kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

নদী ও রমণীর গল্প

শামীম রেজার নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

৫ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শামীম রেজার নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে

শুরুতে এক এনথ্রোপমরফিক ঈশ্বরের সঙ্গে রাতে ঘুমোতে যাবার আগে কোলাকুলি এবং তাকে নিজের ভেতরে নিয়ে ঘুমিয়ে থাকা, শেষে ‘মনেতে বসতি নদী/দূর-বনে আগুন-পাহাড়/কীভাবে বসতি গাড়ি/এমন চিতার ভিতর’—এ রকম অসম্ভবতা নিয়ে প্রশ্ন—তাহলে তো দেখা যাচ্ছে ঈশ্বর সত্যি শুয়ে নেই কবির ভেতরে, আছে এক অস্পষ্ট ঈশ্বর কল্পনা অথবা কল্পনার ছায়া, যা মিলিয়ে যায় এই আঁধার সময়ে। ঈশ্বর নেই, ‘শিবের ত্রিশূলে গাঁথা নিরীহ শিকার’ তিনি, সেই মানুষও নেই যে তাকে চিনবে। মানুষ ‘ক্ষয়িত’ ‘মিথ্যা-মিথ্যি ধর্মপ্রাণ’, আর সর্বত্র ‘অমানুষের জয়’। আর ‘পৃথিবীতে মৃত দুপুর প্রেমিকা মরে গেছে। ‘মৃত-মুখ তার’, ধানক্ষেত ‘প্রজননহীন’, ‘চারদিকে অপরিচিতের ছায়া বাড়ে, দিগন্তে/মৃত কিছু মুখ ডেকে যায়।’ একটা মোটামুটি ওয়েস্টল্যান্ডের ছবি তৈরি হয়; কিন্তু এইখানে একসময়ে নদী ছিল, জীবনানন্দীয় নিসর্গ ছিল। সেই নিসর্গ এখনো সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি যদিও, তবে তার পুনরুজ্জীবন প্রশ্নবিদ্ধ। কে দেবে পুনর্বার সেই জীবন? যদি ভাবেন, ‘আমরা’, তবে সেই ‘আমরা’দের নিয়ে কিছু কথা শুনুন; ক. আমরা এক একটি ক্ষুদ্র শামুক খ. আমরা আসলে নির্বিষ কতিপয় সাপ গ. আমরা কতিপয় জীবাশ্ম ঘ. আমরা কতিপয় রূপচাঁদা মাছ ঙ. আমরা কতিপয় নির্বোধ

যদি ভাবেন, মধ্যবিত্ত আনবে সেই জীবন, তাহলে মধ্যবিত্তরা যে ‘বীর্যহীন’? আর ‘... মধ্যবিত্ত মন, জানে না কিছুই। শুধু-শুধু ঈর্ষা আর পলায়ন।’ যদি ভাবেন, কেন বিপ্লবীরা তো আছে, তাহলে শুনুন : ‘যাদের বিপ্লব করার কথা ছিল/তারা মেঘাবৃত দৃশ্যহীন ধূসর।’ তাহলে উপায়?

উপায় আছে। তার কিছু সম্ভাবনা শামীম রেজা আঁকেন তাঁর নদী ও রমণীর গল্পে, কিছু জীবনানন্দ থেকে তুলে নেন। জীবনানন্দ থেকে? হ্যাঁ, যারা নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে (ঐতিহ্য, ঢাকা, ২০০৪) পড়বেন প্রথমবার, তাঁদের মনে হবে এর কবিতাগুলো জীবনানন্দ-আকীর্ণ—‘এখানের রাত্রিরা জানে না নগর’, ‘আমাদের রক্তের ভিতর বিভিন্ন রূপের জল নৃত্য করে অগোচরে... অন্তর্গত দীর্ঘশ্বাসে খেলা করে দূর-পৃথিবীর আলো’ ‘ওখানে দাসেরা থাকে... অপঘাতে মারা গেছে আইবুড়ো মেয়ে’, ‘আমাদের খুঁজে পেয়েছি একই গাঁয়ে মৃতদের লাশের পাশে নিথর ঝরে পড়া সারস-শাবক...’ ইত্যাদি, এবং আরো অনেক চিত্রকল্প মাঠ, ঘাস ও নদীর, জানিয়ে দেয় জীবনানন্দ-ভুবনে শামীম রেজা বেশ ভালো ঘুরেছেন, দেখেছেন জীবনানন্দের চোখ দিয়ে, অনুভব করেছেন তাঁর ইন্দ্রিয় দিয়ে। কিন্তু জীবনানন্দকে তার প্রয়োজন হয় তার ওয়েস্টল্যান্ডকে কিছুটা হলেও সবুজের স্পর্শ দিতে। জীবনানন্দের নদী বৃক্ষ প্রান্তরের ছবি সে জন্য প্রয়োজন শামীম রেজার। সেগুলো তাঁর কবিতার পরোক্ষে অথবা প্রত্যক্ষে বিছিয়ে দিয়ে তিনি তাঁর ভিন্ন পথে চলেন।

