kalerkantho

সোমবার । ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৩ নভেম্বর ২০২০। ৭ রবিউস সানি ১৪৪২

সুখ

পলাশ মজুমদার

২৩ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সুখ

অঙ্কন : মাসুম

হঠাৎ এত ধন-সম্পদের মালিক হয়ে যাবেন, তা কয়েক বছর আগেও তৌফিক আলম ভাবেননি। তাঁর অবস্থা এমন হয়েছে, বলা যায়, আঙুল ফুলে কলাগাছ।

বেশির ভাগ আঙুল ফুলে কলাগাছের উত্থানের পেছনে থাকে দুর্নীতি আর অবৈধ সম্পদ অর্জনের কাহিনি। কিন্তু তৌফিক আলমের ক্ষেত্রে তা নয়।

তবু প্রায় সময় তাঁর মনে হয়, এই টাকা ঠিক নিজের নয়। তাঁর কাছে স্রোতের মতো টাকা শুধু আসছে, যেন জাদুকাঠির ছোঁয়ায় রাতারাতি তিনি এখন অঢেল বিত্তবৈভবের অধিকারী।

তৌফিক আলম ছিলেন নির্দিষ্ট বেতনের চাকুরে। মোটামুটি আয় দিয়ে বেশ চলে যাচ্ছিল সংসার; স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে সেখানে অভাব ছিল না সত্য, তবে স্বাচ্ছন্দ্যও ছিল না।

স্থায়ী সম্পদের জন্য তিনি আফসোস করেননি কখনো। আফসোস করার মতো সময় কোথায় তাঁর! তিনি তো সব সময় ডুবে আছেন নিজের মধ্যেই। তাঁর যে নিজস্ব একটি জগৎ আছে, সেখানে তিনি জগদীশ্বর।

তাঁর এ ভাবনার জগৎ নিয়ে স্ত্রী সুরমার অভিযোগের অন্ত ছিল না। প্রায়ই কথা শোনাতেন সুরমা; কিন্তু তিনি কোনো কিছুই কানে নিতেন না। তৌফিক শুধু বলতেন, তুমি তো জেনেশুনে আমাকে বিয়ে করেছ। তখনই শুধু চুপ হয়ে যেতেন সুরমা।

আশপাশে কে কী বলল, তা নিয়ে তিনি কোনো সময় মাথা ঘামাননি। তিনি সব সময় চলেছেন নিজের মতো। তথ্য অধিদপ্তরের সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও তিনি ধরে রেখেছেন পুরনো অভ্যাস।

ছোটবেলা থেকেই ছিল তাঁর বই পড়ার অভ্যাস। বিশেষত সাহিত্য, দর্শন, ভূগোল ও ইতিহাস তাঁর বরাবরই প্রিয়। পড়তে পড়তে চাকরিজীবনের শুরুতে হঠাৎ লেখা শুরু করেন একটি উপন্যাস। প্রায় তিন বছর ধরে একটু একটু করে এটি লিখেছেন তিনি। অনেক দিন ধরে এটি ড্রয়ারের ভেতর ফেলে রেখেছিলেন; ভুলেও গিয়েছিলেন হয়তো।

পাঁচ বছর আগের সেই দিনের কথা তৌফিক আলমের প্রায়ই মনে পড়ে। কেন নজরে পড়ল খরবটা! যদি অনেক সংবাদের মতো এটিও তাঁর নজর এড়িয়ে যেত, তাহলে আজ তাঁর ভাগ্য এখানে এসে দাঁড়াত না।

সেদিন শুক্রবার। সকালবেলায় পত্রিকার পাতা ওল্টাতে গিয়ে তিনি ভেতরের পাতায় হঠাৎ দেখতে পান ছোট্ট খবরটি। একটি জাতীয় দৈনিক ঈদ সংখ্যার জন্য অনূর্ধ্ব ৪০ বছর বয়সী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি আহ্বান করেছে। সঙ্গে সঙ্গে বয়সের হিসাব করেন তৌফিক; দেখেন, ওই তারিখে তাঁর ৪০ বছর হতে এক দিন মাত্র বাকি।

