kalerkantho

মঙ্গলবার। ৫ মাঘ ১৪২৭। ১৯ জানুয়ারি ২০২১। ৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

যেখানে হিমালয়, যেখানে এভারেস্ট

তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে

ইফতেখারুল ইসলাম

৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে

ভোরের আলো ফুটেছে। সূর্যোদয় হয়েছে কি হয়নি বোঝা যায় না। আমাদের ছোট প্লেন ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের রানওয়েতে একটু ছুটে গিয়ে সময়মতো টেক অফ করে। খুব বেশি উঁচুতে ওঠে না এই প্লেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই শহর ছাড়িয়ে পাহাড়ের রাজ্যে ঢুকে পড়ি আমরা। উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় তুষার সাদা হয়ে আছে। ভোরের নরম রোদে আলোকিত হয়ে উঠছে চারদিক। কখনো প্লেনটা একটা পাহাড়ের গা ঘেঁষে উড়ে যায়, কখনো দুই পাহাড়ের মাঝখানের ফাঁকটুকু দিয়ে বেরিয়ে যায় সন্তর্পণে। সামনে আরো পাহাড়, আগের চেয়েও উঁচু।

কোনো পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যের আলো ঝলমল করে। কোনো কোনো পাহাড় এখনো ছায়ায় অন্ধকার। দুই পাশের পর্বতশ্রেণির মাঝখানে কোনো উপত্যকায় ছবির মতো ছোট ছোট ঘরবাড়ি। প্লেনের সব যাত্রী ছবি তুলতে ব্যস্ত। লুকলা যাওয়ার পথে বাঁ দিকের দৃশ্যগুলো বেশি সুন্দর। আমি প্রাণভরে তা উপভোগ করি। কিন্তু আমরা চলেছি এই দৃশ্যের আরো অনেক গভীরে, হিমালয়ের আরো কাছে। লুকলা থেকে হেঁটে, ট্রেক করে যাব এভারেস্ট বেইস ক্যাম্প পর্যন্ত।

একটু পর পাহাড়ের ভিড় থেকে প্লেন নামতে শুরু করে। কিন্তু নামবে কোথায়? চারদিকেই তো পাহাড়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ঠিক ৩৫ মিনিট হয়েছে। এখন ভয় হয়, আমাদের প্লেন একটুখানি নেমে সঠিক উচ্চতায় থেকে তার ছোট ছোট চাকা দিয়ে রানওয়ের ঠিক অংশটি স্পর্শ করতে পারবে তো? সামনের পাহাড়ের গায়ে দেখি ছোট একটা সমতল জায়গা। হ্যাঁ, ওটাই লুকলা। বেশিক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হয়নি। প্লেনের চাকা রানওয়েতে নেমে ছুটে চলেছে। ছোট্ট একটু রানওয়ের শেষ প্রান্তে ইংরেজিতে বড় করে লুকলা লেখা। তার সামনে পৌঁছে প্লেনটা দ্রুত ডান দিকে ঘুরে জোরে ব্রেক করে থেমে যায়। এখানেই নামতে হবে আমাদের।

কয়েকটা মাত্র সিঁড়ি। নেমে এসে দাঁড়াই, চারদিকে তাকিয়ে দেখি। দুটি প্লেন, বেশ কজন যাত্রী, অন্যান্য কর্মী, অদূরে পাহাড় আর আমার শরীরজুড়ে এক আশ্চর্য শিহরণ। এইখানে হেঁটেছেন স্যার এডমন্ড হিলারি। এয়ার স্ট্রিপ তৈরির কাজ করেছেন শ্রমিকদের নিয়ে। আসা-যাওয়ার পথে, কাজ চলাকালে এখানেই তাঁবুতে তিনি কাটিয়েছেন বহুদিন। আশ্চর্য ধীরস্থির, শান্ত ছিল তাঁর মন। ছিলেন হিমালয়ের মতোই উদার ও উদাসীন।

পাহাড়ের ওপরে একটুখানি স্থান নিয়ে লুকলা এয়ারপোর্টের ছোট্ট রানওয়ে আর যাত্রী নামানোর সামান্য জায়গা। হিলারির তত্ত্বাবধানে ১৯৬৪ সালে তৈরি হয় এই ছোট্ট বিমানবন্দর। গ্রামের ভেতরে সমতলে জমি খুঁজেছিলেন তিনি। চাষিরা জমি দিতে রাজি হয়নি বলে শেষমেশ পাহাড়ের ওপরের এই জমিটুকু শেরপাদের কাছ থেকে দুই হাজার ৬৫০ মার্কিন ডলার দিয়ে কিনে নেন হিলারি। তৈরির কিছুদিন পর তিনি এয়ারপোর্টটা নেপাল সরকারকে দিয়ে দেন। তার পরও বহু বছর এর দেখাশোনা এবং অনেক খরচ হিলারিকেই করতে হয়েছে। ২০০১ সালে এর রানওয়ে পাকা হয়েছে। ছোট্ট টার্মিনাল ভবনটি নির্মিত হয় আরো পরে। ২০০৮ সালে তেনজিং ও হিলারির নামে এর নামকরণ করা হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এয়ারপোর্ট হিসেবে চিহ্নিত লুকলা তার এই বিশেষ মর্যাদা ধরে রেখেছে টানা কুড়ি বছর।

সব ধরনের প্লেন সেখানে যেতে পারে না। টুইন ওটার, ডর্নিয়ার ডু ২২৮, এল-৪৮০ টার্বোলেট—এই ধরনের ছোট এবং অল্প দৌড়ে ওঠা-নামা করা প্লেন যায়। যান্ত্রিক সহায়তা ছাড়া, চোখে দেখে দেখে পাইলট প্লেন নিয়ে নামে ওখানে। এই নেমে আসা আর ল্যান্ডিংটা আসলেই ঝুঁকিপূর্ণ। আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনুকূল ও পরিষ্কার হলে সেটা সম্ভব। 

টার্মিনাল ভবন মানে ছোট একটা ঘর। সেখানে গিয়ে আমরা লাগেজ সংগ্রহ করি। এই ফ্লাইটে বাংলাদেশ থেকে আরেকজন নবীন ট্রেকার এসেছে। তার নাম নিম্নি। এখানে তেজ আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় পোর্টারদের সঙ্গে। একরাজ আর তিলক। স্লিম, ফিটফাট, হাসিমুখের উজ্জ্বল দুটি তরুণ। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা একটা ছোট রেস্তোরাঁর দিকে যাই। চারদিকে পাহাড় এত কাছে, এত রাজসিক! কফি খেতে খেতে তেজ গাইড হিসেবে ছোট্ট করে বুঝিয়ে বলে, আজ আমাদের লক্ষ্য কী। করণীয় কী। এখন আমরা কোন জায়গায়, আর এখান থেকে কোথায়, কিভাবে, কতক্ষণে যাব।

লুকলা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার ৮৪০ মিটার উঁচুতে। আমরা উড়ে এসেছি কাঠমাণ্ডু থেকে, যা এক হাজার ৩৫০ মিটার উচ্চতায়। এখান থেকে এভারেস্ট বেইস ক্যাম্প পর্যন্ত ট্রেক করে যাব। ইবিসির উচ্চতা পাঁচ হাজার ৩৬৪ মিটার—১৭ হাজার ৫৯৮ ফুট। অর্থাৎ লুকলা থেকে ইবিসি পর্যন্ত আমাদের দুই হাজার ৫২৪ মিটার উঁচুতে উঠতে হবে। এর জন্য হাঁটতে হবে ৬২ কিলোমিটার, আনুমানিক এক লাখ ১৫ হাজার স্টেপস। শেষ লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমাদের লাগবে আট দিন। দুটি দিন একলাইমেটাইজেশনের জন্য। আর ফেরার সময় পাঁচ দিনে এই ৬২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ফিরব। টানা ১৩-১৪ দিন ধরে হাঁটা। যাওয়ার পথে দুধকোশি আর ইমজা নদী কয়েকবার পার হব। সব মিলিয়ে মোট ৯টা ঝুলন্ত সেতু পার হতে হবে আমাদের। ফেরার পথেও তাই।

ট্রেকিংয়ের পথটা কেমন সেটা আগে থেকে জানার উপায় নেই। তবে ট্রেকিং শেষ করার পর আমাদের গাইড তেজের সঙ্গে এই নিয়ে আমার বিস্তারিত আলাপ হয়েছে। এই ট্রেকিংয়ের পথের অন্তত ৩০ শতাংশ হচ্ছে খাড়া চড়াই। আর ৩৫ শতাংশ হচ্ছে ধারাবাহিক চড়াই। এ ছাড়া আছে ১৫ শতাংশ উতরাই আর ২০ শতাংশ উঁচু-নিচু ধরনের সমতল, যাকে ওরা কৌতুকের সঙ্গে বলে নেপালি ফ্ল্যাট। অর্থাৎ সমতল ঠিকই, তবে পুরোটাই উঁচু-নিচু-মাটি-পাথর মিলিয়ে কঠিন পথ।

আসা-যাওয়ার পথে হিমালয়ের অন্তত কুড়িটি পর্বতশিখর আমরা দেখব। যার মধ্যে রয়েছে সর্বোচ্চ মাউন্ট এভারেস্ট আট হাজার ৮৪৮ মিটার। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পাঁচটি শৃঙ্গের আরো দুটি—লোহেতস আট হাজার ৫০১ মিটার ও মাকালু আট হাজার ৪৫৩ মিটার। আর বাকি পর্বতশিখরগুলোর বেশির ভাগই উচ্চতায় ছয় হাজার মিটারের চেয়ে বেশি।

আজ চার-পাঁচ ঘণ্টা হেঁটে আমরা যাব লুকলা থেকে ফাকদিং। দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। সেটা এখান থেকে ২৩০ মিটার নিচে। ট্রেকিংয়ের শুরুতেই খুমবু-পাসাং রুরাল মিউনিসিপ্যালিটির অফিস। ওদের অনুমতিপত্র নিতে প্রত্যেক ট্রেকারকে দুই হাজার রুপির পর্যটন ফি দিতে হয়। তারপর হাঁটতে শুরু করি। ট্রেকাররা চলেছেন নিজ নিজ গাইড বা পোর্টার সঙ্গে নিয়ে। নারীর সংখ্যাই বেশি। একা অথবা দু-তিনজন নারী একসঙ্গে এসেছেন নানা দেশ থেকে। ট্রেকারদের বেশির ভাগই তরুণ অথবা মধ্যবয়সী। যাঁরা বারবার আসেন, এই অঞ্চল ভালোভাবে চেনেন, তাঁদের একা যেতেও কোনো বাধা নেই। উঁচু-নিচু পথ ধরে হাঁটতে শুরু করি। প্রথম দিকে মনে হয়, এ তো সাধারণ যেকোনো মেঠোপথে হাঁটার মতোই। একটু পরেই বুঝতে পারি, শুরুটা সহজ মনে হলেও আসলে পুরো পথটাই হচ্ছে চড়াই আর উতরাই। কখনো নামতে হবে, কখনো উঠতে হবে।  শুরু হয়ে গেছে আমাদের ট্রেকিং ও পর্বতারোহণ।

প্রকৃতি এখানে বিস্ময়কর। এই প্রথম আমি পাহাড় আর অরণ্যঘেরা জায়গায়, পাহাড়ের এত কাছে এসে দাঁড়িয়েছি এই অনভূতিটাই অপূর্ব। চারদিকে পাইনের বন আর পাহাড়। কাছের পাহাড়গুলো সবুজ বৃক্ষে ঢাকা। তার পেছন থেকে অনেক উঁচুতে উঁকি দিচ্ছে যেসব পর্বতশিখর তাদের চূড়ায় শুভ্র তুষার সকালের রোদে ঝকঝক করছে।

