kalerkantho

সোমবার । ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ৮ মার্চ ২০২১। ২৩ রজব ১৪৪২

তেঁতলে ম্যাডাম

মঈন শেখ   

২২ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



তেঁতলে ম্যাডাম

অঙ্কন : মাসুম

মৈত্রেয়ী সরকার গল্পটা বলতে গিয়ে শেষ করতে পারছেন না। দুকথা বলেই হেসে উঠছেন খলবলিয়ে। আবার শুরু করেন গোড়া থেকে। কিন্তু মাঝপথে গিয়ে খেই হারান। হেসে ওঠেন দম আটকিয়ে। বলাটা আর শেষ হয় না। বাকি দুজনও হাসে তাঁর সঙ্গে। সহকর্মী হাসে গল্প শুনে নয়; মৈত্রেয়ী গল্পটা বলতে পারছেন না বলে। শেষতক কামরুন নাহার বলল, ‘বৌদি গল্প পরে শুনব, ক্লাসটা সেরে আসি। আপনি বরং দম নেন।’ কামরুন উঠতেই মৈত্রেয়ী চিল্লিয়ে উঠলেন—‘এই থাম থাম, শুনে যাও। টানা তিনটা ক্লাস করে হাঁপিয়ে উঠেছ, একটু চার্জ নিয়ে যাও।’

—ঠিক আছে বলেন, চার্জ নিয়ে নিই। ধপ করে বসল কামরুন।

মৈত্রেয়ীও কিছুটা গুছিয়ে নিলেন। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে কয়েকবার তোলাফেলা করলেন। বুকে আটকে থাকা হাসিটার জন্য মুখটা লাল হয়ে উঠেছিল, তা কিছুটা কমল। সহকর্মী দুজন তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। কামরুন আর শাহাদত। প্রধান শিক্ষক তখন অফিসে নেই। এতে অফিসের পরিবেশ যথেষ্ট হালকা। এই অফিসের সহকর্মী কয়েকজন এক পেট। হেন কথা নেই যা তারা ভাগাভাগি করে না। এমন পেট পাতলা সহকর্মীর মিলমিশ আর পাঁচটা অফিসে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

হাড়দহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছয় শিক্ষকের স্কুল। এখন চারজন। একজন বিনা নোটিশে নিখোঁজ আর অন্যজন প্রশিক্ষণে আছেন। ছয় শিক্ষকের মধ্যে একজনই পুরুষ। মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর মৈত্রেয়ী সরকার। অবশ্য সুন্দর ছিলেনও বলা চলে। আজ থেকে ১০ বছর আগে যারা দেখেছে, তারা যদি হঠাৎ করে দেখে, তবে চিনতে সময় নেবে। মুখটা দেখে বলবে, ‘তুমি মৈত্রেয়ী নও?’ শরীরটা এখন প্রায় ডাবল। মুখটা আছে আগের মতোই। সমস্ত সৌন্দর্য এখন তাঁর মুখে। চেনার মধ্যে আছে বলতে এই মুখটাই। মুখের দিকে তাকিয়েই মানুষ যা একটু চেনে। অথচ ১০ বছর আগেও কেউ কেউ তাঁকে নাম দিয়েছিল শতাব্দী রায়।

মৈত্রেয়ী প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষক। তিনি অবশ্য প্রাক-প্রাথমিকে নিয়োগপ্রাপ্ত নন। প্রাক-প্রাথমিকের নাইমা আক্তার বিনা নোটিশে নাই হওয়ার কারণে তাঁকে দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। তবে এর ওপর একটা প্রশিক্ষণ নেওয়া আছে তাঁর। প্রাক-প্রাথমিকে যতটুকু পড়াশোনা হয়, তার অধিক হয় খেলাধুলা, গান-গল্প। বেশ মজিয়ে থাকেন মৈত্রেয়ী। শিশুরা বাড়িতে থাকতে চায় না। ছুটে আসে নানা রকম খেলনার টানে। তবে প্রায়ই একেকটি শিশু একেকটি কাণ্ড ঘটায়। মৈত্রেয়ী উপভোগ করেন। আজকেও নির্ঘাত কিছু একটা ঘটেছে। যা বলতে গিয়ে পারছেন না হাসির হুড়কোতে। এমনটাই ভাবল সহকর্মীরা। ঔত্সুক্য বেড়েছে শাহাদতেরও। কিন্তু মৈত্রেয়ীকে সেটা বুঝতে দিল না। তাগাদা দেওয়ার ঢঙে বলল, ‘আমিও ক্লাসে যাব ম্যাডাম। পরে শুনব।’ শাহাদতের কথা শুনে মৈত্রেয়ী তাড়াহুড়া করে বলতে শুরু করলেন, ‘ওই যে আপনার প্রিয় ছাত্রী ফেরদৌসি ছিল না? যার ফাইভ পাস করে বিয়ে হয়ে গেল। তার ছেলে সিহাম শিশু শ্রেণিতে আছে। ওর সাহস আর দস্যিপনা দেখলে ওখানেই থাকবেন। প্রতিদিনই কোনো না কোনো কাণ্ড বাধিয়ে বসে। আজকে কী করেছে শোনেন।’ আবারও হাসতে লাগলেন মৈত্রেয়ী। তবে এবার সহজেই সামলিয়ে নিলেন নিজেকে। নতুন করে বলতে লাগলেন, সেই সিহাম আজ গায়ের জামা খুলে বলছে, ‘আপা, দ্যাখছেন আমার বডি।’ সিহাম এ কথা বলেই ডানা ভাঁজ করে বাহু ফোলাবার চেষ্টা করল। আমার কেন জানি হঠাৎ রাগ হলো। মনে হলো, একে বেশি লাই দিয়ে মাথায় তোলা হয়েছে। একটু ধমক দেওয়া দরকার। আমি একটা ধমক দিতেই তাড়াহুড়া করে জামাটা পরে নিল।

‘আপনাকে পরে কিছু বলল না?’ কামরুন প্রশ্ন করল।

‘না, তবে মন খারাপ করে অনেকক্ষণ বসে থাকল। ধমকটা একটু জোরেই দেওয়া হয়েছিল। আমারও খারাপ লাগল। ঠিক করলাম ক্লাসের শেষ পর্যন্ত তাকে কিছু বলব না। আসলে সিহাম কী করে সেটাই দেখতে চাচ্ছিলাম।’

‘চুপ করে বসে ছিল?’ শাহাদত বলল।

‘হ্যাঁ, চুপ করেই ছিল। তবে ছুটি দেওয়ার খানিক আগে হঠাৎ করে বলল কথাটা।’ মৈত্রেয়ী আবারও হেসে উঠলেন, বেশ শব্দ করে। শাহাদত ফোড়ন কাটার ঢঙে এক গ্লাস পানি তাঁর কাছে এগিয়ে দিল। মৈত্রেয়ী না রেগে বরং ঢকঢক করে তা খালি করলেন। একটা ধন্যবাদও দিলেন পানিদাতাকে। উল্টো ধাক্কা খেল দাতা। এ কোন মহিলারে বাবা, তলে তলে এত তেষ্টা পুষে রেখেছিলেন। মৈত্রেয়ী অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে বললেন আটকে রাখা কথাটা—‘সিহাম হঠাৎ আমাকে বলল, ‘আপা গে, আপনি আমাহোরে তেঁতুলগাছের লাগান।’

‘মানে! এটা আবার কেমন কথা। মাড়িসুদ্ধ বাঁধানো দাঁতের পাটি বের করে হেসে উঠল কামরুন।’ না, বয়সের ধারাপাত দাঁত ফেলেনি কামরুনের। দাঁতের পুরো পাটি ভেঙেছিল মারাত্মক রোড অ্যাকসিডেন্টে। শাহাদতও অবাক হলো সিহামের এমন কথা শুনে। মৈত্রেয়ী সহকর্মীদের না বলা জিজ্ঞাসা পড়তে পেরে বললেন, ‘তাহলে আর বলছি কী। আমিও অবাক হলাম সিহামের কথার মধ্যে ঢুকতে না পেরে। এমন আজব কথা পাঁচ বছরের ছেলের মুখ থেকে বের হতে পারে, ভাবতেই পারছি না। আর কোন অর্থেই বা সে এ কথা বলল, সেটাও আমি বুঝতে পারছিলাম না।’

‘আপনি জানতে চাননি?’ কামরুন প্রশ্ন করতেই থামলেন মৈত্রেয়ী। আর কথা শিগগিরই বললেন না। তাঁর মুখে হাসির আভা আর নেই। মনে হলো কিছুক্ষণ সময় নিচ্ছেন। শ্রোতাদ্বয়ও তাড়া দিল না। মৈত্রেয়ীর মুখে ভেসে ওঠা ছায়ায় কী যেন খুঁজে পেল তারা; বরং অপেক্ষা করতে থাকল তাঁর বলার জন্য। মৈত্রেয়ীও নতুন করে বলতে শুরু করলেন।

 

কথাটা শোনার পর মৈত্রেয়ী অনেক কথা জানতে চেয়েছিলেন সিহামের কাছে। সিহাম কোনো উত্তর দেয়নি। মুখটা বেশ চুপসানো। মনে হলো দলা দলা দুঃখ সিহামের বুকের মধ্যে জমা হয়ে আছে। বড় মায়া হলো মৈত্রেয়ীর। ছেলেটাকে কাছে টেনে নিলেন। সে-ও মুরগির বাচ্চার মতো ম্যাডামের বুকের মধ্যে এলো সুড়সুড় করে। একটা চুমু এঁকে দিলেন সিহামের কপালে। সিহাম এতে আরো গলে যায়। মিশে যেতে চায় ম্যাডামের বুকে। তবে মৈত্রেয়ী হারিয়ে যান ছোট্ট এক শিশুর ছোট্ট এক বাক্যে। ছোট কথা, অথচ কথাটির মধ্যে কত দর্শন। সে কার মুখে যেন শুনেছিল—পাগলরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক। আজকে তাঁর মনে হলো, শিশুরাই শ্রেষ্ঠ দার্শনিক। তাঁর আরো মনে হলো, সিহাম বড় অনাদারে বেড়ে উঠছে। মৈত্রেয়ী ক্লাসে আদর করলে তার মধ্যে জেগে ওঠে সেই অভাববোধ। আর সেটা থেকেই বোধ হয় সিহাম বলল, ‘আপা, আপনি আমাদের তেঁতুলগাছের মতো।’ যে গাছটার ওপর সিহামের বড় মায়া। গাছটাও বুঝি ভালোবাসে সিহামকে। মৈত্রেয়ী সিহামের মাথায় বিলি কাটতে কাটতে বললেন, ‘কেন গো সিহাম, তোমাদের তেঁতুলগাছটা বুঝি খুব বড়, ডালপালা অনেক? তুমি তার নিচে বসে খেলা করো? নিশ্চয় অনেক ছায়া দেয় গাছটা? কী গো কথা বলছ না কেন?’

সিহাম কোনো কথা বলে না। চোখও তুলল না ম্যাডামের দিকে। তবে ম্যাডাম ঠিকই বুঝলেন, আদর স্নেহের বড় কাঙাল সিহাম। তেঁতুলগাছটাকে তাঁর খুবই দেখতে ইচ্ছা করল। বড় আপন মনে হলো গাছটাকে। তার ছায়া, তার বাতাস, তার শিকড়—সব কিছুই সিহামের বড় আপন। মায়ের মতো। মৈত্রেয়ীর বুকটা ভরে গেল সিহামের কথা ভেবে। চোখ ভিজে উঠল সিহামের দেওয়া অমন একটি উপমার জন্য। নিজেকে তেঁতুলগাছ ভাবতে ইচ্ছা করল। ইচ্ছা করল বাহু দুটি ওপরে তুলে তেঁতুলগাছ হতে। পারলেন না। তবে মনে মনে হলেন। মৈত্রেয়ী ভাবলেন, তাঁর ১৭ বছরের শিক্ষক জীবন যেন আজ সার্থকতার কিনারে ভিড়ল। সিহামের মুখটা ওপরে তোলার চেষ্টা করলেন মৈত্রেয়ী।

‘সিহাম লজ্জা পাচ্ছ কেন? তেঁতুলগাছটা তোমার খুব প্রিয়, তাই না সোনা? তার ছায়া খুবই ঠাণ্ডা? নিশ্চয় উঁচু শিকড়টার ওপর দুদিকে পা ঝুলিয়ে মোটরসাইকেল চালাও? নিশ্চয় লবণ ছিটিয়ে তেঁতুলের কচি পাতাগুলো চাবাও কষমষ করে? গাছের তেঁতুল বুঝি খুব মিষ্টি। ঠিক আছে, আজ কিন্তু ছুটির পর তোমার সেই গাছটাকে দেখতে যাব। নিয়ে যাবে না?’

সিহাম কোনো কথা বলল না। শুধু পাথালে ভাবে মাথা ঝোঁকাল। নিয়ে যাবে না।

‘কেন, নিয়ে যাবে না কেন? তোমার প্রিয় জিনিসটাতে ভাগ বসাব ভাবছ। না না একেবারে না। তোমার প্রিয় গাছ তোমারই থাকবে। যাকে তুমি মায়ের মতো দ্যাখ, তাকে এই মাসির একবার দেখতে ইচ্ছা করছে।’

সিহাম নিয়ে যাবে না। মৈত্রেয়ী যাবেন। নাছোড়বান্দা মৈত্রেয়ী। প্রাক-প্রাথমিকের ক্লাস আজ ১০ মিনিট আগেই ছুটি দিলেন। পাশের দোকান থেকে একটা চিপস কিনে সিহামের হাতে দিয়ে তার হাত ধরে হাঁটতে লাগলেন।

রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকে অনেক প্রশ্ন করল। কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন, সিহামের বাড়িতে দাওয়াত নাকি ইত্যাদি। মৈত্রেয়ী দায়সারা উত্তর দিয়ে এদিক-ওদিক করে পিছলে যান। প্রশ্ন করল সিহামকেই বেশি।

‘কিরে সিহাম, ম্যাডামকে দাওয়াত খাওয়াবি নাকি? নিশ্চয় আলুর ভর্তা দিয়ে ভাত দিবি?’ আরো কয়েকজন সিহামকে জ্বালাতে চাইল বিভিন্ন প্রশ্ন করে। এতে বোঝা গেল, সিহাম পাড়ার মধ্যেও কম দুরন্ত নয়।

সিহাম বাড়ির কাছে যেতেই হাত উঁচিয়ে তার আপাকে বাড়িটা দেখিয়ে দিল। বাড়ি দেখালেও মৈত্রেয়ী ভাবলেন সে গাছ দেখাল। গাছ খুঁজতে লাগলেন মৈত্রেয়ী। বাড়ির সামনে পুরো ফাঁকা জায়গায় তেমন কোনো গাছ নেই। তিনি সামলাতে পারছেন না নিজেকে।

‘কই গো সিহাম, তোমাদের তেঁতুলগাছটা কোথায়?’

সিহাম কথা বলল না। আবারও হাত উঁচিয়ে বাড়ির পেছন দিকটা দেখিয়ে দিল। মৈত্রেয়ী সিহামের হাতটা ছেড়ে দিয়ে ছুটে গেলেন সেদিকটায়। গাছের দিকে তাকিয়েই থমকে গেলেন তিনি।

তাঁরও যেন শিকড় গজিয়ে গেল হঠাৎ। পাথুরে গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। গাছটা দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির প্রাচীরের গা ঘেঁষে। যার গোড়া ছুঁয়ে নামছে উঠানের আর গোয়ালঘরের যত নোংরা পানি। শিকড়গুলো জবুথবু সেই পানিতে। গাছের ওপরের দিকে তাকিয়ে পলক আর ফেলতে পারলেন না। এ কেমন গাছ। তেঁতুলগাছ এমনও হয়! ডালপালা নেই বললেই চলে। তিন দিকে তিনটি ডাল তেফারাঙ্গা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি ডালের মাথার দিকটা মরা। যেন কোনো একসময় বাজ পড়েছিল, দুনিয়া কাঁপিয়ে। ডালের শরীর ফেটে কিছু কিছু ছোট প্রশাখা মাথা তুলে আছে। কতগুলো বাঁকা তেঁতুলও ঝুলছে সেই শাখায়। সেদিক থেকে গাছটার মাথা নেই বললেই চলে। তিন ডালের মিলনস্থল থেকে খানিক নিচে বিশাল এক গর্ত, যা প্রমাণ দেয় গাছটার বেশ প্রাচীনত্ব আছে। বিচ্ছিরি গর্ত। নির্ঘাত শিয়াল, বেজি, নয়তো খাটাশের আস্তানা এটি। গা ঘিনঘিন করে উঠল ম্যাডামের। গাছের পুরো ধড়টার দিকে নিপুণভাবে খেয়াল করে আর দাঁড়াতে ইচ্ছা করল না। তেঁতুলগাছ যে এমন মোটা হতে পারে, তা জানা ছিল না। তা-ও আবার এমন একটা বিচ্ছিরি ন্যাড়া গাছ। তিনজন মানুষ লাগবে ধড়ের বেড়টা বাহু মেলে ধরতে। রাগে নিজের শরীরটা ছেনে গেল। নিজেকে নিজেই খামচাতে চাইলেন। তবু একবার মিলিয়ে নিলেন গাছের সঙ্গে নিজেকে। গাছের দিকে ভালো করে দেখে নিয়ে নিজের শরীরটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন। কিছু মিলে, কিছু মিলে না। গাছের মাথার দিকে তাকিয়ে নিজের মাথার আট-দশ ইঞ্চি লম্বা চুলগুলোতে একবার হাত বোলান। দাঁত কড়মড় করে পেছনে তাকালেন সিহামের দিকে; খামচে ধরবেন বলে। সিহাম নেই। বেশ দূরে দাঁড়িয়ে মিনি বিড়ালের মতো হাসতে হাসতে চিপস খাচ্ছে। মৈত্রীর মনে হলো, তাঁকে ভেঙাচ্ছে সিহাম। নিজেকে সামলাতে না পেরে বলেই ফেললেন, ‘কালকে আগে আয়।’

 

মৈত্রেয়ী গল্পটা শেষ করে হাঁপাচ্ছেন। সহকর্মীদ্বয় তাঁর বলায় বাধা দেয়নি। কামরুন হাসলেও ওড়নায় মুখ ঢাকা ছিল। শাহাদত দাঁতে দাঁত চেপে সামলিয়েছে নিজেকে। গল্প শেষে কামরুন ফোড়ন কাটতে ছাড়ল না।

‘বৌদি নিশ্চয়ই ওই গাছের তেঁতুলগুলো মিষ্টি।’

‘আরে না, না, তা মুখেও তোলা যায় না।’

বৌদি কামরুনের দিকে কড়মড়িয়ে তাকিয়েও শান্ত হওয়ার ভান করলেন।

‘তেঁতুল তো টক হবেই। ও গাছেরটা বোধ হয় একটু বেশিই টক।’ শাহাদতও ছাড়ল না।

‘আরে টক তো আছেই। সেটা তেতোর একশেষ।’

‘ম্যাডাম চেখে দেখেছেন নাকি?’

‘আরে না। তাহলে শোনো।’ আবারও হেসে উঠলেন মৈত্রেয়ী।

আমার শরীরটা তো জ্বলছে রাগে, আর সিহামের দাদি এসে বলছে, ‘হ্যাঁরে মা, তেঁতুল খাবি নাকি। মুখে তুলতে পারবি না রে মা। দুনিয়ার তিতো।’

‘আপনি কী বললেন?’

‘কথা বলব? এক সেকেন্ডও দাঁড়ায়নি। সেখান থেকেই তো এলাম।’

‘ম্যাডাম, আমি একটা কথা বলি।’ শাহাদত কিছু বলবার আগেই মৈত্রেয়ী কাঁধ বাঁকিয়ে চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘শোনেন, যা বলবেন বলেন, রাগ ধরাবেন না কিন্তু। এমনিতেই মাথা তেঁতে আছে।’

‘ম্যাডাম রাগাব কী, আপনি তো রেগেই আছেন। তবে আজকের ঘটনা শুনে আর সিহামের তুলনা দেখে আপনাকে আমারও একটা বিশেষণ দিতে ইচ্ছা করছে।’

‘দেন যা খুশি দেন। কী কারণে যে শিশু শ্রেণির প্রশিক্ষণটা দিয়েছিলাম।’

‘না ম্যাডাম, আমি বলতে চাচ্ছিলাম, আপনি শুধু শিশু শ্রেণির নন, আজ থেকে আমাদের সবার ম্যাডাম; তেঁতলে ম্যাডাম।’

হো হো করে হেসে উঠল কামরুন। হাসল না শাহাদত। মাড়ি চেপে নিচের দিকে চোখ করে থাকল। মৈত্রেয়ীর দিকে তাকাতে সাহস পেল না। মৈত্রেয়ী চোখ দিয়ে গিলছেন শাহাদতকে। মুখটা এবার ঝাঁজালো লাল হয়ে উঠল। হাতের কাছের ওয়েট পেপারটা ছুড়ে দেবেন হয়তো। কিন্তু দিলেন না। বলার জন্য ঠোঁট দুটি ফাঁকও হলো। কিছু বললেন না। অবশেষে শরীরটা ঝাঁকিয়ে হেসে উঠলেন অ্যাজমা রোগীর মতো হিসহিস করে। হাসিটা রাগের, না আনন্দের, তরজমা করা গেল না। জোরেও হাসলেন না। তবে হাসির যা শব্দ হলো, তার অধিক হারে ঢেউ দিয়ে কেঁপে উঠল শরীরটা। পঁচানব্বই কেজির নিটোল শরীর।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা