kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

যেভাবে গল্প পড়ি ৯

সুবোধ ঘোষের গল্প অযান্ত্রিক

আহমাদ মোস্তফা কামাল

৩০ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বহুবিচিত্র চরিত্র ও অভিজ্ঞতার কোমল-মায়াময়-হৃদয়গ্রাহী গল্প লিখতেন সুবোধ ঘোষ। তাঁর ‘জতুগৃহ’, ‘পরশুরামের কুঠার’, ‘অযান্ত্রিক’, ‘সুন্দরম’, ‘কালপুরুষ’, ‘বারবধূ’—এ রকম কত গল্প নিয়েই তো আলাপ করা যায়; কিন্তু যেহেতু আমাকে বেছে নিতে হচ্ছে একটিমাত্র গল্প, বিশেষ কিছু কারণে ‘অযান্ত্রিক’কে বেছে নিচ্ছি আমি। মানুষের সঙ্গে মানুষের এবং মানুষের সঙ্গে নিসর্গের বিবিধ অনুষঙ্গের সম্পর্ক নিয়ে অনেক লেখকই লিখেছেন; কিন্তু জড় পদার্থের সঙ্গেও যে মানুষের অপূর্ব সম্পর্ক তৈরি হতে পারে সেই বিষয়টি সাহিত্যে খুব সুলভ নয়। এই গল্পটি সেই অদ্ভুত সম্পর্কের মনোগ্রাহী বিবরণ দিয়েছে।

গল্পের শুরুতেই আছে বিমল আর তার ভাঙাচোরা ট্যাক্সির বিবরণ : ‘বিমলের একগুঁয়েমি যেমন অব্যয়, তেমনি অক্ষয় তার ঐ ট্যাক্সিটার পরমায়ু। সাবেক আমলের একটা ফোর্ড, প্রাগৈতিহাসিক গঠন, সর্বাঙ্গে একটা কদর্য দীনতার ছাপ।... তালিমারা হুড, সামনের আর্শিটা ভাঙা, তোবড়ানো বনেট, কালিঝুলি মাখা পরদা আর চারটে চাকার টায়ার পটি লাগানো; সে এক অপূর্ব শ্রী।’

দেখতে কদর্য হলেও গাড়িটি করিতকর্মা। রাস্তায় গর্জন তুলে চলে সে, রাজার মতো, দূর থেকেও সবাই টের পায় বিমলের গাড়ি আসছে। দুর্গম-ভাঙাচোরা-ভয়াবহ জংলীপথে বা ঘোর বর্ষার রাতে কোথাও যাওয়ার জন্য আর কোনো গাড়ি না পাওয়া গেলেও বিমলের গাড়ি প্রস্তুত। তাকে আসতে দেখলে সবাই সভয়ে পথ ছেড়ে দেয়, যতই বিরক্ত হোক না কেন লোকজন, কিচ্ছুটি বলা যাবে না—‘সবচেয়ে বেশি ধুলো ওড়াবে, পথের মোষ ক্ষ্যাপাবে আর কানফাটা আওয়াজ করবে বিমলের গাড়ি। তবু কিছু বলবার জো নেই বিমলকে। চটাং চটাং মুখের ওপর দুকথা উল্টো শুনিয়ে দেবে—মশাই বুঝি কোনো নোংরা কম্ম করেন না, চেঁচান না, দৌড়ান না? যত দোষ করেছে বুঝি আমার গাড়িটা।’

বিদ্রুপ করে লোকে নানা নামে ডাকলেও বিমলের কাছে এই গাড়ি একটা আদরের নাম পেয়েছে—জগদ্দল। ‘এ নামেই বিমল তাকে ডাকে, তার ব্যস্ত-ত্রস্ত কর্মজীবনে সুদীর্ঘ পনেরোটি বছরের সাথী এই যন্ত্রপশুটা, বিমলের সেবক বন্ধু আর অন্নদাতা।’ কিন্তু কেবল অন্নদাতা বলেই যে জগদ্দলের জন্য বিমলের এত ভালোবাসা, তা নয়। তাদের সম্পর্কটি দারুণ মানবিক। জগদ্দলের সব দুঃখ-কষ্ট-বেদনা-আর্তি বিমল বুঝতে পারে। এমনকি তার সঙ্গে কথাও বলে বিমল— “সন্দেহ হতে পারে, বিমল তো ডাকে, কিন্তু সাড়া পায় কি? এটা অন্যের পক্ষে বোঝা কঠিন। কিন্তু বিমল জগদ্দলের প্রতিটি সাধ-আহ্লাদ, আবদার-অভিমান একপলকে বুঝে নিতে পারে।... ‘ভারি তেষ্টা পেয়েছে, না রে জগদ্দল? তাই হাঁসফাঁস কচ্ছিস? দাঁড়া বাবা দাঁড়া।’ জগদ্দলকে রাস্তার পাশে একটা বড় বটগাছের ছায়ায় থামিয়ে কুয়ো থেকে বালতি ভরে ঠাণ্ডা জল আনে, রেডিয়েটরের মুখে ঢেলে দেয় বিমল। বগ বগ করে চার-পাঁচ বালতি জল খেয়ে জগদ্দল শান্ত হয়, আবার চলতে থাকে।” কিংবা—‘কী করব জগদ্দল! এবার তালি নিয়েই কাজ চালা। আসছে পুজোয় ক’টা ভালো রিজার্ভ পেলে তোকে নতুন রেক্সিনের হুড পরাবো, নিশ্চয়।’

শুধু কি বিমল বোঝে জগদ্দলের ভাষা? না, জগদ্দলও বোঝে বিমলকে—‘জগদ্দলও যে মানুষেরই মতো... এই কম্পিটিশনের বাজারে এই বুড়ো জগদ্দলই তো দিন গেলে নিদেন দুটি টাকা তার হাতে তুলে দিচ্ছে! আর তেল খায় কত কম। গ্যালনে সোজা বাইশটি মাইল দৌড়ে যায়। বিমল গরিব, জগদ্দল যেন এই সত্যটুকু বোঝে।’

জগদ্দল সম্পর্কে কোনো কটু মন্তব্য সইতে পারে না বিমল। সহমর্মী ট্যাক্সিচালকরা এই ভাঙাচোরা গাড়ি পাল্টে নতুন গাড়ি কেনার পরামর্শ দিলে সে রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়, নতুন গাড়ি তার কাছে ‘চটকদার হাল-মডেল বেশ্যে’! জগদ্দলের ব্যাপারে কেউ কথা বললেই বিমলের মনে হয়, ওরা যেন তার ‘প্রাইভেট’ ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে! ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে সারা দিন বসে থেকেও ভাড়া জোটে না তার, তবু জগদ্দলের যত্নআত্তির শেষ নেই। হয়তো সে জন্যই অন্য সব গাড়ি এক-আধবার কামাই দিলেও ‘জগদ্দলের উপস্থিতি ছিল সূর্যোদয়ের চেয়েও নিয়মিত ও নিশ্চিত’, দেবতার কাছেও বিমলের একটিই মাত্র প্রার্থনা ছিল, ‘হে বাবা, জগদ্দল যেন বিকল না হয়। এ বয়সে আর সঙ্গীহীন করো না বাবা, দোহাই।’

কিন্তু এভাবে আর কত দিন? জগদ্দলের বয়স হয়েছে, কতই বা আর ভার বইবে সে? একসময় সব কঠিন চড়াই-উতরাই ‘চিতাবাঘের মতো একদমে গোঁ গোঁ করে’ পার হয়ে যেত, এখন সেটি পার হতে তার দম ফুরিয়ে যায়, পিস্টন ভেঙে যায়।... একটা না একটা উপসর্গ লেগেই থাকে।... আজ ফ্যানবেল্ট ছেঁড়ে, কাল কারবুরেটারে তেল পার হয় না, পরশু প্লাগগুলো অচল হয়ে পড়ে শর্ট সার্কিট হয়। ‘উত্কণ্ঠায় বিমলের বুক দুর দুর করে। তবে কি শেষে সত্যই বিমল ছুটি নেবে?’

‘না, আমি আছি জগদ্দল; তোকে সারিয়ে টেনে তুলবই, ভয় নেই।’ বিমল প্রতিজ্ঞা করে। ‘কলকাতায় অর্ডার দিয়ে প্রত্যেকটি জেনুইন কলকব্জা আনিয়ে ফেলে বিমল। নতুন ব্যাটারি, ডিস্ট্রিবিউটর, অ্যাঙ্গেল, পিস্টন—সব আনিয়ে ফেলল। অকৃপণ হাতে শুরু হলো খরচ; প্রয়োজন বুঝলে রাতারাতি তার করে জিনিস আনায়। রাত জেগে খুটখাট মেরামত, পার্টস বদল আর তেলজল চলছে। জগদ্দলকে রোগে ধরেছে, বিমল যেন ক্ষেপে উঠেছে। অর্থাভাব—বেচে ফেলল ঘড়ি, বাসনপত্র, তক্তপোশটা পর্যন্ত।’

না, জগদ্দল কেবল তার অন্নদাতা নয়। অন্নদাতা হলে সর্বস্ব ত্যাগ করে  সারিয়ে তুলতে চাইত না, বরং পাল্টে আরেকটি গাড়ি কিনে নিত। বিমল নিঃসঙ্গ, জগদ্দল তার একমাত্র সঙ্গী, হয়তো জীবনসঙ্গী, কখনো বা সন্তানতুল্য।

অনেক চেষ্টা করেও জগদ্দলকে আর আগের অবস্থায় ফেরাতে পারে না বিমল। তার চেহারা বদলায় বটে, প্রাণশক্তি আর ফেরে না। ‘বিমলের মনের ভেতরে বেদনা ছড়ায় একটা সন্দেহ। জগদ্দল চলছে ঠিকই, কিন্তু কই সেই স্টার্টমাত্র শক্তির উচ্চকিত ফুকার, সেই দর্পিত হ্র্রেষাধ্বনি আর দুরন্ত বনহরিণের গতি?’ নানাভাবে জগদ্দলকে পরীক্ষা করলো সে, কিছুতেই কিছু হলো না, বিমল বুঝে গেল ‘জগদ্দলকে যমে ধরেছে।... এইবার দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামবে। শেষ কড়ি খরচ করেও রইল না জগদ্দল।’

তারপর? লেখকের চোখ-ভিজে-ওঠা অনবদ্য বর্ণনা পড়ুন প্রিয় পাঠক, ‘আমি শুধু রৈনু বাকি... পরিশ্রান্ত বিমল মনে মনে যেন বলে উঠল। কিন্তু আমারও তো হয়ে এসেছে। চুলে পাক ধরেছে, রগগুলো জোঁকের মতো গা ছেয়ে ফেলেছে সব। সেদিনের আর বেশি দেরি নেই, যেদিন জগদ্দলের মতো এমনি করে হাঁপিয়ে আর খুঁড়িয়ে আমাকেও বাতিল হয়ে যেতে হবে।... জগদ্দল আগেই যাবে বলে মনে হচ্ছে, তারপর আমার পালা! যা জগদ্দল, ভালো মনেই বিদেয় দিলাম। অনেক খাইয়েছিস, পরিয়েছিস, আর কত পারবি? আমার যা হবার হবে।’ যা কোনো দিন হয়নি, তাই হলো। ইস্পাতের গুলির মতো শুকনো ঠাণ্ডা বিমলের চোখে দেখা দিল দু ফোঁটা টলমলে উষ্ণ জল।

আহা! কী মায়া এই বর্ণনায়, কী দিব্যকান্তি এই সম্পর্ক! গল্প আসলে এখানেই শেষ, তবু লেখক আরেকটু এগিয়ে দেখেন, বিমল মহুয়ার বোতল নিয়ে নেশা করতে বসেছে আর এক ব্যবসায়ী এসেছে তার কাছ থেকে পুরনো বাতিল হয়ে যাওয়া লোহালক্কড় কিনতে। অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি তখনই ঘটে। তারা জগদ্দলকে কিনতে আসেনি, সে কথা বলার সাহসই নেই তাদের; কিন্তু বিমল তাকে পুরনো লোহালক্কড় হিসেবেই বিক্রি করে দেয়। আর তারপর, ‘শোক আর নেশা। জগদ্দলের পাঁজর খুলে পড়ছে একে একে। বিমলের চৈতন্যও থেকে থেকে কোন অন্তহীন নৈঃশব্দ্যের আবর্তে যেন পাক দিয়ে নেমে যাচ্ছে অতলে। তারপরই লঘুভার হয়ে ভেসে উঠছে ওপরে। এরই মাঝে শুনতে পাচ্ছে বিমল, ঠং ঠং ঠকাং ঠকাং, ছিন্নভিন্ন ও মৃত জগদ্দলের জন্য কারা যেন কবর খুঁড়ছে।’

আমরা যেমন করে আমাদের প্রিয়জনদের শেষবিদায় জানাই, গভীর শোকে যেমন আমাদের চৈতন্য ‘অন্তহীন নৈঃশব্দ্যের আবর্তে’ তলিয়ে যায়, জগদ্দলের শোকে বিমলেরও তেমনই হচ্ছে। তার যে ওই একজনই ছিল আপনজন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা