kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

২০২০ : সাহিত্যের ক্ষতি শিল্পের সম্ভাবনা

মোজাফ্ফর হোসেন

মোজাফ্ফর হোসেন   

১ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



২০২০ : সাহিত্যের ক্ষতি শিল্পের সম্ভাবনা

২০২০ সাল পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে অভিশপ্ত বছরের একটি। এর আগে মানবসভ্যতা নানা রকম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে এসেছে। প্লেগ, বসন্ত ও কলেরার মতো অতিমারিতে ঝরে পড়েছে কোটি কোটি জীবন। গত ২০০ বছরে সাতবারের মতো কলেরা অতিমারিতে আক্রান্ত হয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশসহ গোটা বিশ্ব। করোনাভাইরাসের ১০০ বছর আগে এসেছিল মরণঘাতী স্প্যানিশ ফ্লু। কিন্তু এর আগে দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রায় সব দেশ করোনার মতো এমন একটি অতিমারিতে একই সঙ্গে আক্রান্ত হয়নি। অতিমারির পাশাপাশি ৪০ বছরের মধ্যে দুটি বিশ্বযুদ্ধে আক্রান্ত হয়েছে বিশ্ব। কিন্তু তখনো সব দেশ একসঙ্গে এভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি। 

২০২০ সাল হয়তো পৃথিবীর ইতিহাসে লেখা থাকবে ‘করোনা-ইয়ার’ নামে। বাংলাদেশে করোনা-আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয় ২০২০ সালের মার্চ মাসে। এরপর যা কিছু ঘটে চলেছে তার কোনো কিছুই আমাদের অজানা নয়। কভিড-১৯ একদিন থাকবে না নিশ্চিত, অন্য আর সব অতিমারির মতো এটাও কাটিয়ে উঠবে বিশ্ব, কিন্তু এই সময়টায় আমাদের যে ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে তা অপূরণীয়। অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা সবাই বলছেন। কিন্তু দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চা ও শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনের যে ক্ষতি সেটিও কম না। এ বছর করোনা কিংবা করোনাকালীন অন্যান্য শারীরিক জটিলতায় আমরা দেশের অগ্রগণ্য কয়েকজন বুদ্ধিজীবী, কবি, সাংবাদিক, লেখককে হারিয়েছি।

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন আমাদের অভিভাবক। দেশের যেকোনো সংকটে তাঁর বাণীর মধ্যে মানুষ সমাধান খুঁজতেন। তাঁর রচিত ও সম্পাদিত বিভিন্ন গ্রন্থ আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁকে আমরা হারালাম। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২০ মে চলে গেলেন ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা, বরেণ্য সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে শুরু করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন—সব জায়গায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। চলে গেলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর। তিনি একাধারে চিত্রশিল্পী, ভাষাসংগ্রামী, গবেষক ও ঔপন্যাসিক। ১৭ আগস্ট চলে গেলেন অনন্যা পুরস্কারজয়ী দেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী সাঈদা খানম। শুধু আলোকচিত্রী নয়, তিনি বাংলাদেশ লেখিকা সংঘের সাধারণ সম্পাদকও। তাঁর ছোটগল্প, উপন্যাস, ফিচার, সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। সাংবাদিক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক রাহাত খানকেও আমরা হারালাম। তিনি বাংলাদেশের ছোটগল্প, প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও উপন্যাসে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন। তাঁর মতো রশীদ হায়দারও বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখাকে সমৃদ্ধ করেছেন। রশীদ হায়দারও চলে গেলেন বিদায়ী বছরের ১৩ অক্টোবর। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মকবুলা মনজুর ৩ জুলাই প্রয়াত হন। মকবুলা মনজুরের গল্প, উপন্যাসে এ দেশের বিস্তৃত জনজীবন ও সংগ্রামমুখর মানুষের আখ্যান উঠে এসেছে। শিশু-কিশোর সাহিত্যেও তিনি রেখেছেন স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর। আবুল হাসনাতের বিদায় আমাদের সম্পাদনা জগতে অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি কবি, চিত্রসমালোচক হিসেবেও সুখ্যাত। সর্বশেষ মাসিক কালি ও কলম পত্রিকায় সম্পাদনার সঙ্গে যু্ক্ত ছিলেন। কবি, লোকবিজ্ঞানী ও বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক ড. আশরাফ সিদ্দিকী এবং জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকেও স্মরণ করছি। তাঁরা ছিলেন আমাদের সাহিত্যজগতে বটবৃক্ষের মতো। 

বছরের শেষ দিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক, কবি ও প্রাবন্ধিক মনজুরে মওলা। তিনি বাংলা একাডেমির সফল মহাপরিচালক ছিলেন। বরেণ্য নাট্যজন, লেখক, মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের প্রয়াত হন ২৭ নভেম্বর। তিনি বাংলাদেশের মঞ্চ ও টেলিভিশন নাটকে এক ঐতিহাসিক নাম। প্রখ্যাত নাট্যজন মান্নান হীরা ২৩ ডিসেম্বর প্রয়াত হন। তিনি বাংলা গণনাটকের ধারাকে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ করেছেন।

চলে গেলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর শতাধিক গ্রন্থ লিখেছেন। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, লেখক ও অধ্যাপক আলী আসগর ১৬ জুলাই প্রয়াত হন। বাংলাদেশে বিজ্ঞানসাহিত্যে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ার আন্দোলনেও তিনি ছিলেন পুরোধা মানুষ। জনপ্রিয় ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক মুক্তিযোদ্ধা আলম তালুকদার চলে গেলেন ৮ জুলাই। শিশুসাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তাঁর শক্ত অবস্থান ছিল। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ৮০টিরও বেশি।

এ ছাড়া এ বছর আমরা হারিয়েছি বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক অধ্যাপক শিশিরকুমার ভট্টাচার্য। তাঁর বিজ্ঞানবিষয়ক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই আমাদের ঋদ্ধ করেছে। বিশিষ্ট কবি ও সাংবাদিক মাশুক চৌধুরী প্রয়াত হয়েছেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত অনুবাদক জাফর আলম প্রয়াত হয়েছেন। উর্দু সাহিত্যের অনুবাদের মাধ্যমে তিনি আমাদের সাহিত্যভুবনকে সমৃদ্ধ করেছেন। বিশিষ্ট গবেষক-সম্পাদক, অভিধান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইউম প্রয়াত হয়েছেন। চলে গেছেন বরেণ্য সংগীতজ্ঞ আজাদ রহমান। তিনি একাধারে সংগীত পরিচালক, সুরকার, চলচ্চিত্রজন। চলে গেলেন অভিনেতা ও নাট্যজন আবদুল কাদের।

পৃথিবীর সবখানে যখন মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটছে, উগ্রতা ও অসহিষ্ণুতা পৃথিবীর শান্তি ও সম্প্রীতি নষ্ট করছে, তখন আমাদের মতো দেশের প্রধান প্রধান অসাম্প্রদায়িক কবি, লেখক, শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের প্রায় একসঙ্গে এভাবে চিরপ্রস্থান যে ক্ষতি করে দিয়ে যাচ্ছে, তা সত্যিই ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার। যাঁরা প্রয়াত হয়েছেন তাঁরা আমাদের জাতির সংগ্রাম ও উত্থানপর্বের ইতিহাসের রচয়িতা, প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তাঁরা আমাদের শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে অভিভাবকের ভূমিকায় ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতি আমাদের প্রগতিশীল চেতনায় শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে। জাতি বিভ্রান্ত হলে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে উত্তরণের পথ বের করে দিয়েছেন। একটি বছরে দেশের শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রের এতগুলো বিদগ্ধ মানুষের প্রয়াণ আমাদের জাতীয় ক্ষেত্রে বিরাট ও অকল্পনীয় ক্ষতি।    

তবু আশার কথা এই যে মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। সৃষ্টিশীলতা কখনো থেমে থাকে না। মহামারি, অতিমারি যেমন ছিনিয়ে নেয়, তেমন নতুন নতুন উপকরণ দিয়ে সমৃদ্ধ করে শিল্প-সাহিত্যকে। ড্যানিয়েল ডিফোর ‘আ জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার’, আলেসান্দ্রো মানজির উপন্যাস ‘দ্য বিট্রথেড’, আবেয়ার ক্যামুর ‘প্লেগ’, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’, হোসে সারামাগোর ‘ব্লাইন্ডনেস’, ওরহান পামুকের ‘নাইটস অব প্লেগ’ ইত্যাদি মাস্টারপিস তার জ্বলন্ত প্রমাণ। ২০২০ সালে করোনার থিমনির্ভর সর্বাধিক পরিমাণ গল্প, কবিতা লিখেছেন আমাদের লেখক, কবিরা। করোনা থেকে লেখা হয়েছে গান, নির্মিত হচ্ছে নাটক। শিল্পীরা ছবি আঁকছেন করোনার ফলে সৃষ্ট নানা সামাজিক ও ব্যক্তিগত সংকটের গল্প নিয়ে। হয়তো দেখা যাবে আগামী দিনে করোনা অতিমারি অবলম্বনে ‘প্লেগ’-এর মতো বিশ্বমানের উপন্যাসও লেখা হচ্ছে বাংলা ভাষায়।ল্পের সম্ভাবনা



সাতদিনের সেরা