kalerkantho

সোমবার । ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ৮ মার্চ ২০২১। ২৩ রজব ১৪৪২

যেখানে হিমালয়, যেখানে এভারেস্ট ৭

হে পূর্ণ তব চরণের কাছে

ইফতেখারুল ইসলাম    

২২ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



হে পূর্ণ তব চরণের কাছে

ইবিসিতে পৌঁছানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে আছি সবাই। দুপুরে গোরাকশেপের লজে সামান্য কিছু খেয়ে বেরিয়ে পড়ি। সাড়ে ১২টায় শুরু করি দিনের দ্বিতীয় ভাগের ট্রেকিং। এটাই আমাদের নিয়ে যাবে শেষ লক্ষ্যে, এভারেস্টের পায়ের কাছে। দূরত্ব বেশি নয়। তবে এখনো প্রায় ১৭০ মিটার উচ্চতা ট্রেক করে উঠতে হবে।

ট্রেকিংপথের চড়াই ধীরে ধীরে ক্রমাগত উঁচুতে উঠে গেছে। কিছুটা পথ পাথুরে সমতল। এ রকম রাস্তায় হাঁটতে আমার অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কিন্তু ওই উঁচুতে ওঠার পথে আমি আশ্চর্যজনকভাবে হাঁপিয়ে উঠি। নিচের তুলনায় এখানকার বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ অর্ধেক। চড়াই আর অক্সিজেনস্বল্পতা মিলে এখানে হাঁটাটা বেশির ভাগ ট্রেকারের জন্য কষ্টসাধ্য। তার সঙ্গে আছে পায়ের নিচে চূর্ণ তুষার আর পাথরে তৈরি বালুর মতো স্তর।

এভারেস্টের খুব কাছের একটি পর্বতশিখরকে আজ তেজ এভারেস্টকন্যা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। অসম্ভব সুন্দর পুমোরি নামের এই তুষারঢাকা পর্বত। পুরো পথটায় এই পাহাড় আমাদের সঙ্গ দেয়। ঠিক পিরামিডের মতো আকৃতির এই পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা সাত হাজার ১৬১ মিটার বা ২৩ হাজার ৪৯৪ ফুট। আর এর অবস্থান এভারেস্ট থেকে মাত্র আট কিলোমিটার পশ্চিমে।

গোরাকশেপ থেকে ট্রেকিং শুরু করার পর পথের যেকোনো জায়গা থেকে যে স্বর্গীয় দৃশ্য দেখা যায় তা ভালোভাবে দেখতে হলে অনেক সময় দরকার। এখানে তুষারঢাকা পর্বতগুলো অনেক কাছে, কিন্তু এখন এই দৃশ্য প্রাণভরে দেখার জন্য থামলে আমাদের বেইস ক্যাম্পে পৌঁছতে দেরি হয়ে যাবে। তা ছাড়া ওই মাইনাস ১৬-১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আর শিরশিরে হাওয়ায় একটু দাঁড়ালেই ঠাণ্ডা লাগে। তার চেয়ে বরং জোরকদম ট্রেক করে চলা সহজ। ইবিসি পর্যন্ত পৌঁছতে আমাদের সময় লেগেছে দুই ঘণ্টার চেয়ে সামান্য একটু বেশি।

ঠিক ২টার সময় আমরা খুমবু গ্লেসিয়ার ঘেঁষে এমন একটি জায়গায় গিয়ে পৌঁছি, যেখান থেকে পরিষ্কার দেখতে পাই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরটি। অহংকারী, সুন্দর ও রহস্যময়। পাশের ও সামনের শিখরগুলো সব তুষারশুভ্র আর পেছন থেকে উঁকি দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এভারেস্টকে দেখায় একটু গাঢ় রঙের। আরেকটু স্পষ্ট, একটু বেশি দেখা যাবে না? না, এভারেস্টের শিখরদেশের অল্প একটুই দেখা যায় এদিক থেকে।

তার ডান দিকে লোহেতস গিরিশিখর আট হাজার ৫১৬ মিটার বা ২৭ হাজার ৯৪০ ফুট আর বাঁ দিকে নুপ্তেস সাত হাজার ৮৬১ মিটার বা ২৫ হাজার ৭৯১ ফুট। লোহেতস আর নুপ্তেসর মাঝখানে মাউন্ট এভারেস্ট আট হাজার ৮৪৮ মিটার বা ২৯ হাজার ২৯ ফুট। এত কাছে তবু মনে হয় কত দূরে। হাজার দেড়েক ফুট মাত্র দেখা যায়। এ যেন এক ভিভিআইপি। কাছে এসেও বেষ্টনীর বাইরে থেকে একটুখানি দেখা। তবু যতটা সম্ভব তাকিয়ে থাকি। মেঘ উড়ে এসে তাকে ঢেকে দেয়। কয়েক মুহূর্তের বিরতির পর আবার সেটা দেখা দেয়। এত সুন্দর আর এমন অপার্থিব একটি দৃশ্যের মাঝখানে আমি কিভাবে এসে পৌঁছলাম? কোনো দৈব আমন্ত্রণ ছাড়া এখানে আসা কি সম্ভব? স্বপ্নের মতো লাগে আমার কাছে।