কী ভেবে যেন তত্ক্ষণাৎ বের করেন পাণ্ডুলিপিটি। উল্টেপাল্টে দেখেন। তখনই ল্যাপটপ নামিয়ে শুরু করলেন টাইপ। অফিসের বসকে বিশেষ কাজের কথা বলে ১৫ দিনের ছুটি নিলেন; ডুব দিলেন লেখালেখির মধ্যে। প্রথম ১০ দিনের মধ্যে টাইপ করা শেষ। তারপর শুরু করলেন সম্পাদনা।

প্রতিযোগিতার একেবারে শেষ দিন তিনি উপন্যাসটি মেইল করে পাঠিয়ে দিলেন। পাঠানোর সময়ও তাঁর ধারণা ছিল, এখানে অনেক ভালো ভালো পাণ্ডুলিপি জমা পড়বে; তাঁর লেখাটি পাত্তাই পাবে না।

হঠাৎ একদিন অচেনা নম্বর থেকে ফোন। নিজের পরিচয় দেওয়ার পর কণ্ঠটি তাঁকে জানায়, আপনার পাঠানো উপন্যাস ‘দ্বীপবাসিনী’ আমাদের প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে।

এ কী শুনছেন তিনি! নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

তারপর ঈদ সংখ্যায় ঘোষণা দিয়ে তাঁর উপন্যাস প্রকাশ করল পত্রিকাটি। উপন্যাসের নামের নিচে বড় বড় অক্ষরে তাঁর নিজের নাম দেখে চোখ ছানাবড়া। তিনি অনুমান করতে পারছিলেন, তাঁর জীবনের গতি অন্যদিকে বাঁক নিতে যাচ্ছে।

এদিকে ধন্য ধন্য করতে লাগল পাঠক। এসব শুনে তিনি লাল হয়ে উঠছেন লজ্জায়। কয়েকজন বিশিষ্ট লেখক যখন এই উপন্যাস নিয়ে কথা বললেন, তা নজর কাড়ে পাঠকের। সেই কথাগুলো সংযুক্ত করা হয় বইটির ভূমিকা অংশে। বইমেলায় এক স্বনামধন্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশ করা হয় উপন্যাসটি।

প্রতিযোগিতায় প্রথম না হয় হলেন; কিন্তু উপন্যাসটি যে এত পাঠকপ্রিয়তা পাবে, এক বইমেলায় যে বইটির ছয়টি মুদ্রণ প্রকাশিত হবে, তা তিনি ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেননি। মেলার প্রথম দুই দিনেই প্রথম মুদ্রণ শেষ। প্রথম মুদ্রণে এক হাজার কপি হলেও কাটতি দেখে প্রকাশক পর্যায়ক্রমে প্রতি মুদ্রণে কপি সংখ্যা বাড়াতে থাকেন; যথাক্রমে ১০ হাজার, ২০ হাজার, ৩০ হাজার, ৪০ হাজার এবং সর্বশেষ ৫০ হাজার কপি।

গত পাঁচ বছরে বইটির ৩০টি মুদ্রণ বের হয়ে গেছে। প্রকাশক এই বইয়ের রয়ালটি বাবদ এ পর্যন্ত দিয়ে গেছেন প্রায় ৬০ লাখ টাকা।

সেই মেলা শেষে অন্যান্য প্রকাশকও তাঁর কাছে ধরনা দিয়েছেন উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি দেওয়ার জন্য। প্রকাশকদের এই তীব্র চাহিদা মেটানোর জন্য এই পাঁচ বছরে তিনি উপন্যাস লিখেছেন ২০টি। ওই বইগুলোর রয়ালটি অগ্রিম দিয়ে পাণ্ডুলিপি নিয়ে গেছেন প্রকাশক।

‘দ্বীপবাসিনী’ প্রকাশের এক বছরের মাথায় পেশাগত ব্যাপারে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। দুম করে ছেড়ে দিলেন চাকরি। তিনি ভেবে দেখলেন, চাকরিটা তো আলটিমেটলি টাকার জন্যই। ওই সময় অনুভব করলেন, লিখে তিনি যে আনন্দ পাচ্ছেন, তার সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা চলে না। টাকা, প্রভাব-প্রতিপত্তি, সম্মান-ভালোবাসা তো এর কাছে নস্যি। তবু মনের কোণে খেলা করে এক বিপন্ন বিস্ময়।

