kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

পার্কের ভেতরে

আজাদুর রহমান

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পার্কের ভেতরে

অঙ্কন : মাসুম

সন্ধ্যার ইমেজটা ঠিক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। একটা ল্যাম্পপোস্টের লম্বা আলোর ফালা পেরিয়ে যেতেই নাজমুল একটা কুণ্ডলী দেখতে পেল। কুণ্ডলী নয়, পরস্পরমুখো দুজন বন্ধ চোখে শামুকের মতো চুমুক দিয়ে আছে। এক দমকে যা দেখল, তাতেই সে বুঝে ফেলল, ওরা আর যাই হোক তাকে টের পাবে না। এমন নিগূঢ় জোড়চুমুক! নাজমুল সরে গেল। তার পরই গন্ধটা টের পেল। চেনা একটা গন্ধ উড়ছে হাওয়ায়। সুতা ধরে ডান দিতে গিয়েই স্পষ্ট হয়ে গেল। নাজমুলের তন্ত্রীতে তাত্ক্ষণিক যেন বীণা বেজে উঠল। কাছাকাছি যেতেই দুটি ছোকরা আচমকা হাজির হয়ে গেল। ওদের একজন নিজ থেকেই বলল, ‘ভাইজান বসেন।’ পরিবেশটা এমন সহজ যে নাজমুল ইতস্তত করার মতো বাহানা খুঁজে পেল না। দ্রুত বসে পড়ল।

নাজমুল যেন নো বডি। তালুতে ঘুরিয়ে সিগারেটের সুকা ফেলে দিতে গিয়ে ছেলেগুলো একবারের জন্য ঝটপট পরস্পরের মুখ দেখে নিল। তারপর ফের নতমুখী হয়ে কাজে ডুব দিল। সুকা খালাস করে ওরা কোমরের গিঁট থেকে পোঁটলা বের করল। তারপর হাতের তালুতে তামাক তুলে নিয়ে ডলে ডলে মাখতে লাগল। সুকা মিশিয়ে স্টিক বানাতে ১২ মিনিটের বেশি লাগল না। দেদার সিয়ানা টান দিতে লাগল ওরা। আর কী আশ্চর্য! সহজ হাতেই আধখাওয়া স্টিকটা মতিন নাজমুলের নাকের সামনে তুলে ধরল। পর্ব অতিক্রম করতে হলো না। শরিক হয়ে গেল সে। দমাদম টান। এক স্টিক, তারপর পরের স্টিক।

...মিনিট পাঁচেকেই নাজমুল টের পেল, নেশার লকলকে ডগা বাতাস পেতে শুরু করেছে। সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে ছেলে দুটি মোবাইলে গান ছেড়ে দিল—বন্ধু তুই ক্যামন আছ, মোরে ছাড়া, ভিনদেশে মোর ঘুম আহে না।

—তোমাদের বাড়ি কোথায়?

গানের মধ্যে প্রশ্ন করাতে মতিন বোধ হয় বিরক্ত হলো—মোগো বাড়ি বরিশাল।

—এখানে কী করো?

—মোরা রঙের কাম করি। আজকের মনে হয় কাম শ্যাষ।

নাজমুল আর কোনো প্রশ্ন করতে পারল না। কারণ এতক্ষণে মাথার ভেতরে বরফ গলে দু-তিনটা তরল নদী হয়ে গেছে। মনে মনে আপনিতেই সুর বাজছে এখন। সব সময় অবশ্য এ রকম হয় না, বরং উল্টো হয়। স্টিকে টান দিলেই ঘড়ির কাঁটা দ্রুত ঘুরতে শুরু করে। অস্থির লাগে। ঘণ্টা না যেতেই মনে হয় দু-তিন ঘণ্টা পার হয়ে গেছে।

ছেলে দুটির সঙ্গে খানিক গল্প করতে পারলে হয়তো ভালো হতো; কিন্তু ওরা অন্য কিসিমের। লাগাতার গানে গানে চুটকি বাজিয়েই চলেছে ওরা। বন্ধ মুখে একা একা এ অবস্থায় কতক্ষণ আর থাকা যায়! ১০ মিনিট, ২০ মিনিট...। একসময় কিছু না বলেই উঠে পড়ল নাজমুল। তারপর ঢেউয়ে ঢেউয়ে হাঁটতে শুরু করল ফের। কী আশ্চর্য! খানিক আগেই যেসব জিনিস আবছা মতন মনে হয়েছিল, সেগুলোই এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে। পার্কটা সত্যিই বদলে গেছে। নেশাটা মনে হয় ধরে গেছে ভালোই। পুরনো পার্কের ইমেজটাকে আর কোনোমতেই ছবি করতে পারছে না নাজমুল। ঘুরে ঘুরে অবশেষে পুকুরপারের সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে পড়ল সে। একসময় আপনিতেই বাড়ির কথা মনে পড়ে যায়।

