kalerkantho

সোমবার। ৪ মাঘ ১৪২৭। ১৮ জানুয়ারি ২০২১। ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

রফিক আজাদের সঙ্গ

জাহিদ হায়দার

২৭ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



 রফিক আজাদের সঙ্গ

অঙ্কন : মাসুম

তারিখ ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২। টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধুর কাছে কাদেরিয়া বাহিনী অস্ত্রসমর্পণ করবে। সকাল ছয়টা। দাউদের সঙ্গী আমি। গন্তব্য হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল। কবি, কাদেরিয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক আজাদের মোটরসাইকেলে দাউদ যাবে টাঙ্গাইলে। সকাল সাতটার মধ্যে হোটেলের সামনে ওকে থাকতে হবে।

তখন মৌচাক মার্কেট ছিল নির্মাণাধীন। সেখান থেকে গন্তব্য পর্যন্ত রিকশঅলা ভাড়া নিলেন এক টাকা।

গত রাতে দাউদ আমাকে বলেছিল, ‘রফিক আজাদ অন্য রকম মানুষ। তাঁর কবিতা আলাদা। আচরণে কবিসুলভ ভাব নেই। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরেন না। বড় চুল। বড় গোঁফ। যদি দেখতে চাস, যেতে পারিস।’

হোটেলের লবিতে, বাইরে অনেক বিদেশি সাংবাদিক। কেউ কেউ গাড়িতে বড় বড় ক্যামেরা তোলায় ব্যস্ত, যাবেন টাঙ্গাইলে।

সময়ের ব্যবস্থাপনা কবিরা করেন নিজেদের হিসাবমতো। কবি কখন স্বাধীন, কখন স্বেচ্ছাচারী বোঝা মুশকিল। তখন সাতটা দশ। দাউদকে বললাম, ‘কবি কি আসপিনি? মনে হয়, ঘুম তেন ওঠেইনি।’

সম্ভবত রফিক আজাদের ধুলিপীড়িত মোটরসাইকেলের সাইলেন্সার ছিল না। গেরিলার কান যুদ্ধদিনে গুলি ও কামানের যে শব্দ শোনে, তার থেকে সাইলেন্সারের শব্দ তুলনামূলক গ্রাহ্যে ছোট যন্ত্রের গোঙানি মাত্র।

সাইলেন্সারের শব্দে বিদেশি সাংবাদিকদের কাজের ব্যস্ততা ব্যাহত হলো। তাঁদের সঙ্গে আমিও দেখলাম : হেলমেট নেই, মাথা কালচে কাপড়ে বাঁধা, কপাল দেখা যাচ্ছে না, নিচের ঠোঁটের পাশ দিয়ে নেমেছে উদ্ধত গোঁফ, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, ঘাড়ের ওপর পড়ে আছে শুকনো চুল, পোশাক ময়লা, পায়ের জুতোর চামড়ার কী রং ছিল বোঝার উপায় নেই, সব উষ্কখুষ্ক অবস্থা তাঁর আয়ত্তাধীন, ছোট চোখ, চেহারা বাঙালির নয়, মঙ্গোলিয়ানদের মতো বলিষ্ঠ শরীর, উচ্চতা বেশি নয়, এলেন কবি রফিক আজাদ।

ঘড়িতে সাতটা বারো। ‘রফিক ভাই, আমার ছোট ভাই জাহিদ।’ দাউদের কথা শুনে আমার দিকে তাকিয়ে, খুব তাড়া, ‘আচ্ছা, আচ্ছা, ওঠো ওঠো।’ হেসে, সাইকেল স্টার্টেই ছিল, চলে গেলেন। স্বাধীন বাতাসে উড়ছিল কবির চুল। আমার কানের ভেতর ঘুরছিল সাইলেন্সারের ভটভট শব্দ।

ষাটের যে কজন কবিকে নিয়ে, মাকিদ ও দাউদের কাছে ১৯৬৮ থেকে ’৭২ পর্যন্ত, অনেক রকম সত্য বা বানানো গল্প শুনতাম, তাঁদের মধ্যে বারবার নাম আসত রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ ও আবুল হাসানের। তাঁদের জীবনচর্যার বিবিধ রং চিত্রিত যাপন, তাঁরা হয়তো অতটা করেননি, যতটা গল্প বলা হতো।

অগ্রজ রশীদ আমাকে ১৯৭৩-এর মধ্য জুনে বললেন, ‘রফিক আজাদ তোক দেখা ক্যরবের ক্যয়ছে।’ বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের দোতলার একটি ঘরে বসেন রফিক আজাদ, সেলিনা হোসেন ও রশীদ ভাই। সকালে গেলাম। ‘রফিক জাহিদ আসছে।’ বললেন রশীদ ভাই।

রফিক ভাইয়ের সামনে দাঁড়ালে, আন্তরিক আমন্ত্রণ, স্বর নাসারন্ধ্রঘেঁষা, ‘বেটা বসো।’ পিয়নকে বললেন, ‘জাহিদকে চা দাও।’

কারো লেখা পড়ছিলেন, শেষ হলে আমাকে নিয়ে ঘরের বাইরে, তাঁর হাতে আমার কবিতা, এলেন রফিক ভাই। কবিতার একটি শব্দে ছন্দ ভুল এবং দুটি যথাশব্দ নয়। কাগজের মার্জিনে দেখলাম তিনি পরস্পর পরিবর্তনসাপেক্ষ কয়টি শব্দ লাল কালিতে লিখে রেখেছেন। ‘কবিতাটি ভালো লেগেছে, তুমি বলো কোন দুটি শব্দ দেব।’ ‘এই দুটো, আর এই শব্দটি দিলে মাত্রা ঠিক হবে।’ রফিক ভাই হেসে বললেন, ‘আগামী সংখ্যায় যাবে।’ ছাপা হলো ‘উত্তরাধিকার’-এ।

তাঁর রুমে, যত দূর মনে পড়ে, আমার প্রথম পরিচয় হয় শহীদ কাদরী, আরশাদ আজিজ, আবিদ আজাদ, শিহাব সরকার, জাহাঙ্গীরুল ইসলাম, ইমদাদুল হক মিলন, ফিউরি খোন্দকার, ইকবাল হাসান, তাপস মজুমদার ও মাহবুব হাসানের সঙ্গে।

কাঠের সিঁড়ি ভেঙে, এক ইতিবাচক চেতনায় ঋদ্ধ হয়ে নামতে নামতে মনে হলো, রফিক আজাদ তাঁর রুমে বসেই তো আমাকে কবিতার সংশোধনীর কথা বলতে পারতেন? ওই ঘরে তখন সেলিনা আপা ও রশীদ ভাই ছাড়াও যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সামনে একজন তরুণ কবিকে তিনি লজ্জা দিতে চাননি। সম্মান দিয়েছিলেন। পরবর্তী কবিপ্রজন্মকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য এক সৌজন্যশ্রমে তিনি ব্যস্ত।

বর্ধমান হাউজের পেছনে নতুন বিল্ডিংয়ের চারতলায় বসতেন রফিক আজাদ। যখনই ওঁর ওখানে গেছি, দেখেছি, বিভিন্ন বয়সের কজন লেখকের সঙ্গে, আসর প্রশ্নোত্তরে, টীকা-টিপ্পনীতে গুলজার, চলছে আড্ডা। কাপের পর কাপ চা শেষ হচ্ছে। পুড়ছে একটার পর একটা সিগারেট। ঘরের পর্দা হাসির আওয়াজে কেঁপে উঠছে। কখনো চলছে কারো লেখার প্রশংসা, কিছু সমালোচনা।