চাকরি ছাড়ার বিষয়টিতে তাঁর স্ত্রীরও সায় ছিল। সুরমার এখন তাঁর প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। ঘুরতে ও কেনাকাটা করতে সুরমা খুব পছন্দ করেন; স্বামীর সীমিত আয়ের কারণে ইচ্ছাটা চেপেই রেখেছিলেন। সেই সুযোগ করে দিয়েছে তৌফিক আলমের লেখালেখি।

তাঁর এই অভূতপূর্ব উত্থানে পেছনে লেগে যায় বন্ধুরা। যে বন্ধুর মাধ্যমে তিনি লেখালেখির জগতে পা রাখলেন, তিনিও লাগলেন পেছনে। আত্মীয়-স্বজন টাকার জন্য এসে বসে থাকে। চারদিকে রটে গেছে যে তিনি এখন অনেক টাকার মালিক। প্রয়োজনমতো দিতে পারছেন না বলে তারাও অন্যদের কাছে তাঁর নামে নিন্দা শুরু করে।

তিনি এখন কোথাও বের হতে পারেন না। অটোগ্রাফের জন্য হামলে পড়ে লোকজন। বইমেলায় গেলে পুলিশ প্রটেকশন দিয়ে রাখতে হয়।

তাঁর মনে পড়ে, একসময় তিনি অফিস শেষে পুরো সন্ধ্যা ঘুরে ঘুরে মেলা থেকে বই কিনতেন। কত রকমের বই! বই নিয়ে বাসায় ফিরলে স্ত্রীর বকা শুনতে হতো—এত বই রাখব কোথায়!

যখন তাঁকে কেউ চিনত না, তখন তিনি সব কাজেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। সম্পদের জন্য তিনি কোনোকালেও লালায়িত ছিলেন না। অনেক সময় বলতেন যে তিনি স্থায়ী সম্পদে বিশ্বাস করেন না; স্থায়ী সম্পদ যন্ত্রণার অন্য নাম।

সবাই তাঁর নিরাসক্ত জীবন নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করত। তিনি কোনো কিছু গায়ে মাখতেন না।

বই লিখে তৌফিক শুধু প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হয়েছেন তা নয়, এরই মধ্যে তাঁর কিছু খাস ভক্ত জুটেছে, যারা তাঁর একটু সান্নিধ্য পেতে মরিয়া। কয়েক দিন আগে একজন ধনী ভক্ত, যিনি কর্মসূত্রে ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থান করছেন, তাঁকে সপরিবার আমন্ত্রণ জানান বালি দ্বীপ ভ্রমণের জন্য।

বালিতে দিনচারেক ভ্রমণ শেষে ফেরার সময় নাগুরাহ রাই বিমানবন্দরে বন্ধু সজলের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সজলও পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন। তিনি এখন একটি বেসরকারি ব্যাংকের ডিএমডি।

তৌফিকের টাকা-পয়সা হওয়ার আগে সুরমা বারবার সজলের সঙ্গে তুলনা করতেন। হঠাৎ সুরমার সেই পুরনো কথাগুলো মনে পড়ে তাঁর। সুরমাকেও তা মনে করিয়ে দিলেন। কিছু না বলে সুরমা শুধু মুচকি হাসেন।

ভিআইপি লাউঞ্জে বসে কথা বলার সময় সজলের কথায় বারবার প্রকাশ পায় যে তাঁর সাফল্যে সজল ঈর্ষাকাতর; কী নেই তাঁর! নাম-যশ-অর্থবিত্ত। কাঙ্ক্ষিত নারীর ভালোবাসা। পেয়েছেন মনের মতো জীবন। একজন মানুষের জীবনে আর কী চাই।

সজল তাঁকে আরো বলেন, দেখো, আমাদের দুজনেরই আজ অনেক টাকা। কোনো অভাব নেই। পার্থক্য শুধু আমাকে কেউ চেনে না। মরলে পরিবারের লোক ছাড়া কেউ কাঁদবে না। আর তোমার জন্য কাঁদবে দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্ত। তুমি মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে।

সজলের মুখে এসব প্রশংসা শুনে তৌফিক তাত্ক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখান না। একপর্যায়ে তিনি বলেন, আমি বরং আগেই ভালো ছিলাম।

মন্তব্য