kalerkantho

রবিবার। ২২ ফাল্গুন ১৪২৭। ৭ মার্চ ২০২১। ২২ রজব ১৪৪২

স্বপ্নের বাহাদুরি

জিয়া হাশান   

১৫ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



স্বপ্নের বাহাদুরি

অঙ্কন : মাসুম

স্বপ্ন আমার ওপর বাহাদুরি চালায়। রাতে যা দেখায়, দিনে তা বাস্তবে ঘটায়। বেশ কিছু দিন থেকে তার এই বাহাদুরি চলছে। আমার ঘাড়ে সওয়ার হয়ে আছে। তবে শুরু আমার বসরে দিয়া।

সেদিন রাতের শেষ দিকে দেখি—বস মারা গেছেন। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্নও পাত্তারি গুটায়ে নেয়।

কিন্তু বস মারা যাবেন কেন? এইতো মাত্র কয়েক দিন আগে তার পঞ্চাশে আমরা ফেসবুকে হৈচৈ বাধাই। স্বনাম-বেনামের অ্যাকাউন্ট থেকে ছবিসহ পোস্ট দেই। তারপর আবার অফিসে কেক কেটে তার সঙ্গে সেলফি তুলি। তা ছাড়া তার চেয়ে বেশি বয়সের ঢের ঢের লোক জগৎ চষে বেড়াচ্ছে। করে-কেটে খাচ্ছে। সুতরাং তাদের বাদ দিয়ে তার পরপারে যাওয়ার দরকার পড়বে কেন?

বস এমনিতে ভালো মানুষ। গোলগাল চেহারার সঙ্গে জোড়া লাগানো হালকা-পাতলা দেহ। আমাদের একুশজনের মাথার ওপর তার ছড়ি। সকাল নটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তা তিনি ঘোরান।

আমাদের চাকরি এনজিওতে। এখানে করপোরেট হাউসের মতো বসিং, মানে বসের কথায় উঠবস করা, তার সব বাক্যে ঘাড় কাতানো নেই, বরং নিজ নিজ স্বাধীনমতো কাজ করার অবাধ সুযোগ আছে বলে বাজারে বেশ ওজনদার অভিমতের কারবার চালু আছে। আমাদের বসও তাই বলেন। বক্তৃতা-বিবৃতিতে মোটা হরফে লেখেন, জোর গলায় তুলে ধরেন। তবে অফিসের যেকোনো ডিসিশন তিনি একাই নেন। আমরা তারে গড়েপিটে মানুষ করে, ডোনারের চাহিদামতো চেহারাসুরত দিয়া, গহনাপাতি, ডাটা-উপাত্তে সাজায়ে তাদের কাছে হাজির করি। বস খুশিতে আমাদের পিঠ চাপড়ান, মেইলে থ্যাংক ইউ, ওয়েলডানের স্তূপ জমা করেন।

কিন্তু সমস্যা হলো—দুদিন পর পর তিনি ডিসিশন পাল্টান। কখনো কখনো একেবারে উল্টোপথে আমাদের টেনে নিয়ে যান। তখন এত দিন ধরে আগানো পথটা বিষণ্ন মনে আমাদের পানে তাকায়। ঘাড় ঘুরায়ে তার করুণ চাহনিতে আমাদের হাত-পা শিথিল হয়ে যায়। উদ্যমে ভাটার টান পড়ে। তবে বস সব সময় যে উল্টোপথ ধরেন তা নয়, বরং পাশের পথটা পানেও তাকান। সেটা তার কাছে সুন্দরী-সুঠামী মনে হয়। আমাদের তার পিছু ধাওয়া করতে বলেন। আমরা বিনা বাক্য ব্যয়ে তারে ফলো করি। তখন পাশে তাকায়ে দেখি ফেলে আসা পথটা হতাশায় ভেঙে চৌচির হয়ে আছে। তারে সান্ত্বনা দিতে আমাদের অনেকটা সময় কেটে যায়।

তবে বসের একক সিদ্ধান্তে আমাদের কোনো অসুবিধা হয় না। আমরা বরং ডিসিশন নেওয়ার ঝামেলা থেকে রেহাই পাই। মাথা ঘামানো থেকে মুক্তি মেলে।

শুনেছি, মনে মনে মানুষ যা চায়, কল্পনায় ছবি আঁকে, তা-ই স্বপ্নে এসে হানা দেয়। চোখের সামনে সাদা-কালো রূপ ধরে ভেসে ওঠে। কিন্তু আমি তো কখনোই এ রকম, আগাগোড়া নিজের সিদ্ধান্তে অটল, বসের মৃত্যু কামনা করি নাই। তাহলে স্বপ্নে তার এমন পরিণতি হলো কিভাবে? ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমের দেশে পাড়ি দেই। স্বপ্নের জগতে হামলে পড়ি। যার কিছুই আর সকালে মনে থাকে না। বরং তড়িঘড়ি করে অফিস পানে ছুটি।

তবে রিসিপশনে ঢুকেই টের পাই পরিবেশ লোহার মতো ভারী। জগদ্দল পাথরের মতো অনড়। তাই সবার চেহারাসুরত গাম্ভীর্যের মোটা কাঁথায় মোড়া। কারো মুখে উচ্চবাচ্য নাই। কী ব্যাপার? শুনি, এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের পরিচালক, আমাদের বস সাইদুর রহমান সাহেব হার্ট অ্যাটাকের কবলে পড়েন। গভীর রাতে তারে হাসপাতালে নেওয়া হয়। আরেকটু পরেই তার লাশ অফিসে আসবে। প্রাঙ্গণে প্রথম জানাজার আয়োজন চলছে।

আমার আর অফিসের ভেতরে পা দেওয়া হয় না। রিসিপশনের সোফাতেই ধপ করে বসে পড়ি। স্বপ্নের বাহাদুরিতে গায়ে ঘাম ঝরা শুরু হয়।

এই শুরু, তারপর একদিন দেখি—লিপিকা, আমার তিন বছরের প্রেমের বউ, অ্যাকসিডেন্টের শিকার হয়েছে। বড় রাস্তায় দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠে একবার ভাবি—আজ অফিসে যাব না। ফ্যামিলি ইমার্জেন্সি বলে ছুটির মেসেজ পাঠায়ে ওকে পাহারা দেব। সঙ্গে সঙ্গে থাকব। দেখে নেব স্বপ্ন কিভাবে তার বাহাদুরি দেখায়?

কিন্তু লিপিকার দেহটা নাজুক। রাতে চড়াও হতে গেলে না না করে ওঠে, শেষে চড়াও হলে উহ্ আহ্ কাতর ধ্বনি তোলে। আমার বুকের তলে দেহটা মোচড়ায়। তখন বুঝতে পারি তার শরীরটা এতটুকু, চড়ুই পাখির মতো ছোট। সুতরাং এতটুকু দেহের আঘাত লাগবে কোথায়? অ্যাকসিডেন্টটা হবে কিভাবে? তা ছাড়া ও তো কোনো চাকরি-বাকরিতে নাই। কেবল দোকানপাট, বাজার-ঘাটের জন্য বাইরে বের হয়। আমাদের টোনাটুনির সংসার, তাতে কী-ই বা লাগে। বাইরে বের হওয়ার অত দরকার পড়ে না। প্রায় সারাক্ষণই বাসায় থাকে। সিরিয়ালে সময় ভাসায়ে দিয়ে দিন পাড়ি দেয়।

ওদিকে অফিসে আজ আমার গুরুত্বপূর্ণ মিটিং। নতুন বসের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রথম দিন। মিস করা ঠিক হবে না। তাই লিপিকারে সাবধান করে দিয়ে অফিসের পথ ধরি।

দুপুরে যথারীতি হাসপাতাল থেকে ফোন। মিটিং-সিটিং রেখে ছুটি। কোথায় যেন পড়েছি—স্বপ্ন নিয়ে কারবারিরা বলেছেন, কখনো কখনো স্ব্প্ন তির্যকভাবে আসে। মানে একটা দেখালে আরেকটা হয়। যেমন নিজের গায়ে জ্বর দেখলে আশপাশের কেউ আক্রান্ত হবে। আবার আগেরকার আমলের রাজা-বাদশাহর জ্যোতিষীরা বলেছেন, স্বপ্নের ফল হবে বিপরীত। যেমন দেশে দুর্ভিক্ষ দেখলে সে বছর ফসলের বান ডাকবে। প্রজারা খুশিতে নাচবে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তার কোনোটাই হয় না। বরং স্বপ্ন যেন বুক চেতায়ে একেবারে সরাসরি সামনে এসে হাজির হয়। তাই হাসপাতালে পৌঁছে দেখি লিপিকার ডান হাতে ব্যান্ডেজ। আগাগোড়া সাদা কাপড়ে মোড়া। তবে আমাকে দেখে বেডে উঠে বসে—‘দুদিন পর তোমার বার্থডে। তাই গিফট কিনতে বের হয়ে রিকশা বড় রাস্তায় উঠতেই একটা হুতোমমুখো লেগুনা এসে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়...।’

—তোমাকে কিছু বলতে হবে না। আমি সব জানি। কাল রাতে স্বপ্ন তার বাহাদুরি দেখাতে গিয়ে সব দেখায়ে দিছে—তুমি সিটকে রাস্তায় পড়ে যাও। ডান হাতের ওপর লেগুনার চাকা গা তোলে। হাতের সঙ্গে তোমার সাধের স্মার্ট ফোনটাও চুরমারের ঘরে বসত নেয়।

সন্ধ্যায় লিপিকারে নিয়ে বাসায় আসি। ভাবি, স্বপ্নের বাহাদুরির থেকে বাঁচার উপায় কী? ঘুম এলেই তো তারা এসে হাজির হয়। ঝাঁকে ঝাঁকে চোখের পাতায় বসে। তাই তাদের অত্যাচার থেকে বাঁচার এক ও একমাত্র উপায়—না ঘুমানো। চোখরে একত্র না করা। পত্রপিত্রকায় মাঝে মাঝে দেখা যায়—অমুক দেশের তমুক না ঘুমানোর রেকর্ড করেছেন। বছরের পর বছর না ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। আমারও তাহলে তাদের দলে শামিল হতে হবে। কিন্তু লিপিকা অসুস্থ, তাই তার ওপর চড়াও হওয়া থেকে তারে মুক্তি দিয়ে সে রাতে বারোটা বাজার আগেই আমার ঘুমের দেশে পাড়ি জমানে সারা হয়ে যায়।

ফলে দেখি—ভার্সিটি লাইফের বান্ধবী রুমার সঙ্গে শহর ঘুরে বেড়াচ্ছি। পরদিন তাই ফুরফুরে মেজাজে অফিসে যাই।

ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারেই রুমার সঙ্গে পরিচয়। পানপাতা মুখের সুন্দরী বালিকা সে। তারপর টানা চার বছর ধরে ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু তার মাথায় গিয়া হঠাৎ এক কূটনীতিককে বিয়া করে বিদেশে পাড়ি জমায়। সে-ই থেকে সোয়ামির সঙ্গে বিদেশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ বছর এ দেশের রাজধানীতে তো পরের বছর আরেক দেশের। তবে মাঝে মাঝে দেশে আসে। একবার এসে অফিসে আমার সঙ্গে দেখা করে গেছে।

এখন নিশ্চয়ই কোনো ছুটিছাটায় দেশে আছে। তা না হলে স্বপ্ন দেখাবে কেন। তাই আশায় আশায় থাকি—ও আসবে। রিসিপশন থেকে ফোন দেবে। আমি নিচে নেমে গিয়ে ওর সঙ্গে ঘুরতে বের হব। অফিসে তাই সেকেন্ড হাফে ছুটির কথা বলে রেখেছি।

ঠিক করেছি—দুজনে আজ পুরো আগের জামানায় ফিরে যাব। তাই টিএসসির চা দিয়ে শুরু হবে আমাদের ঘোরাঘুরি। তারপর পাবলিক লাইব্রেরির সামনে ফুচকা-চটপটি, শাহবাগের আজিজ মার্কেটের লুচি-আলুর দম—কিছুই আজ বাদ রাখব না। তাই বাসায় ফিরতে দেরি হবে বলে লিপিকারে জানায়ে রেখেছি। সুতরাং সব দিকই আমার পরিপাটি করে সাজানো-গোছানো। কেবল রুমার আসা বাকি।

কিন্তু দুপুর পার হয়ে বিকেল এসে হাজির হয়। তার পরও তার দেখা নাই। ঘোরাঘুরির সময় পার হয়ে গেলে আশায় আশায় থাকি—ও অন্তত একটা ফোন করবে। নিদেনপক্ষে ফেসবুকে একটা নক। তা না হলে স্বপ্ন এভাবে দেখাবে কেন—তারে নিয়া শহরের এমাথা-ওমাথা ঘুরে বেড়াচ্ছি। রিকশায় পাশাপাশি বসে হাসি-ঠাট্টায় এ ওর গায়ে ঢলে পড়ছি।

শেষ পর্যন্ত ফোন বা নক—তার কিছুই মেলে না। তাহলে নিশ্চয়ই স্বপ্নের বাহাদুরি শেষ। আমারে নিয়া তার খেলায় ইতি। যাক বাবা! বাঁচোয়া, বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অফিস থেকে যথাসময়ে বাসায় ফিরি। সঙ্গে লিপিকার পছন্দের রেস্টুরেন্ট থেকে দুই প্লেট কালাভুনা।

তবে কিছুদিনের মধ্যে সে, স্বপ্নের বাহাদুরি ফিরে আসে। মাস দেড়েকের মাথায় আমার ঘাড়ে সওয়ার হয়। তখন একদিন দেখি—অফিসের নতুন বসের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না। তাই তিনি তার রুমে ডেকে নিয়ে টার্মিনেশন লেটার ধরায়ে দেন—‘দেখুন, ডোনাররা হাত গুটিয়ে নিছে। তারা আর আগের মতো দরাজ দিল নাই। তাই অর্গানাইজেশনের পক্ষে এত স্টাফ রাখা আর সম্ভব হচ্ছে না। তা না হলে আপনার মতো কম্পিনেন্ট, রিলায়েবল স্টাফরে কি আমরা হারাই।’

পরদিন অফিস থেকে কাগজপত্র নিয়ে বাসায় ফিরলে আবার বেকার জীবন শুরু হয়। দিন দিন তা ভারী হতে থাকে। ধারদেনা দ্রুত মোটাতাজা হয়ে ওঠে। দিনগুলোরে অস্থির করে তোলে।

একদিন দেখি—দুজনের বদলে একজন হলে বেকারত্বের বোঝা হালকা হয়। ধারদেনা চিকন-পাতলা। তাই লিপিকার মুখে বালিশ চাপা দেই। সে হাত-পা ছোড়ে। বিছানা তোলপাড় করে। আমিও বালিশে সর্বশক্তি নিয়োগ করি। শেষে নিথর হয়ে গেলে বালিশ তুলে নিলে লিপিকার চোখ আমার দিকে নিষ্পলক তাকায়ে থাকে।

ভয়ে ছটফট করে বিছানায় উঠে বসি।

মন্তব্য