kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

স্যার, আপনাকে অন্তিম প্রণতি

স্বকৃত নোমান

১৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



স্যার, আপনাকে অন্তিম প্রণতি

ছবি : কাকলী প্রধান

সেদিন সকাল থেকে ঢাকায় খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। কোথাও কোথাও রাস্তা ডুবে গিয়েছিল। দুপুরে একটু সেঁক দিলে পরে ইস্কাটন থেকে হাঁটতে হাঁটতে বাংলা একাডেমিতে গেলাম। শামসুজ্জামান খান তখন একাডেমির মহাপরিচালক। বসেন প্রেস ভবনের দ্বিতীয় তলায়। আগেই ফোনে কন্ট্রাক্ট করে নিয়েছিলাম। পত্রিকার বিশেষ সংখ্যার জন্য তাঁর একটি দীর্ঘ ইন্টারভিউ করব। তিনিই আসতে বলেছেন। তাঁর রুমে গিয়ে আমার নাম বলতেই তিনি বললেন, কী করো? আমি বললাম, লিখি।

: কী লেখো?

: উপন্যাস।

: বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ পড়েছ?

: জি, পড়েছি।

: উপন্যাসটা সম্পর্কে বলো তো দেখি কী পড়েছ?

আমার একটু অপমানবোধ হলো। স্বভাবে তখন একটু ত্যাঁদড় টাইপের ছিলাম। সবাইকে সব কিছুকে খারিজ করে দেওয়ার প্রবণতা ছিল। আমি কি স্যারের কাছে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছি? এসেছি তো তাঁর একটি ইন্টারভিউ নিতে। তিনি কিনা উল্টো আমার ইন্টারভিউ নেওয়া শুরু করলেন! কিন্তু তিনি বয়োজ্যেষ্ঠ, গুরুজন; তাঁর সঙ্গে উল্টাপাল্টা কিছু বলা ঠিক হবে না। আমি ‘আনন্দমঠ’ নিয়ে বলতে শুরু করলাম। তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘জানো না, কিচ্ছু জানো না।’

আমার অপমানবোধ আরো বেড়ে গেল। তিনি আমার চোখে চোখ রেখে বললেন, এখন কী করছ? বললাম, একটি উপন্যাস লিখছি। বললেন, কী বিষয়ে? বললাম, রোহিঙ্গাদের নিয়ে। এবার তিনি রোহিঙ্গা জাতির উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমার রাগ ক্রমে বেড়েই চলেছে। আমি তখন ‘বেগানা’ লিখছি। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিষয়াদি সম্পর্কে পড়ালেখা করছি, খোঁজখবর রাখছি। ঘুরে বেড়াচ্ছি টেকনাফ-উখিয়ার পথে পথে। স্যার বললেন, ‘বসো।’ আমি বসলাম সামনের একটি চেয়ারে। তিনি তাঁর সহকারীকে ডেকে চা দিতে বললেন। চা খেয়ে প্রায় আধাঘণ্টা পর শুরু করলাম তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়া। একটি ক্যাসেট শেষ হয়ে গেল, সাক্ষাৎকার শেষ হলো না। আরো এক দিন গেলাম। দুই দিনে নিলাম প্রায় ১৩ হাজার শব্দের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। পরবর্তীকালে সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয় পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় এবং অন্তর্ভুক্ত করি আমার ‘বহুমাত্রিক আলাপ’ বইয়েও।

২০১৩ সালের এক দিন তিনি আমাকে ফোন করলেন। বাংলা একাডেমিতে যেতে বললেন। গেলাম। অনেকক্ষণ বসে রইলাম তাঁর রুমে। আমার বিরক্তি লাগছিল। আমাকে আসতে বলে এতক্ষণ বসিয়ে রাখছেন কেন? তিনি ফ্রি হলেন। বললেন, ‘এক কাজ করো, তুমি বাংলা একাডেমিতে জয়েন করো।’ আমি কিছু না ভেবেই বললাম, ‘না স্যার, আমার পোষাবে না। আমি বড় সাংবাদিক হবো। তা ছাড়া সরকারি চাকরিতে বেতন কম। যা বেতন পাব, তাতে তো আমার বাসা ভাড়াও হবে না।’ তিনি বললেন, ‘ওহ্, তাহলে তো হবে না।’

তারপর ২০১৫ সালের এক দিন। আমি তখন ট্রেনে করে ফেনী থেকে ফিরছিলাম। জামান স্যার ফোন দিলেন। বললেন, ‘একাডেমিতে আমি কিছু কাজ করতে চাই, তোমাকেও কিছু কাজ দিতে চাই, করবে?’ আমি বললাম, ‘করব স্যার।’ বললেন, ‘সে ক্ষেত্রে তোমার চাকরিটা ছাড়তে হবে।’ আমি বললাম, ‘না স্যার, চাকরি ছাড়ব না। আমি ৫টার পর কাজ করতে পারব।’ স্যার বললেন, ‘কী সব বলো! ৫টার পর একাডেমি খোলা থাকে!’ আমি আর কিছু বললাম না, তিনি ফোন রেখে দিলেন। আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে লাগলাম।

এরই মধ্যে সংবাদপত্রের প্রতি আমার মন উঠে যেতে লাগল ক্রমে। কেন যেন পত্রপত্রিকা আর ভালো লাগছিল না। পত্রিকায় কাজ করা তো দূর, কোনো পত্রিকায় লিখতেও ইচ্ছা করছিল না। সেসব দিনের কোনো একদিন পড়লাম আর্নেস্ট হেমিংওয়ের একটি সাক্ষাৎকার। তিনি বলছেন, ‘তরুণ লেখকদের জন্য সংবাদপত্র আদর্শ জায়গা বটে; কিন্তু সময়মতো সংবাদপত্র থেকে সরে দাঁড়ানোটা বুদ্ধিমত্তার কাজ।’ আমার মন আরো উত্তাল হয়ে উঠল। সংবাদপত্রকে বিদায় জানানোর জন্য অস্থির হয়ে উঠলাম। কিন্তু কোথায় যাব? সংবাদপত্র বাদ দিয়ে কোথায় জয়েন করব?

তত দিন গল্পকার মোজাফ্ফর হোসেন একাডেমিতে জয়েন করেছেন। এক দিন তাঁকে বললাম, ‘জামান স্যার আমাকে কতবার বলেছেন জয়েন করতে, আমি করলাম না। এখন তো মনে হচ্ছে করা উচিত।’ মোজাফ্ফর বললেন, ‘আপনি স্যারের সঙ্গে দেখা করেন।’ এক দিন আমি বাংলা একাডেমিতে গেলাম স্যারের সঙ্গে দেখা করতে। আমাকে দেখেই তিনি মুখ গোমড়া করে রইলেন। কথা বলছেন না, বসতেও বলছেন না; যেন চিনতেই পারছেন না। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। বেশ খানিকক্ষণ পর আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘বলো।’ আমি বললাম, ‘স্যরি স্যার, আমি একাডেমিতে জয়েন করতে চাই।’ বললেন, ‘মিয়া, তোমরা তো কথা শোনো না। যখন বলেছি তখন করোনি।’ আর কিছুই বললেন না তিনি। শুধু বললেন, ‘পরে আসো।’ আমি বেরিয়ে এলাম।

২০১৬ সালের ডিসেম্বর। সাংবাদিকতার প্রতি আর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। অফিসে যেতে ইচ্ছা করে না। মনটা সারাক্ষণ বিষণ্ন, অস্থির। বাসায়ও মন টেকে না। বেশির ভাগ সময় কাটাই শাহবাগে, আজিজে। মন খুব খারাপ ছিল সেদিন। দুপুরের দিকে বিক্ষিপ্ত মনে ইস্কাটনের পথে হাঁটছিলাম আর সিগারেটের পর সিগারেট ফুঁকছিলাম। সহসা বেজে উঠল ফোন। শামসুজ্জামান স্যারের কল। রিসিভ করলাম। বললেন, ‘শোনো, তুমি উপন্যাস লেখো। এখন তো বুঝতেছ না, আমি না থাকলে বুঝবে। তোমাকে এতবার বললাম একাডেমিতে জয়েন করো। আমার কথা শুনলে না।’

জানি না কেন, আমি আপ্লুুত হয়ে উঠলাম। বললাম, ‘স্যার আপনি কোথায়?’ বললেন, ‘আমি অফিসে।’ বললাম, ‘স্যার আমি তো জয়েন করতে চাই, আপনাকে সেদিন বলেছি, আপনি তো কিছুই বললেন না।’ তিনি বললেন, ‘তুমি একাডেমিতে আসতে পারবে এখন?’ বললাম, ‘আমি এক্ষুনি আসছি, স্যার।’ একটা রিকশা নিয়ে আমি ছুটে গেলাম বাংলা একাডেমিতে। সোজা ঢুকে পড়লাম স্যারের রুমে। স্যার বসতে বললেন। বসলাম। খানিক পর স্যার বললেন, ‘এস্টাবলিশমেন্টে যাও। আজই জয়েন করো।’ আমি সেদিনই জয়েনিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলাম। রাতে আমাকে কবি সরকার আমিন ভাই ইনবক্সে লিখলেন, ‘কংগ্র্যাচুলেশন। আসো।’ এটুকুই। পরের দুই দিন ছিল সরকারি ছুটি। তৃতীয় দিন আমিন ভাইয়ের দপ্তরে জয়েন করে শুরু করলাম কাজ।

একবার আমরা চর কুকরিমুকরি ভ্রমণে যাব। আমিন ভাই, অনু ভাইয়ের সঙ্গে আমিও গেলাম স্যারের কাছ থেকে ছুটি নিতে। ছুটি নিতে হয় সাধারণত প্রতিষ্ঠান থেকে। কিন্তু আমরা পাশাপাশি স্যারের কাছ থেকেও ছুটি নিতাম। এটা আমাদের দস্তুর ছিল। তিনি যথারীতি আমাদের বসতে বলে কফি দিতে বললেন তাঁর সহকারীকে। আমরা চর কুকরিমুকরি যাচ্ছি শুনে তিনি বলতে শুরু করলেন ওই চরের ইতিহাস। বললেন, ‘তোমরা কি জানো বঙ্গবন্ধু ওসব অঞ্চলে গিয়েছিলেন?’ সম্ভবত আমিন ভাই বললেন, ‘না স্যার, ঠিক জানি না।’ স্যার বললেন, ‘আমি হতাশ, তোমাদের নিয়ে আমি খুবই হতাশ, তোমরা কিচ্ছু জানো না।’ এ কথাটি স্যার আমাদের প্রায়ই বলতেন। স্যারের তুলনায় আসলেই আমরা কিছু জানি না। কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার আজ এক পোস্টে শামসুজ্জামান খানকে ‘চলন্ত বাংলাকোষ’ বললেন। আসলেই তিনি তাই। বাংলাদেশ, বাঙালি, বাঙালি সংস্কৃতির হেন কিছু নেই, যা তিনি জানতেন না।

বাঙালির উৎসবের দিন পহেলা বৈশাখ। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঠিক এ দিনেই চলে গেলেন বাঙালি সংস্কৃতির প্রখ্যাত গবেষক ‘চলন্ত বাংলাকোষ’ শ্রদ্ধেয় শামসুজ্জামান খান। অনেক সাংবাদিক বন্ধু ফোন করে জানতে চাইছিলেন তাঁর প্রয়াণের খবর। আমি তখনো খবরটি পাইনি। আমিন ভাইকে ফোন করে নিশ্চিত হলাম। তখন মনে হচ্ছিল, চারদিকে শুধু শূন্যতা, শূন্যতা আর শূন্যতা। আমি এক মহাশূন্যতায় ভাসছি। শোকের ঢেউ ভাঙছিল বুকে। একের পর এক ফোন আসছিল। আমি ফোনগুলো রিসিভ করতে পারছিলাম না। করলেও ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলাম না।

শ্রদ্ধেয় শামসুজ্জামান খান, আপনাকে অন্তিম প্রণতি। আপনার স্মৃতি বয়ে বেড়াব। আপনার শিক্ষা লালন করব। আমৃত্যু।



সাতদিনের সেরা