লুকলা ছেড়ে আসার পর কিছুটা নিচে নামতে হয়। নামাটা যত সহজ ভেবেছিলাম ততটা নয়। তার ওপর আছে যখন-তখন পণ্যবাহী প্রাণীর সদলবলে যাওয়া-আসা। এই পাহাড়ি অঞ্চলে কিছুদূর পর পর ট্রেকারদের জন্য লজ আছে। রয়েছে স্থানীয়দের ঘরবাড়ি। শেরপাদের নিজস্ব গ্রাম। এদের সবার যত জিনিসপত্র লাগে সেসব কাঠমাণ্ডু অথবা লুকলা থেকে ওপরের দিকে বয়ে নেওয়ার জন্য নানা রকম প্রাণী আছে। আছে অসংখ্য ঘোড়া, মিউল, মহিষ। ওপরের দিকে বেশি দেখা যায় ইয়াক। এদের প্রত্যেকের কানে ছোট নম্বর প্লেট বসানো রয়েছে। এসব পণ্যবাহী প্রাণী সাধারণত সদলবলে চলে ২০-৩০টি একসঙ্গে। ট্রেকিংয়ের সময়, বিশেষত সেতু পারাপারের আগে সামনে বা পেছনে ঘোড়া অথবা মিউলের দল চলে এলে পথ ছেড়ে দিয়ে আমাদের দাঁড়াতে হয় পাশের কোনো নিরাপদ জায়গায়। এভাবে সময় বেশি লেগে যায়।

বেশ খানিকটা নেমে ছেপলুং নামের একটা জায়গায় পৌঁছে দুধকোশি উপত্যকা ধরে হাঁটি। এটা লুকলার চেয়েও নিচুতে। দুধকোশি। দুধেরই মতো তার রং, সাদা ধবধবে। উদ্দাম বেগে বয়ে চলে। কখনো নদী আমাদের চলার পথের একেবারে কাছে চলে আসে। আবার কখনো আমরা সরে যাই দূরে। আর যখন কাছে আসি তখন দেখতে পাই দুধ সাদা সফেন স্রোতের উচ্ছ্বাস। ওই সাদা সফেন অস্থির তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে আমার ক্লান্তি মুছে যায়।

তিন ঘণ্টা হাঁটার পর খাওয়া কঠিন, তারপর হাঁটা আরো কঠিন। তখনই আসে এক ঘণ্টার চড়াই আর অনেক উঁচুতে একটা ঝুলন্ত সেতু। প্রথম সেতুটাই দীর্ঘ; খুবই রোমাঞ্চিত বোধ করি। সেটাতে ওঠার আগে একপাল ঘোড়ার জন্য পথ ছেড়ে দিতে হয়। তারপর আমরা সেতু পার হই। সেতুর দুই পাশের রেলিংয়ে ছোট ছোট পতাকার মতো করে কাটা নানা রঙের কাপড়ের টুকরো বেঁধে রাখা। এগুলো আসলে প্রেয়ার ফ্ল্যাগ, প্রার্থনাপতাকা। সেতুর অপর পারে আবার চড়াই। হেঁটে হেঁটে ক্রমেই উঁচুতে উঠে যাই। এরই মধ্যে আকাশে মেঘ জমা হয়। চারদিকের দৃশ্য আর রং বদলে যেতে থাকে।

বিকেলে ফাকদিং পৌঁছে যে যার নির্দিষ্ট লজে যাই। ঘরের জানালা থেকে দেখা যায় দুধকোশি নদী আর পেছনের উঁচু পাহাড়। এখানে এমনিতেই ঠাণ্ডা, তার ওপর আসন্ন বৃষ্টির জন্য হিমেল হাওয়া। আলো থাকতে থাকতে লজের চারপাশটা হেঁটে দেখে আসি। বৃষ্টি শুরু হলে চলে যাই দোতলার লাউঞ্জে। এখন সে জায়গাটা সাদা তুষারে ঢাকা। নিচে দুধকোশি নদী আর লজের পেছনে রডোডেনড্রন গাছের ওপর বৃষ্টি পড়ে। দিনের আলো নিভে যায় খুব তাড়াতাড়ি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা