kalerkantho

সোমবার। ৪ মাঘ ১৪২৭। ১৮ জানুয়ারি ২০২১। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

লেখায় নিম্নবর্গীয় মানুষের কথা

বুকার পেলেন ডগলাস স্টুয়ার্ট

দুলাল আল মনসুর

২৭ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বুকার পেলেন ডগলাস স্টুয়ার্ট

২০২০ সালের বুকার পুরস্কার পেলেন স্কটিশ আমেরিকান কথাসাহিত্যিক ডগলাস স্টুয়ার্ট। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘শাগি বেইন’-এর জন্য পেলেন এই পুরস্কার। এই উপন্যাসের কাহিনি তৈরি হয়েছে গ্লাসগো শহরে গত শতকের আশির দশকে লেখকের দেখা জীবন নিয়ে। তাঁর নিজের পরিবারের ছায়া থেকেই গড়ে উঠেছে উপন্যাসের চরিত্রদের অবয়ব।

তাঁর বেড়ে ওঠা এবং সাহিত্যজগতে আগমন সম্পর্কে স্টুয়ার্ট জানান, তাঁদের বাড়িতে সাহিত্যের কোনো বই ছিল না। তবে ছেলেবেলায় বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই তিনি গল্প বলে চলেছেন। ছয় বছরের মতো বয়সে তাঁর চারপাশের সব কিছু কল্পিত কাহিনির মতো মনে হতো। সে জগতের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য তাঁকে অনেক কিছুর ভান করতে হতো। তাঁর চারপাশের অন্য বাচ্চাদের থেকে তিনি দূরে থাকতেন। তারা তাঁকে নিয়ে মজা করার চেষ্টা করলে বাড়িতে গিয়ে কাউকে কিছু জানাতেন না। এমন ভান করতেন, যেন কিছু হয়নি। অন্যদিকে বাড়ির কোনো বিষয়ও বাইরের কাউকে জানাতেন না। চারপাশের মানুষের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার জন্য তিনি গল্প বানিয়ে বলতেন। তিনি কলেজজীবনে ইংরেজি সাহিত্য পড়তে চেয়েছিলেন; কিন্তু তাঁকে নিরুৎসাহ করা হয় এই বলে যে তাঁর মতো পারিবারিক আবহ থেকে উঠে আসা ছাত্র ইংরেজি সাহিত্য পড়ার জন্য উপযুক্ত নন। সুতরাং তাঁর পড়াশোনা ও কর্মজীবন টেক্সটাইলকেন্দ্রিক হয়ে গেল। কর্মব্যস্ত জীবনে গোপনে ‘শাগি বেইন’ লেখা শুরু করেন প্রায় ১২ বছর আগে। কাজে যাওয়ার আগে খুব ভোরে কিংবা অসুস্থ হলে সেদিনও লেখার কাজ করতেন। কর্মজীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়ার কারণে ‘শাগি বেইন’ শুধু নিজের জন্যই লেখেন। কোনো দিন এটা প্রকাশ করবেন তেমন সাহস ও স্বপ্ন তাঁর ছিল না। প্রকাশ করার তাড়না ছিল না বলেই লেখার কাজটা তাঁর কাছে ছিল নির্মল আনন্দ পাওয়ার একটা পথ। শুধু ব্যক্তিগত হিসেবে কিছু লেখা, বাইরের কারো সামনে না আনা এবং বড় বড় প্রত্যাশারহিত লেখা একটা ব্যতিক্রমী বিষয় বটে। স্টুয়ার্ট মনে করেন, এখনকার দিনে মানুষ নিজের ডিনারের মতো তুচ্ছ বিষয়ও ছবি তুলে বিশ্ববাসীর কাছে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে তিনি এমন একটা বই লিখেও গোপন রাখতে চেয়েছেন।

তাঁর উপন্যাসে গ্লাসগোকে হাজির করা সম্পর্কে স্টুয়ার্টের মতামত হলো, মানুষ পরিণত বয়সে যা-ই হোক না কেন, যেখানে যত দূরে যাক না কেন, তার অতীতের জীবন তাকে তথ্য জোগান দিয়ে যায়। নিজের বেড়ে ওঠার শহরে কষ্টের জীবন কাটানোর পরও সে জায়গটাকে তিনি কখনো ছোট করে দেখেন না। তিনি বলেন, ‘আমার নিজের শহরের সঙ্গে টানাপড়েনের সম্পর্ক ছিল ঠিকই; কিন্তু আর কোনো জায়গাকে আমি গ্লাসগোর চেয়ে বেশি ভালোবাসি না।’ তাঁর উপন্যাস ‘শাগি বেইন’ একটি ভালোবাসার উপন্যাস। কঠিন কোনো বিষয় সম্পর্কে সরাসরি বলার বৈশিষ্ট্য স্কটিশদের স্বভাব বলেই মনে করেন তিনি। সেখানে বসবাস করা কঠিন ছিল—এই সত্যকে লুকিয়ে রাখার কিছু নেই। তাঁর শহর বৈপরীত্যে ভরা : ধ্বংস, বঞ্চনা—এসব নেতিবাচক বিষয় সত্ত্বেও সেখানকার মানুষ মনের বলে বলীয়ান থাকে, নিজের শহর নিয়ে গর্ব করতে পারে।

উপন্যাসের শাগির মায়ের মতোই স্টুয়ার্টের মা মারা যান মাদকাসক্তির শিকার হয়ে। তখন স্টুয়ার্টের বয়স মাত্র ১৬ বছর। আত্মজীবনীর সব উপাদান সত্ত্বেও লেখকের স্পষ্ট ও জোরালো ঘোষণা হলো—এটা কথাসাহিত্য, সরাসরি ইতিহাস নয়। এখানে দারিদ্র্য, মানববিদ্বেষ, নেশা, শ্রেণিবিভাজন—সবই আছে। মানুষের জীবনে দুর্দশা ঘটানোর মতো সবই আছে। তবু স্টুয়ার্ট নিজেই মতামত দেন, এই উপন্যাসের প্রধান বিষয় হলো ভালোবাসা। মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা। ত্রুটি ভরা মা-বাবার জন্য সন্তানের মনে এ রকম ভালোবাসার প্রতিনিয়ত নবায়ন ঘটে।

ইংরেজ কথাসাহিত্যিক অ্যালান হলিংহার্স্ট, ফরাসি লেখক এডওয়ার্ড লুইস, আইরিশ স্মৃতিকথাকার ফ্রাংক ম্যাককোর্ট, আমেরিকান কথাসাহিত্যিক হানিয়া ইয়ানাগিহারিয়া প্রমুখ খুব অল্পসংখ্যক লেখক শ্রমজীবী শ্রেণির নিবিড় জীবনচিত্র তুলে ধরেন তাঁদের লেখায়। তাঁদের দলে যুক্ত হলেন ডগলাস স্টুয়ার্ট তাঁর শ্রমজীবী শ্রেণির মানুয়ের পোড়-খাওয়া জীবন নিয়ে।

মন্তব্য