খুবই রোমাঞ্চিত বোধ করি এই ভেবে যে আমরা বেইস ক্যাম্পের একেবারে কাছে চলে এসেছি। বাকি পথটুকু কিভাবে গেছি, পথটা কেমন ছিল, কেমন ছিল চারপাশের দৃশ্য, তার কিছুই মনে নেই আমাদের। ২০-২৫ মিনিট হেঁটে আমরা পৌঁছে যাই আমাদের স্বপ্নের রাজ্যে। হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করি একটা বড় পাথরের সামনে। ছোট্ট একটা পাহাড়ের মতোই তার আকৃতি। তার ওপরটা তুষার দিয়ে ঢাকা। আর সামনের দিকটায় জ্বলজ্বল করছে লাল রং দিয়ে লেখা—এভারেস্ট বেইস ক্যাম্প। পাঁচ হাজার ৩৬৪ মিটার। সেই পাথর ঘিরে অনেক দড়িতে টানানো রয়েছে নানা রঙের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। একই রকম ছোট ছোট প্রার্থনা-পতাকা বিভিন্ন দিকে আরো কয়েকটি দীর্ঘ দড়িতে। এটাই আমাদের লক্ষ্য। এখানে আসব বলেই এত দিন ধরে এত স্বপ্ন, এত অস্থিরতা আর এত প্রস্তুতি। ৬৩ বছর বয়সে আমি জড়ো করেছি তারুণ্যের শক্তি, যৌবনের উদ্দীপনা আর কৈশোরের উচ্ছ্বাস। আমাদের আগে যারা এসে পৌঁছেছে তারা ওই পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। আমার ছবি তুলে দেয় অন্যরা। তাদের ছবি তুলে দিই আমি।

তখন ২টা বেজে ৪০ মিনিট। খুবই উজ্জ্বল ঝলমলে একটি দিন। এখন স্পষ্ট মনে করতে পারি না, কতটা ঠাণ্ডা ছিল তখন। ওই মুহূর্তে কি আকাশ একটু মেঘাচ্ছন্ন ছিল? আসলে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেটা তো আকাশেরই গায়ে। মেঘ আমাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। তখন একটু ধূসর আর অস্পষ্ট দেখায় চারপাশ। অন্তত তুষার থেকে ঠিকরে আসা চোখ-ধাঁধানো আলো একটু কম মনে হয়। আমি এখানে একটু বিরতি চাই। একটা পাথরের ওপর থেকে তুষার সরিয়ে তাতে বসি কয়েক মিনিটের জন্য। সারা জীবন উদয়াস্ত কাজ করে আমরা যা অর্জন করি, প্রতিযোগিতায় জিতে আমরা যে পুরস্কার পাই, সেসব কত তুচ্ছ, সেটা এখানে না এলে জানা হতো না। আজ এই অভাবনীয় পুরস্কার আমি কত সহজেই পেয়ে গেলাম! কারো সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়নি, কাউকে পরাস্ত করতে হয়নি। তাহলে কিভাবে পেলাম একে? কোন সুকৃতি আমাকে এত বড় এই পদক পরিয়ে দিল? কে আমাকে নিয়ে এলো এই অপরূপ দৃশ্যের মাঝখানে, এই অপূর্ব সৃষ্টির কাছে, এই সর্বোচ্চ শিখরের পদপ্রান্তে, তাঁর এই লীলাস্থলে? তাঁর কাছে নত হতে ইচ্ছা করে আমার।

তিলকের হাত ধরে নিম্নি ওই বড় ও উঁচু পাথরটার ওপরে উঠে দাঁড়ায়। একজনের স্বপ্নপূরণের আনন্দ অপরের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের একটি জেলা শহর থেকে ঢাকায় এসে এক কিশোরী দেশের সবচেয়ে বড় ইউনিভার্সিটির জিওলজি বিভাগে ভর্তি হয়েছিল একটা পাহাড় দেখবে বলে। অনার্সের প্রথম বর্ষের ফিল্ডওয়ার্কে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে উঠে সে মনে মনে এভারেস্টের কাছে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। সেই মেয়েটি আজ এভারেস্টের বেইস ক্যাম্পে পাহাড়ঘেরা হিমবাহের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। একজন স্থিরপ্রতিজ্ঞ মানুষ শুধু মনোবল দিয়ে কত কিছু অর্জন করতে পারে, সেটা ভেবে আশ্চর্য লাগে। নবীনদের, বিশেষ করে মেয়েদের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা আর মানসিক শক্তি দেখে খুবই অনুপ্রাণিত হই আমি। আমার মেয়ের কথা মনে পড়ে।

ঠিক পাঁচ মাস আগে, গত অক্টোবরে পোখরা থেকে আমি অন্নপূর্ণা দেখতে যেতে চেয়েছিলাম। হাতে কয়েকটা দিন বাড়তি সময় ছিল না বলে তখন সেটা পারিনি। ভেবেছি, শিগগিরই একবার একটু বেশি সময় নিয়ে আসব হিমালয়ের কোলে। হেঁটে বেড়াব সেই সব পথে, যেখানে গিয়েছিলেন আমার স্বপ্নের ভ্রমণকাহিনির লেখকরা। যদি সম্ভব হয়, তাহলে ট্রেক করে যেতে চাই এভারেস্ট বেইস ক্যাম্প পর্যন্ত। ইচ্ছা প্রকাশ করার পর প্রথম দিন থেকে আমার স্ত্রী আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন। আমার পেশা, অনভিজ্ঞতা, বয়স—এসব বিবেচনা করে অনেকে আশ্চর্য হয়েছে, আমি কেন এভারেস্ট দেখতে যেতে চাই। এখন আমি সেইখানে এসে পৌঁছেছি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই জনশূন্য হয়ে পড়ে বেইস ক্যাম্প। তুষারাচ্ছাদিত চত্বরটি ধীরে ধীরে নীরব হয়ে আসে। পর্বতশিখরগুলোও মৌনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। চারদিকে মাত্রাতিরিক্ত শুভ্রতা। সাদার ওপর সূর্যের আলো পড়ে প্রতিফলিত হয়ে এত উজ্জ্বল দেখায় যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। মাঝে মাঝে মেঘ এসে ছায়া দেয়। আমরা পুরো এলাকা ঘুরে এভারেস্টের দিক থেকে আসা হিমবাহের প্রান্তসীমায় গিয়ে দাঁড়াই।

আমাদের ট্রেকিংয়ের পথ শেষ। চারদিকের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে আমাদের মনে অপূর্ণতার বোধ জেগে ওঠে। বেইস ক্যাম্পে কোনো তাঁবু নেই। আমরা পরিচিত হতে পারি না এমন কোনো অভিযাত্রীর সঙ্গে, যাদের চোখে শীর্ষে পৌঁছানোর স্বপ্ন। যারা এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে আর অপেক্ষা করছে সঠিক দিনক্ষণের জন্য।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মার্চ-এপ্রিলে এখানে ভিড় হওয়ার কথা। সারি সারি তাঁবু থাকার কথা এই চত্বরজুড়ে। পর্বতারোহী আর তাদের সঙ্গে আসা শেরপা ও সহায়তাকারীদের ভিড়ে মুখর হয়ে থাকে এই বেইস ক্যাম্প। করোনাভাইরাস সতর্কতা আর বিধি-নিষেধের কারণে এভারেস্টের শিখরে যাওয়ার সব অভিযান বন্ধ করা হয়েছে। এই শূন্যতায় আমরা এভারেস্ট বেইস ক্যাম্প অঞ্চলের প্রকৃতিকে আরো নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ পাই।

এবার ফিরে যাওয়ার পালা। এখন মৃত্যু হলে আমি স্মৃতি বুকে নিয়ে মরব; অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়ে নয়। আমার স্মৃতিতে অমর হয়ে রইবে মার্চ ২০২০। মার্চ ২০২০—যখন সারা পৃথিবী থমকে দাঁড়িয়েছিল গভীর অসুখ বুকে নিয়ে, ঠিক সেই সময় একজন মানুষ পুরোদস্তুর ট্রেকারের সাজে, ব্যাকপ্যাক পিঠে সবুজ অরণ্য, তুষারিত প্রান্তর, নদী, পাথর, হিমবাহ ও পাহাড় পেরিয়ে অবিচলভাবে হেঁটে গিয়েছিল হিমালয়ে, এভারেস্টের দিকে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা