kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

জীবনানন্দ দাশ ও সিলভিয়া প্লাথ

অসূর্যম্পশ্য হৃদয়সন্ধানী দুই কবির গদ্য

রোখসানা চৌধুরী

৩০ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অসূর্যম্পশ্য হৃদয়সন্ধানী দুই কবির গদ্য

প্লেটো আত্মহত্যাকে আংশিকভাবে যৌক্তিক বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যখন কেউ রাষ্ট্রীয় আইনে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত হয় অথবা দুর্ভাগ্যবশত জীবনধারণে অপারগ হয়, তখন আত্মহনন অনৈতিক নয়। তবে তিনি এটাও বিশ্বাস করতেন, যদি কেউ নিষ্ক্রিয়তা বা কাপুরুষোচিত কারণে এই কাজ করে, তবে সেটা অবশ্যই উৎসাহব্যঞ্জক নয়, বরং শাস্তিযোগ্য অপরাধ (মৃত্যুর পর তাকে কিভাবে শাস্তি দেওয়া যাবে, তা অবশ্য জানা যায়নি)। শোপেনহাওয়ারও আত্মহত্যাকে জীবনের সবচেয়ে বড় স্বস্তি হিসেবে দেখেছেন। ফ্রয়েডীয় মতবাদ বলে, মানুষের আত্মহত্যার স্বাধীনতা থাকা উচিত, যেমনভাবে থাকা উচিত ভালোভাবে বাঁচার অধিকার। মিশেল ফুকোর আজীবন স্বপ্ন ছিল, আত্মহত্যার উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন।

২.

মানুষ আসলে কেন আত্মহত্যা করে? তারা কি জীবনকে ভালোবাসে না? কোন পৃথক রাশিরেখা তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয়, কে জানে?

ইতিহাসের পাতা থেকে দেখা যায়, একই রকম প্রেক্ষাপটে অ্যাডল্ফ হিটলার ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে শত্রুর হাতে আত্মসমর্পণ করার চেয়ে আত্মহত্যাকে বেছে নেন। ঘটনার দিক থেকে এক হলেও কত পৃথক তাদের ভূমিকা, কত ভিন্ন ইতিহাসের রেখাপাত।

বলা বাহুল্য, অন্য সব আত্মহননের ঘটনার মতো এগুলোও রহস্যে আবৃত রয়ে গেছে। হিটলারের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। জীবনানন্দ দাশের আত্মহত্যা প্রমাণিত নয়।

৩.

সিলভিয়া প্লাথের জীবনী থেকে যেটুকু জানা যায়, তাতে তাঁকে অসম্ভব মেধাবী বলেই মনে হয়। ছোটবেলায়ই ছবি এঁকে, কবিতা লিখে পুরস্কার পেয়েছেন। বাবার মৃত্যুর পর থেকে তাঁর ডিপ্রেশনজনিত মানসিক সমস্যার সূত্রপাত ঘটে। অথচ তখনো তিনি সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন। সাত বছরের অসুখী দাম্পত্যকালে দুটি সন্তান নিয়ে কালজয়ী কবিতা লিখেছেন। তাঁর প্রথম আত্মহত্যাচেষ্টার ঘটনাটি ঘটে ১৯৫৩ সালে। অর্থাৎ টেড হিউজকে বিয়ের তিন বছর আগে। অথচ পরকীয়া সম্পর্কের জন্য তাঁদের বিচ্ছেদের মাত্র ছয় মাসের মাথায় প্লাথ সফলভাবে ঘটনাটি ঘটান।

৪.

জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুও এ রকম রহস্যময় হয়ে বিরাজ করছে। কেউ বলছেন আত্মহত্যা, কেউ বলছেন দুর্ঘটনা। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চলছে অন্তহীন চুলচেরা বিচার। তাঁর বেকারত্ব, দাম্পত্য সংকট ইত্যাদি। কুণ্ঠিত স্বভাবের কারণে অনেকে আজকাল তাঁকে সামাজিক প্রতিবন্ধী হিসেবে চিহ্নিত করছেন। লেখার জন্য সামান্য একটা ঘরের আকুতি নিয়ে বেঁচে ছিলেন তিনি। অথচ নিজেই কবিতায় বলে গেছেন, মশা-মাছি-ইঁদুর-প্যাঁচারা জীবনের লোভে বেঁচে থাকে, আর যে মানুষটি সব কিছু পেয়ে যায় তারও বোধের অতীত বিতৃষ্ণায় জীবনাবসান ঘটাতে ইচ্ছা হতে পারে। আবার জীবনে তেমন কোনো বৈষয়িক প্রাপ্তি না থাকলেও সেই বোধে আক্রান্ত হতে পারে সহ্যাতীত সংবেদনশীল মানুষ।

৫.

জীবনানন্দ দাশ ও সিলভিয়া প্লাথ—দুজনেরই মৃত্যুর পর তাঁদের গদ্য সাহিত্য ও ব্যক্তিগত ডায়েরি পাওয়া গেছে।

সিলভিয়া লেখেন—

I can never read all the books i want; i can never be all the people i want and live all the lives i want. I can never train myself in all the skills i want. And why do i want? I want to live and feel all the shades, tones and variations of mental and physical experience possible in life. And i'm horribly limited.

দাশ মহাশয় লেখেন...

পুরুষের পৌরুষ বা সৌন্দর্য... কিছুই আমার নাই... flat nose, short neck and fat ugly appearance... uglily ugly. Can't sing, play, talk... poor voice, poor organizing power, not subtle aggressive or cliques, not adept at flattery.

এই প্রতিতুলনা যেকোনো গবেষকের জন্য দারুণ কৌতূহলোদ্দীপক কাজ হতে পারে। এই লেখাটা তেমন গবেষণা গোছের কিছু নয়, পাঠকের অনুভবজারিত উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

এই দুজনের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যে যেমন, তেমনি মিল রয়েছে তাঁদের অপ্রকাশিত গদ্য সাহিত্যের অন্তর্গত রচনা ভঙ্গিমায়।

দুজনের ভেতরই এক ধরনের মেঠো সারল্য দেখতে পাওয়া যায়। অনির্বচনীয়, প্রায় অবাস্তব এক বিশুদ্ধতার দাবি ছিল যেন জীবনের কাছে তাঁদের।

সিলভিয়া প্লাথের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসে দেখা যায়, প্রেমিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্তে মেয়েটি অনেক দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করে বসে ছেলেটি এখনো ভার্জিন কি না। এবং ভার্জিন না হলেও ঘটনাটি আকস্মিক ছিল কি না। কিন্তু পরিচারিকার সঙ্গে একাধিক মিলিত হওয়ার সহজ স্বীকারোক্তিতে ভেঙে পড়ে মেয়েটি।

সিলভিয়া প্লাথের লেখায় যেমন অবিশ্বস্ত প্রতারক বহুগামী পুরুষের দেখা মেলে, জীবনানন্দ দাশের গল্প-উপন্যাসের নারীরাও সোনার পিতল মূর্তি হয়ে কোথাও বন্দি হয়ে ক্রন্দনরত, কোথাও পণ্য হয়ে।

৬.

জীবনানন্দ দাশের নায়কেরা বিশুদ্ধতাকামী হলেও তারা কেউ আত্মহননে উদ্যত হয় না। ব্যক্তিজীবনেও তাঁর আত্মহত্যাচেষ্টার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। যদিও মৃত্যু ছিল তাঁর প্রিয় প্রসঙ্গ। কবিতা বা গদ্যে ঘুরেফিরে বারবার বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছে। ‘আট বছর আগের একদিন’ বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য নজির, আত্মহত্যাবিষয়ক সন্দর্ভই বলা যায়। একটি মাত্র কবিতা, যেটি নিয়ে আজও বিতর্ক চলমান রয়েছে। ‘কারুবাসনা’ উপন্যাসের নায়ক সুকুমার মাকে জানায় তার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু গলায় দড়ি দিয়ে বা বিষ খেয়ে না, পশ্চিম আকাশের বেগুনি মেঘের ভেতর মিলিয়ে যেতে মন চায়।

৭.

সিলভিয়া আর জীবনানন্দের অপ্রকাশিত গদ্যের মধ্যে যোগসূত্র মূলত কোথায়? তাঁদের স্বল্পায়ু জীবনের ছিঁড়ে যাওয়া-ফেড়ে যাওয়ার আভাস কবিতায় খানিকটা পাওয়া গেলেও সার্থক কবিতা শেষ পর্যন্ত রহস্যময়, বেদনাবিধুর সুন্দরের গোলকধাঁধা। বনলতা সেন তখন নাটোর ছেড়ে নটিংহামেও যাত্রা করতে পারেন।

তাঁদের গদ্যে দিনযাপনজনিত ক্লান্তি আর ক্ষোভের ছবি আছে। জীবনানন্দের উপন্যাসে অপ্রাসঙ্গিক, ধীর লয়ের, দীর্ঘ সব সংলাপ বিনিময় রয়েছে। একই ঘটনা ও চরিত্রের পুনরাবৃত্তি আছে।

তবু কি তাঁদের গদ্য বা কথাসাহিত্যের জগৎ অতীব সরল? তাহলে সিলভিয়ার গল্প কেন অবিরত গৃহবধূদের গল্প বলতে থাকে? ‘ডে অব সাকসেস’ গল্পে দেখা যায়, অ্যালেনের স্বামী একজন লেখক। মেয়েটির জীবন আবর্তিত হয় লেখক স্বামীর সাফল্য-ব্যর্থতাকে কেন্দ্র করে। নিজের লেখকজীবনের গল্পটি তিনি আড়াল করে যান। এমনকি গল্প শেষে এমন একটি ইঙ্গিত দেন, ওই জীবনটাই যেন তার কাম্য। স্বনির্ভর নারীদের প্রতি বিদ্রুপ প্রকাশের মাধ্যমে গল্পটি শেষ হয়। অথচ গল্পটি ভালোভাবে পাঠ করলে ধরা পড়ে, অ্যালেন কখনো মনে মনে নিজেকে অসহায়, বিরক্ত ভঙ্গিতে ‘ন্যাকড়া’ বলে সম্বোধন করছে, কখনো স্বামীর সঙ্গে আহ্লাদিত মুহূর্তকে ‘গেম’ বলে ভাবছে।

৮.

তবু এই সব নান্দনিক ভাবনার ঘূর্ণাবর্তে পাক খেতে খেতে শেষ পর্যন্ত শব্দেরা কথা বলে ওঠে। কালের গর্ভ থেকে তাদের চাপা দিয়ে রাখা ঢাকনা খুলে বেরিয়ে আসতে থাকে বিস্ময়! আত্মহত্যা কিংবা দুর্ঘটনা—যেকোনো রকম মৃত্যুই ব্যর্থ হয়ে যায়। বরং সেই শব্দেরা জবানবন্দি দিয়ে যাক। প্রতিধ্বনি বাজুক চারপাশজুড়ে।

আত্মহত্যা হোক, কিংবা দুর্ঘটনা, জীবনানন্দ দাশ বারবার অমোঘ নিয়তির মতো ট্রামলাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে গেছেন, বিষাক্ত স্পর্শ অনুভব করেও।

সিলভিয়ার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসে আত্মহত্যাচেষ্টার বর্ণনা—‘বোতলের ভেতরের জিনিসগুলো শেষ হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে লাল আর নীল আলো জ্বলতে লাগল। শিশিটা হাত থেকে খসে পড়ে গেল। শুয়ে পড়লাম আমি। তরল পদার্থের মতো গড়িয়ে পড়তে লাগল নিস্তব্ধতা, মেলে ধরতে লাগল আমার জীবনের যত নুড়িপাথর, কড়ি আর ছেঁড়াখোঁড়া অংশবিশেষ। তারপর, দৃষ্টির একেবারে কিনারায় জড়ো হলো সেই নিস্তব্ধতা এবং হ্যাঁচকা টানে আমাকে নিয়ে চলে গেল ঘুমের দেশে।’ (দি বেল জার)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা