kalerkantho

মঙ্গলবার। ৫ মাঘ ১৪২৭। ১৯ জানুয়ারি ২০২১। ৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

যেভাবে গল্প পড়ি ১১
আবু রুশদের গল্প

বিকল্প বেহেস্ত ও বেড়া

আহমাদ মোস্তফা কামাল

৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আবু রুশদ বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের গল্পকার। চল্লিশের দশকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার যে কজন লেখক তাঁদের গল্প-উপন্যাসে এই অঞ্চলের মানুষের কথা বলতে শুরু করেছিলেন, তিনি তাঁদেরই একজন। অর্ধশতাব্দীর গল্পচর্চাকালে তাঁর পরিবর্তন ও বিকাশ ব্যাপক ও বিস্ময়কর। তাঁর গল্পে ধারাবাহিক পাঠ যেকোনো পাঠককে বলে দেবে—তিনি সময়ের সঙ্গে হেঁটেছেন সর্বদা, তাঁর রচনা সব সময়ই একজন তরুণের মতো বৈচিত্র্যপিয়াসি ও সমসাময়িক। তাঁর বিষয় নির্বাচন, ভাষা ও নির্মাণশৈলী সব কিছুর মধ্যে রয়েছে বদলে যাওয়া সময়ের চিহ্ন; সমসাময়িকতা ও তারুণ্যের উজ্জ্বল উদাহরণ।

লেখালেখির শুরুতে মিষ্টি প্রেমের গল্প লিখলেও পরবর্তীকালে নিজেকে আমূল বদলে ফেলেন আবু রুশদ; হয়ে ওঠেন মানব-স্বভাব, মানবজীবন, দেশ ও জাতির ধ্রুপদি চিত্রকর। এই পর্যায়ে এসে তিনি প্রায় নিস্পৃহ-নির্বিকারভাবে সব শুভ সম্পর্কের ওপর বাজ ফেলেছেন; আপাত সুখী-সামাজিক মানুষের ভেতর থেকে বের করে এনেছেন ক্রূর সাপ। যে আবু রুশদের দেখা আমরা তাঁর প্রথম দিকের গল্পে পাই, এখানে তিনি তা নন; সহজ-সরল গল্প আর বলেন না তিনি; মিষ্টি ভাষায় মিলনাত্মক কাহিনি আর তাঁর নয় এখন—বরং নির্মোহ-নিরাসক্ত লেখক এখন মানুষের সকল ভণ্ডামি-বদমায়েশি-প্রতারণার ছবি আঁকার নিপুণ শিল্পী। মূলত এই পরিবর্তনই আবু রুশদের বৈশিষ্ট্য; পরবর্তীকালে যা আরো তীব্র হয়ে উঠেছে।

শেষের এই গল্পগুলোতে যেমন তাঁর দার্শনিক প্রতীতির দেখা মেলে তেমনই আখ্যানপর্ব, নির্মাণ-কৌশল, প্রতীকময়তা, রূপকল্প সবই একজন অত্যন্ত শক্তিমান লেখককে তুলে ধরে। ‘পিথাগোরাস’ ‘রদবদল’ ‘খালাস’ ‘বেড়া’ ‘ছিনতাই’ ‘বিকল্প বেহেস্ত’ ‘পাবনা-রাজশাহী এক্সপ্রেস’ এই ধরনের গল্প। এর মধ্যে ‘বেড়া’ ও ‘পাবনা-রাজশাহী এক্সপ্রেস’ আবার বিশেষ উল্লেখযোগ্যতার দাবি রাখে। ‘বিকল্প বেহেস্ত’ ‘ছিনতাই’ ‘রদবদল’ গল্পগুলো সামান্যের মধ্যে অসামান্যের আভাস দেয়। ‘খালাস’ মুক্তিযুদ্ধের অনবদ্য চিত্রায়ণ। এর মধ্যে অন্তত দুটি গল্পের সঙ্গে সংক্ষেপে পরিচয় করিয়ে দিই আপনাদের।