গতকাল বিকেলের ঘটনা। নুরবানু পায়ে আঙুল দিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে দিল। মোড়ের দোকানে বসে ভিডিও দেখলেই নুরবানুর মাথাটা গরম হয়ে যায়। বাড়িতে ঢোকা মাত্র বকতে লাগল। গরম কথাবার্তা আর সহ্য হলো না। গালাগাল করে নাজমুল অবশেষে বাড়ি মাথায় তুলল। নুরবানুও ছাড়ল না—আমি কিছু বুঝি না! ওখানে মেয়ে দেখার জন্য বসে থাকো, নাহ? আমাকে দিয়ে মন ভরে না! দুশ্চরিত্র-চরিত্রহীন লোক কোথাকার...। রাগে তার কণ্ঠ বুজে গেছে।  নুরবানুর মূর্তিটা অগ্নিময় ছিল যে নাজমুল যেন মুহূর্তে জ্ঞানশূন্য হয়ে গেল। কষে চড় বসিয়ে দিল গালে। চড়ের দমকে নুরবানু মাটিতে পড়ে গেল। আর দেরি করাই মানে হয় না। দ্বিতীয় আক্রমণ হওয়ার আগেই নাজমুল রমারম ঘরে ঢুকে গেল। তারপর যারপরনাই দ্রুত ব্যাগে কিছু হাবিজাবি কাপড়চোপড় পুরে সোজা চুয়াডাঙ্গা স্টেশনে চলে গেল। সেখান থেকে রাতের রূপসায় চেপে দুই টানে ঢাকা। এ রকম ঘটনা এর আগেও বহুবার করেছে সে। মুক্তির পথ খুঁজতে যেদিকে ইচ্ছা বেরিয়ে পড়ে। 

১০ বছর আগে বিয়ে হয়েছে। বাচ্চাকাচ্চা থাকলেও তবু কিছু একটা আঁকড়ে নিয়ে সান্ত্বনা পাওয়া যেত। তখন যদি বুঝতে পারতাম, আহ, আফসোসে হায় হায় করে উঠল নাজমুল। লোকে বোঝাল—নুরবানু চাকরি করে। মাস গেলে কাঁচা টাকা।

একদিন প্রস্তাব এলো। মাথা নষ্ট হওয়ার জোগাড়। নাজমুলের চেয়ে বয়স বেশি। বেঁকে বসল নাজমুল। রেহাই পেল না। বিয়ে হয়ে গেল।

আফসোস কী কম! বিয়ের তিন মাসের মাথায় একটা সরকারি পিয়নের চাকরিও হয়ে গেল। যাঃ বাবা, চাকরিটা যদি হবেই তো আর কটা মাস আগে হলেই তো পারত। পায়ে করে শিকল টানতে হতো না। সাত গ্রাম থেকে সম্বন্ধ করতে মেয়ে হাতে করে লোকে বাড়ি চলে আসত। মনমতো দেখেশুনে-বুঝে বিয়ে করতে পারত সে...। কল্পনার সুতাটা অবশ্য বেশি দূর নিতে পারল না নাজমুল। গা ঘেঁষে চাওয়ালা ছোকরাটা আবার কিনকিনে কণ্ঠে হাঁক মারল—মামা চা-সিগারেট লাগব।

নাজমুলের রাগ তরাক করে ওপরে উঠে গেল। একটানে গালে এক চড় বসাতে ইচ্ছা করছে এখন। নাজমুল অবশ্য কিছুই করল না, পা থেকে উঠে আসা রাগটাকে মাথা পর্যন্ত উঠতে দিল না সে। সামলে নিল। চাওয়ালা ছোকরাটা তো মনের কথাটাই বলেছে। ভেতরে ভেতরে হয়তো চা-ই খুঁজছিল নাজমুল।

বেঞ্চ থেকে উঠে পড়ল নাজমুল। তারপর অগোছালো পা ফেলে গেটকে টার্গেট করে হাঁটতে লাগল। এর মধ্যেই রাত ১১টা। তাতে কী! ময়দানময় সিগারেটের আগুন জোনাকিদানা হয়ে হরদম উঠছে-নামছে। শোরগোল কমেনি। এরা কি বাড়ি যাবে না! আনমনেই প্রশ্ন করল নাজমুল। সোডিয়াম বাতিগুলো এতক্ষণে বেশ পোক্ত আর জ্বলজ্বলে। নাজমুলের এখন কেন জানি কিছুটা অসহায় লাগছে। হঠাৎ করে ঠাণ্ডা পড়লে যেমন নিজের ভেতরে ফাঁকা ফাঁকা লাগে। গেটের দিকে ফিরতে ফিরতে আনমনেই ফিসফিস করে উঠল—নাহ, কাল বাড়িতে যাব। এ শহর আর ভালো লাগছে না। গ্রাম তাকে যেন ডেকে বলছে, আয় ফিরে আয়।

মন্তব্য