকার করতে আসবে না এবং খুব সহজেই শিয়াল-সিংহের খাদ্য হতে পারব।

তমালটা একবার গিয়েছিল চিড়িয়াখানায়। সে কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিল যেন তারা তাকে বাঘ-সিংহের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে। কর্তৃপক্ষ তাকে পাগল ভেবে তাড়িয়ে দিল এবং সেদিন তমালের মন ভীষণ রকম খারাপ হয়েছিল। নদীর পারে সে আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘কী ভাগ্য নিয়ে জন্মালাম, শিয়াল-কুকুরের খাদ্য হওয়ারও যোগ্যতা নেই।’ আমি তাকে সেদিন কোনো সান্ত্বনা দিতে পারিনি।

আমি গিয়েছিলাম রেস্টুরেন্টে; সেখানে জুঁই আসার কথা। জুঁই এসেছিল, সঙ্গে ছিল পলাশ। পলাশকে দেখে মন খারাপ হলো।

আমরা প্রতিদিন সকালে হাড্ডিখোলার দিকে যেতাম এবং ফিরে এসে টাউন হলের মাঠে ঘুমিয়ে যেতাম। উঠে ভ্রাম্যমাণ দোকানে চা খেয়ে যেতাম ধর্মসাগর পারে। সেখানে একদিন তমাল এক পতিতার খোঁপায় গোলাপ গুঁজে দিয়েছিল—কাঠগোলাপ। পতিতা কোনো কিছু মনে করার চাইতে তার দালাল খেপে গেলে তমাল কক্ষনো আর পতিতাদের খোঁপায় গোলাপ গুঁজে দেয়নি।

পলাশের আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়াটা নাটকীয়! একদিন সে এসে বলল, ‘জুঁইকে ডিভোর্স দিয়ে এসেছি। আমি তোমাদের দলে মিশতে চাই।’ আমরা ছিলাম প্রাণহীন—বস্তুত সবাই মৃত্যুপূজারি এবং আমাদের কোনো গন্তব্য ছিল না।

পলাশকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার এমন পরিবর্তনের মানে কী? পলাশ জানিয়েছিল যে সে এসব কিছু বলতে চায় না এবং সে পুনরাবৃত্তি করতে চায় না কোনো মন খারাপ করা দৃশ্যপট। আমি বললাম, ‘যাবার সময় কি জুঁই খুব কান্না করেছিল? না! একদমই না—সে খুব স্বাভাবিক ছিল এবং মিষ্টি করে হাসছিল।’ আমি বুঝতে পারলাম এ হাসিটা সেই হাসি, যে হাসি দিয়ে সে একদিন আমাকে ক্যাম্পাসে সবার সামনে চুম্বন করেছিল।

তমালের ব্যাপারটা আলাদা। সে মা-বাবা হারা আজ বারো বছর। ভাইয়েরা তার সম্পদ কেড়ে নিয়েছে। ফলে সে শহরে ভাসমান। আমাদের বন্ধু বলে তাকে ফেলে যেতে পারি না এবং দিন-রাত্রির অধিক সময় একসঙ্গেই কাটাই।

তমাল গিয়েছিল চাকরির জন্য। বললাম, তুমি কি দাসপ্রথাকে ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছ, নাকি বিলীন করতে। সে বলেছিল বিলীন করতে। কিছুদিন সে চাকরিটা করেও ছিল। তমালের চাকরিটা টেকেনি এটা ঠিক নয়, তমাল চাকরিটা করেনি।

এক সন্ধ্যায় আমরা দূরে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম। আমাদের সঙ্গে তখন ছিল কাফকার বই এবং ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট। পলাশ সেদিন পড়ে এসেছিল নেমেসিস এবং তার মনে হতে থাকল নাটক এবার শেষ হওয়া উচিত। তিনজনেই সিদ্ধান্ত নিলাম দূরে কোথাও চলে যাব এবং এই নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে মুক্তি চাই আমাদের।

শেষবারের মতো আমাদের পরিকল্পনা নিশ্চিত করে নিলাম এবং যাওয়ার দিনক্ষণ ধার্য হলো। যেতে পারলাম না। এই ব্যর্থতা আমাদের আরো বেশি বিধ্বস্ত করে গেল। তখন ভাবলাম তাহলে কি মুক্তি নেই আমাদের?

পলাশ ঘুমের ওষুধ খেয়ে মরতে চেয়েছিল, সে পারেনি। তমাল বলেছিল, মরার অধিকারও কি আমাদের নেই? 

সর্বশেষ পরিকল্পনা হলো আমরা পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করব। সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমরা বান্দরবানের আইয়াং পাহাড়ে উঠছি। পলাশই সবচেয়ে আগে পড়বে সিদ্ধান্ত হলো। আমাকে দেওয়া হলো শেষে, কারণ তারা মনে করে আমার জীবনে বড়সড় কোনো দুঃখ নেই। তাই প্রাণের বন্ধুদের চোখের সামনে মরতে দেখে আমি যেন সেই দুঃখে আত্মহত্যা করতে পারি।

চাঁদের আলোতে পাহাড়ের চূড়ায় উঠলাম আমরা এবং প্রথম পলাশ লাফিয়ে পড়ল। তার পতনের শব্দ আমাদের কানে এসে পৌঁছল। ঝিলিক দিয়ে উঠল তমালের চোখ। সে আমার চোখে চোখ রেখে বলল যেন বিশ্বাসঘাতকতা না করি এবং সে-ও লাফিয়ে পড়ল।

আমি ভেবেছিলাম পাহাড় থেকে নেমে যাব এবং খুঁজে বের করব আমার দুই বন্ধুর মৃতদেহ। পরক্ষণেই তমালের শেষ কথা কানে বাজতে থাকল। চিন্তা ও অচিন্তার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকলাম। হঠাৎ আমার চিন্তা-পরিকল্পনা সব কিছুকে গুলিয়ে দিয়ে সেখানে আবির্ভাব হলো পলাশ ও তমাল। তমালের হাতে একটি খড়্গ আর পলাশ ধরে আছে মশাল। তারা  বলছিল গলা কেটে আমাকে পুড়িয়ে দেওয়া হবে। আমি প্রাণপণে না না করছিলাম; কিন্তু তারা আমার কথা শোনেনি।

পাহাড়ের কোলে ঝোপের ভেতর আমাদের মরদেহ পড়ে আছে—থেঁতলানো, বিধ্বস্ত। রাত প্রায় শেষ হতে চলল। একটা হায়েনা এসে আমাদের চারপাশে একবার ঘুরল। তারপর আকাশের দিকে মুখ করে গভীর শোকে ডেকে ওঠে। মুহূর্তেই সেখানে আরো তিন-চারটি হায়েনা এসে জড়ো হয়। তারা আমাদের ঘিরে বসে থাকল। আমি হায়েনাগুলোর চোখ থেকে পানি পড়তে দেখলাম। প্রথম হায়েনাটি তার অন্য সাথিদের ডেকে বলল, আসলে মৃত্যুর সঙ্গে কেউ কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না; কক্ষনো না।



সাতদিনের সেরা