kalerkantho

সোমবার । ২৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ৮ মার্চ ২০২১। ২৩ রজব ১৪৪২

সমরেশ বসু কালের অভ্রান্ত পথিক

গৌতম রায়   

২২ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সমরেশ বসু কালের অভ্রান্ত পথিক

সমরেশ বসু (১১ ডিসেম্বর ১৯২৪—১২ মার্চ ১৯৮৮) ছিলেন কালের এক নিঃসঙ্গ পথিক। ১৯৪৬ থেকে ১৯৮৮ সাল—এই চল্লিশ বছর ব্যাপ্ত সাহিত্যজীবনে ভারতীয়, বিশেষ করে বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবনবৃত্তের ঘূর্ণাবর্তের সুলুকসন্ধানের ভেতর দিয়ে তিনি সময়ের এক অভ্রান্ত টিপছাপ রেখে গেছেন। মধ্যবিত্তের প্রত্যাশা—নিম্নবর্গীয়র যাপনচিত্র—সার্বিকভাবে জাতীয় আন্দোলন এবং স্বাধীন ভারত ঘিরে বাঙালির প্রত্যাশা, ছয়ের দশকের দোলাচল, সাতের দশকের ঘূর্ণাবর্ত, লেখকের নিজের জীবনের অন্তিম দশক, আটের দশকের সংকট-প্রত্যাশা-পাওয়া না পাওয়ার চিরন্তন দ্বন্দ্ব-বিরোধের ভেতরেই রামকিঙ্করকে কেন্দ্র করে ধ্রুপদিয়ানার খোঁজ—সমরেশকে বাঙালির অতি কাছের, অতি ভালোবাসার একজন মানুষ হিসেবে চিরদিনের জন্য গ্রন্থিত করে দেয়।

ব্যক্তি সমরেশের জীবনযুদ্ধের সূচনায় বিভাগপূর্ব বাঙালিসমাজের যে সংকট এবং সদ্যোবিভাজিত বাঙালিসমাজের সংকট ছিল প্রবল। প্রধানত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জেরে বাঙালির অর্থনৈতিক বনিয়াদটি তখন প্রায় বিধ্বস্ত। তেতাল্লিশের মন্বন্তর বাঙালির সামাজিক মূল্যবোধকে টলিয়ে দিতে শুরু করেছে। ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সামাজিক বিন্যাস, দেশভাগের করাল হাতছানি ব্যক্তি সমরেশকে যেভাবে আগ্নেয়গিরির প্রান্তসীমায় এনে দাঁড় করিয়েছিল, সেভাবেই বিধৃত হয়েছে তাঁর এ যুগের লেখাগুলো। তেভাগা আন্দোলন যে ছেচল্লিশের দাঙ্গাকে বাংলাব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারেনি—আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের এই সামাজিক নির্যাসের বিজয়বার্তা তাঁর ‘আদাব’ গল্পের ভেতরে উচ্চারণের ভেতর দিয়েই নিজের জয়যাত্রা শুরু করেছিলেন সমরেশ। ভুলে গেলে চলবে না যে তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের (বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর ও মানিক) প্রোজ্জ্বল উপস্থিতির ভেতরেই আত্মপ্রকাশ করে নিজের একটি প্রতিষ্ঠা গড়ে নিতে পেরেছিলেন সমরেশ। এঁরা মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের জীবনের বারোমাস্যা রচনা করে বাংলা সাহিত্যের পরিমণ্ডলে যে সামাজিক তাৎপর্যমূলক উপাদান সংযুক্ত করেছিলেন, সেই উপাদানকে সমাজের আরো ভূমিস্তরে পৌঁছে দিয়ে অন্তেবাসী মানুষজনের জীবন-জীবিকার বাস্তবমুখী সুলুকসন্ধানে প্রথম থেকেই ব্রতী ছিলেন সমরেশ।  সমরেশের বোধ হয় একটি লেখাও তাঁর ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার, পরিশ্রমের বাইরে নয়। সেই ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য হয়তো এমন জীবনও তাঁকে কখনো কখনো যাপন করতে হয়েছে, যার জন্য সামাজিকভাবে তাঁকে অনেক নাক সিটকানির সম্মুখীন হতে হয়েছে।

মানবিকতা আর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার যে মূলধন সমরেশের ছিল, তা তাঁর সমসাময়িক যুগে অনেকেরই ছিল না। আজকের দিনের লেখকদের কথা তো বাদই দিতে হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতোই প্রত্যক্ষভাবে বামপন্থী রাজনীতি করার অভিজ্ঞতা সমরেশের ছিল। জাতীয় আন্দোলনের সময়কালের জাতীয় ভাবাবেগকে যেমন সমরেশ প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তেমনি সেই জাতীয় ভাবাবেগের ফলের শূন্যতা, ক্ষমতা হস্তান্তরের যন্ত্রণা, দেশভাগের অব্যবহিত পরের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের পর্যবেক্ষণের আণুবীক্ষণিক চিত্রমালা সমরেশ নির্মাণ করেছেন ‘শ্রীমতী কাফে’ বা ‘সওদাগর’-এ। নিম্নবিত্তের মানুষের কাকুতি নিয়ে ‘উত্তরঙ্গ’ বা ‘গঙ্গা’র আবেদনের ভেতর দিয়েই তিনি যে কোন মাপের স্রষ্টা তা যেন আমাদের চিনিয়ে দিয়েছিলেন সমরেশ। মধ্যবিত্তের আজকের এই চরিত্রহীনতা এবং চরম পণ্যমুখিনতার বিবরণ তো তিনি রেখে গেছেন তাঁর ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘বিবর’-এ।

সমরেশের একেকটি উপন্যাস যেন কালের অভ্রান্ত টিপছাপ। ‘উত্তরঙ্গ’, ‘বি টি রোডের ধারে’, ‘শ্রীমতী কাফে’ পড়তে পড়তে পাঠক সময়ের টাইমমেশিনে চড়ে সহজেই গত শতকের দুই, তিন, চারের দশকে পৌঁছে যেতে পারেন। পারিপার্শ্বিক বাস্তবের যে কষ্টিপাথরে নিজের সাহিত্যজীবনের প্রথম দিকের এই উপন্যাসগুলো সমরেশ সৃষ্টি করেছিলেন, তার ভেতর দিয়ে তাঁর ভেতরে সব সময়ই ধ্বনিত হয়েছিল একটা সমষ্টিগত প্রতিবাদের অভিধারা। এটি ছিল সময়ের অভ্রান্ত প্রতিচ্ছবির একটা বাস্তবোচিত টিপছাপ। জাতীয় আন্দোলনের অভিঘাতে বাঙালিসমাজের একটা বড় অংশই তখন ব্যক্তি নয়, সমষ্টির চিন্তায়ই নিজেকে, নিজেদের সঁপে দিয়েছিল। সমষ্টির যূথবদ্ধতার যে পরিবেশ-প্রতিবেশের চিত্র সমরেশ এঁকেছিলেন ‘শ্রীমতী কাফে’ বা সমসাময়িক উপন্যাসগুলোতে, সেই সমরেশই মধ্যবিত্ত বাঙালির, পণ্যমুখিন হয়ে ওঠা বাঙালির, স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে ঘূর্ণমান বাঙালির ‘একক’ যাত্রায় পানসি ভাসানোর অভিপ্রায়ের কথা বিধৃত করলেন ‘বিবর’ উপন্যাসে। সময়ের প্রতিবিম্ব অঙ্কনে যে মুনশিয়ানা সমরেশ দেখাতে পেরেছিলেন, তেমনটা তাঁর সমকালে মূলধারা বা বিকল্পধারার বাংলা সাহিত্যে ছিল অপ্রতুল, আজও তেমনই দুর্লভ। ‘শ্রীমতী কাফে’র ট্র্যাজিক চরিত্র ‘ভজুলাট’।

বাঙালির এই সমষ্টি থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ার অভ্রান্ত সময়ের স্বরলিপি সমরেশ রচনা করেছিলেন তাঁর ‘বিবর’ উপন্যাসে। ছয়ের দশকে বাংলা ভাষায় এমন উপন্যাস ছিল রীতিমতো বৈপ্লবিক। ঘর ভাঙে, দেশ ভাঙে; ভাঙো-ভাঙো বিশ্বের মাঝে মানুষের অন্তরে মানুষের নিঃস্ব হয়ে ওঠার কাহিনি ‘বিবর’। এ উপন্যাস নিয়ে সেই সময়কালের মিস্টার ও মিসেস গ্র্যান্ডিদের কম আপত্তি ছিল না। সব আপত্তিকেই নীলকণ্ঠের মতো ধারণ করে সমরেশ সমষ্টি থেকে ব্যক্তির দিকে মানুষের এই অভিযাত্রার যে পাঁচালি রচনা করলেন মার্ক্সের দর্শন আর ফ্রয়েডের চিন্তাধারার সম্মিলিত স্রোতের মেলবন্ধনে, তা বাংলা সাহিত্যকে একদিকে পরীক্ষা, অন্যদিকে বীক্ষণের এক নয়া দিগন্তের সামনে এনে দাঁড় করাল।

মতাদর্শ আর মতাদর্শ ঘিরে মৌলবাদী প্রবণতার দ্বন্দ্বের এই যে চিরন্তন ত্রিভুজ সমরেশ রচনা করেছিলেন, সময়ের নিরিখে তা আজ আমাদের গোটা মানবসমাজের একটা বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে। সমরেশের লেখকজীবনের সূচনালগ্নে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোখে এই সংকট ধরা পড়েছিল। সমরেশের সমসাময়িক যুগে দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হাতে গোনা দু-একজন কথাসাহিত্যিক এই ক্রান্তিলগ্নের কথকতায় প্রয়াসী হয়েছিলেন। অমিয়ভূষণ মজুমদারের মতো ধ্রুপদিয়ানার সার্থক রূপকাররা তাঁদের অনুভূতিতে এই সংকট ফুটিয়েছিলেন। কিন্তু এই সংকটের সঙ্গে বসবাস করে, এই সংকটের সঙ্গে গেরস্তালি পাতিয়ে তাকে সাহিত্যের পরিমণ্ডলে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে এক এবং অনন্য হিসেবেই চিরদিন বাংলা সাহিত্যে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন সমরেশ বসু।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা