kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

গ্রামোফোন গ্রামোফোন

অমর মিত্র

২ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



গ্রামোফোন গ্রামোফোন

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

নিউ ইয়র্কের কুইন্স সিটিতে বাড়ি কিনেছেন লতা। বাড়ি, বাড়ির পেছনে ক্ষেত, বাগান... মার্ক চাষ করেন। লতা বিয়ে করেছেন মার্ক সায়েবকে। মার্ক রুশি আমেরিকান। লতা আর মার্ক সায়েবের যৌথ জীবন শান্ত। সাড়ে ছয় ফুট লম্বা মার্ক সায়েব ছুটির দিনে ধুতি-পাঞ্জাবি কিংবা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরেন। হাত দিয়ে ভাত মেখে খান। হল্যান্ড থেকে ৫০ বছর আগে তাঁর মা নাতালিয়ার আনা গ্রামোফোনে রবীন্দ্রনাথের গান শোনেন, এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর! লতার গলায় গলায় জোড়েন আঞ্জুমান আরা বেগমের গানে, ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল, বাতাসের আছে কিছু গন্ধ...।’ তা বাদ দিয়ে তিনি আইন ব্যবসা করেন। ওকালতি। লুত্ফুন্নাহার লতা তাঁর স্বামী মার্ক সায়েবকে বলছেন, মার্ক, পৃথিবীতে কত গান, এই পৃথিবীতে যেমন অস্ত্র তৈরি হয়, মানুষ মারার ভাইরাস ছড়িয়ে যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি গান রচনা হয়, সুর রচনা হয়, শয়তানের চেয়ে ভাবুকের সংখ্যা বেশি, মার্ক শোনো, জীবন মরণ সীমানা ছাড়ায়ে বন্ধু হে..., মার্ক, তিন দিন আগে সমীর মারা গেছে।

সেই যে আগের বছর, ১৪২৬-এ, নববর্ষ উৎসব হলো ১৪ এপ্রিল, বাংলা নিউ ইয়ার, ম্যানহাটান লিংকন হলে গান-বাজনা হলো, ‘ডাকঘর’ নাটক হলো, কবিরাজের রোল করেছিল সমীর, আমি মেকআপ ছাড়া দেখিনি, তবে ও আড়ালেই থাকে, দুটি নাটকে দেখেছিলাম।

মার্ক বললেন, সুমি, আমি সুমিকে চিনি?

সুমি ভালো অভিনয় করে, গানের গলাও সুন্দর, একবার এক ইন্ডিয়ান রাইটার এলো, রায় আমাদের ডেকেছিল, আমরা গেলাম, সুমি গান গাইল, এই গান, জীবন মরণ সীমানা ছাড়ায়ে...সেদিন সমীর আসেনি, এলে আলাপ হতো।

মার্ক জিজ্ঞেস করলেন, সুমি কোনো জব করে?

করে, একটা চেন স্টোরে অ্যাকাউন্টস দ্যাখে, সে আর কত পায়!

সুমি নিউ ইয়র্কের বাঙালিদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের খুব চেনা মুখ। এখানে বাংলাদেশিদের গ্রুপ থিয়েটার বলতে যেটি আছে, রক্তকরবী, সেই গ্রুপের থিয়েটারে সুমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন অভিনেত্রী। দুপুরের দিকে সমীরের মৃত্যুসংবাদ দিল লিলি রহমান। লতা আপা গো, সুমি নিঃস্ব হয়ে গেল। প্রবাসে দৈবের বশে, জীবতারাটি খসে গেল। শোনার পর আর কাজে মন বসছিল না লতার। চেন স্টোরে কাজ করে দুটি বাচ্চাকে বড় করে তুলতে হবে। পারবে, না ফিরে যাবে দেশে। সমীর বড় চাকরি করত। হায়রে। সুমির বাড়ি নড়াইল। মধুমতী নদীর ধারের গ্রাম ছায়াপুর। ছায়াপুর, আহা ছায়াপুর। বাবা সন্তানকে ছায়া দেয়, মা সন্তানকে ছায়া দেয়। স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে। প্রেমিক প্রেমিকাকে। সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। সুমি দুটি ছেলে-মেয়ে নিয়ে কী করে সোজা হয়ে দাঁড়াবে সেটা যেমন আছে, তার চেয়ে বেশি হলো এই মানসিক ট্রমা সে কেমন করে সামলাবে? বাচ্চাদের সে কেমন করে এই আকস্মিক মর্মান্তিক মৃত্যুর ধাক্কা থেকে আবার সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফেরাবে! মার্ক, বলতে পারো, সুমি কি করে বাঁচবে বাকি জীবন?

মার্ক বললেন, আমি জানি না, তোমার কবি বলতে পারত, টেগোর।

লতার অনেক কাজ। কবিতার জন্য রান্না করে নিয়ে যেতে হবে। ওর করোনা হয়েছে, হোম আইসোলেশনে আছে। রান্না করা ভাত, শ্যামন মাছের কারি, চিকেন, সবজি, রুটি—বেশ কয়েক দিনের জন্য নিয়ে যেতে হবে। এরই ভেতর সমীরের মৃত্যুসংবাদ। লতার ভেতরে ঝিমঝিমে ভাব আসছে। এত অবসাদ। ছায়াপুরের সমীর ছায়াপুরের সুমিতাকে বিয়ে করেছিল প্রেম করে। সুমি কি পারবে একা এই বিদেশবিভুঁয়ে টিকে থাকতে? ছায়া দেবে কে?

কবিতাকে কথা দিয়েছিল লতা, ওর জন্য হলুদ বেশি দেওয়া রান্না খাবার দিয়ে আসবে। কবিতা একা থাকে। বিয়ে করেনি। ইঞ্জিনিয়ার। আনন্দময়ী। কী করবে ভেবে পায় না। ওর জন্য কয়েক দিনের খাবার রান্না করে নিয়ে যাওয়ার কথা। সমীরের জন্য হাহাকার করতে করতে কোনো মতে রান্না শেষ করে রাত ৯টার দিকে লতা চলল এস্টোরিয়ার ২৩ নম্বর স্ট্রিটে। শ্যামন মাছের কারি, বরবটি, কুমড়ো, রাঙা আলু, কাঁচকলা, টমেটো... এই সব দিয়ে মিক্সড ভেজিটেবল কারি। এ তো আর স্বাভাবিক সময় নয়, এ হলো করোনাকাল। ঘরে গিয়ে দেওয়ার উপায় তো নেই, তাই বাড়ির সিঁড়িতে খাবার রেখে মেয়েটাকে ফোন করে বলল, ফুড দিয়ে যাচ্ছি, নিয়ে নিয়ো। কবিতার গলার স্বর এত করুণ, বলল, খুব দুর্বল হয়ে গেছি আপা। ফিরতে ফিরতে মনে পড়ল সমীরের মৃত্যুসংবাদে এতই মন খারাপ গেল সারা দিন, এত ব্যস্ত ছিল যে একবার ফোন করে খবর নেওয়া হয়নি কবিতা মেয়েটা কেমন আছে।

সিঁড়িতে খাবার রেখে মার্ক আর লতা এলোমেলো ঘুরলেন নিউ ইয়র্কের রাস্তায়। সারা দিন তো বেরোনো হয় না। বেরোল যখন শহরটা কেমন আছে একা একা, দেখে নিই। খাবার রাখার পরই কবিতার মেসেজ পেয়েছিল লতা। খাবার নিয়ে গেছে সিঁড়ি থেকে। খাবার খেতে আরম্ভ করেছে সে। মুখে স্বাদ নেই। তবু খাচ্ছে। খেতে হবেই। প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে হবেই। লতারা বাড়ি ফিরল রাত ১১টা নাগাদ। এস্টোরিয়া-২৩ নম্বর পথ কাছেই, যেতে-আসতে মিনিট কুড়ি-পঁচিশ। বাকি সময় তারা ঘুরেছে নিঝুম নগরে। নগর কেমন রুপোর কাঠির ছোঁয়ায় ঘুমিয়ে পড়েছে। টাইমস স্কয়ার যাবেন মার্ক? মার্ক বলেছিলেন, চলো যাই। তারপর শূন্য পথে ইস্ট নদী পার হয়ে ম্যানহাটান হয়ে টাইমস স্কয়ার। সব বন্ধ। সারা রাত যে নগর জেগে থাকে, সেই নগর জনশূন্য হয়ে গেছে বুঝি। ব্রডওয়ে থিয়েটার এই সময়ে ভাঙে। এখান থেকে সবাই টাইমস স্কয়ারে গিয়ে দাঁড়ায়। কেউ কোথাও নেই। এক বৃদ্ধ দ্রুত পায়ে রাস্তা পার হয়ে হাঁটতে লাগল ম্যানহাটানের পথে। মার্ক বললেন, কেমন ভয় করছে লতা, ঘোস্ট স্কয়ার হয়ে গেছে টাইমস স্কয়ার।

কেউ নেই। শুধু বিলবোর্ডগুলো জ্বলছে-নিভছে। ব্যবসা বন্ধ, কিন্তু এসব রয়েছে। দেখার কেউ নেই। বিজ্ঞাপনের সুন্দর মুখের নারী-পুরুষ এবার বিলবোর্ড থেকে নেমে আসবে নিচে, আচমকা তাই মনে হলো লতার। মন হু হু করছে সুমির জন্য। এই মুহূর্তে সে কেমন আছে? এখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের সান্নিধ্য। একটি কোমল হাতের একটুখানি ছোঁয়া। বিকেলে ঘরের কাজ করতে করতে ফোন করেছিল শিরিন বকুলকে। ওরা একই গ্রুপে থিয়েটার করে। খবর পেয়েছে, কিন্তু বেরোতে পারছে না। ভয় করছে আপা, ভয় করছে। যে কেউ যেকোনো সময় চলে যেতে পারে। রেন্ডম কিছু ঘটছে। যাকে পারছে ধরে নিচ্ছে ভাইরাস। সমীর ভাই খুব সাবধানি মানুষ ছিল। তবু কিভাবে ওকেই ধরে নিল করোনাভাইরাস। সুমির হয়নি পাশাপাশি থেকে। বাচ্চারাও ভালো আছে।

গৃহে অন্তরীণ লতা ঘরের কাজই শুধু করে। চুপ করে বসে থাকা যায় না তো। বসলেই অবসাদ আসে। মার্ক বলেন, তুমি মুক্তিযুদ্ধের দেশের মানুষ, ভয় পাও কেন, মুক্তিযুদ্ধ এক বিপ্লব। আমিও রুশ বিপ্লবের দেশের মানুষ লতা। পৃথিবীতে কোনো কিছুই দীর্ঘজীবী হয় না। কিন্তু আদর্শ টিকে থাকে। নির্ভয় হও লতা।

লতা চুপ করে থাকে।

হায়! পৃথিবীতে এখন মৃত্যুর মিছিল। চেনা মানুষরা চলে যাচ্ছে। তবু আমি ঘর সাজাই, কাপড় গোছাই, কিচেন পরিষ্কার করি। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার চালাই, ব্যালকনির গাছে জল দিই। মার্ক বাড়ির পেছনের জমির ঘাস ছাঁটে। পেছনে বাগান। লাউ-কুমড়ো চাষ করেন মার্ক। ফুলগাছ লাগিয়েছেন। দোপাটি, করবী, কাঠগোলাপ। লতাও বাগানের কাজ করে। মার্ক দেয়ালের পেইন্টিং নামিয়ে যত্ন করে মোছে। আমাদের কাজের শেষ নেই। ঘর গোছানো, ঘর সাজানো শেষ হয় না। কাপড় ধোয়া, বাসন ধোয়া, চায়ের কাপ, গ্লাস, প্লেট ধোয়ামোছা কিছুই শেষ হয় না। সব গুছিয়ে যখন ওপরে গেলাম ততক্ষণে ঝুম ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। রাত দেড়টা। এত রাত অবধি কিসের কাজ? কে আসবে আমাদের বাড়ি? কেউ না। সেই ফেব্রুয়ারির তৃতীয় রবিবার আমরা বসেছিলাম। দেশ দিবস। দেশ মানে বাংলাদেশ। একুশে স্মরণ করা হলো। মার্কের পরিকল্পনা এটি। সেদিন সুমি আসেনি। অনেকে এসেছিল। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’ ৭ই ফাল্গুন। তারপর আর কেউ আসেনি। কভিড-১৯ এসে গেল। সব মনে পড়ছে এখন। বৃষ্টি হয়ে নামছে পুরনো সব দিন। ঘুম আসছে। তবু মোবাইল খুলল লতা। মার্ক ঘুমিয়ে পড়েছেন। লতা ঘুমের আগে ফেসবুকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল, আচমকা দেখল, ঢাকা থেকে রুহেল ভাই জরুরি মেসেজ দিয়েছেন মেয়ের খবর না পেয়ে। কবিতা তাঁর মেয়ে। তাঁর মনে হয়েছে মেয়ে হাসপাতালে। ফোনে পাচ্ছেন না। মেসেজের জবাব পাচ্ছেন না, অথচ মেসেজ ঢুকছে। লতারা ফিরেছে রাত ১১টা নাগাদ, কবিতার ওখানে গিয়েছিল রাত ৯-৩০ নাগাদ। মনে হয় কবিতা ভালোই ছিল। লতা ফোন নিয়ে বিছানা থেকে নেমে অন্য ঘরে গেল উদ্বেগ নিয়ে। মার্ক ঘুমোক। সে কবিতার অ্যাপার্টমেন্ট হাউসের সিকিউরিটিতে ফোন করল। হ্যাঁ, ওর বাবা যা ভেবেছেন ঠিক তাই। মেয়ে হাসপাতালে। রাত ১১টায় সিকিউরিটিকে দিয়ে ইমার্জেন্সি অ্যাম্বুল্যান্স ডেকে সে হাসপাতালে চলে গেছে। এস্টোরিয়ায় কবিতার বাসার কাছেই মাউন্ট সায়নাই হাসপাতাল। সিকিউরিটি বলল, শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। অক্সিজেন কমে যাচ্ছিল ফুসফুস থেকে।

বাইরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। আকাশ থেকে কান্না ঝরে পড়ছে। রুহেল ভাইকে সে বলেছিল, কবিতার দায়িত্ব তার। কড় কড় কড়—মেঘের ডাক শুনছে লতা। কবিতা বেঁচে আছে তো। ভয় লাগে। মৃত্যু এত স্বাভাবিক হয়ে গেছে, যে কেউ চলে যেতে পারে গভীর অন্ধকারে। লতা হাসপাতালে ফোন করল গাইড দেখে। ইমার্জেন্সি বলল, হ্যাঁ, সে হাসপাতালে। কথা বলা যাবে না। অবস্থা সংকটজনক। হ্যাঁ, বেঁচে আছে। হায় আল্লাহ।

লতার ঘুম আসে না। চুপ করে বসে থাকল। আজ সুধার সঙ্গে কথা হয়নি। সুধা ও জাভেদ দুজনেরই করোনা পজিটিভ হয়েছিল তিন সপ্তাহ আগে। সুধা আগে সুস্থ হয়েছে, কিন্তু জাভেদ ক্রমেই সংকটের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। শ্বাসকষ্ট শুরু হলো তার। অক্সিমিটারে দেখা গেল ফুসফুসে অক্সিজেন কম ঢুকছে। তখন জাভেদকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। একেবারে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ঢুকে গেল সে। ভেন্টিলেশনে। জীবন-মরণের সীমানায় পৌঁছে গিয়েছিল জাভেদ। তখন সুধার খুব উদ্বেগ গেছে। লতা তাকে ফোন করত, লতাকে সে ফোন করত। লতা খোঁজ নিত সব দিন। এক সপ্তাহ হাইফ্রিকোয়েন্সি অক্সিজেন দিয়ে জাভেদকে মরণের দুয়ার থেকে ফিরিয়ে এনেছে হাসপাতাল। গত পরশুই জাভেদ বাড়ি ফিরেছে। সুধা মেসেজ করেছিল। জাভেদ ফোন করেছিল।

আপা, তোমাকে না বলে পারছি না, জীবনের ওপারটা দেখে এলাম, কদিন কী ভয়ানক সব স্বপ্ন, না দুঃস্বপ্নের ঘোরে কেটেছে লতা আপা, আমি এক বিরান ও বিজনভূমির ভেতরে একা, আকাশ কালো হয়ে আছে, দেখে মনে হচ্ছিল ওখানে একটা নগর ছিল, নেই, সেখানে দুটি লোক হাজির, একজন বুকে হাত রেখে বলল, সে আজরাইল, আমার মৃত্যুর দিনক্ষণ হিসাব করে যাচ্ছে, আর একজন হলো তারই দোসর, একজন যে টাইম বলছে, অন্যজনের সঙ্গে তা মিলছে না, দুজন শেষে বলল, তাদের ভেতর সমঝোতা দরকার, মতের অমিল হলে হবে না।

লতা বলেছিল, থাক জাভেদ, ওসব ভুলে যাও।

ভুলতে পারছি না আপা, ওদের মধ্যে সমঝোতা হয়নি বলে আমি বাড়ি ফিরতে পারলাম, ওরা যেন ইস্ট ওয়েস্ট, এ দেশ সে দেশ, ওদের মিটিং হতে লাগল আমার ডেথ টাইম নিয়ে, আমি সময় পেয়ে গেলাম, ডাক্তাররা সময় পেয়ে গেল..., ধীরে ধীরে কালো আকাশ, বিরান বিজনভূমি মুছে যেতে লাগল, লোক দুটির চিহ্ন লুপ্ত হতে লাগল..., আমি চোখ মেললাম।

একজন মৃত্যুকে হারিয়ে ঘরে তো ফিরল।

মার্ক উঠে এসেছেন, ঘুমাতে যাবে না লতা?

কবিতা হাসপাতালে, ভেন্টিলেশনে, আমাদের দেওয়া খাবার খেয়েই হাসপাতালে গেছে।

মার্ক সামনের সোফায় বসে পড়লেন। বাইরে আকাশ ভেঙে পড়েছে। বৃষ্টির শব্দ, বজ্রপাত, মেঘে ভেতরে বিদ্যুতের ঝলক, চিকুর হানা... এর ভেতরে তারা দুজন চঞ্চল, উচ্ছ্বল মেয়েটির কথা ভাবতে লাগল। এখন আবার সেই দুজন, আজরাইল এবং তার দোসর হিসাব কষছে, আসলে পরেরজন জীবনদূত, সে ঘোরে আজরাইলের পিছু পিছু, পারলে মৃত্যু পিছিয়ে দেয়... লতা বিড়বিড় করছিল।

মার্ক বললেন, লতা, গান শুনি।

হ্যাঁ মার্ক।

মার্ক রেকর্ড বসাল বৃদ্ধ গ্রামোফোনে। এইটা সে রেখেছে বাঁচিয়ে। মস্ত বড় চোঙা, ৭৮, ৪৫ লংপ্লেয়িং রেকর্ড। তাদের সংগ্রহ কম নয়। কতবার যন্ত্র থেমে যেতে যেতে যায়নি। একবার ভাবা হয়েছিল, একেবারেই গেছে, বাতিল, বাইরে রেখে আসতে হবে, সিটি করপোরেশনের লোক নিয়ে গিয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দেবে। কিন্তু মার্ক পেরেছেন। আবার গেয়ে উঠেছেন—যন্ত্র, আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার, পরাণ সখা বন্ধু হে আমার...। লতা অবাক হয়ে মার্কের দিকে তাকিয়ে আছে। গ্রামোফোন গ্রামোফোন, তুমি বেজেছ বলে কবিতা ফিরে আসবে।

মন্তব্য