kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

বাঙালি সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বহুস্বর শামসুজ্জামান খান

মোজাফফর হোসেন

১৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গত ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখ চলে গেলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিদগ্ধ পণ্ডিত শামসুজ্জামান খান। করোনাভাইরাস ছিনিয়ে নিল বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এই অগ্রগণ্য ভাষ্যকারকে।

শামসুজ্জামান খানের জন্ম ১৯৩৭ সালের ১৫ জুন। তাঁর জন্মের ১০ বছর পরই ভারত বিভক্ত হয়। এরপর তিনি ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাংলাদেশের অধিকার ও স্বাধিকার আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী থেকে কর্মী হয়ে ওঠেন। ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। কিন্তু পরে তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে সরে আসেন। এই সরে আসার পেছনেও ছিল তাঁর রাজনীতির প্রতি কমিটমেন্ট। তিনি জানান, “শেখ মনি তাঁকে বলেছিলেন যে, ‘ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের চেয়ে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা সংস্কৃতিতে এগিয়ে, তুমি সংস্কৃতির দিকেই থাকো’।” অর্থাৎ তিনি সংস্কৃতিচর্চার ভেতর দিয়ে বাঙালির মুক্তি ও জাগরণের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তিনি মনে করেন, সংস্কৃতি ও রাজনীতি আলাদা মেরুতে অবস্থান করতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি বারবার বঙ্গবন্ধুর সংস্কৃতিপ্রেমের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালি জাতিগঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে অধ্যাপনা ছেড়ে বাংলা একাডেমিতে যোগদান করেন। বাঙালিত্ব, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির আদর্শ ধারণ করে তিনি তাঁর লেখকসত্তার বিকাশ ঘটান। এই কারণে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর কক্ষচ্যুত ও লক্ষ্যচ্যুত বাংলাদেশে তাঁর মতো নিষ্ঠাবান সংস্কৃতিকর্মী, সংগঠক ও লেখকের প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি করে দেখা দেয়। তিনি বাঙালির ধর্মীয় বহুত্ববাদ, সাংস্কৃতিক উদারতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠা করতে সচেতনভাবে লেখকজীবনের গতিপথ পরিবর্তন করেন। তিনি অনুধাবন করলেন বাংলার সমৃদ্ধ সমন্বয়বাদী লোকবিশ্বাস ও লোকায়ত সাহিত্যের ধারা মেইনস্ট্রিমে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে প্রগতিশীল সাহিত্য ও শিল্পের অগ্রযাত্রা, যার নেতৃত্বে ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ, শামসুর রাহমান, মুনীর চৌধুরী, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ, আনিসুজ্জামানের মতো লেখকরা, সেটি ব্যর্থ হয়ে যাবে। তাই তিনি আশির দশক থেকে সচেতনভাবে লোকসংস্কৃতি চর্চার দিকে ঝুঁকে পড়লেন। এর একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলেন। আধুনিক ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে নাগরিক সংস্কৃতিকে মেলালেন।

শামসুজ্জামান খান আরো অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী হলো মুসলিম জনগোষ্ঠী। ফলে তাদের বাঙালি মুসলমান হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলমান থেকে স্বতন্ত্র একটা পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা দরকার, না হলে চারদিক থেকে যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছিল সেটা প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে। শামসুজ্জামান খান তখন বাঙালি মন ও মনন নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, চন্দ কুমার দে, গুরুসদয় দত্ত, বঙ্কিম, বিদ্যাসাগর, মাইকেল, অন্নদাশঙ্কর রায়ের সঙ্গে লালন সাঁই, হাসন রাজা, মীর মশাররফ হোসেন, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, জসীমউদদীন, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, কাজী নজরুল ইসলাম, শাহ আবদুল করিম, মুনীর চৌধুরী, আবুল মনসুর আহমদ, মওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী প্রমুখ মুসলিম মনীষা নিয়ে প্রবন্ধ লিখলেন। পাশাপাশি বাংলার সংগীত, বাংলার উৎসব, বাংলা পঞ্জিকা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে লেখালেখি এবং সেগুলো শিক্ষিত বাঙালির চর্চার বিষয় করে তোলার পেছনে তাঁর অবদান নেতৃত্বস্থানীয়। 

বাঙালির ইতিহাসের আদিপর্ব নিয়ে প্রয়োজনে তিনি বিখ্যাত ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায় থেকে শিবনারায়ণ পালের সঙ্গে দ্বিমত করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। শামসুজ্জামান খান বলছেন, ‘কোনো জাতিসত্তাই আকস্মিকভাবে গড়ে ওঠে না। দীর্ঘকাল ধরে একটি দেশের জনসমাজে ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে পর্যায়ক্রমে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় সেই দেশের মানসিক মনস্তাত্ত্বিক এবং আর্থ-সামাজিক ধারার বিকাশের সঙ্গেই জাতিসত্তার গঠন প্রক্রিয়ার প্রথমে ভ্রুণাকারে পরে প্রত্নপর্যায়ে আরো পরে সৃজ্যমান পর্যায়ে সময়ের পরিক্রমায় একটা সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে। বাঙালির ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছে।’

শুধু প্রাচীন রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, সেই সময়ের সাহিত্যচর্চার স্বরূপ নিয়েও লিখেছেন। বাংলার ২০০ বছরের স্বাধীন সুলতানি আমলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অসামান্য বিকাশের কথা উল্লেখ করে শামসুজ্জামান খান এই সময়টাকে বাঙালির প্রাথমিক নবজাগরণের কাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মঙ্গলকাব্য এবং ভারতীয় ধর্ম-দর্শন-পুরাণের বাংলায় অনুবাদ, চৈতন্য প্রভাবিত সাহিত্য ও সংগীতের ধারা এবং বিপুলসংখ্যক মুসলিম কবি-সাহিত্যিকের বিশাল অবদানে বাঙালিত্বই পরিপুষ্টতা লাভ করেনি, মূলত সমন্বিত বাঙালি জাতিসত্তারও ভিত নির্মাণ করেছে।’

শামসুজ্জামান খান এও জানাচ্ছেন, বাংলার প্রথম জাগরণ মুসলমানদের হাত দিয়ে এলেও দ্বিতীয় জাগরণের পথিকৃৎ হলেন হিন্দুরা। কারণ বাঙালি মুসলমান পাশ্চাত্য প্রভাবকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি, যেখানে হিন্দুরা নবচেতনকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে বাংলায় উনিশ শতকে দ্বিতীয় দফায় নবজাগরণ ঘটাল।

এভাবেই শামসুজ্জামান খান লোকসংস্কৃতি ও বাংলার ইতিহাস ধরে তাঁর নির্মোহ দৃষ্টি ফেলেছেন বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ক লেখায়। তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলো দল-মত ঊর্ধ্ব হয়ে উঠেছে কালের অনবদ্য দলিল। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের রাজনীতির ধারা প্রভৃতি বিষয়ে তিনি ছিলেন আমাদের এই প্রজন্মের আশ্রয়। 

একজীবনে তিনি আরো বিচিত্র বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেছেন। রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। লোকসাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ের পাশাপাশি ছোটদের জন্য গল্পও লিখেছেন। ‘কোলা ব্যাঙ যাবে হিমালয় চূড়ায়’, ‘অভিনব ডাকাতি’, ‘বনমোরগের বুদ্ধি’—এই বইগুলোর পাশাপাশি তিনি বেশ কিছু শিশুতোষ লোকগল্পের আধুনিক রূপ দিয়েছেন। লিখেছেন খেলাধুলা নিয়ে। ‘দুনিয়া মাতানো বিশ্বকাপ’ ও ‘কালো মানিকের গল্প’—এ দুটি তাঁর বহুল পঠিত বই। ‘মহাকাশ গবেষণা’ নামেও তাঁর একটি বই আছে শিশুদের জন্য। একজন মানুষের কত দিকে আগ্রহ থাকলে বাংলা ভাষার গোয়েন্দা গল্প, ভূতের গল্প, রহস্যগল্প, সায়েন্স ফিকশন গল্প, আফ্রিকার কবিতা, রঙ্গরসের গল্প—এসব বইও সম্পাদনা করার কথা ভাবতে পারেন। 

জীবনের শেষ দিকে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা বই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং ‘আমার দেখা নয়াচীন’ (সম্ভবত সিক্রেট ডকুমেন্টসও) সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন।

কর্মজীবনও তাঁর সৃষ্টির মতো বৈচিত্র্যময়। অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে পেশাজীবন শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে। মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজ, ঢাকা জগন্নাথ কলেজ, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন তিনি। বাংলা একাডেমিতে উপপরিচালক পদে যুক্ত হয়ে পরিচালক হিসেবে অবসরে যান। এরপর তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তিন মেয়াদে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। পরে তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতি ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হন। ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক।

এই বর্ণিল কর্মময় ও সৃষ্টিশীল জীবনে পুরস্কার, সম্মাননা ও স্বীকৃতিও পেয়েছেন অসংখ্য। একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার, কালুশাহ পুরস্কার, দীনেশচন্দ্র সেন ফোকলোর পুরস্কার, শহীদ সোহরাওয়ার্দী জাতীয় গবেষণা পুরস্কারসহ দেশে-বিদেশে নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

শামসুজ্জামান খানের বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায় তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।



সাতদিনের সেরা