‘বিকল্প বেহেস্ত’ গল্পটির কথা ধরা যাক। ‘নুরানী চেহারা’র মওলানা শুকুর সাহেব ষাটোর্ধ্ব বয়সেও ‘জোয়ানীর তাকত’ ধরে রেখেছেন। তার ‘বেগম কিন্তু পঞ্চাশ বছর বয়সে চুমসিয়ে গেছেন, কোনো খায়েশ জাগাতে পারেন না। আর পঁয়ত্রিশ বছর ধরে একই পাত্রে বীর্য রাখলে কোন পাত্রকেই আর তত মনোলোভা ঠেকে না।’ অতএব মওলানা শুকুর সাহেবকে নতুন ‘মনোলোভা পাত্র’ খুঁজে নিতে হয়—এক দেহোপজীবিনী। মওলানা সাহেব সবিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র—‘ভক্ত ও মুরীদের সংখ্যাও কম নয়।’ ‘সাংসারিক ও জাগতিক জ্ঞান’ তার ‘প্রখর’ হলেও মানুষের কাছ থেকে শ্রদ্ধা-ভক্তি-নজরানা পেতে অসুবিধা হয় না। তো এহেন শ্রদ্ধাভাজন মওলানার প্রকৃত স্বরূপ বেরিয়ে পড়ে ওই মেয়েটির কাছে। গোপনে লুকিয়ে তিনি তাঁর ‘তাকত’ প্রদর্শন করেন মেয়েটির কাছে। মেয়েটিও বিস্মিত—‘এই বয়সে এতটা শক্তি আসে কোত্থেকে?’ দুই সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী চরিত্র ও অবয়ব নিয়ে শুকুর সাহেব সমান্তরাল জীবন যাপন করে যান। গল্পের শেষে মেয়েটির বুকেই তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু ‘পরের দিন ঢাকার প্রত্যেক দৈনিকে খবরটা বেরোয়; মওলানা আবদুস শুকুর সাহেব গতদিন দ্বিপ্রহরে নিজের কায়েত্টুলির বাসভবনে ইহলীলা সম্বরণ করিয়াছেন (ইন্নালিল্লাহে...রাজেউন)। গত কয়েক সপ্তাহ ধরিয়াই তাঁহাকে একটু পরিশ্রান্ত লক্ষ করা যাইতেছিল। গতকাল জোহরের নামাজের পরে এবাদৎ করিবার সময় মওলানা সাহেবের শরীর হঠাৎ অসুস্থ হইয়া পড়ে কিন্তু ডাক্তার আসিবার আগেই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হইয়া তিনি এন্তেকাল করেন। ...এমন ধর্মভীরু ও নিষ্কাম ব্যক্তি আজকাল আর সচরাচর দেখা যায় না।’

যে দ্বৈতজীবন শুকুর সাহেব যাপন করেছেন, মৃত্যুতেও তারই ছায়া। মৃত্যুসংবাদে ‘জোহরের নামাজের পর এবাদৎ করার সময়’ তো ডাহা মিথ্যা কথা। ওই সময় তিনি ছিলেন মেয়েটির সঙ্গে সঙ্গমরত। তিনি ছিলেন এক, মানুষ জানল আরেক। কোনটা তার জন্য কিংবা মানুষের জন্য সত্য? গল্পে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। হয়তো উত্তরের প্রয়োজনও নেই; হয়তো মানুষের এই দ্বৈতচরিত্রই—যদিও তা পরস্পরবিরোধী ও বিপরীত ধর্ম—সত্য ও স্বাভাবিক। এই গল্পে লেখক নির্মোহ-নিস্পৃহতায় মওলানা সাহেবের চরিত্র এঁকেছেন—তাঁর দ্বান্দ্বিক দ্বৈতচরিত্র চিত্রায়ণের জন্য নিজ ঘরে যেমন, তেমনই মেয়েটির সঙ্গে সঙ্গম দৃশ্যের অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন। গল্পটি পাঠককে ভাবায়—কেন আপাতদৃষ্টিতে সৎ, নিষ্কাম, ধার্মিক একজন মানুষকে লেখক অন্য একটি রূপে পরিচিত করালেন? মনে হয়, তিনি যেন সকল শুভবোধের ওপর নিরাসক্ত সন্তের মতো বাজ ফেলেই যাবেন।

আরেকটি গল্প ‘বেড়া’। এই গল্পটি যতটা না আখ্যানের জন্য তার চেয়ে বেশি এর নির্মাণ-কৌশলের জন্য বহুদিন পাঠকের কাছে আদরণীয় হয়ে থাকবে। এ রকম আঙ্গিকের গল্প বাংলা সাহিত্যে আর একটিও আছে কি না জানি না। গল্পের প্রথম বাক্য—‘কায়সার হঠাৎ মাটিতে ঢলে পড়ে মারা গেলো।’ খ্যাতিমান ডাক্তার কায়সার এরপর প্রবেশ করে অন্য এক জগতে—আর মৃত্যু-পরবর্তী এ জগিটই তার প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরে। ওই জগতে প্রথমেই তার ‘দেখা’ হয় তারই এক রোগীর সঙ্গে যে রোগগ্রস্ত হয়ে তার কাছে এসেছিল; কিন্তু ফি দিতে পারেনি বলে চিকিৎসা পায়নি। মৃত্যুপথযাত্রী জেনেও তার যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা করেনি কায়সার। ‘মহৎ পরোপকারী’ ডাক্তার কায়সারের ইমেজটি প্রথম ধাক্কাতেই এভাবে ভেঙে পড়ে। ওই রোগীর কাছ থেকেই সে জানতে পারে অনেক তথ্য—তার স্ত্রীর ফষ্টিনষ্টির স্বভাব ইত্যাদি। অতঃপর তার ‘দেখা’ হয় একটি মেয়ের সঙ্গে—যে তাকে ভালোবেসেছিল; কিন্তু টাকার লোভে কায়সার বিয়ে করেছিল অন্য আরেকজনকে। জানা গেল, সেই স্ত্রীর সঙ্গেও সে প্রতারণা করেছিল। ‘ভালো মানুষ’ কায়সারের লোভী-প্রতারক চরিত্রটিও এবার পরিষ্কার হলো। এভাবে সে ওই মৃত্যু-পরবর্তী জগতে বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় আর তার বহুমাত্রিক চরিত্র পরিষ্কার হয়ে ওঠে। আশ্চর্য কোনো এক উপায়ে নিজ কন্যাকে দেখার সুযোগ পেলে—কন্যার ডায়েরির পাতা পড়ার সুযোগ পায় সে এবং বেদনাহত হয়ে লক্ষ করে—আদর্শ ও মহত্ত্বের মডেল হিসেবে কন্যার কাছে নির্বাচিত হয়েও তার প্রতারণা ও শঠতা ধরা পড়ে গেছে। দুর্বিষহ এই জগৎ তাকে পাগল করে দেয়—প্রতি মুহূর্তে নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে হচ্ছে তাকে, নিজেরই যাবতীয় নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে—কতক্ষণই বা এসব সহ্য হয়? পালানোর জন্য সে ছুটতে থাকে এবং ছুটতে ছুটতেই সে দেখতে পায়—‘সামনে একটা রূপালী বেড়ার উপর সৌম্যদর্শন এক প্রৌঢ় চুপ করে বসে আছে। তার পেছনেই বিরাট এক উঁচু প্রাচীর। পরিষ্কার আলোতে সোনালী হর্ষে এক গ্রহাতীত দ্যুতি ছড়াচ্ছে। সেই উঁচু প্রাচীর ছাড়িয়ে ধবল শুভ্রতায় এক বিশাল গম্বুজ নীল আসমানকে তসলিম জানাচ্ছে। আর কিছু দেখা যায় না, অথচ নিশ্চিত প্রত্যয়ের মত মনে হয়—বেড়ার ওপারে আলাদা এক জগৎ—

— আমাকে একটু বেড়া পার হতে দাও।

— সময় হলে পেরুবে।

— এখন যে অবস্থায় আছি মনে হয় তার চেয়ে মওতও ভাল।

— তুমি কি মনে করো তুমি বেঁচে আছ?

— বেঁচে নেই! তবে আছি কোথায়? যেখানে আছি তার চেয়ে তো দোজখও ভাল।

— তুমি কি মনে করো তুমি অন্য কোথাও আছ?

গল্প এখানেই শেষ হয়ে যায়। আর পাঠকরা বিমূঢ় বিস্ময়ে আবিষ্কার করেন—এ রকম অনন্যসাধারণ গল্প পাঠের অভিজ্ঞতা তাদের নেই বলতে গেলে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা