kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ কার্তিক ১৪২৭। ৩০ অক্টোবর ২০২০। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বই আলোচনা

মুক্তিযুদ্ধের সচিত্র সংকলন

গৌরবময় স্বাধীনতা, সম্পাদক,মাছুম আহাম্মদ ভূঞা, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ

২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মুক্তিযুদ্ধের সচিত্র সংকলন

এলএফও হচ্ছে পাকিস্তানের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের একটি ফরমান, যা আদতে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের নীতিমালা। এই নীতিমালার বিরোধী ছিলেন ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতারা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এই নীতিমালা মেনে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। সেই সময়ের কেন্দ্রীয় নেতাদের একজন আ ক ম মোজাম্মেল হক, যিনি বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। সেই ঘটনার স্মৃতিচারণায় তিনি জানাচ্ছেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একটি সভায় মিলিত হয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এলএফও মেনে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে প্রবল আপত্তি জানান। ২৬ জন ছাত্রলীগ নেতা তীব্র সমালোচনা করে বক্তব্য দেন। মোজাম্মেল ছিলেন সেই সভার দ্বিতীয় বক্তা। ছাত্রলীগ নেতাদের বক্তব্য শেষ হলে বঙ্গবন্ধু দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘খবধফবত্ং ষবধফং, যব রং হড়ঃ ষবফ নু ড়ঃযবত্ং। এই নির্বাচন ক্ষমতায় যাবার নির্বাচন নয়। এই নির্বাচনকে স্বাধীনতার পক্ষে রেফারেন্ডাম হিসেবে গণ্য করে কাজ করে যা। জনসভায় সুস্পষ্টভাবে বলবি, ৬ দফা পাকিস্তানিরা না মেনে নিলে ১ দফার (অর্থাৎ স্বাধীনতা) আন্দোলন হবে। নির্বাচনকে জনমত গঠনের সর্বোত্তম সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। বাঙালির নেতা কে হবে তাও নির্বাচনের মাধ্যমে ঠিক করতে হবে। বাঙালিরা আমার পক্ষে রায় দিলে কীভাবে এলএফও লাথি মেরে বুড়িগঙ্গা পার করে সিন্ধু নদীতে ফেলে দিতে হয়, তা আমার জানা আছে। স্বাধীনতাই আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য। আমার উপর বিশ্বাস রেখে কাজ করে যা।’

এভাবে বঙ্গবন্ধুর জীবনের নানা ঘটনা তুলে ধরেছেন সেই সময়ের তরুণ মোজাম্মেল হক। তাঁর লেখাটির শিরোনাম, ‘আমার নেতা বঙ্গবন্ধু’। ‘গৌরবময় স্বাধীনতা’ সংকলনে লেখাটি স্থান পেয়েছে। এটি মূলত একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সচিত্র সংকলন। প্রকাশ করেছে ঢাকা জেলা পুলিশ। প্রচ্ছদ এঁকেছেন গৌতম ঘোষ।

এই সংকলনে মোট আটটি প্রবন্ধ রয়েছে। যার মধ্যে শামসুজ্জামান খান ও মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখাও রয়েছে। সেলিনা হোসেন ও সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের দুটি গল্প রয়েছে। ৩৪৮ পাতার এই সংকলনের ২৫৬ পাতা জুড়ে রয়েছে আলোকচিত্র। এগুলো দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগের শিরোনাম ‘আলোকচিত্রে বঙ্গবন্ধু ও মহান মুক্তিযুদ্ধ।’ আরেক ভাগ ‘আলোকচিত্রে গৌরবময় বিজয় ও গৌরবময় স্বাধীনতা’।

এই সংকলনের সম্পাদক ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের  ডেপুটি কমিশনার (ক্রাইম) মাছুম আহাম্মদ ভূঞা। বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিচিত্র ও বর্ণিল আলোকচিত্র সংগ্রহে সম্পাদক যে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন, তার তারিফ করতেই হয়। বিশেষ করে ছবি বাছাইয়ে সম্পাদক যথেষ্ট নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ ছিলেন। দু-একটা উদাহরণ দিলেই পাঠকদের কাছে বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যাবে। এই সংকলনে যেমন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বা মাওলানা ভাসানীর মতো নেতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছবি আছে। তেমনি আছে একজন ভিখারিনির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছবিও। যিনি বঙ্গবন্ধুকে নির্বাচনী প্রচারণার সময় এক টাকা উপহার দিয়েছিলেন। ১১০ নম্বর পাতার একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক নিরাপত্তাকর্মীর হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু একসঙ্গে খাবেন বলে। অনুমান করা যায়, এই নিরাপত্তাকর্মী ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরে তাঁর বাড়ির পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন। এই ছবি দেখে চমকে উঠেছিলাম এ কারণে যে আজকের বাংলাদেশে তো অনেক নেতা আছেন। কিন্তু বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীকে হাত ধরে টেনে এনে কেউ খাইয়েছেন বলে তো শুনিনি। এর মানে বঙ্গবন্ধু যে আদর্শ নেতা, তা শুধু মুখের কথা নয়, বাস্তবেও তিনি তাই ছিলেন।

এভাবে আলোকচিত্র অংশে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর জীবনের নানা দিক ফুটে উঠেছে। অগ্নিযুগের দুর্লভ আলোকচিত্র সংবলিত এই সংকলনের জন্য আমরা এর সম্পাদককে সাধুবাদ জানাই।

►হানযালা হান

মন্তব্য