সেই পথটা তাঁর প্রজন্মের অনেকের কাছে প্রিয়। কারণ এটি গেছে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পুরাণ, লোকজীবন ও কাহিনি, শহর এমনকি রাজনীতির ভেতর দিয়ে, সমকালের বিবর্ণ, রুক্ষ পথঘাট আর ইতিহাসের চোরাবালি পার হয়ে একটি ব্যক্তিগত দিগন্তে। শামীম রেজার কাছে ওই পথ ‘বাবুইপথ,’ যা বেয়ে তিনি ‘রাত্রির খোঁজে’ বেরিয়েছেন ‘অনন্তে’, অথবা খুঁজতে নেমেছেন সেই নদীকে— শান্তিয়ানো অথবা অন্য কিছু যার নাম—যে ‘স্বপ্ন দেখে নতুনের আবার ছবি আঁকে আমাদের পৃথিবীর।’ কাজটি কঠিন, অথবা অসম্ভব অথবা অর্থহীন; কিন্তু শামীম সত্যি সেই পথে নামেন। এবং খোঁজেন। নালন্দা একটা পতিত সময়ের গল্প তবে নালন্দা একটা নদীও বটে এবং তার বিস্তার আছে, এ নদী মরে যায়নি। নালন্দা আবার মেয়ে দূরবিশ্বের। দুটো ইতিবাচক চিত্র, দুটি দূরবর্তী সম্ভাবনা।

এলিয়টের পতিত জমিতেও শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি নামে।

২.

শামীম খুবই প্রকৃতিমগ্ন, যেহেতু প্রকৃতি থেকে ক্রমাগত উৎখাত হচ্ছি আমরা। তিনি খুবই কালসচেতন, যেহেতু এখন সময়টা পরিচর্যাহীন, সাধনাহীন এবং যে কারণে জীবন থেকে অর্থ উধাও। তিনি এক একটা ‘ছিল’র বয়ান দেন—নদী ছিল, পাখি ছিল, রোদ ছিল—কিন্তু একই সঙ্গে ‘নেই’-এর বয়ানটাও দেন, যা খুব বড় হয়ে ওঠে। যা ছিল, তা নেই—এই দুঃখ, এই অভাব তাঁকে তাড়িত করে। যখন ‘ছিল’র গল্প বলেন শামীম, তাঁর ভাষায় থাকে তীব্র সব অনুভূতি, থাকে ধ্যানের মতো মগ্নতা, থাকে প্যাশন। যখন ‘নেই’ নিয়ে গল্প বলেন, তখনো থাকে সেই তীব্রতা এবং একটা শূন্যতার অনুভূতি। কবিতাগুলো তাই হয়ে দাঁড়ায় এক তীব্র, তাড়িত মানুষের আত্মকথন। এই কথনের ঠাসবুনট কোনো কোনো কবিতাকে দেয় ভাস্কর্যের শরীর—শান্তিয়ানো নদীটি দেখেনি কোনো দিন, অথবা একটা ঘোর লাগা কণ্ঠে বলা ‘বিবর্ণ সবুজ’ যেমন—আবার কোনো কোনো কবিতাকে করে তোলে শব্দময়, কবি হয়তো ভাবেন, একটি অতিরিক্ত শব্দ তীব্রতাটা কিছুটা বাড়াবে। ‘শান্ত ঘুঘুচোখ’ অকারণে শব্দময়, কেননা অতিরিক্ত শব্দমাত্র কবিতার জন্য বিরাট বোঝা। তবে এ রকম কবিতা খুবই কম। একই কারণে, অনুপ্রাসের দিকে তিনি ঝুঁকে পড়েন—অনুপ্রাস শামীমের একটি প্রিয় অভ্যাস, বোঝা যায়—‘সুরকীবাড়ির সুরতহীন, ‘পচাডিম-পৃথিবী’, ‘জনগণে-জনমনে’ ‘শিকার ও স্বীকার’। প্রিয়, তবে নিয়ন্ত্রিত। অনিয়ন্ত্রিত হলে বিপদ।

নালন্দার শুরুর কবিতাগুলোতে যতটা ঠাসবুনট এবং কোনো কোনোটিতে শব্দ বাহুল্য চোখে পড়ে, শেষের কবিতাগুলোতে তার বিপরীত কিছু ঘটে। একটি অ-শব্দবহুল কবিতা খুব যে সংবেদনশীল হতে পারে, শামীম নিজেই তা দেখান শেষের তিন-চারটি কবিতায় (‘চুপ হয়ে যাওয়া একটি রাত’ খুবই প্রাণময়)। এসব কবিতায় অনেক সেকেলে বর্ণনাও আছে ‘সাঁঝের মায়া’, ‘ঝর্ণাময়ী’, ‘দূর-অজানায়’ ইত্যাদি। শেষ তিনটি কবিতার দুটিতে ‘তোমার মাঝে’, ‘তোমার ছবি’ একটা প্রেমের সম্ভাবনা অথবা পরিণতি অথবা কিছু হওয়া না হওয়া-নিরপেক্ষ একটা অবস্থাকে তুলে ধরে। আর শেষ কবিতায় আবারও সেই নদী। ফেরাটা শেষ পর্যন্ত শুরুর দিকেই। ক্ষয়িত মানুষ, হালখাতার ধূসর টেবিল আর কেঁচো জীবনকে তিনি দেখেন, হতাশা আসে তার মধ্যে; কিন্তু তিনি নদীকে দেখেন, রমণীকে দেখেন। তারপর একটা সমীকরণে পৌঁছান।

সমীরকরণটি খুব জটিল নয় এবং তাতে হতাশা খুব স্পষ্ট নয়। এই সমীকরণের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি মারে নিসর্গ।

মন্তব্য