kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

হেভেন

সিরাজউদ্দিন আহমেদ

১৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



হেভেন

অঙ্কন : মাসুম

অভিজাত ফ্ল্যাটপল্লী হেভেন। পাহাড়ের উঁচু সমতলে ১০ তলা ১০টি আধুনিক ভবন নিয়ে গড়ে উঠেছে হেভেন কলোনি। প্রতিটি ফ্লোরে তিন হাজার বর্গফুটের দুটি করে প্রতি বিল্ডিংয়ে মোট ১৮টি ফ্ল্যাট। নিচতলায় কার পার্কিং। হেভেন কলোনির মোট ফ্ল্যাট সংখ্যা ১৮০টি। হেভেন কলোনি থেকে জলপ্রপাতের মতো রাস্তা নেমে মিশেছে সমতল হাইওয়েতে। ২০ কিলোমিটার হাইওয়ে পেরোলে মূল শহর।

সমুদ্র ঘেঁষে একটি টিলায় আছে মনোরম এক উদ্যান। উদ্যানের প্রধান আকর্ষণ একটি প্রাকৃতিক ঝরনা। পাহাড়ি নদীর একটি ধারা পার্কের ভেতর দিয়ে সাগরে পড়েছে।

পার্কের সবচেয়ে সুন্দর যে ভিউ কর্নারটি হেভেন কলোনির মানুষজন অজানা এক রহস্যে এড়িয়ে চলে। এই সুন্দর কর্নারটির গোপন পরিচয় ডেথ কর্নার। হেভেনবাসী ও পার্ক রক্ষণাবেক্ষণের কর্মচারীরা বিশ্বাস করে যাঁরা ডেথ কর্নারে যান, ওই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন, মৃত্যু তাঁদের ডেকে নিয়ে যায়।

প্রথম মৃত্যু হয়েছে একজন কবির। তিনি তাঁর সুইসাইড নোটে সমুদ্র পাহাড় ঝরনা ও পূর্ণিমার প্লাবিত জ্যোত্স্নায় মুগ্ধ হয়ে জীবনের শেষ কবিতা লিখেছেন। কবিতার নিচে বিদায়ি মন্তব্য লিখেছেন—মাতাল সৌন্দর্যের বিষ পান করতে আমি চললাম। বিদায়। সেই থেকে এই গুজবের উৎপত্তি। এর দুই বছর পর হ্যাভেন কলোনির একজন বৃদ্ধের লাশ পাওয়া যায় ডেথ কর্নার বরাবর সমুদ্রের বেলাভূমিতে। তিনি কোনো সুইসাইড নোট লেখেননি। সম্ভবত তিনি সুইসাইড কর্নার থেকে লাফ দিয়েছিলেন।

দুই বছর পর আবার এক ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়। ডেথ কর্নার থেকে লাফ দিয়েছিল। নিচ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। মাথায় পাথরের আঘাত লেগে গাছের কাণ্ডে আটকে ছিল। এ লোক শহর থেকে বেড়াতে এসে আর ফিরে যায়নি। সে-ও কোনো সুইসাইড নোট লেখেনি।

দুই বছর পার হয়েছে। সবাই আতঙ্কিত, এবারও কি ডেথ কর্নারে কোনো লাশ পাওয়া যাবে?

প্রায় সন্ধ্যা। সূর্য একটা বিরাট লাল বলের মতো সাগরের জলে ভাসছে। পার্ক প্রায় খালি হয়ে গেছে। এ সময় চল্লিশোর্ধ্ব এক মহিলাকে ডেথ কর্নারের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা গেল। কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে দৃপ্ত পায়ে সে রেলিং ধরে দাঁড়াল। অস্তাচল সূর্যের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে ঝুঁকে পড়ে সাগরের বেলাভূমি দেখতে চেষ্টা করল। আকাশের দিকে তাকাল। আজ কি পূর্ণিমা? আবার ঝুঁকল নিচের দিকে।

একজন পুরুষ নির্বিকার কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি আত্মহত্যা করতে চান?

মহিলা চমকে ফিরে তাকাল। সভয়ে বলল, আপনি কে? আপনি এখানে কী করছেন?

আপনি যে উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন, আমার মনে হয় আমাদের দুজনের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন।

মহিলা বিরক্ত হয়ে বলল, মরতে এসেছেন, মরছেন না কেন?

লোকটি না হেসে গম্ভীর মুখে বলল, আমি অপেক্ষা করছি। মৃত্যুর জন্য একটি ভালো মুহূর্তের।

আপনি পঞ্জিকা দেখে শুভ দিনক্ষণ ঠিক করে এসেছেন? কবে, কখন, কোন ক্ষণে মরলে বেহেশত নসিব হয় এমন দিনক্ষণ আছে নাকি?

সে রকম দিনক্ষণ আছে কি না জানি না। জীবনে বারবার মৃত্যুর কোনো সুযোগ নেই। জীবন যেমন একবার পেয়েছি, মৃত্যুর স্বাদও একবারই গ্রহণ করতে পারব। 

আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না। মৃত্যু নিয়ে আপনার কি কোনো পরিকল্পনা আছে?

আছে। এই ধরুন, আপনি আকাশে চাঁদ দেখতে চেয়েছেন। আপনার অবচেতন মন চাঁদ খুঁজছে। সে চাইছে পূর্ণিমার জ্যোত্স্নায় প্লাবিত না হলে এই অলৌকিক সৌন্দর্য পূর্ণ হয় না। অপূর্ণ সৌন্দর্যে সে মরতে চায় না।

মহিলা বলল, পূর্ণিমার প্রতি আমার দুর্বলতা আছে এ সত্য।

লোকটি উৎসাহের সঙ্গে বলল, আজই পূর্ণিমা। সন্ধ্যা ৭টা ২৯ মিনিটে আকাশে পূর্ণ শশী বিরাজ করবে। আর কিছুক্ষণ পর পূর্ণিমার জ্যোত্স্নায় প্লাবিত হবে সমুদ্র বনভূমি ঝরনা হেভেন পার্ক, আমাদের হৃদয়, মন, দেহ বিশ্বচরাচর। জোয়ারে আছড়ে পড়বে ঢেউ, সমুদ্রের গর্জন বাড়বে। কী আনন্দ, মৃত্যু নামের এক অজানা ভ্রমণে আমরা সঙ্গী হতে পারছি। সব দুঃখের অবসান হতে চলছে। এসো মুক্তি, এসো মৃত্যু, আমাদের গ্রহণ করো।

মহিলাকে চিন্তিত দেখায়। সে লোকটির বেঞ্চের এক পাশে বসল। বলল, একটা বিষয় ভেবে দেখেছেন, আমরা দুজন যদি একসঙ্গে আত্মহত্যা করি তাহলে প্রিন্ট মিডিয়া, টিভি, ইন্টারনেট—এরা কাভারেজ করতে আসবে। একই সময়ে একই স্থানে মধ্যবয়সী একজন নারী ও পুরুষের আত্মহত্যা। ওরা লিখবে ‘রোমান্টিক সুইসাইড’। নানা পত্রিকায় টিভি চ্যানেলে কেচ্ছার হরিলুট লেগে যাবে। আমি ওই কেচ্ছার মধ্যে নেই।

লোকটি শব্দ করে হাসতে লাগল, আমরা তখন মৃত। যত ইচ্ছা কেচ্ছা-কাহিনি ছড়াক, তাতে আমাদের কী!

মহিলা রাগের সঙ্গে বলল, আপনার কিছু না, কিন্তু আমার অনেক কিছু। আমার ছেলে-পুত্রবধূ তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই সত্য, তার পরও আমি চাই না মিথ্যা কেচ্ছা-কাহিনি শুনে ওদের মাথা হেঁট হোক। দুজন একসঙ্গে আত্মহত্যার পরিকল্পনা বাতিল।

লোকটি বলল, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখুন। পূর্ণ শশী উদয় হয়েছে।

হোক উদয়। আপনার সঙ্গে আমি নেই। আমি ফিরে যাচ্ছি।

মহিলা উঠে হাঁটা দিল। লোকটি তাঁর পিছু পিছু উঠে এলো।

আপনি থাকেন কোথায়?

টিলার মাথায় যে ফ্ল্যাটগুলো দেখছেন ওখানে।

হেভেন ভিলেজ? ওখানে আমিও থাকি। সি-৫।

লাইটপোস্টের কাছে এসে মহিলা দাঁড়াল। বিস্মিত হয়ে বলল, কী আশ্চর্য, আমরা একই বিল্ডিংয়ে থাকি! আমার সি-৭।

লোকটি মৃদু হেসে বলল, আমি আকাশ। আপনি?

আমি ফারিয়া। দেখুন আমরা কেমন মানুষ, একই বিল্ডিংয়ের বাসিন্দা অথচ কেউ কাউকে চিনি না।

এ দোষ আপনার একার নয়। আমি আত্মকেন্দ্রিক মানুষ। অফিস-বাসা, তারপর নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কারোর সঙ্গে মিশতে, কথা বলতে ইচ্ছা করে না।

ফারিয়া হেসে বলল, আপনি দেখছি আমার মতো।  আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে প্রথম থেকে আমার চেনা চেনা মনে হচ্ছে। হয়তো লিফটে কিংবা সিঁড়িতে কখনো দেখা হয়েছে। আপনার লাল রঙের সুজুকি-মারুতি?

আকাশও হাসল, আপনি নীল টাটা।

ফারিয়া শব্দ করে হেসে উঠল, ওহো, আপনি আত্মভোলা মানুষ; কিন্তু এটা ঠিকই খেয়াল রেখেছেন। গাড়িকে না আমাকে, কাকে মনে পড়ল?

আকাশ অপ্রস্তুত হয়ে বলল, আপনাকে মনে পড়ার পেছনে একটা ঘটনা আছে। আপনি গাড়ি নিয়ে বেরোবেন গেট বন্ধ। গার্ড হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে গেট খুলে দিল। আপনি হেডমিস্ট্রেসের মতো ১০ মিনিট ধরে গার্ডকে দায়িত্বজ্ঞান ও সময়জ্ঞান বোঝালেন। পেছনে আমার গাড়ি। আমি হর্ন দিলাম। হাত তুলে আমাকে বসিয়ে দিলেন। সেই ঘটনা মনে পড়ে গেল।

ফারিয়া শব্দ করে হাসল, আমি আসলেই একজন দায়িত্বশীল হেডমিট্রেস। মেয়েদের একটা স্কুল চালাই। আপনি?

একটা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিতে চাকরি করি।

ওরা লিফটের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল। ফারিয়া বলল, আপনার তিন, আমার চার।

আকাশ হেসে বলল, আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল। কিন্তু একটা কৌতূহল রয়ে গেল। কী কারণে আপনি সুইসাইড করতে চেয়েছেন?

ফারিয়া বলল, আমারও একই প্রশ্ন। আপনার কারণ কী?

তাহলে এক কাজ করা যাক। আপনার সঙ্গে যখন পরিচয় হয়েই গেল আর আমরা দুজন যখন একই পথের যাত্রী, চলুন না আমার ফ্ল্যাটে। দুজনে কারণটা জেনে নিই। এক মুহূর্ত বিরতি দিয়ে আবার আকাশ বলল, আমার তৈরি কফির সুনাম আছে। আপনি না হয় পরীক্ষা করে দেখবেন।

ফারিয়া হাসল, চলুন, আপনার কফির স্বাদ নেওয়া যাক।

ফারিয়ার জন্য কিছু বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। দরজার চাবি ঘোরাতে ভেসে এলো, ‘এসো এসো আমার ঘরে/বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছো অন্তরে...।’ দরজা খোলামাত্র আপনা-আপনি লাইট জ্বলে উঠল। আলো পড়ল একটি ছবির ওপর। অপূর্ব সুন্দরী এক তরুণী ক্ষণিকের জন্য জীবন্ত হয়ে ওঠে। মুখে মৃদু মধুর হাসি। কয়েক মুহূর্তের জন্য ফারিয়া বিভ্রান্ত হলো।

ফারিয়া বিস্ময়ের সঙ্গে বলল, এটা কী হলো! আকাশের দিকে তাকাল। কিছু বলল না।

আপনার স্ত্রীর ছবি?

না। আমি বিয়ে করিনি। চলুন, ঘরে না বসে ব্যালকনিতে বসি। আমার প্রিয় অবসরে, ঘুমানোর আগ পর্যন্ত প্রকৃতির সঙ্গে এখানে আমার সময় কাটে।

ফারিয়া অবাক হয়ে বলল, কী অদ্ভুত ব্যাপার! আপনার সঙ্গে এটাও মিলে গেল।

কফির মগ বাড়িয়ে দিয়ে আকাশ বলল, নিন, খেয়ে বলুন কেমন হয়েছে।

ঘ্রাণ নিয়ে বলল, ফ্লেভারে মাতোয়ারা। এক চুমুক দিয়ে মগ হাতে রেলিং ধরে দাঁড়াল। পূর্ণিমার জ্যোত্স্নায় সমুদ্রের ঢেউয়ের সাদা ফেনা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দখিনা বাতাসে সমুদ্রের গর্জন ভেসে আসছে। প্লাবিত জ্যোত্স্নায় জোনাকিরা আজ ম্রিয়মাণ। ফিরে এসে সোফায় বসে বলল, অপূর্ব! কফি তৈরিকে আপনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন স্বীকার করতেই হবে। আমি মুগ্ধ। আরেকজনের কফিও আমার খুব পছন্দ ছিল।

কার কফি? কোনো পারসন, না কফিশপ?

আমার এক্স হাসব্যান্ড। খুব ভালো কফি বানাত। কফি খাওয়ার হ্যাবিটটা ওর কাছ থেকে পাওয়া। মেয়ে পটানোর কাজটাও খুব ভালো জানত। আমাকে মুগ্ধ করল। ১০ বছর ঘর করে একটি অধম পুত্র আমার ঘাড়ে চাপিয়ে আরেক তরুণীর সঙ্গে চলে গেল। এ কেমন সভ্য মানুষ বলুন তো?

আকাশ বিষণ্ন গলায় বলল, স্যরি। অন্য বিষয়ে কথা বলি।

ফারিয়া রেগে গেল, অন্য বিষয় কেন? এটুকু শুনে আপনার কৌতূহল মিটে গেল। আপনি জানতে চান না কেন আমি সুইসাইড করতে চেয়েছি?

চাই।

আমি একজন শিক্ষিকা। হাজার হাজার মেয়েকে আমি মানুষ হওয়ার দীক্ষা দিই। কিন্তু নিজের ছেলেকে আমি মানুষ করতে পারি না। আমার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। পিতার আদর্শে পুত্র উজ্জীবিত। রমণীমোহন চেহারা নিয়ে কিশোরী তরুণী মুগ্ধ করতে পিতার চেয়েও সে পারদর্শী। বহু মেয়ের সর্বনাশ করে এক ধনীর দুলালিকে নিয়ে সে দেশান্তরি হয়েছে।

আকাশ জিজ্ঞেস করল, আরেক কাপ কফি হয়ে যাক?

ফারিয়া বাধা দিল, না, কফি না। ওয়াইন আছে? দিন। মদ খেলে দুঃখ ভোলা যায়? আমি ভুলতে চাই। আমি চিরতরে ভুলতে চেয়েছিলাম। আপনার জন্য হলো না।

দুই পেগ খেয়ে ফারিয়া বলল, আপনার কথা বলুন। আপনার ফ্ল্যাট এত গোছানো পরিপাটি, আমার ফ্ল্যাট অগোছালো। আপনি সুশৃঙ্খল রুচিশীল মানুষ। আমার পছন্দ হয়েছে। আপনার জীবন আমার মতো শূন্য নয়। আপনি কেন মরতে চান?

ড্রয়িংরুমে যে তরুণীর ছবি দেখেছেন ওই মেয়েটির জন্য আমি বেঁচে আছি। আবার ওই মেয়েটির জন্য আমি মরতে চাই।

যার জন্য বেঁচে আছেন তার জন্য মরতে চান? এ কেমন, বুঝলাম না।

পিকনিক করতে এসে জায়গাটা নিশার খুব পছন্দ হয়।  আমরা ঠিক করলাম বিয়ের পর হ্যাভেনে বসবাস করব। নিশার ছবিটি যেখানে দেখেছেন ওখানে আমাদের দুজনের ছবি থাকার কথা ছিল। আমরা যখন ঘরে ঢুকব তখন বেজে উঠবে, ‘এসো এসো আমার ঘরে, এসো আমার ঘরে...।’ সব নিশার পরিকল্পনা। ঘরের যেখানে যা কিছু দেখছেন নিশা সাজিয়েছে।

নিশার সঙ্গে বিয়ে হলো না কেন?

নিশার ঘর সাজানোর স্বপ্ন যখন পূর্ণ, আমরা গৃহ প্রবেশের আয়োজন করলাম। তারপর আমরা বিয়ে করে হ্যাভেন ফ্ল্যাটে বসতি শুরু করব। পূর্ণিমার প্লাবিত জ্যোত্স্নায় আমাদের গৃহ প্রবেশের রাতভর অনুষ্ঠান ছিল। সেই রাতে নিশাকে কেউ ডেকেছিল। সবার অজান্তে নিশা চলে গেল। আর ফিরে এলো না। কে তাকে ডেকেছিল, মৃত্যু নাকি অন্য জীবন? কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল নিশা?

ফারিয়া বিরক্ত হয়ে বলল, আপনি দেখছি ভূতের গল্প শোনাচ্ছেন। এত রহস্য করে বলছেন কেন? সোজাসুজি বলুন নিশা কি মারা গেছেন?

নিশার কোনো ট্রেস পাওয়া যায়নি। না জীবিত, না মৃত। হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমাকে ছেড়ে কেন গেল, কোথায় গেল? ২০ বছর ধরে আমি এর উত্তর খুঁজে মরছি। উত্তর পাই না। আমার বাঁচতে ইচ্ছা করে না।

ফারিয়ার নেশা ধরেছে। বলল, তুমি দেখছি দেবদাসকেও ছাড়িয়ে গেছ। ওই মেয়েটির জন্য বিয়েই করলে না! দারুণ!

আমার মনে হয়েছে নিশা একদিন ফিরে আসবে। নিশার জন্য মরতে গিয়েছিলাম। অর্থহীন নিঃসঙ্গ এক জীবন টেনে চলেছি। কথা বলার ঝগড়া করার একজন মানুষ তো দরকার। কার সঙ্গে জীবনের কষ্ট-আনন্দ-স্বপ্ন শেয়ার করব?

ফারিয়া বলল, আমারও ইচ্ছা করে কান্নাগুলো কাউকে দিই। কিছু আনন্দ চেয়ে নিই। শূন্য শূন্য বিরাট শূন্য। কেউ নেই।

আহ ফারিয়া, আর খেয়ো না। তুমি মাতাল হয়ে গেছ।

আকাশ, বাধা দিয়ো না। আজ আমার আনন্দের দিন। কত বছর পর আজ আমি মন খুলে কথা বলছি।

ফারিয়া কথা বলতে বলতে হরহর করে বমি করে দিল। টালমাটাল ঢলে পড়ার আগে আকাশ তাকে ধরে ফেলল।

আই অ্যাম স্যরি, সো স্যরি। আমাকে মাফ করে দাও।

ওকে মাই ডিয়ার। নতুন নতুন এ রকম হয়। তুমি বিশ্রাম নাও। ঠিক হয়ে যাবে। বিছানায় শোয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে ফারিয়া ঘুমিয়ে পড়ল।

সকালে চা হাতে আকাশ ফারিয়াকে ডেকে তুলল, চা খাও।

চায়ের কাপ নিয়ে ফারিয়া বলল, তুমি কত কেয়ারিং। আমার জন্য আজ পর্যন্ত এভাবে কেউ ভাবেনি। আই অ্যাম সো হ্যাপি। 

আকাশ বলল, মন খুলে কথা বলার একজন মানুষ যখন পেয়েছি, সে যদি বন্ধু হয়, মরতে যাব কোন দুঃখে! তুমি কী বলো?

ফারিয়ার প্রাণ জুড়ে আনন্দ বয়ে গেল। ব্যাগ খুলে সুইসাইড নোট বের করে হাসিমুখে ছিঁড়ে ফেলল। বলল, সুইসাইডের মৃত্যু হলো। আজ থেকে আমরা বন্ধু হলাম।

আকাশ বলল, সপ্তাহে এক দিন আমরা দুজন প্রাণ খুলে কথা বলব। সব পাগলামি ক্ষমার যোগ্য।

আগামী রবিবার আমার বাসায়। বাই।

ফারিয়া চলে গেলে আকাশ তার পকেট থেকে সুইসাইড নোট বের করে ড্রয়ারে রেখে দিল। আজকেরটা নিয়ে তার তিনটি সুইসাইড নোট জমা হলো।



সাতদিনের সেরা