kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বিষণ্ন প্রহর

আব্দুল্লাহ আল মামুন আশরাফী

২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিষণ্ন প্রহর

অঙ্কন : মাসুম

গভীর রাত। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ জোছনা ছড়াচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদের ‘চান্নি পসর রাইত’ চলছে। চারপাশটা বড্ড নিস্তব্ধ। ওই দূরে শেয়ালের হাঁক শোনা যাচ্ছে। থেমে থেমে দমকা হাওয়াও বইছে। প্রকৃতিটাকে বড় অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে ওই খোলা মাঠটায় একাকী বসে আছে শিবলী। রাতের খাবার খেয়ে ডায়েরির ধূসর পাখায় কিছু আঁকিবুঁকি করে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় সে। ঘুম আসছে না। আল মাহমুদের ছোটগল্প সংকলনটা হাতে নেয়। ‘পানকৌড়ির রক্ত’ গল্পটা পড়া শুরু করে। ‘প্রথমে কালো পাখিটাকে আমি দেখিনি। আমার লক্ষ ছিলো....’। গল্পের আদিনা চরিত্রটি বঙ্গ দেশের হাজার বছরের লাজুক বধূর নতুন সংস্করণ ঠেকছে। যেন চিরচেনা বাঙালি নারীর প্রশান্ত উপস্থিতি। যাদের কথা মনে হলেই হৃদয় অলিন্দে ভালো লাগার পুবালি সমীরণ বয়ে যায়। ‘আমার কথা শুনে আদিনা মুখে কাপড় চাপা দিয়ে এমনভাবে হেসে উঠেছিল যে, হাসির কাঁপুনিতে তার পিঠটা নুয়ে পড়ছিলো। সে হাসতে হাসতেই আশেপাশে পেছনে চেয়ে দেখছিল, শেষে কেউ আবার আমাদের স্বামী-স্ত্রীর হাসিটা দেখে ফেলে এ ভয়ে আদিনা তদস্থ...’। অনুভূতির কী অসাধারণ চিত্রায়ণ! এ যেন চিরকালের অনন্য বাস্তবতা।

বাংলা সাহিত্যের রাজপুত্র মীর আবদুশ শাকুর আল মাহমুদ শিবলীর সবচেয়ে প্রিয় লেখকদের শীর্ষে। আল মাহমুদের গদ্য-কবিতা দুটিই তার ভীষণ প্রিয়। প্রিয় কবির লেখা তাকে চুম্বকের মতো টানে। কী যে এক ভালো লাগার প্রলেপ মাখানো থাকে প্রিয় কবির লেখার প্রতিটি ছত্রে। শিবলীর জীবনের একটি বড় কষ্ট প্রিয় কবিকে নয়নভরে দেখতে না পারা। সেই শৈশব থেকে প্রিয় কবিকে হৃদয়মন উজাড় করে ভালোবেসে গেলাম কিন্তু তাকে একপলক দেখার সুযোগ পেলাম না। ভাবতেই ওর ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কষ্ট খানিকটা কমেছে এ জন্য যে গত শবেবরাতের আগের শবেবরাতে সে বি-বাড়িয়ার মৌড়াইলে গিয়ে প্রিয় কবির কবর জিয়ারত করেছে। কবরটি একেবারেই নতুন। সদ্যঃপ্রয়াত কবির এপিটাফে ‘স্মৃতির মেঘলা ভোরে’ কবিতার প্রথম চারটি লাইন লেখা রয়েছে :

‘কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে

মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;

অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহর আলো অন্ধকারে

ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।’

‘পানকৌড়ির রক্ত’ গল্পটির চার-পাঁচ পৃষ্ঠা পড়ে শিবলী বইটি রেখে দেয়। বিছানায় এপিঠ-ওপিঠ করছে। কিছুই ভালো লাগছে না। ঘুমও আসছে না। কদিন ধরে ফেসবুকও তার কাছে ভালো লাগছে না। কভিড-১৯ করোনাভাইরাসে পুরো পৃথিবী বিপর্যস্ত। চারদিকে মৃত্যুর অনিঃশেষ মিছিল। আতঙ্কে কাটে সারাটা বেলা। কখন জানি কার মৃত্যুর ভয়ংকর হিমশীতল সংবাদ চলে আসে। ফেসবুকের টাইমলাইন জুড়ে মৃত্যুর সংবাদ। প্রায় চার মাস হতে চলল লকডাউন চলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। শিবলীদের আইআইইউসিতে অনলাইনে ক্লাস চলছে। সে আইনের ওপর অনার্স করছে। ফেসবুকে অসহায় কর্মহীন মানুষের মলিন চেহারাগুলো শিবলীর ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে দিচ্ছে। দিন আনে দিন খায় পরিবারগুলোর কী ভয়াবহ অবস্থা! সরকার কর্মহীন পরিবারগুলোর জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছে। ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকেই ত্রাণকাজে অংশগ্রহণ করছে। শিবলী নিজেও বেশ কয়েকবার অসহায় পরিবারের আর্থিক সহায়তায় অংশগ্রহণ করেছে। বরাবরের মতো এবারও ব্যাপকভাবে দুর্গত মানুষের দ্বারে দ্বারে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে। আর্তমানবতার সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করছে।

রাতটা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। শিবলীর চিন্তাজুড়ে কেবলই অসহায় মানুষ বিরাজ করছে। পাশের বাড়ির আব্দুল্লাহর বাবা শিক্ষকতা করতেন। প্রায় চার মাস ধরে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ। প্রথম কিছুদিন কিছু পেলেও আজ তিন মাস ধরে কিছুই পাচ্ছেন না। মা-বাবা, সন্তানাদি মিলে আটজনের পরিবার। এলাকার জনপ্রতিনিধির খাটের নিচে সয়াবিন তেলের ‘ফ্যাক্টরি’  পাওয়া গেছে। পুকুরে পাওয়া গেছে চালের ‘খনি’। এলাকায় চায়ের কাপে ঝড়। কাদের আমরা ভোট দিয়ে ‘জনসেবার’ আসনে বসাই। ওরা কি কখনো ‘মানুষ’ হবে না।

চার দিন হলো আব্দুল্লাহর বাবার জ্বর। সঙ্গে কাশিও আছে। লকডাউনের পুরো সময়টায় তিনি কখনো দিনমজুরির কাজ করেছেন, কখনো অটোরিকশা চালিয়েছেন। এখন আর বের হতে পারছেন না। শিবলীর আব্বু গতকাল আব্দুল্লাহদের পরিবারে খাবার পাঠিয়েছে। শিবলী নিজেও গোপনে তার জমানো কিছু টাকা ওদের দিয়ে এসেছে।

মানুষকে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করতে পারলেই ওর হৃদয়জুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। বিশেষত এই করোনাকালে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ওর হৃদয়টাকে জর্জরিত করছে ক্ষণে ক্ষণে। পুঁজিবাদী মানসিকতা সমাজটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলছে। একদিকে সম্পদের পাহাড়, অন্যদিকে দুবেলা দুমুঠো আহার জোটানোও ভীষণ দায়। একদিকে অপচয়ের মহোৎসব, অন্যদিকে জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটাতেই রীতিমতো হিমশিম খাওয়া। সমাজের বিত্তশালীরা অসহায় মানুষগুলোর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। আমজনতা বৈষম্যের জাঁতাকলে পিষ্ট। তাদের দেখার যেন কেউ নেই। অসহায় দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের আর্তচিৎকার কেবল ইথারেই মিশে যায়। এই দুঃসহ করোনাকালে দিন আনে দিন খায় মানুষের দুর্ভোগের কথা ভেবে শিবলীর দুই চোখে বেদনার তপ্ত অশ্রু চিকচিক করতে থাকে।

মাঠের দক্ষিণ দিকে আব্দুল্লাহদের বাড়ি। ওদিক থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। ছোট বাচ্চার কান্নার আওয়াজ মনে হচ্ছে। বড় করুণ ঠেকছে সে আওয়াজ। শিবলী আকাশের দিকে চেয়ে আছে। এক খণ্ড মেঘ চাঁদটাকে ঢেকে ফেলছে। বিষণ্ন প্রহর। পৃথিবীটা ক্রমেই অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে। ভীষণ অন্ধকার।

মন্তব্য