নেতৃত্বে রফিক আজাদ। কবিতা পড়তে গেছি ময়মনসিংহ সাহিত্য সম্মেলনে। আয়োজকরা ঢাকায় এসে, কাদের আমন্ত্রণ করা যায়, রফিক আজাদের কাছে জানতে চাইলে তিনি আবু সাঈদ জুবেরী ও আমার নাম বলেছিলেন। কবিতাপাঠের পর রাতে, দেশ-বিদেশের সাহিত্য-অসাহিত্য নিয়ে আড্ডা হলো, সঙ্গে ছিলেন কবি মোশাররফ করিম, শামসুল ফয়েজ ও আশরাফ মীর। পাশের ঘরে হেলাল হাফিজ তখন ঘুমে কাতর।

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। ১৯৮০। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর, তাঁকে আমরা ‘সেন্টু ভাই’ বলি, নেতৃত্বে রফিক আজাদ, রশীদ হায়দার, সুরাইয়া খানম স্বামী-পুত্রসহ এবং আমি যাচ্ছি সরকারের আয়োজিত যশোর সাহিত্য সম্মেলনে।

সুরাইয়ার নিরীহ স্বামীর, অবাক হয়েছিলাম, চেহারা ছিল কবি আবুল হাসানের মতো। হাসান ভাইয়ের জীবননিষ্ঠ প্রেমে পড়েছিলেন সুরাইয়া।

আরিচা পর্যন্ত সুন্দর মেজাজের, অনেক রকম রুচিপূর্ণ রসিকতাসহ বিভিন্ন রকম আড্ডা হচ্ছিল। গোয়ালন্দ ঘাটে নেমে গাড়িটা সামনে বেশিদূর যায়ওনি। প্রসঙ্গ উঠল, বাংলাদেশের কোন কোন কবি কবিতার ভাষা ও বিষয়ে নিজস্ব স্বর তৈরি করেছেন। আলোচনার মধ্যে, শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের নাম, আমাদের কবিতার ইতিহাসের পর্ববুননের কারণেই এসেছিল।

শুনেছিলাম, সুরাইয়া একটু মাত্রায় স্কিসৌফ্রেনিক, কেমব্রিজিয়ান ইংরেজিতে হঠাৎ, কণ্ঠে উত্তেজনা ও রাগ, বললেন, বাংলা অনুবাদে যা দাঁড়ায় : ‘শামসুর রাহমানের থেকে আল মাহমুদ বড় কবি, কিন্তু আপনারা একটা গোষ্ঠী প্রচার করেন শামসুর রাহমান বাংলাদেশের প্রধান কবি।’

সেন্টু ভাই, ভরাট, গমগমে স্বরে, তখনো তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ লেখা শুরু করেননি, বিনীতভাবে বললেন, ‘সুরাইয়া, আমরা তো আলোচনা করছি, আমাদের দুজন কবির ঘরানা আলাদা। কিন্তু দুজনই আমাদের ভাষার বড় কবি।’

রফিক ভাইয়ের ছিল শিশুবৎ বিখ্যাত হাসি। হাসলেন। আমাকে ইশারায় বোঝালেন, সুরাইয়াকে আরো রাগাবেন। ওঁর উদ্দেশ্য ছিল, যাত্রাপথের কষ্ট, এই তর্ক ও বিতর্কের মধ্যে খানিকটা মিইয়ে থাকবে। ‘সুরাইয়া, আপনি রাগছেন কেন? সেন্টু ভাই ভুল বলেননি।’ উত্তর দেওয়ার আগে সুরাইয়া সিগারেট ধরালেন, ‘রফিক, আপনারা আমাকে শেখাতে আসবেন না কে কোন মানের কবি।’ রফিক ভাই বললেন, ‘আপনাকে শেখাতে যাব কেন? কার কবিতা টিকবে তা বলবে ভবিষ্যৎ। আমাদের কাজ ভালো কবিতা লেখা।’ সেন্টু ভাইকে রশীদ ভাই বললেন, উদ্দেশ্য : বিতর্ক তুমুল ঝগড়ার জঙ্গলে যাওয়ার আগে তার থেকে নিস্তার পাওয়া, ‘চলুন, গাড়ি থেকে নামি, কোথাও চা খাই।’ সুরাইয়া নামেননি।

যশোরের সরকারি মমিন গার্লস হাই স্কুলের মাঠে হয়েছিল সাহিত্য সম্মেলন। আয়োজকদের মধ্যে ছিলেন তরুণ কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন, আবদুর রব, দারা মাহমুদ ও ফখরে আলম। কবিতাপাঠের সেশনের উপস্থাপক স্টালিন ও একটি মেয়ে।

রফিক ভাই পড়েছিলেন তিনটি কবিতা। সুরাইয়া কবিতা পড়ার আগে, আসার সময় মাইক্রোবাসের মধ্যে চলা ওই বিতর্ক-কথা, যথাপূর্বক রাগ নিয়ে আবার বললেন। উপস্থিত শ্রোতারা বোঝেইনি, সুন্দরীর মূল বক্তব্য কী। মঞ্চে বসে সভাপতি কবি আজিজুল হক অবাক হয়ে শুনছিলেন।

মিড নাইট হোটেলের একটি ঘরের মেঝেতে বসেছি কজন। রাত বেশি না। কেন্দ্রপ্রভা শিল্পী এস এম সুলতান। রফিক ভাই তাঁর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। শিল্পীর বহুমাত্রিক রঙের ব্যবহৃত শিল্প-আড়াল নয়, এক সরল শিশুর জীবনীয় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে, মৃদু হেসে বললেন : ‘আচ্ছা।’

সুলতান তাঁর ঝোলা থেকে বের করলেন কাঠের একটি সুন্দর ছোট থালা, ছুরি ও কলকে। তাঁর কাছে শোনা, ওই সব জরুরি বস্তু উপহার দিয়েছিলেন ভুটানের রাজা। থালার ওপর সুগন্ধি গাঁজা রেখে সুলতান ধ্যানস্থ হাতে কাটছেন, কথা বলছেন শ্রবণসহন মৃদু স্বরে এবং কলকেতে গাঁজা ভরার পর ‘কবি নাও।’ রফিক ভাই হেসে, ‘না না, আপনি প্রথমে’ বললে সুলতান একটি দীর্ঘ টান দিয়ে কলকে দিলেন কবির হাতে। দারা, ফখরে, রব, স্টালিন আর আমার চোখ সুলতানের দিকে। ‘ধোঁয়া ছাড়েন না কেন।’ রফিক ভাই কলকে পাশের জনকে দিলেন। কলকে যখন আরো একজনের ঠোঁট ঘুরে অন্য হাতে গেছে, সুলতান ছাড়লেন ধোঁয়া। উষ্ণ কলকে আরো ঘুরল।

রফিক ভাই ঘুমাবেন সার্কিট হাউসে। যাওয়ার সময় আমাকে বললেন, ‘জানলা খুলে নিচে তাকাবে না।’ বললাম, ‘কেন?’ ‘বিশেষ পাড়া,’ বললেন।

ওই সম্মেলনের প্রসঙ্গ উঠলে স্টালিন ও রব এখনো আমাকে বলেন, ‘আপনার পড়া একটি কবিতার লাইন ছিল : তোমার ঠোঁটে ও স্তনে আমি আজও চুমু দিইনি বলে/পৃথিবীতে যুদ্ধ থামছে না।’

ইত্তেফাক হাউসের ‘সাপ্তাহিক রোববার’-এর সম্পাদক ছিলেন রফিক আজাদ। আমার কবিতা ছাপতেন নিয়মিত। সত্তরের একজন কবি তাঁকে বলেন, ‘জাহিদের কবিতা ঘন ঘন ছাপেন, আমাদের ছাপেন না কেন?’ ‘জাহিদের মতো কবিতা লিখে আনো, ছাপব।’ রফিক ভাইয়ের উত্তরটি আমাকে জানায় ইমদাদুল হক মিলন, ওর দায়িত্ব ছিল রোববারের গল্প দেখা। মিলন, তার বন্ধু ও অনুজদের রোববারে গল্প লেখার জন্য নিয়মিত তাগাদা দিত। রফিক ভাইয়ের লক্ষ্য ছিল, লেখালেখিতে তরুণ প্রজন্ম উঠে আসুক।

১৯৮১। আবু সাঈদ জুবেরী, আহমদ বশীর ও আমার সম্পাদনায় বের হয়েছিল ‘বিপক্ষে’ নামের একটি লিটল ম্যাগ। প্রকাশক ছিলেন মানিক চৌধুরী।

পরিকল্পনা হলো, রফিক আজাদকে আনতে হবে ‘বিপক্ষে’ অফিসে। তাঁর সঙ্গে সারা রাত আড্ডা দিতে হবে। দায়িত্ব নিল বশীর ও আবেদিন কাদের। উত্তম পানীয়, কাবাব ও নান জোগাড় করল পিউ। দেশ-বিদেশের কবিতা আন্দোলনের কথা তুলে কাদের বলল, ‘রফিক ভাই, আপনাদের স্যাড জেনারেশন নতুন কিছু নয়।’

 

‘শোনো মিয়া, এই দেশের পরিপ্রেক্ষিতে পুরনোও নয়। ষাটের দশকে পুরো পৃথিবীর তরুণরা জীবনযাপন ও চিন্তা-চেতনার মধ্যে এক নতুন ধারা এনেছিল। বাংলাদেশের কবিতায়, পড়ে দেখো, নতুন স্বর আমাদের।’ আমরা দ্বিমত করিনি।

রাত চলে গেছে ভোরের দরজায়। ঘর থেকে বের হলাম। পাগুলো বড় রাস্তায়। পেছনে মালিবাগ রেলগেট, সামনে মৌচাক মার্কেট। আকাশ প্রসন্ন নীল। রফিক ভাই রিকশায় উঠে, কী আয়েশ, সিগারেট ধরিয়ে আমাদের উপদেশ দিলেন, ‘বাড়ি গিয়ে গোসল করে ঘুমাও।’

‘আপনার আঙুলে ক্যাটস আই কেন?’ রফিক ভাই জানালেন, মধ্যরাতে বাড়ির দিকে ফেরার পথে এক সন্ন্যাসী তাঁকে ওই আংটি পরিয়েছিলেন। খুলতে জটাধারীর মুখ তাঁর মনে পড়ে।

তখন রফিক ভাই বিরিশিরিতে, ঢাকায় দেখা হলো, ‘বেটা, কত কবি-অকবি গেল আমার ওখানে, তুমি চলে এসো। চাঁদের নিচে আড্ডা হবে।’ যাওয়া হয়নি।

একদিন বললাম : ‘আপনিও পাঞ্জাবি পরলেন।’

‘জিন্সের ওপরে। ঘর ও বয়সের দাবি।’

রফিক আজাদের মৃত মুখ আমি দেখিনি। অদূরে কফিন। মানুষ ফুল দিচ্ছে। কাঠের শীতলতার মধ্যে আমার নিত্য শুভাকাঙ্ক্ষী শায়িত।

মনে পড়ল, ‘বিপক্ষে’ আয়োজিত সেই আড্ডায়, মধ্যরাতে, রফিক ভাই আবৃত্তি করেছিলেন তাঁর প্রিয় কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘যযাতি’ থেকে কিছু পঙক্তি : ‘ভেলা আমি ভাসিয়েছিলুম একদা তাদেরই মতো, আজ এটুকুই আমার পরিচয়।...আমি বিংশ শতাব্দীর সমান বয়সী; মজ্জমান বঙ্গোপসাগরে; বীর নই, তবু জন্মাবধি যুদ্ধে যুদ্ধে, বিপ্লবে বিপ্লবে বিনষ্টির চক্রবৃদ্ধি দেখে, মনুষ্যধর্মের স্তবে নিরুত্তর, অভিব্যক্তিবাদে অবিশ্বাসী, প্রগতিতে যত না পশ্চাদপদ, ততোধিক বিমুখ অতীতে।’

মন্তব্য